সৃজনশীলতার মৌলিক চরিত্র

সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটির স্বজাত উদ্‌ঘাটন একান্ত জরুরি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য, মিডিওক্রিটির জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে খাঁটি সৃজনশীলতার খোঁজ আমাদের করতেই হবে। আমাদের সমাজে প্রতিযোগিতার দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে সৃজনশীলতা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এভাবে চলতে থাকলে আরেকজন রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ, কিংবা জগদীশচন্দ্রের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে।

সৃজনশীলতার সংজ্ঞা দিয়েছেন হালের কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট মার্গারেট বোডেন। তিনি দ্য ক্রিয়েটিভ মাইন্ড: মিথস অ্যান্ড মেকানিসমস গ্রন্থে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: যেকোনো চিন্তা বা শিল্পকর্ম তখনি সৃজনশীল হয়, যখন তা সম্পূর্ণ নতুন, উৎসাহ-উদ্গারী ও প্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। সৃজনশীলতা চিহ্নিত করতে গিয়ে এর তিনটি রূপ বর্ণনা করেছেন বোডেন। তাঁর মতে, সৃজনশীলতা হতে পারে: এক, এক্সপ্লোরেটরি বা অনুসন্ধানমূলক; দুই, কম্বিনেটরিয়াল বা সমন্বয়সূচক এবং তিন, ট্রান্সফরমেশনাল বা যুগান্তকারী। ধ্রুপদী গবেষণা বা শিল্পসৃষ্টি সাধারণত অনুসন্ধানমূলক সৃজনশীলতার পথ অনুসরণ করে। অর্থাৎ এ যাবৎ যা আবিষ্কৃত হয়েছে বা সৃষ্টি করেন গেছেন পূর্বজনরা, তার ওপর ভিত্তি করে নতুন ধারণা বা শিল্পের জন্ম দেওয়া। এ ধরনের সৃষ্টি সাধারণত ইনক্রিমেন্টাল হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে, একাধিক জ্ঞান বা সৃষ্টিক্ষেত্রের যখন সমন্বয় ঘটে, তখন নতুন ধারণা বা শিল্পের জন্ম হয়। এ কম্বিনেটরিয়াল সৃষ্টিতে বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এমনকি শিল্পেরও জাগরণ (যেমন নতুন ধারার চিত্রকর্ম বা সংগীত) হয়ে চলেছে নিত্য। তৃতীয় ধারার সৃজনশীলতা যুগান্তকারী। অর্থাৎ একটি ‘স্পার্ক অব জিনিয়াস’ই কেবল এরকম কাজ করতে পারে। এভাবেই হয়তো লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট; কিংবা বাঁধা হয়েছে মোৎজার্টের ‘জুপিটার সিম্ফোনি’, চিত্রিত হয়েছে পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’। প্রশ্ন হলো, কোন সৃজনশীলতার উৎকর্ষে ইন্ধন জোগাব আমরা? সরকার এখন বাংলাদেশে গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে, যা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার। তবে সৃজনশীল গবেষণাক্ষেত্র তৈরির জন্য এর চরিত্র বুঝতে হবে।

আমার মতে, বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য একটি সুস্থ ও সৎ ভাবনাক্ষেত্র তৈরি করা আবশ্যক। এ জন্য প্রথমেই বিভিন্ন বিষয়ের বিশ্বের নামী জার্নালগুলোতে দেশব্যাপী অ্যাক্সেস থাকা প্রয়োজন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটা করা হয়েছে। এতে হালের বৈজ্ঞানিক স্থিতি সম্পর্কে দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা অবগত হতে পারবে। এভাবে অনুসন্ধানমূলক সৃজনশীলতার প্রথম ধাপের দিকে এগোবে দেশ।

দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ বা প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ইংরেজিতে যাকে বলে আর্টিকেল রিভিউ-এর সংস্কৃতি বিনির্মাণ একান্ত জরুরি। বিষয়-বিশেষজ্ঞদের রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট যথাযথ মূল্যমান অর্জন করতে পারে। তৃতীয়ত, গবেষণায় জাতীয় অগ্রাধিকারক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে, যাতে সমন্বয়-সূচক কম্বিনেটরিয়াল সৃষ্টির পথ সুগম হয়। কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণাক্ষেত্রই নয়, শিল্পক্ষেত্রেও সৃজনশীলতার মৌলিক সুর গেঁথে দিতে হবে। উৎসাহ দিতে হবে বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শিতা অর্জনকে। যে গায়ক, সে-ই নায়ক বা চিত্রকর হয়ে আবির্ভূত হবে, এ ধারণার অবসান প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, যেকোনো বিষয়ে পারফেকশন আনা সমাজের মেরুদণ্ডে স্থাপিত হওয়া চাই। গুণগত উৎকর্ষই যেন হয় আমাদের ব্রত। তবেই আরেকজন নজরুল, জয়নুল অথবা আরেকজন জীবনানন্দকে লালন করবে সমাজ।

আমরা এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করি, যেখানে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী তাঁর সমস্ত সৃজনশীলতাকে প্রয়োগ করে একটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা নেবে।

আমরা বৈজ্ঞানিক প্রগতির এমন এক যুগে বাস করছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজীবন নিয়ন্ত্রণ করবে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। যন্ত্র কি সৃজনশীল হতে পারে? কবিগুরুর সব সাহিত্যকর্ম যদি স্ট্রিং ডেটা হিসেবে, কিংবা পিকাসোর সব চিত্রকর্ম পিক্সেলেটেড ডেটা হিসেবে কম্পিউটারকে শেখানো যায়, তবে কি যন্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে নতুন রবীন্দ্র সাহিত্য কিংবা আনকোরা নতুন পিকাসোর শিল্পকর্ম সৃজন করতে পারবে? এ প্রশ্নগুলো ছুড়ছেন গণিতবিদ মার্কস দু সৌটোয় তাঁর দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোড গ্রন্থে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌটোয় গাণিতিক অ্যালগোরিদমের ভিত্তিতে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলছেন: যন্ত্রকে প্রশিক্ষণ বা ট্রেইন করতে হলে উপাত্তের ব্যবহার অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ যন্ত্র যদি উপাত্ত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে উপাত্তের ভিত্তিতে অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে নতুন উপাত্ত তৈরি করতে পারবে। এভাবে অনুসন্ধানমূলক কিংবা সমন্বয়সূচক সৃজনশীল সৃষ্টি যন্ত্রের পক্ষে করা অসম্ভব নয়। তবে একেবারে আনকোরা নতুন যে তথ্য বা উপাত্ত যন্ত্রের জানা নেই, তার উদ্ভাবন কিংবা যুগান্তকারী কোনো নতুন আবিষ্কার করার ক্ষমতা যন্ত্রের আছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সৌটোয়। তাঁর মতে, কেবল গুণী মানুষের পক্ষেই ট্রান্সফর্মেশনাল উদ্ভাবন বা সৃষ্টি সম্ভব নিজের স্পার্ক ও জিনিয়াস প্রয়োগ করে।

আজ তাই শুদ্ধাচারী মানুষ গড়ার কাজে মন দেওয়া চাই। মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে যাতে আগামীর কুশলী যন্ত্রের কাছে পরাভূত না হই আমরা। আমরা এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করি, যেখানে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী তাঁর সমস্ত সৃজনশীলতাকে প্রয়োগ করে একটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা নেবে। সমাজ এমন নিখুঁত প্রচেষ্টা অনুপ্রাণিত করবে। স্পার্ক অব জিনিয়াস জোর করে আসে না, তবে এ স্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলনের জন্য যথাযথ পরিবেশ তো তৈরি হওয়া চাই! 

লেখক: অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন, যুক্তরাষ্ট্র

সূত্র:

১. বোডেন, এম এ; দ্য ক্রিয়েটিভ মাইন্ড: মিথস অ্যান্ড মেকানিসমস, ২০০৩, রুলেজ, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

২. দু সৌটোয়, এম; দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোড, ২০১৯, হারভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ক্রেমব্রিজ, এমএ, যুক্তরাষ্ট্র