বরিশাল বিজ্ঞান উৎসব সরগরম

এক মঞ্চে বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসবের বরিশাল আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথি, স্বেচ্ছাসেবকসহ সবাই

সকাল থেকেই সূয্যিমামা বেশ রাগ দেখাচ্ছেন। গরমে টেকা দায়। আবহাওয়া ভ্যাপসা। বৃষ্টি আসি আসি করেও রাতে আসেনি। পড়বি তো পড়, একেবারে মালির ঘাড়ে—রবিবাবুর কবিতার সেই দৃশ্যের মতো বিজ্ঞান উৎসব চলাকালে একদম সময়মতো বৃষ্টি এসে হানা দেবে কি না, সেই চিন্তা (কিংবা দুশ্চিন্তা) বারবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছে মনে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সকাল ৮টার খানিক পরে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের (বিএম স্কুল) সামনে রিকশা থেকে নেমে পড়লাম।

নামার পরে আর চিন্তার সময়-সুযোগ—কোনোটাই রইল না। ইতিমধ্যেই শ খানেক শিক্ষার্থী চলে এসেছে। মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। যারা প্রজেক্ট নিয়ে এসেছে, তাদের প্রজেক্ট সাজিয়ে বসার ব্যবস্থা; কুইজে আগ্রহীদের সিট প্ল্যান দেখাসহ নানা ঘটনা ঘটছে সমান তালে। সবখানেই খুদে বিজ্ঞানীদের নানা প্রশ্ন—সে সব সামলে নিচ্ছেন বরিশাল বন্ধুসভার বন্ধুরা।

ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসবের উদ্বোধনী মুহূর্তে অতিথিবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা

ঢুকে দেখি, বরিশাল একাডেমিক টিমও প্রস্তুত। প্রকল্প দেখেশুনে বিচারের কাজটি করবেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই ঘুরে-ফিরে দেখছেন। জমজমাট উৎসবের আমেজ দেখে মন ভালো হয়ে গেল। বহুবার শুনেছি, বরিশালে বিজ্ঞানে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কম। সেই ধারণা ভেঙে পড়ল ঘণ্টা পেরোনোর আগেই। সকাল সোয়া ৯টায় যখন উদ্বোধনী পর্ব শুরু হলো, ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের মাঠে তখন প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।

আরও পড়ুন

এই সময় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বিএম স্কুলের অধ্যক্ষ ও ভেন্যু প্রধান মো. মোমিন হাওলাদার। উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন বিকাশের রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট সায়মা আহসান এবং বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর বরিশাল প্রতিনিধি জসীম উদ্দিন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হেনা রাণী বিশ্বাস, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম এবং ঝালকাঠি সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গৌতম কুমার সাহা, বিকাশের রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান, বিজ্ঞানচিন্তার সহসম্পাদক কাজী আকাশ এবং উচ্ছ্বাস তৌসিফসহ আরও অনেকে। এ সময় ভেন্যু প্রধান অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা

খুদে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই অস্থির। দ্রুত চলে গেল কুইজের নির্ধারিত কক্ষে। ওদিকে প্রজেক্ট পর্বে সবাই বসে পড়েছে প্রজেক্ট সাজিয়ে। সেখানে আছে অভিনব গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগীসহ আরও অনেক কিছু। সারা পড়ে গেছে পুরো ভেন্যুতে। প্রায় ৫৫টি স্কুলের ৬০০ শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই উপস্থিত; দেখা গেল প্রকল্পও এসেছে প্রায় অর্ধশতাধিক!

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালে শিক্ষার্থীদের একাংশ

আধাঘণ্টার মধ্যেই কুইজ শেষ। মঞ্চে শুরু হলো বক্তৃতা পর্ব। সায়মা আহসান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। আজকের কিশোর-কিশোরীরাই আমাদের এগিয়ে নেবে। আমি তোমাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখে খুব খুশি হয়েছি। তোমাদের সমৃদ্ধি কামনা করছি।’

আরও পড়ুন

এরপর জসিম উদ্দিন শিক্ষার্থীদের বললেন, ‘আজ তোমরা দেখিয়ে দিয়েছ, বরিশালের শিক্ষার্থীরাও কোনো দিক থেকে কম যায় না। তোমরা দারুণ সব প্রকল্প নিয়ে এসেছ। এই পর্বের বিজয়ীরা জাতীয় পর্বে সারাদেশের মেধাবীদের সঙ্গে লড়াই করবে। আমার বিশ্বাস, সেখানেও তোমরা কোনোদিক থেকে পিছিয়ে থাকবে না।’

এরপর গান। বরিশাল বন্ধুসভার নাঈম আর জিহাদ ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি’ গেয়ে মঞ্চ মাতান। গলা মিলায় খুদে বিজ্ঞানীরা। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হলে দেখতেন, শিক্ষার্থীরা গলা মিলিয়ে গান গাইছে। দেশের গান। এরচেয়ে সুন্দর কোনো দৃশ্য কি আর হয়? ওদিকে অতিথিরা ঘুরে দেখছেন প্রজেক্ট, দেখছে একাডেমিক টিমও। এই পর্যায়ে মঞ্চে এলেন জাদুকর রাজীব বসাক। এলেন, দেখলেন এবং মঞ্চ মাতালেন। তাঁর মজার সব রসিকতায় শিক্ষার্থীরা হেসে কুটি কুটি। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা জাদুকরের দিকে ছুড়ে দিল খালি হাতের অদৃশ্য ডাকটিকিট। দেখা গেল, জাদুকরের হাতের কারিকুরিতে বইয়ের সাদা পাতা ভরে গেছে রঙিন ডাকটিকিটে। শুধু জাদু দেখানোই নয়, এর পেছনের কার্যকারণটাও ব্যাখ্যা করলেন তিনি।

এরপর প্রশ্নোত্তর পর্ব। মঞ্চে উপস্থিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হেনা রাণী বিশ্বাস, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম এবং ঝালকাঠি সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গৌতম কুমার সাহা। সঞ্চালনা করছি আমি নিজে। শিক্ষার্থীদের কঠিন সব প্রশ্ন শুনে রীতিমতো হকচকিয়ে যেতে হলো। ‘পানির নিচের উদ্ভিদেরা কার্বন ডাই-অক্সাইড কোথায় পায়?’, ‘একমাত্রিক বা দ্বি-মাত্রিক বস্তুর অস্তিত্ব কি বাস্তবে আছে?’—এমন অদ্ভুত, কিন্তু সাহসী সব প্রশ্ন। শিক্ষকেরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিলেন ধৈর্য নিয়ে।

কুইজ প্রতিযোগিতা চলাকালে শিক্ষার্থীদের একাংশ

এরপর শুরু হলো পুরস্কার বিতরণী। বিজ্ঞান কুইজের নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০ জন এবং বিজ্ঞান প্রজেক্টে পুরস্কার পেল ৯টি প্রকল্প। এর মধ্যে সেরাদের সেরা প্রকল্পটি একাই একশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিএম স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এস. এম. সাইফান শাফি। সেরার স্বীকৃতি তাকে না দিয়ে উপায় কী!

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালে শিক্ষার্থীদের একাংশ

বিজয়ী শিক্ষার্থীরা একযোগে উল্লাসরত অবস্থায় ছবি তুলল অতিথিদের সঙ্গে, কেউ কেউ রসিকতা করে মন ভালো করে দিল মঞ্চে উপস্থিত সবার। এভাবেই পর্দা নামল বরিশালের সরগরম বিজ্ঞান উৎসবের।

আরও পড়ুন