বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের চিন্তার খোরাক জোগাতে দশক পার করল বিজ্ঞানচিন্তা

এক যুগ আগের কথা। তখন সদ্য স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়েছি; ইলেকট্রনের কথা, ইলেকট্রন-আয়ন মিথস্ক্রিয়ার কথা, পরমাণুর অভ্যন্তরের সদস্যদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, তারা কোন কোন কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত, তাদের মাঝে আবার কী সব টান টান করছে—এই সব হাবিজাবি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। শুধু যে তত্ত্বকথা ভেবে চলেছি এমন নয়, মাঝে মাঝে মনে হতো, এই যে ইলেকট্রন নিয়ে এত কাণ্ডকারখানা, এদের দেখতে কী রকম? কোয়ান্টাম তত্ত্বের শুরুর দিকে আমরা জেনেছি, ইলেকট্রন তরঙ্গও হতে পারে আবার কণাও হতে পারে।

বাস্তবে যদি ইলেকট্রনকে আমরা দেখতে পেতাম, তাহলে কেমন একই অঙ্গে এই দুটি রূপ দেখা যেত? মানে হাবিজাবি সব প্রশ্ন আরকি! এখনকার মতো চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির বাড়বাড়ন্ত সে সময় ছিল না। গুগল অবশ্য ছিল, কিন্তু সব সময় আমার আজগুবি প্রশ্নের উত্তর পেতাম না। পরিচিত অধ্যাপকদের জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা পেতাম, পাছে যদি কেউ প্রশ্নগুলো অবান্তর ভেবে বসেন!

এক দিন এক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। ভদ্রলোক বললেন, ‘বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে যদি তোমার মাথায় অবান্তর প্রশ্ন না আসে, তবে তুমি বিজ্ঞান পড়ছ না।’ সত্যি তো! আমরা তো কোনো অচিনপুরের মানুষের জীবন-জীবিকার কথা পড়ছি না। আর বিজ্ঞান তো সতত চলমান; কালকের আবিষ্কৃত তত্ত্বকে আজ আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না, এই রকম স্বৈরাচারী ধারণা বিজ্ঞানে চলে না। সে না হয় বোঝা গেল, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের পাতায় যে সব ভদ্রস্থ কথা লেখা আছে, সেখানে তো আর আমার মনের খোরাক মিটবে না। খোঁজ করতে থাকলাম গুগলে। পাচ্ছি বেশ কিছুই, কিন্তু বেশির ভাগই সাহেবি ভাষায়। হঠাৎ নজরে এল বিজ্ঞানচিন্তা নামক এক প্ল্যাটফর্ম মাতৃভাষায় বিভিন্ন আজগুবি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে। খুব মজা পেলাম। অবসরে একটার পর একটা আজগুবি বিষয় পড়তে থাকি বিজ্ঞানচিন্তার পাতায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানচিন্তার কলেবর চোখে পড়েছে। মহাকাশবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়নসহ মৌলিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় আলাদা আলাদা তাক আবিষ্কার করেছি। শুধু বড়দের মনের খোরাক নয়, জায়গা পেয়েছে শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রশ্নোত্তর। ‘মোবাইল চার্জ করতে কী পরিমাণ খরচ হয়’ বা ‘সিলিং ফ্যানগুলোতে সচরাচর তিনটি পাখা থাকে কেন’—এই জাতীয় জীবনমুখী প্রশ্নও নজরে আসে প্রথম আলোর এই প্রয়াসের সৌজন্যে। এরই বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়তে পড়তে জানতে পারি নিউ সায়েন্টিস্ট, সায়েন্স, পপুলার মেকানিকসসহ পৃথিবীখ্যাত বিজ্ঞান ম্যাগাজিনগুলোর কথা।

আসলে আমাদের পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে কখনোই আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার আভাস পাওয়া যায় না; বেশিরভাগই শতাব্দীপ্রাচীন বা নিদেনপক্ষে পঞ্চাশ বছরের আগের বিজ্ঞান। এ কথা সত্যি যে বুনিয়াদি শিক্ষা ব্যতীত আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা বোঝা সম্ভব নয়। সেই বুনিয়াদি বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী গবেষণা হচ্ছে জানতে পারলে শিক্ষার্থীদের একটু ঝোঁক বাড়ে; তারা আনন্দিত হয়। সেই উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞান ম্যাগাজিনগুলোর জন্ম। ইংরেজি, জার্মানসহ অন্যান্য ভাষায় অনেক আগে থেকেই এসবের প্রচলন রয়েছে। বাংলাতে ছাপা পত্রিকা কিছু আছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুব কম। সেগুলোতে আবার গত মাসে কী কী আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণা হয়েছে, তার হদিস বড্ড মেলে না। যদিও বেশিরভাগের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের ধারা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ছাপার পরিবর্তে যদি একটি সর্বাঙ্গসুন্দর ওয়েব প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়, তাহলে কম খরচে অনেক বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো যায়; আর মোবাইল তো এখন প্রত্যেকের হাতে হাতে। বিগত এক দশক ধরে বিজ্ঞানচিন্তা সেই কাজটাই যত্ন করে করে আসছে।

গবেষণার সময় দেখেছি, সুপারভাইজাররা যখন নতুন কোনো কাজের জন্য এক গণ্ডা গবেষণাপত্র হাতে ধরিয়ে দিতেন, তা পড়ে বোঝা বেশ শক্ত ছিল; প্রথম প্রথম তো দাঁত বসানো যেত না। সেই জায়গায় বিজ্ঞানচিন্তার পাতায় কোনো নতুন গবেষণার কথা লেখকেরা যে সাবলীলভাবে তুলে ধরেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিজ্ঞানচিন্তার পথচলা আরও সহজ ও মসৃণ হোক, যাতে বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষার্থীরা আগামীতে বলতে পারে, আমাদের ’স্পেস ডটকম’ বা ফিজিকস ডটঅর্গ’ নেই তো কী হয়েছে, বিজ্ঞানচিন্তা তো আছে!

লেখক: গবেষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক বিজ্ঞান পরীক্ষাগার, কলকাতা, ভারত