কার্বন পরিশোধনের মেশিন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই বলে আসছিলেন, যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কথাটা একটা ধাপ্পাবাজি। তিনি ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ওই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী। ওটা নাকি ‘চাকরি খেকো’ চুক্তি!

প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছে, এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। তার মানে, বনায়ন বাড়াতে হবে। আর তেল, কয়লা, কাঠ পুড়িয়ে বাতাসে কার্বনদূষণ প্রায় বন্ধ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এটা কি আদৌ সম্ভব হবে? যদি কার্বন নিঃসরণ যৌক্তিক মাত্রায় কমিয়ে আনাও হয়, তাতেই কি জলবায়ু পরিবর্তন আটকানো যাবে?

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। আরও নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে হবে।

সেই নতুন কিছুটা কী?

সেটা হতে পারে এমন কোনো যন্ত্র, যা বাতাস থেকে কার্বন শুষে নিয়ে অক্সিজেন বিমুক্ত করবে। আর সংগৃহীত কার্বন অন্য কাজে লাগাবে।

মনে প্রশ্ন আসতে পারে—এটা কি সম্ভব?

হ্যাঁ সম্ভব, খুবই সম্ভব। একটা মেশিন সত্যিই আবিষ্কার হয়েছে। কাজও শুরু করে দিয়েছে। জুরিখের কাছে একটা সুইস প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে, যা বাতাস টেনে নিয়ে স্পঞ্জের মতো ফিল্টার দিয়ে কার্বন শুষে নেয়। অক্সিজেন বের করে দেয়। বাতাস কার্বনমুক্ত হয়। ফাস্ট কোম্পানি পত্রিকার নিউজ লেটারে ৩১ মে এই সুসংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে (দেখুন https://www.fastcompany.com/40421871/this-)| বলা হয়েছে, কোম্পানিটি ৩১ মে থেকেই কাজ শুরু করেছে।

তেল-গ্যাস পোড়ানোর হার কমাতে হবে নিশ্চয়ই। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, এতে বিশ্বের মোট উত্পাদন কমে যাবে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার নামের থিংক ট্যাঙ্কের পরিচালক বিয়র্ন লমবর্গ (Bjørn Lomborg) ২০১০ সালে তাঁর লেখা স্মার্টার থিংকিং অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত আরও চৌকস চিন্তাভাবনা) নিবন্ধে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। থিংক ট্যাঙ্কের উদ্যোগে একদল সেরা অর্থনীতিবিদ গবেষণা করছেন। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস তাঁদের গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশ করছে। নাম স্মার্টার সলিউশনস টু ক্লাইমেট চেঞ্জ (জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার অধিকতর চৌকস সমাধান)। তাঁরা বলছেন, উষ্ণায়ন বৃদ্ধি যদি প্রতিশ্রুত ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখতে হয়, তাহলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৮০ শতাংশ কমাতে হবে। এতে প্রায় ১ লাখ কোটি (১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন) ডলারের সমপরিমাণ জলবায়ুক্ষতির হাত থেকে বাঁচা যাবে। কিন্তু এর জন্য যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে, তার পরিমাণ দাঁড়াবে বছরে ৪০ লাখ কোটি ডলার। অর্থাত্ ১ লাখ কোটি ডলার সমমূল্যের জলবায়ু-বিপর্যয় রোধে এই শতাব্দীর শেষার্ধে প্রতিবছর কার্যত ৪০ লাখ কোটি ডলার ক্ষতি মেনে নিতে হবে। উৎপাদন কমবে, মানুষ চাকরি হারাবে, উন্নয়ন ধীরগতিতে চলবে। পৃথিবীকে বাঁচাতে আমাদের এই পরিকল্পনা নিতে হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এর চেয়ে আর কোনো ভালো বিকল্প আছে কি না?

সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পদ্ধতি বেশি হারে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যাপারেও নতুন চিন্তাভাবনার অবকাশ আছে। যেমন মহাশূন্যে উপগ্রহে সৌরশক্তি সঞ্চয় করে ‘জ্বালানি-রশ্মির’ আকারে পৃথিবীতে প্রেরণের বিশেষ ব্যবস্থা করা যায় কি না, ইত্যাদি। তাহলে বর্তমানে প্রচলিত সৌরবিদ্যুত্ সেল ব্যবহারের পাশাপাশি, আকাশ থেকে পাঠানো বিদ্যুতৎ বাড়ির ছাদে অ্যানটেনার সাহায্যে গ্রহণ করে বাসার বিদ্যুতের কাজ চালানো যাবে। এগুলো এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কত কিছুই তো আবিষ্কার করা সম্ভব।

এই সময় কার্বন পরিশোধন প্ল্যান্টের খবরটি নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক। তবে মনে রাখতে হবে, তেল-কয়লা পুড়িয়ে কার্বন নিঃসরণ পরিশ্রুত সীমায় নামিয়ে আনতেই হবে। কিন্তু শুধু সেটাই যথেষ্ট হবে না। কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি আরও কিছু উদ্যোগ না নিলে হয়তো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া থামিয়ে বিপরীতমুখী করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাই এসব নতুন প্ল্যান্টেরও দরকার হবে।

বনায়ন সবচেয়ে ভালো উপায় সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে সমস্যা হলো অনেক জায়গা লাগে। আর খরচও অবশ্যই আছে। সেখানে কার্বন মেশিনটি গাছের মতোই কাজ করে, কিন্তু অনেক বেশি ফল দেয়। যেমন মেশিনটি বাতাস থেকে বছরে ৫০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে নেবে। আর তার সমতুল্য একটি গাছ বছরে শুষে নিতে পারে মাত্র ৫০ কিলোগ্রাম কার্বন। তার মানে, একই পরিমাণ কার্বন বের করে আনতে গাছের চেয়ে মেশিনটি ১ হাজার গুণ বেশি দক্ষ! বনায়নের চেয়ে ১ হাজার গুণ কম জমি লাগবে। আবার যেসব জমিতে কৃষিকাজ হয় না, বনায়নও কঠিন, সেখানেও এই প্ল্যান্ট বসানো যাবে।

প্রশ্ন হলো এই প্ল্যান্ট যে কার্বন বের করে আনবে, তা কোথায়, কী কাজে লাগবে? এর উপায়ও ওই কোম্পানি বের করেছে। যেমন, যেসব পণ্য তৈরিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড লাগে, ওদের কাছে ওই কার্বন বিক্রি করা যাবে। অথবা কোম্পানি অব্যবহূত কার্বন মাটির নিচে পুঁতে রাখবে।

সুইজারল্যান্ডে নির্মিত প্রথম প্ল্যান্ট বছরে ৯০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেবে। যা মাত্র ২০০টি গাড়ি থেকে নির্গত কার্বনের সমান। কোম্পানিটি হিসাব করে দেখেছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ মাত্র ১ শতাংশ কমাতে হলে ৭ লাখ ৫০ হাজার শিপিং কনটেইনারের আকারের প্ল্যান্ট লাগবে।

সুতরাং শুধু এ ধরনের প্ল্যান্টও যথেষ্ট নয়। আরও উদ্ভাবনী উদ্যোগ দরকার। বড় প্ল্যান্ট তো শুরু হয়ে গেছে। তারপরও আমরা কি ভাবতে পারি না, আরও ছোট পরিসরে; যেমন, ল্যাবরেটরিতে বাতাসের কার্বন পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে?

বিজ্ঞাপন

গাছ যে কাজটি হাজার হাজার একর জমির ওপর ছড়িয়ে থেকে করে, সে কাজটি কি ল্যাবরেটরির কয়েক শ বর্গফুট কক্ষে করা সম্ভব নয়? এমন একটি ব্যবস্থা কেন করা যাবে না যে, গাছ থাকবে না, থাকবে শুধু পাতার ক্লোরোফিল, যা পানি ও আলো ব্যবহার করে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে কার্বনটুকু রেখে অক্সিজেন বাতাসে ফিরিয়ে দেবে?

অসম্ভবকে সম্ভব করাই বিজ্ঞানের কাজ। আজকাল মানুষের স্টেম সেল ব্যবহার করে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিত্সা করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে গাছের কোন স্টেম সেল তার কোন অঙ্গ তৈরি করে সে বিষয়ে গবেষণায় অগ্রগতি হয়েছে (দেখুন, সায়েন্স ডেইলি, জানুয়ারি ২, ২০০৬)। তাহলে উদ্ভিদের ক্লোরোফিল তৈরির স্টেম সেল বিকশিত করে গাছ ছাড়াই গাছের শুধু ক্লোরোফিলের স্টেম সেল ল্যাবরেটরিতে কোনো যন্ত্রে ব্যবহার করা যাবে না কেন? আর সেটা যদি হয়, তাহলে ল্যাবরেটরিতেই বাতাসের কার্বন পরিশোধনের কাজটি করা সম্ভব হতে পারে।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গ্লোবাল এডিটরস ফোরাম সম্মেলনের এক আলোচনায় আমি এ রকম প্রস্তাব করলে একজন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফান রামসটরফ প্রশ্ন তোলেন, ল্যাবরেটরিতে এত কার্বন রাখার জায়গা কোথায়? গাছ তো বাতাসের কার্বন জমা করে তার কাঠে, এ জন্যই তো বনভূমি এত বিশাল জায়গা দখল করে রাখে।

আমি বললাম, ল্যাবরেটরিতে তো গাছ থাকবে না, থাকবে শুধু তার ক্লোরোফিল। তাই গাছের মতো বিশাল জায়গার দরকার হবে না। আর সেখানে কাঠের আকারে যে কার্বন জমা হবে, তা আসবাব তৈরির জন্য ব্যবহার করলে ক্ষতি কী?

সেই বিজ্ঞানী এ রকম প্রকল্প প্রথমে অবাস্তব বললেও পরে অবশ্য বলেন, এ ধরনের কোনো প্রকল্পের তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে।

কার্বন নিঃসরণ অবশ্যই কমাতে হবে। তবে তার পাশাপাশি বাতাসের কার্বন শুষে নেওয়ার বিভিন্ন উপায় আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এই শতাব্দীর বিজ্ঞান মূলত এই দিকেই নিবেদিত হোক।

লেখক: সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি বিজ্ঞানচিন্তার ২০১৭ সালের জুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন