বঙ্গোপসাগরের বুকে ছোট্ট সুন্দর দ্বীপ ঢালচর। সে দ্বীপের তারুয়া সৈকতের কাছে সারি করে লাগানো রয়েছে প্রায় ১১টি অ্যান্টেনা। জোয়ারের পানি যেটুকু আসে তার সীমানা থেকে একটু দূরেই বসানো হয়েছে ৩টি বড় তাঁবু । তাঁবুর ভেতর থেকে একজনকে রেডিওর সামনে বসে বলতে শোনা গেল, ‘সিকিউ ডিএক্স, সিকিউ ডিএক্স, দিস ইজ সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান ডেলটা এক্সরে’। এই দৃশ্যটি অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের জনপ্রিয় ইভেন্ট আইল্যান্ডস অন দ্য এয়ারের।
১৫ জন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলা ভোলার ঢালচরে গিয়েছিলেন এই আয়োজনে। আইল্যান্ডস অন দ্য এয়ার (সংক্ষেপে IOTA বা আইওটা) একটি বৈশ্বিক আয়োজন। এখানে অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা একটি নির্দিষ্ট দ্বীপে তাঁদের অ্যান্টেনা, রেডিও, ক্যাম্পিং গিয়ার, জেনারেটর, ব্যাটারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে রেডিও স্টেশন স্থাপন করেন। বিশ্বব্যাপী অন্য অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন অনুমোদিত এই আয়োজনে বিশেষ কলসাইন S21DX (সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান ডেল্টা এক্সরে) ব্যবহার করে তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার বার যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে কোনো আইওটা উদ্যাপন।
প্রস্ততি
২০২৪ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। অ্যামেচার রেডিও অপারেটর মঞ্জু হক (কলসাইন সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান আলফা মাইক, S21AM) এবং ফজলে রাব্বি (কলসাইন সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান রোমিও চার্লি, S21RC) সিদ্ধান্ত নেন, এ বছর একটি আইওটা আয়োজন করবেন। লক্ষ্য বাংলাদেশের তরুণ অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের হাতেকলমে অ্যান্টেনা বানানো, এইচএফ রেডিও পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রথমে দ্বীপ বাছাই করার পালা। সেজন্যে বাংলাদেশের ভোলা জেলার কয়েকটি দ্বীপ থেকে যাতায়াত এবং অন্য সবকিছু বিবেচনা করে বেছে নেওয়া হলো ঢালচরকে।
এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। আসলে ঢাকা শহর এবং তার আশপাশ থেকে রেডিও চালনা এতটা সুখকর নয়। কারণ জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রচুর ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি চলে, সেগুলো থেকে কৃত্রিম নয়েজ তৈরি হয়। তাই অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা চেষ্টা করেন শহর এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে একটু দূরে গিয়ে রেডিও অপারেট করতে। আইওটা যেহেতু দ্বীপ থেকে করতে হয় এবং দ্বীপে তেমন কোনো কৃত্রিম নয়েজ থাকে না, তাই আইওটা বিশ্বব্যাপী অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের কাছে খুবই পছন্দের আয়োজন। সে হিসেবে ঢালচর দারুণ জায়গা। ফজলে রাব্বি এবং মঞ্জুরুল হকের ঘোষণার পর একে একে অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা যোগ দিতে থাকেন। দলের বাকি সদস্যরা হলেন এম. ও. বি. জিহাদ (কলসাইন S21MOB), হানিয়াম মারিয়া রাকা (S21YLJ), রাকিব আহমেদ (S21RED), অমি (S21OM), শাওন আহমেদ (S21OD), সাব্বির রহমান (S21ACP), পারভেজ (S21DW), জাবেদ (S21ALT), সামিউল ইসলাম (S21TQ), মারুফ আহমেদ (S21FIA), জোবায়ের (S21BK) এবং রিপন (S21ARK)।
এদের মধ্যে ফজলে রাব্বির বাসা পরিণত হয় ওয়ার্কশপে। সেখানে প্রায়ই দলের বিভিন্ন সদস্যের আনাগোনা দেখা যায়। ফজলে রাব্বির নেতৃত্বে দলের বাকি সদস্যরা বিভিন্ন অ্যান্টেনা, ব্যান্ডপাস ফিল্টারসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বানাতে শুরু করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা এমন আওইটা আয়োজন করলে তাঁদের বাজেট থাকে মিলিয়ন ডলার। সে সুবিধার কারণে তাঁরা বিভিন্ন অ্যান্টেনাসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র প্রফেশনাল কোনো ভেন্ডর থেকে কেনে। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারো বাংলাদেশি অপারেটররা তাঁদের নিজেদের অ্যান্টেনা এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিজেরা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। এসব করতে করতে পেরিয়ে যায় ৬ মাস। ঘনিয়ে আসে ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের কাছে অনুমতিপত্র এবং কলসাইনের আবেদন করা হয়। অনুমতিপত্রসহ দলের জন্য ৭ দিন মেয়াদি একটি স্পেশাল কলসাইন ইস্যু করা হয়। ‘সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান ডেল্টা এক্সরে, S21DX—এই কলসাইন ব্যবহার করেই সম্পূর্ণ আইওটায় অপারেটররা যোগাযোগ করেছিলেন।
যাত্রা শুরু
অফিশিয়ালি বিশ্বব্যাপী ঘোষণা দেওয়া হয়, ১৩-১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রোগ্রামটি। কিন্তু দলের সদস্যরা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই জিনিসপত্র প্যাক করা শুরু করেন। ১০ ডিসেম্বর একটি পিকআপ ট্রাকে ভারী মালামালগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভোলার কচ্ছপিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে। দলের বাকি সদস্যরা ১০ তারিখ রাতে সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে বেতুয়া লঞ্চঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। লঞ্চে বসেই আলোচনা করা হয়, কীভাবে অপারেশন সুন্দরভাবে পরিচালনা করা হবে। সকাল ৬টায় লঞ্চ ভেড়ে ভোলার বেতুয়া লঞ্চঘাটে। সেখান থেকে মাইক্রোবাসে চেপে বসেন সবাই। উদ্দেশ্য কচ্ছপিয়া ঘাট। সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, পিকআপ ট্রাকটি অপেক্ষা করছে মালামালসহ। ট্রাক থেকে সেগুলো নামিয়ে লোড করা হয় একটি ট্রলারে। ট্রলারের মাঝি আমাদের বিশ্বস্ত ও পূর্বপরিচিত বাবুল মাঝি। দক্ষ হাতে খাল পেরিয়ে দলের সদস্য এবং মালামাল নিয়ে সমুদ্রে প্রবেশ করেন। প্রচণ্ড গরমে তখন দলের সদস্যদের নাজেহাল অবস্থা। চর কুকরিমুকরিকে ডানপাশে রেখে আরও ঘণ্টা দুই সমুদ্রে ভেসে অবশেষে ট্রলার গিয়ে ভেড়ে তারুয়া বিচে। দলের কয়েকজন গিয়ে ক্যাম্পিং এবং অ্যান্টেনা বসানোর মতো জায়গা ঠিক করে। ট্রলার থেকে জিনিসপত্র নামাতে নামাতে বেজে যায় দুপুর ২টা।
সেটআপ
১১ তারিখ দুপুর থেকেই শুরু হয় সেটআপের কার্যক্রম। ছোট ছোট অনেকগুলো দলে ভাগ হয়ে সদস্যরা কাজ শুরু করেন। একদল তাঁবু সেট করেন। বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট থেকে ৩টি বড় তাঁবু দেওয়া হয়েছিল অপারেশনের জন্য। এই তাঁবুগুলাতেই বসানো হবে মূল রেডিওগুলো। আরেকদল জেনারেটর এবং ইলেক্ট্রিক লাইন বসানো শুরু করে। কারণ, সন্ধ্যা হলেই শুরু হবে শেয়ালের আনাগোনা। আরেকদল বাকি সদস্যদের থাকার জায়গা পরিষ্কার করে। সন্ধ্যার দিকে জেনারেটর, অপারেশন চালানোর তাঁবু এবং দলের সদস্যদের থাকার তাঁবু বসানো শেষ হয়। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দলের সব সদস্য রাতের খাবার শেষেই ঘুমিয়ে পরে। কারণ, পরদিন সকালে উঠেই অ্যান্টেনা সেটআপ শুরু করতে হবে।
১২ তারিখ সকালে শুরুতেই উঠে যায় স্পাইডারবিম অ্যান্টেনা। মাকড়সার জালের মতো দেখতে ২টি স্পাইডারবিম অ্যান্টেনা সেটআপ করা হয়। ১০ মিটার, ২০ মিটার এবং ১৫ মিটার ব্যান্ডে যোগাযোগের জন্য মূলত এটাই জনপ্রিয়।
আরেকদল স্টেশন টেন্টের ভেতর রেডিও সেটআপ শুরু করে। সন্ধ্যা হতে হতে দাঁড়িয়ে যায় আরও কয়েকটি অ্যান্টেনা।
অপারেশন
১২ ডিসেম্বর ঠিক রাত ১২টায় প্রথম রেডিও থেকে তথ্য প্রেরণ করা হয়। দলের সদস্যরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেন। একদল রেডিও অপারেট করতে থাকে, আরেকদল পরের দুইদিনের মধ্যে বাকি অ্যান্টেনাগুলো স্থাপন করে। মোট ১১টি অ্যান্টেনা বসানো হয়। দুইটি স্পাইডারবিম অ্যান্টেনা, দুইটি ভার্টিকাল ডাইপোল এ্যরে অ্যান্টেনা, একটি ফোর স্কয়ার অ্যান্টেনা, একটি কে নাইন এ ওয়াই ( K9AY) রিসিভ অ্যান্টেনা, একটি মাল্টিব্যান্ড ভার্টিক্যাল অ্যান্টেনা, একটি ৮০ মিটার ভার্টিকাল অ্যান্টেনা, একটি ৬০ মিটার ভার্টিক্যাল অ্যান্টেনা ও একটি ৬০ মিটার অ্যান্টেনা। পাশাপাশি একটি অ্যামেচার রেডিও স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনও বসানো হয়েছিল। ৪টি রেডিওর সাহায্যে প্রতিদিন প্রায় ২৪ ঘণ্টা প্রথিবীর বিভিন্ন দেশের অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে চলতে থাকে যোগাযোগ। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী দিনের বিভিন্ন সময় অ্যান্টেনাগুলো বিভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে জাপান, ইউরোপ, নর্থ আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দলের সদস্যরা বিভিন্ন শিফটে ভাগ হয়ে রেডিওগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগ সচল রাখেন।
বাংলাদেশে আইল্যান্ডস অন দা এয়ার
বাংলাদেশে প্রথম আইওটা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে, সেন্ট মার্টিনে ফজলে রাব্বি এবং মঞ্জু হকের হাত ধরে। সে বছর তাঁরা মোট সাড়ে তিন হাজার যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। পরে ২০২১ সালে চর কুকরিমুকরি এবং ২০২২ সালে ঢাল চরে আরও দুইটি আইওটা আয়োজন করা হয়। ২০২১ এবং ২০২২ সালে তাঁরা যথাক্রমে সাড়ে ৫ হাজার এবং ১০ হাজার অ্যামেচার রেডিও স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন।
অ্যামেচার রেডিও
অ্যামেচার রেডিও মূলত একটি টেকনিক্যাল হবি হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা নিজেদের বানানো অ্যান্টেনা এবং রেডিও ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যান্য অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে ফ্রিতে কথা বলেন। অ্যান্টেনা, রেডিওসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বাজারে কিনতে পাওয়া গেলেও অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেরা বানাতেই বেশি পছন্দ করেন। মাঝেমধ্যে কয়েকজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর একসঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন রেডিও ক্যাম্পিং করেন। অ্যামেচার রেডিওতে সেসব ক্যাম্পিংয়ের সুন্দর সুন্দর নাম আছে। যেমন দ্বীপ থেকে করা রেডিও ক্যাম্পিংকে আইওটা, পাহাড়ের ওপর উঠে রেডিও যোগাযোগ করাকে ‘সামিটস অন দ্য এয়ার (সোটা)’ বলা হয়। সেখানে আবার কিছু নিয়ম মানতে হয়। যেমন কোনো জ্বালানি বা জেনারেটর নেওয়া যাবে না। জিনিসপত্র ওঠাতে ব্যবহার করা যাবে না কোনো গাড়ি। কিছুর সাহায্যও নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে অ্যামেচার রেডিও চর্চা করতে হলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন আয়োজিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পরীক্ষায় পাশ করার পর বিভিন্ন ধাপ পার করে নিতে হয় লাইসেন্স এবং কলসাইন। কলসাইন হচ্ছে আমাদের ফোন নম্বরের মতো। রেডিওতে কে কথা বলছে তার আইডেন্টিটি বোঝানোর জন্য এ সাইন। যেমন এই আইওটা প্রোগ্রামের জন্য একটি স্পেশাল কলসাইন ইস্যু করা হয়েছিল ‘সিয়েরা টুয়েন্টি ওয়ান ডেল্টা এক্সরে (S21DX)’ নামে। এখানে S2 দিয়ে বোঝায় বাংলাদেশ, S21 মানে বাংলাদেশি অ্যামেচার রেডিও অপারেটর। বাকিটাসহ সম্পূর্ণটা মিলে হয় একটা ইউনিক কলসাইন। যখনই রেডিওতে S21DX বলে ডাকা হচ্ছিল, তখন পুরো দুনিয়ার অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা বুঝতে পারে, বাংলাদেশ থেকে কোনো অ্যামেচার রেডিও অপারেটর ডাকছে।