বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ২০২২
প্রজেক্ট নির্দেশিকা: যেমন চাই একটি বিজ্ঞান প্রজেক্ট
বিজ্ঞান উৎসবে বিজ্ঞান প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে চাইলে কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, কীভাবে একটি প্রকল্প হয়ে ওঠে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট, তারই খুঁটিনাটি জানিয়েছেন বিজ্ঞানচিন্তা সম্পাদনা দলের সদস্য ইবরাহিম মুদ্দাসসের।
শুরু হতে যাচ্ছে বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ২০২২। বিজ্ঞান কুইজ ও বিজ্ঞান প্রজেক্টের এই দারুণ আয়োজন শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে ঢাকা আঞ্চলিক উৎসবের মধ্য দিয়ে। এরপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও সিলেট—এই ৬ বিভাগে অনুষ্ঠিত হবে আঞ্চলিক উৎসব। সবশেষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ আয়োজন।
বিজ্ঞান উৎসবের আগের আসর বসেছিল ২০১৯ সালে। করোনা মহামারীর জন্য গত দুবছর এ আয়োজন করা যায়নি। চলতি বছর আবারও এ আয়োজন উপলক্ষে শুরু হয়েছে পূর্ণদ্যম প্রস্তুতি। বিজ্ঞান উৎসবে বিজ্ঞান প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে চাইলে কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, কীভাবে একটি প্রকল্প হয়ে ওঠে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট, তারই খুঁটিনাটি জানিয়েছেন বিজ্ঞানচিন্তা সম্পাদনা দলের সদস্য ইবরাহিম মুদ্দাসসের।
কোনো একটি প্রকল্প বানাতে গেলে তোমাকে অবশ্যই ভেতরের বিজ্ঞানটুকু জানতে হবে। এটাই হচ্ছে তোমার প্রকল্প বিচারের প্রধান বিষয়। চমৎকার একটি প্রকল্পের জন্য, ভালো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য তোমাকে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
মাপজোক আবশ্যিক
বিজ্ঞান মানেই হিসাব-নিকাশ। বিজ্ঞান উৎসবে যদি একটি প্রকল্প প্রদর্শন করতে চাও, অবশ্যই তার খুঁটিনাটি সবকিছু হিসাব করে আসতে হবে তোমাকে। যেমন তুমি স্বল্পমূল্যের একটি রেফ্রিজারেটর বানানোর পরিকল্পনা করলে। তাহলে অবশ্যই হিসাব করতে হবে তোমার রেফ্রিজারেটর কত সময়ে কত ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কমাতে পারে। কত তাপমাত্রায় খাদ্য নষ্ট হয় না।
জানতে হবে পেছনের বিজ্ঞান
তোমার প্রকল্পের পেছনের বিজ্ঞান অবশ্যই সবাইকে জানাতে এবং বোঝাতে হবে। যেমন তুমি যদি একটি যন্ত্র বানাও, যা হাইড্রোলিক প্রেসের মেকানিজমে কাজ করে, তাহলে তোমাকে হাইড্রোলিক প্রেসের মেকানিজমটা জানতে হবে। আবার তুমি যদি একটি পদ্ধতি বের করো, যেখানে কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়, তাহলে সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোও তোমাকে জানতে হবে। তোমার প্রকল্প যদি হয় তথ্যপ্রযুক্তির এবং তাতে যদি একটা প্রোগ্রাম কোড করা থাকে, তাহলে অবশ্যই তোমাকে সোর্স কোড দেখাতে হবে। শুধু পেছনের সূত্র বা সোর্স কোড দেখালেই চলবে না, তোমাকে তা ব্যাখ্যাও করতে পারতে হবে।
