এ বছর জুন মাসে বাংলা একাডেমি থেকে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। ইউক্লিডের এলিমেন্টস (প্রথম পর্ব)। প্রায় ২ হাজার ৩০০ বছর ধরে মানবসভ্যতায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসা গণিতশাস্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক গ্রন্থ ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এর প্রথম ছয়টি পরিচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। এই গ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই বিজ্ঞানচিন্তা একটি বিশেষ প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করে। পরে তা বিজ্ঞানচিন্তা ও প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। এই খবর দেশের বিজ্ঞান অনুরাগী ও সাধারণ পাঠকমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিজ্ঞান ভাবনার গ্রন্থকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক অসামান্য পদক্ষেপ। বিজ্ঞানচিন্তার মতো একটি সচেতন মাধ্যম ছিল বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। আমাদের সমাজে যদি এমন একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকত, তবে এই জ্ঞানচর্চার বিস্তার আরও বহুগুণ তীব্র ও ফলপ্রসূ হতো।
বিজ্ঞানচিন্তার এই প্রগতিশীল উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা যদি আজকের বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিকে চোখ ফেরাই, তবে দেখতে পাব আন্তঃপ্রজাতি সংলাপের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়, যা মানব ইতিহাসে অন্য কোনো প্রজাতির সঙ্গে যোগাযোগের প্রথম বৈজ্ঞানিক সেতু। অথচ প্রকৃতির কী অদ্ভুত পরিহাস! ভিন্ন বুদ্ধিমত্তা ও মহাজাগতিক চেতনার খোঁজে আমরা যখন আলোকবর্ষ দূরে চোখ মেলে রেখেছিলাম, তখন সেই প্রজ্ঞার সুর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহমান ছিল আমাদেরই ঘরের পাশের অন্ধকার নীল জলরাশির নিচে। মানুষ যখন বিশালাকার তিমিকে কেবল বাতি জ্বালানোর তেল ও চর্বির উৎস হিসেবে কেটে টুকরো করেছে, তখনো সমুদ্রের হাজার হাজার ফুট গভীরে—যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না—প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছিল তাদের অনুভূতির দীর্ঘ স্বর: ‘আমি এখানে আছি, আমি জীবিত আছি।’
আজ আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বায়ো-অ্যাকুস্টিকসের সমন্বিত প্রয়াস আমাদের চোখের সামনে থেকে অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে দিচ্ছে। প্রজেক্ট সেটির মতো বৈশ্বিক উদ্যোগের সাম্প্রতিক আবিষ্কার আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্পার্ম ও হাম্পব্যাক তিমির জটিল ধ্বনিতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তাদের নির্গত শব্দ কেবল কোনো যান্ত্রিক সাড়া নয়; মানুষের ভাষার মতোই সেখানে রয়েছে নির্দিষ্ট ছন্দ, ব্যাকরণ, সময়মাত্রা, এমনকি স্বরবর্ণ ও দ্বিস্বরবর্ণের মতো জটিল গঠন।
প্রকৃতির এই গোপন দুয়ার খুলে দেওয়ার পেছনে যে হাতিয়ারটি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু সমুদ্রের নিচের এই অলিখিত ভাষার রহস্য উন্মোচনে এআই যেমন সাহায্য করছে, অন্যদিকে তেমনি তা মানবসভ্যতার জন্য নিয়ে আসছে অস্তিত্বের এক নতুন প্রশ্ন। মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই গণিতকে ধরা হয়েছে মানুষের বিশুদ্ধ মেধা ও যুক্তির সর্বোচ্চ স্তম্ভ হিসেবে। জটিল উপপাদ্য প্রমাণ কিংবা যুগের পর যুগ অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা ছিল কেবল মানুষের মস্তিষ্কেরই একচ্ছত্র অধিকার। কিন্তু প্রযুক্তির এই নতুন সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের সেই চিরন্তন অহংকার প্রবল ঝাঁকুনি খেয়েছে। এআই এখন একের পর এক গাণিতিক অচলাবস্থা ভেঙে ফেলছে। ফিলাডেলফিয়ার আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে এ নিয়ে গণিতবিদদের গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশিত হয়েছে, যা আজ বৈজ্ঞানিক মহলে ‘গণিতের এআই অ্যাপোক্যালিপস’ নামে আখ্যায়িত হচ্ছে।
