বিজ্ঞানবক্তা আসিফ শোনালেন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইতিহাস

বিজ্ঞানবক্তা আসিফের বক্তৃতার শেষে ভয়েজারের গোল্ডেন রেকর্ডের সুর বাজছেবিজ্ঞানচিন্তা

পৃথিবীটা গোল—এই হিসেবটা প্রথম করেন এরাতোস্থেনেস। গ্রিক এই গণিতজ্ঞ ও ভূগোলবিদ প্রথম লক্ষ করেন, বছরের নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে মিশরের সিয়েন শহরে লম্বভাবে পোঁতা দণ্ডের কোনো ছায়া পড়ে না। অথচ একই সময়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পোঁতা দণ্ডের ছায়া পড়ে। এই দুই জায়গার দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার। সমতল কোনো স্থানে দুটো দণ্ডের ছায়ায় এই পার্থক্য থাকার কথা না। তার মানে, পৃথিবীর ওপরের তলটা বাঁকানো। এই বক্রতা যে আসলে একটি গোলকের অংশ, তা ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে হিসেব করেন তিনি। নির্ণয় করেন পৃথিবীর পরিসীমা। তাঁর হিসেবে মাত্র ১ শতাংশ ভুল পাওয়া গেছে আধুনিক হিসেব অনুসারে।

পর্তুগালের নাবিক ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান। তিনি প্রথম সমুদ্রভ্রমণে বের হন গোল পৃথিবী পর্যবেক্ষণে। সেই ১৫১৯ সালে। পাঁচটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেন ম্যাগেলান। মাকতান দ্বীপের যুদ্ধে তিনিসহ এ অভিযানের প্রায় ২০০ নাবিক মারা যান। ফিরে আসেন মাত্র ২০ জনের মতো। পাঁচটি জাহাজের তিনটি ধ্বংস হয়ে যায়। ফিরে আসে দুটি জাহাজ, যার একটির নাম ছিল ভিক্টোরিয়া। পৃথিবী গোল—এ পর্যবেক্ষণের জন্য প্রাণ দেন প্রায় ২০০ নাবিক।

বিজ্ঞানবক্তা আসিফ
বিজ্ঞানচিন্তা

বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য, অ্যারিস্টটলের ভূকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে সরে আসতে কালে কালে অবদান রেখেছেন অনেকে। জিওর্দানো ব্রুনোর মতো মহান বিজ্ঞানী প্রাণ দিয়েছেন, টাইকো ব্রাহে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন আকাশ পর্যবেক্ষণ করে। পরে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানবজাতির ধারণায় এক বিপ্লবের জন্ম দেন কোপার্নিকাস। পৃথিবীসহ সব গ্রহকে সূর্যের চারপাশের কক্ষপথে দেখান তিনি। তাঁর উত্তরসূরী কেপলার, গ্যালিলিও এবং নিউটন সেই ধারণাটাই প্রতিষ্ঠিত করেন গাণিতিকভাবে। অথচ জ্যোতির্বিদ টলেমির প্রায় ৩০০ বছর আগে এ কথা বলে গিয়েছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টার্কাস।

কালের আবর্তে আজ আমরা এসব সত্য জানি। বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় ভয়েজার ১ ও ২ পেরিয়ে গেছে সৌরজগতের সীমা। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সৌরজগতের এল২ ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে অবস্থান করে খুঁজে ফিরছে মহাবিশ্বের প্রথম আলো। বহু পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা, পরিবর্তন হয়েছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

বিজ্ঞানবক্তা আসিফের আলোচনায় এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইতিহাস উঠে আসে। উঠে আসে মানুষের চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস, বহু বিজ্ঞানীর আত্মত্যাগের কথা, ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

ছবি প্রদর্শনী
বিজ্ঞানচিন্তা

৫ আগস্ট, শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় এ বক্তৃতা। যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্ঠিভঙ্গির আলোকে সৌরজগতবিষয়ক নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন আসিফ। শ্রোতাদের নিয়ে চলেন মহাজাগতিক ভাবনার পথে, বিজ্ঞানচর্চার প্রাচীন ইতিহাসের কোণে কোণে। এই আয়োজনের নাম ছিল ‘সৌরজগত: দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইতিহাস’।

দুই পর্বের এ আয়োজনের প্রথম পর্বে বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞানবক্তা আসিফ। দ্বিতীয় পর্বটি ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। পাঠকের নানা কৌতুহলী প্রশ্নের জবাব দেন আসিফ। পর্বটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক আমাদের সময়-এর সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর সুর। পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিজ্ঞানকর্মী যোয়েল কর্মকার।

এ আয়োজনে অংশগ্রহণের জন্য টিকিট কাটতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য টিকিট মূল্য ছিল ২০০ টাকা। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ ছাড়। ১৫০ টাকার টিকিট কেটেই শিক্ষার্থীরা এ বক্তৃতা শোনেন। টিকিট কেটে যে মানুষ বিজ্ঞান বক্তৃতা শুনতে আসতে পারেন, এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ দুই ঘণ্টার এ বক্তৃতার পুরোটা সময় ছিলেন। বক্তৃতার সঙ্গে ছিল প্রয়োজনীয় ছবি প্রদর্শনী ও ভিডিও প্রজেকশন। আলোচনার শেষে ভয়েজারের গোল্ডেন রেকর্ডে বেজে চলা সুরের মূর্ছনায় আবিষ্ট হন দর্শক।

এটি ছিল ডিসকাশন প্রজেক্টের ৮২তম ওপেন ডিসকাশন। বিজ্ঞানবিষয়ক অনলাইন বুকশপ চন্দ্রদ্বীপের উদ্যোগে আয়োজিত হয় এ বক্তৃতা।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা