অধ্যাপক ম্যাটস লারসন বলেন, ‘এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। ১৯৩৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন, নীলস বোর এবং আরউইন শ্রোয়েডিঙ্গারের মতো বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে ভেবেছেন। তবে আইনস্টাইন কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভাবতেন, সঠিক হলেও এটি অসম্পূর্ণ। তবে বোর বরাবরই কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে সম্পূর্ণ বলে মনে করেছেন। আর শ্রোয়েডিঙ্গার বলেন, একই উৎস থেকে উৎপন্ন দুটো কণার মধ্যকার এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বিজ্ঞানের এই শাখাটির মৌলিক ধর্ম।

বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানী বোরের সঙ্গে একমত হন এবং শ্রোয়েডিঙ্গারের বক্তব্য মেনে নেন। তবে তাঁরা এটির তাত্ত্বিক গবেষণার চেয়ে বাস্তব দুনিয়ায় প্রয়োগ নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তাঁদের অনেকে নোবেলও পেয়েছেন। আর এর সূত্র ধরে আমরা পেয়েছি টেলিভিশন সম্প্রচার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের মতো চমৎকার সব প্রযুক্তি। ২০২০ ও ২০২১ সালে নোবেলপ্রাপ্ত রজার পেনরোজ, রাইনহার্ড গেনজেল কিংবা আন্দ্রেয়া গেজ—তাঁদের সবার গবেষণার সঙ্গেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কেউ না ভাবলেও ১৯৬৪ সালে জন স্টুয়ার্ট বেল গাণিতিকভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্পূর্ণতা ও সঠিকতা যাচাইয়ের উপায় দেখিয়ে দেন বিজ্ঞানীদের। তাঁর এই উপায়টি ‘বেলের অসমতা’ নামে পরিচিত। এই অসমতা ভঙ্গ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান যতই অদ্ভুত বলে মনে হোক না কেন, এটি সঠিক। এবারের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানী সেটাই করেছেন। তাঁরা বেলের অসমতা ভঙ্গের পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ হাজির করেছেন বিশ্বের সামনে। এর হাত ধরে আমরা জেনেছি, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সঠিক। প্রকৃতি এভাবেই কাজ করে।

শ্রোয়েডিঙ্গার ছিলেন অস্ট্রিয়ান। জেইলিঙ্গারও অস্ট্রিয়ান। যে রহস্যের সূচনা অস্ট্রিয়াতে হয়েছিল, সেটা বৃত্ত ঘুরে এসে সম্পন্ন হয়েছে অস্ট্রিয়াতেই। আর এর মাধ্যমে আমরা প্রবেশ করেছি কোয়ান্টাম বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্বে!’ এই বক্তব্যের শেষে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানীকে অভিবাদন জানিয়ে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে পুরস্কার নেওয়ার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ওলোফ রামস্ট্রোম রসায়নে নোবেলজয়ীদের নিয়ে বলেন, ‘রসায়ন বেশ জটিল বিষয়। এর কারণ, অণু-পরমাণুর উদ্ভট আচরণ। আর তারা যে পরিবেশে আছে, সে পরিবেশের জটিলতা। এ কারণে অণুরা অনেক সময়ই বিজ্ঞানীদের কথা শোনে না। বিজ্ঞানীরা এদের বশে আনতে চান, গবেষণা করতে চান, ইচ্ছেমতো বিক্রিয়া করতে চান—অণু-পরমাণুর দল তাতে বাগড়া দেয়। আমাদের এবারের রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ, এই জটিলতার মধ্যে তাঁরা আমাদের জন্য সহজ উপায় খুলে দিয়েছেন। চট করে দুটো অণু বা পরমাণুর দল জুড়ে যায় তাঁদের এ পদ্ধতিতে। এটিই ক্লিক রসায়ন।

অণু-পরমাণুর দলকে জোর করে দলবদ্ধ করার প্রচেষ্টা বা বারবার বিক্রিয়া করার ব্যর্থ চেষ্টার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে তাদের গায়ে দুটো আংটা জুড়ে দিলে কেমন হয়? কী দারুণ একটা বিষয় হতো সেটা! পরমাণুর দুটো দলকে তখন চাইলেই তাদের দুটো আংটা জুড়ে দিয়ে আটকে দেওয়া যেত, ফলে তৈরি করা যেত দরকারি সব অণু, ইচ্ছেমতো! এটিই ক্লিক বিক্রিয়া। এই দারুণ বিষয়টি আমাদের জন্য সম্ভব করে তুলেছেন ব্যারি শার্পলেস ও মর্টান মেলডাল। আর ক্যারোলিন বারতোজ্জি মানবদেহে সেই বিক্রিয়া ঘটানোর উপায় বের করেছেন। তবে ক্লিক বিক্রিয়ায় তামার উপস্থিতি ছিল আবশ্যক। আর তামা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞানী বারতোজ্জি সেই ক্ষতিকর তামা বাদ দিয়ে মানবদেহে এই বিক্রিয়া ঘটানোর উপায় আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের এই আবিষ্কার রসায়নে নতুন শাখার যেমন সূচনা করেছে, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ঔষুধ রসায়ন গবেষণায় খুলে দিয়েছে নতুন দ্বার।’ বক্তব্য শেষে তিনি এই তিন রসায়নবিজ্ঞানীকে অভিবাদন জানিয়ে সুইডেনের বর্তমান রাজা ষোড়শ কার্ল গুস্তাভের হাত থেকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আহ্বান জানান।

অধ্যাপক আন্না ওয়েডেল শারীরতত্ত্বে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে বলেন, ‘প্রাচীন দেহাবশেষ ও হাড় নিয়ে মানুষ আগেও গবেষণা করেছে। তবে প্রাচীন বিভিন্ন প্রজাতীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ও আমরা তাদের থেকে কতটা ভিন্ন, এ প্রশ্নের সঠিক জবাব মেলেনি। ডিএনএ গবেষণা তখন বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। তাঁরা ডিএনএ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। বিজ্ঞানী সোয়ান্তে প্যাবো এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি বিলুপ্ত সুপ্রাচীন হোমিনিনদের জিনোম নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী এবং আমরা কতটা আলাদা। এই গবেষণা করতে গিয়ে তিনি হোমিনিনদের নতুন এক গণ আবিষ্কার করেছেন। এই গণটির নাম ‘ডেনিসোভা’।

তাঁর এই গবেষণা আমাদের ইতিহাস জানতে যেমন ভূমিকা রাখছে, তেমনি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব তুলে ধরেছে আমাদের সামনে। নিয়ানডার্থালদের মতো হোমিনিনরা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আমরা টিকে আছে কেমন করে? আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে প্রাচীন হোমিনিনদের কোনো সম্পর্ক কি আছে? ঠিক কোন বৈশিষ্ট্য আমাদের করে তোলে সবার থেকে আলাদা? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মাধ্যমে তিনি জীববিজ্ঞানের জগতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন।’—এ কথা বলে তিনি সোয়ান্তে প্যাবোকে অভিনন্দন জানান ও আহ্বান করেন পুরস্কার নিতে।

বিজ্ঞানীদের প্রত্যেকে রাজা ষোড়শ কার্ল গুস্তাভের হাত থেকে মেডাল গ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেক বিভাগের বিজয়ী বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার। এটিই নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য। বর্তমানে এর মান ৯ লাখ ৬৬ হাজার মার্কিন ডলার।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: নোবেল প্রাইজ ডট অর্গ