হলি ক্রস কলেজ। ঢাকার ফার্মগেটের ব্যস্ত বড় রাস্তার ঠিক পাশে। কলেজের মূল ভবনের তিন তলার এক ক্লাসে মাথায় হাত রেখে অঙ্ক করতে দেখা যায় অরিত্র বৈরাগীকে। সরকারি বিজ্ঞান কলেজের অরিত্র গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করছে। একই রুমে দেখা গেল ঢাকা শহরের নানা কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। সবাই ভীষণ মনোযোগী। পরীক্ষার হলে পিনপতন নিরবতা।
গণিত অলিম্পিয়াডের পর শুরু হয় সাইকোলজি অলিম্পিয়াড। অরিত্র বলে, ‘বন্ধুদের নিয়ে হলি ক্রস কলেজের বিজ্ঞান উৎসবে এসেছি। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে এই আয়োজনে। অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন কিছুটা কঠিন মনে হলেও চেষ্টা করেছি ভালো করতে। অলিম্পিয়াড শেষ করে বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রজেক্ট দেখতে যাব।’ তার পাশেই দেখা যায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহকে। ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চাওয়া আব্দুল্লাহ জানায়, ‘বিজ্ঞানের উৎসব মানেই নতুন কিছু জানার সুযোগ। বন্ধুদের নিয়ে ছুটির দিনে সেই সাতসকালে চলে এসেছি। উদ্বোধনী আয়োজনে দেশবরেণ্য বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের কথা শোনার সুযোগ পাই। ভীষণ উপভোগ করছি এই উৎসব।’
অরিত্র, আবদুল্লাহর মতো এমন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে দেখা গেল হলি ক্রস কলেজের ২১তম আন্তঃকলেজ বিজ্ঞান উৎসবে। হলি ক্রস কলেজ সায়েন্স ক্লাবের শিক্ষার্থীরা এবারের আয়োজনে ঢাকার সব কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। কলেজ প্রাঙ্গণে এ উৎসবের নানা আয়োজনে ঢাকার প্রায় ৫০টি কলেজের শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।
গত ১০ মে, শুক্রবার হলি ক্রস কলেজে শুরু হয় এই আন্তঃকলেজ বিজ্ঞান উৎসব। উদ্বোধনী আয়োজনে অতিথি হিসেবে ছিলেন শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প সোনালী ব্যাগের উদ্ভাবক বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। উদ্বোধনী আয়োজনে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে এবং বিজ্ঞানবিষয়ক কাজে আরও সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
হলি ক্রস কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী মোসা. তুনা জানায়, ‘আমি মানবিক বিষয়ে পড়লেও বিজ্ঞানে ভীষণ আগ্রহী। ভবিষ্যতে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই। দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিজ্ঞানমুখী সমাধানের চেষ্টা করব। বিভিন্ন বিজ্ঞানবিষয়ক প্রজেক্ট থেকে আমি অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। অন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সুযোগ পেয়েছি। এ ধরনের আয়োজন সব শিক্ষার্থীকে নেটওয়ার্কিং ও নতুন কিছু জানার সুযোগ করে দেয়। আজ প্রথম আমি পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প তৈরির কথা জেনেছি। আমি বিজ্ঞানীদের এমন কাজের খবর জেনে দারুণ আগ্রহ পাচ্ছি।’
দুদিনের এ আয়োজনে বিজ্ঞান ও গণিত অলিম্পিয়াড, পোস্টার প্রদর্শনী, বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রজেক্ট প্রদর্শনী করছে কলেজশিক্ষার্থীরা। উৎসবে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাড়াও মানবিক ও ব্যবসায়ে শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি ছিল রুবিকস কিউবসহ আরও নানা ধরনের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ তৈরির উৎসাহ ও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানমুখী করে তুলতে হলি ক্রস আন্তঃকলেজ বিজ্ঞান উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে।
কলেজে বিজ্ঞান পড়ুক বা না পড়ুক, মহাবিশ্ব নিয়ে জানার আগ্রহ রয়েছে অনেকেরই। এ বছর বিজ্ঞানে কোন বিষয়ে নোবেল দেওয়া হবে, তা নিয়ে আছে অনেক কৌতূহল।
বিজ্ঞানের নানা আয়োজন আগ্রহী করেছে শিক্ষার্থীদের
বিজ্ঞানীদের নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক আগ্রহ। কলেজে বিজ্ঞান পড়ুক বা না পড়ুক, মহাবিশ্ব নিয়ে জানার আগ্রহ রয়েছে অনেকেরই। এ বছর বিজ্ঞানে কোন বিষয়ে নোবেল দেওয়া হবে, তা নিয়ে আছে অনেক কৌতূহল। সেই কৌতূহলের উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে দিতে এই বিজ্ঞানায়োজনে ছিল নানা চমক। বিজ্ঞান ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সামিহা মুত্তাকীয়া জানায়, ‘মানব মন হচ্ছে ফিনিক্স পাখির মতো। সব সময় উড়তে চায়। বিজ্ঞানের চমকে আলোড়িত হতে চায়। বিজ্ঞান উৎসবে নানা ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরছে। সব শিক্ষার্থীর জন্য গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, রসায়ন অলিম্পিয়াড, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, সাইকোলজি অলিম্পিয়াডের মতো অনন্য সব অলিম্পিয়াড আমরা আয়োজন করেছি। এ ছাড়াও প্রজেক্ট ডিসপ্লে, বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে স্ক্র্যাপবুক, দেয়ালচিত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে কলেজ প্রাঙণে।’
বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মাহফুজুর রহমান জানায়, ‘আমি পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চাই। বিজ্ঞানের এমন আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আমি আনন্দিত। হলি ক্রস কলেজের অলিম্পিয়াডের প্রশ্নের ধরন বেশ কঠিন ও আধুনিক বলে মনে হয়েছে আমার।’
কলেজ প্রাঙ্গণে দেখা হয় রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের তিন শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সিদ্দিক, আহনাফ হোসাইন ও স্মিথা হোসেনের সঙ্গে। দলনেতা আহনাফ জানায়, ‘বাংলাদেশের কৃষি সংকট মোকাবেলায় আমরা একটি প্রজেক্ট তৈরি করেছি। আসছে সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে চমক তৈরি করবে। আমরা সেই চমক নিয়ে একটি বিজ্ঞানবিষয়ক প্রজেক্ট বানিয়েছি।’
অন্যদিকে পাশেই দেখা গেল আরডুইনোর এক প্রকল্প নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভীড়। সেই প্রকল্পের সদস্য সেঁজুতি তাবাসসুম শ্রেয়া ও সিদরাতুল মুনতাহা। সিদরাতুল জানায়, ‘এমনিতেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারী বিজ্ঞানীদের কম উপস্থিতি দেখি আমরা। এই বিজ্ঞান মেলায় আমরা আরডুইনোর একটি প্রকল্প উপস্থাপন করছি। আমরা বলতে চাই, বিজ্ঞানে নারীরাও পিছিয়ে নেই।’
এ উৎসবে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহের নানা বিষয় উপস্থাপনের সুযোগ হচ্ছে। বিজ্ঞানবিষয়ক অসংখ্য প্রজেক্ট দেখা যাচ্ছে।
উৎসবের রঙে রঙিন কলেজ ক্যাম্পাস
হলি ক্রস আন্তঃকলেজ বিজ্ঞান উৎসবের রঙে পুরো ক্যাম্পাসে নানা রঙের ছাপ। কলেজ ক্যাম্পাসে পা রাখতেই দেখা মিলবে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনীর বিশাল পোস্টার। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখা গেল, আইনস্টাইন থেকে শুরু করে বিভিন্ন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীসহ বিজ্ঞান দুনিয়ার নানা বিষয় ক্যাম্পাসে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কলেজের বিজ্ঞান ক্লাবের সব শিক্ষার্থীকেই দেখা গেল অনেক ব্যস্ত। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে নানা ব্যবস্থাপনায় দেখা যায় স্মিথা তাবাসসুম, জান্নাত শিকদার, মাধুরী মজুমদার, অনন্যা মেহজাবীন, মাইশা তাসনীমসহ অনেককে। মাইশা তাসনীম জানায়, ‘এ উৎসবে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহের নানা বিষয় উপস্থাপনের সুযোগ হচ্ছে। বিজ্ঞানবিষয়ক অসংখ্য প্রজেক্ট দেখা যাচ্ছে। কৃষি, জলবায়ু থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর অসংখ্য প্রজেক্টের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমরা। দুই দিনের এ আয়োজনে শিক্ষার্থীরা উপহার হিসেবে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা জেতার সুযোগ পেয়েছে।’
হলি ক্রস আন্তঃকলেজ বিজ্ঞান উৎসবের টাইটেল সহযোগী তীর (সিটি গ্রুপ), শিক্ষা সহযোগী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই আয়োজনে যুক্ত রয়েছে গোল্ডমার্ক, জা এন জি, গো গ্রিন, প্রথমা প্রকাশন ও যমুনা টিভি।