মিল্কিওয়ের ভর ও ডার্ক ম্যাটার মডেলিং শিখল শিক্ষার্থীরা

শীতের সকাল। জানালা দিয়ে তাকালেই বাইরে দেখা যাচ্ছে কুয়াশার চাদরে ঘেরা শহরের দৃশ্য। এই ঠান্ডার মাঝেই ঢাকার বাংলামোটরে অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। কিছুক্ষণ পরেই ক্লাসরুমে বসে সবাই ল্যাপটপ খুলে কোড করতে শুরু করল। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রোটেশন কার্ভ এবং ভর বের করার জন্য এই কোডিং। দৃশ্যটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যে আয়োজিত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কর্মশালার। স্পেস অবজারভেটরি থেকে পাওয়া ডেটা এবং কম্পিউটেশনাল টুলসগুলো বর্তমানে কীভাবে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় বিজ্ঞানীদের সহায়তা করছে, তা এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা শিখেছে হাতেকলমে।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৩৫ জন শিক্ষার্থী কর্মশালাটিতে অংশ নিয়েছে

জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ প্রবল। গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, গ্যালাক্সি—এসবের রঙিন সব ছবি দেখে, সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহে পাঠানো মহাকাশযানের অভিযানের খবর পড়ে, কিংবা বিখ্যাত অনেক বিজ্ঞানীর কাজ নিয়ে জানতে পেরে ছোটবেলা থেকে এই আগ্রহটা তৈরি হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে এত আগ্রহ থাকার পরেও এই বিষয়ে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ নেই বললেই চলে। উৎসাহ থাকলেও হাতেকলমে জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখার সুযোগ হয় না অনেকেরই। দেশের বাইরে ব্যাচেলর পর্যায়ে এবং গ্রাজুয়েট স্কুলে এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনার ভালো সুযোগ রয়েছে। সেজন্যে ভালো প্রস্তুতিও থাকা দরকার।

কর্মশালাটিতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন প্যারিস অবজারভেটরির পিএইচডি গবেষক ইশতিয়াক আকিব

এসব বিষয় মাথায় রেখেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা। ‘ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যাস্ট্রোফিজিক্স রিসার্চ: মিল্কিওয়েজ ডার্ক ম্যাটার অ্যান্ড ম্যাস’ শীর্ষক এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি। অংশ নিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির ৩৫ জন শিক্ষার্থী। কর্মশালাটিতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন প্যারিস অবজার্ভেটরির পিএইচডি গবেষক ইশতিয়াক আকিব। তিনি বর্তমানে লোকাল গ্রুপ, গ্যালাক্সি ও ডার্ক ম্যাটার ডিসট্রিবিউশন নিয়ে গবেষণা করছেন।

কর্মশালার প্রথম দিন অনলাইন সেশনে অংশগ্রহণকারীরা ভরের ধারণা, কেপলারের সূত্র, গ্যালাক্সির রোটেশন কার্ভ, ডার্ক ম্যাটার মডেলিং ও এর ভর নির্ণয়ের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে জেনেছে। পাশাপাশি কিছু স্ট্যাটিস্টিকাল টুল, যেমন ডেটা ফিটিং, এরর বার/আনসার্টেইনটি ও প্রোবাবিলিটি ডিসট্রিবিউশন নিয়ে ধারণা পেয়েছে। কর্মশালার দ্বিতীয় দিন ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্লাসে অংশ নিয়েছে। এদিন পাইথন এবং এর বেশ কিছু প্যাকেজ (নামপাই, সাইপাই, অ্যাস্ট্রোপাই, গ্যালপাই ও ম্যাটপ্লটলিব) ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারে কোড করে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রোটেশন কার্ভ বের করেছে। পুরো গ্যালাক্সিতে ব্যারিয়নিক ম্যাটার, যেমন গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, নেবুলা, উল্কা ইত্যাদির বৃত্তাকার গতিবেগ (Circular velocity) এবং পর্যবেক্ষণকৃত গতিবেগের (Observed velocity) মধ্যে যে পার্থক্য, তা ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব নির্দেশ করে। পর্যবেক্ষণকৃত গতিবেগের জন্যে শিক্ষার্থীরা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গায়া (Gaia) স্পেস অবজারভেটরি থেকে পাওয়া ডেটা ব্যবহার করেছে। রোটেশন কার্ভ ফিট করার জন্যে মিল্কিওয়েতে ডার্ক ম্যাটার ডিসট্রিবিউশনের বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মডেল ব্যবহার করেছে অংশগ্রহণকারীরা।

শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারে কোড করে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রোটেশন কার্ভ বের করেছে

কর্মশালার শেষে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার বিভিন্ন দিক এবং এই বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্ন করেছে এই পর্বে। প্রশিক্ষক ইশতিয়াক আকিব এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কর্মশালায় অংশ নেয়া সবাইকে দেয়া হয়েছে সনদ। সঙ্গে সবাই পেয়েছে বিজ্ঞানচিন্তা।

অংশগ্রহণকারী সবাই পেয়েছে সনদ ও বিজ্ঞানচিন্তা ম্যাগাজিন

ফেসবুকে এই আয়োজন নিয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে এই লিংক থেকে: https://www.facebook.com/events/917349137214758