প্রযুক্তির এই অভাবনীয় জয়যাত্রা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হলো? যন্ত্রের মেধা এত দ্রুত অগ্রসর হলেও আমাদের নৈতিক ও মানবিক চেতনা কেন এভাবে পিছিয়ে পড়ছে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ছয় কোটি মানুষের মৃত্যু, পরিবেশের চরম অবক্ষয় কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিচালিত মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা—কোনো কিছুই যেন আমাদের বোধের সঠিক জাগরণ ঘটাতে পারেনি। ১৯৫৯ সালে বিজ্ঞানী ও ঔপন্যাসিক সি পি স্নো তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য টু কালচারস’ বক্তৃতায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, বিজ্ঞান এবং মানবিকতা যদি দুটি বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তবে তা মানবজাতি ও চিন্তাজগতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। আজ সেই শঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে।
১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসরের উদ্ভাবক ফেদেরিকো ফাজিন চেতনা ও অস্তিত্বের উত্তরণের যে গভীর দর্শনের কথা তুলে ধরেছিলেন, আমরা তা অনুধাবন করার চেষ্টা করিনি। ফলে রোবোটিকসের অধ্যাপক হ্যান্স মোরাভেক কয়েক দশক আগে যে যান্ত্রিক স্বর্গের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তা আজ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। একদিকে কৃত্রিম স্বর্গের মোহময় হাতছানি, আর অন্যদিকে মানুষের জৈবিক ও নৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাকুল সংগ্রাম—এই দুই বৈপরীত্যের মাঝে পড়ে আমরা আজ এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক ধাক্কার মুখোমুখি।
বিশ্বজুড়ে যখন ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির চরম বাস্তবতা ও প্রযুক্তিগত এই সাংস্কৃতিক ধাক্কা ঘনীভূত হচ্ছে, তখন আমাদের মতো সমাজে এসব অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা নেই বললেই চলে। অথচ প্রযুক্তি আর প্রকৃতির এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে বিষয়গুলোকে অনুধাবন করে কাজ করার পথ এখনো খোলা রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ইতিহাসবিমুখতা, ভঙ্গুর রাজনীতি আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে আমাদের সামাজিক চিন্তাশক্তি আজ অনেকটাই অবরুদ্ধ। আমাদের নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টাদের ডিগ্রির ঘাটতি না থাকলেও, নতুন যুগের এসব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও মেধা অনুধাবনের চেয়ে মোসাহেবিতেই তাঁদের আগ্রহ বেশি।
এমন এক স্থবির ও আত্মঘাতী সময়ে মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা তার ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পা রাখল। বাংলাদেশে যেখানে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টা ছাড়া নিয়মিত বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান সাংবাদিকতার প্রদীপ জ্বালাবার মতো আর কেউ নেই, সেখানে বিজ্ঞানচিন্তা টানা এক দশক ধরে আলোর বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে; এক ছাদের নিচে যুক্ত করছে হাজারো বিজ্ঞানমনস্ক মানুষকে।
আজকের দিনে বিজ্ঞান কেবল ল্যাবরেটরির চার দেয়ালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; প্রযুক্তি আমাদের অস্তিত্বকে কোন অভিমুখে নিয়ে যাচ্ছে আর নৈতিকতার নিত্যনতুন সংকট কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এই মৌলিক প্রশ্নগুলো তৈরি করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমই হলো বিজ্ঞান। এমন একটি যুগে বিজ্ঞানচিন্তার মতো শতাধিক চিন্তাশীল প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠা জরুরি, যেন মানুষ অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার আর যান্ত্রিক অপসংস্কৃতির গ্রাস থেকে বেরিয়ে চিন্তার নতুন আলো দেখতে পায়। বিজ্ঞানচিন্তার এই ১০ বছরের যাত্রা কেবল একটি সাময়িক পত্রিকার টিকে থাকা নয়, এটি মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা ও বৈজ্ঞানিক মনন গড়ে তোলার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ ক্ষণে বিজ্ঞানচিন্তা ও এর নেপথ্যের সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই প্রয়াস যেন আরও অজস্র উদ্যোগকে অনুপ্রাণিত করে। প্রশ্ন জাগে, এই অনুপ্রেরণা থেকেই কি আগামী দিনের আলোকিত মানুষেরা অস্তিত্বের সমীকরণ মেলাতে সক্ষম হবেন?