লুকোচুরি বিজ্ঞানীর স্বভাব নয়
প্রকল্প উপস্থাপনের সময় একটা জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, তুমি বিজ্ঞান প্রকল্প প্রদর্শন করতে এসেছ, ম্যাজিক দেখাতে নয়। তাই তোমার প্রকল্পের সব অংশ বিচারক এবং দর্শককে দেখতে দিতে হবে। যেমন ধরো তুমি একটি ইলেকট্রনিক সিস্টেম বানালে, যাতে অনুমতি ছাড়া তোমার ঘরে কেউ ঢুকলে অ্যালার্ম বাজে। তাহলে তোমাকে অবশ্যই ওই ইলেকট্রনিক সিস্টেমের সার্কিটটা উন্মুক্ত রাখতে হবে, দেখতে দিতে হবে সবাইকে।
অলৌকিকতা বিজ্ঞান নয়
বিজ্ঞান প্রকল্পে এমন কোনো অংশ থাকতে পারবে না, যা দেখতে অলৌকিক লাগে। যেমন ধরো তোমার প্রকল্প কেবল একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কাজ করে অথবা শুধু তোমার হাতে কাজ করে। আরও একটু নির্দিষ্ট করে বলা যায়, ধরো তুমি একটি বাতি দেখালে, যা নির্দিষ্ট জায়গায় ধরলে জ্বলে ওঠে। তারপর তুমি বললে এটা ‘অদৃশ্য কারেন্টে’র জন্য হচ্ছে। ‘অদৃশ্য কারেন্ট’ বলতে বিজ্ঞান কিছু জানে না। এমন প্রকল্প তাই অলৌকিক বলে বিবেচিত হবে।
কোনো কিছু শূন্য থেকে উদয় হতে পারে না
বিজ্ঞানের একেবারে গোড়ার একটি কথা হলো, শূন্য থেকে আমরা কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারি না। তাই তোমার প্রকল্পের পুরোটা বা কোনো অংশ এমন হতে পারবে না যে সেখানে কোনো কিছু শূন্য থেকে উদয় হয়।
‘অবিরাম গতিযন্ত্র’ অসম্ভব
অবিরাম গতিযন্ত্রের ইংরেজি হলো পারপেচুয়াল মোশন মেশিন। এটি এমন যন্ত্র, যা কোনো শক্তি ছাড়াই আজীবন চলতে পারে। এমন কোনো যন্ত্র নেই, বানানোও সম্ভব নয়। বিজ্ঞানের একেবারে গোড়ায় যে ব্যাপারগুলো আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে কাজ করতে শক্তি লাগবেই। গাধার সামনে মুলা ঝুলিয়ে দিলে মুলার টানে গাধা সামনে যাবে, কিন্তু সামনে যাওয়ার জন্য তাকে অবশ্যই শক্তি খরচ করতে হবে। তুমি কখনোই এমন কোনো যন্ত্র বানাতে পারবে না, যা চালাতে বাইরে থেকে কোনো শক্তি দেওয়া লাগে না বা একবার দিলে সারা জীবন চলতে থাকে। একবার দেখে নাও তোমার যন্ত্রে কোথাও শক্তি খরচ না করে কাজ করার কথা তুমি ভাবছ কি না।
আবারও চাই মাপামাপি
প্রকল্প উপস্থাপনের সময় তোমাকে অবশ্যই মাপামাপি করে আসতে হবে খুঁটিনাটি সবকিছু। জানাতে হবে সব হিসাব-নিকাশ। যেমন তুমি উদ্ভাবন করলে স্বল্পমূল্যের কীটনাশক। তোমার উদ্দেশ্য যদি হয় স্বল্পমূল্যে বানানো, তবে তোমাকে অবশ্যই জানতে হবে বাজারে কীটনাশকের দাম কত এবং তোমার কীটনাশক বানাতে কত খরচ হবে। বাজারের কীটনাশকের তুলনায় তোমার কীটনাশক কত শতাংশ কম দামি। বাজারের কীটনাশক কত সময় ধরে কার্যকর থাকে এবং তোমারটা কত সময় ধরে কার্যকর থাকে, তাও হিসাব করে আনতে হবে অবশ্যই। এমন খুঁটিনাটি সব হিসাব থাকলেই তোমার প্রকল্পটি একটি সুন্দর বিজ্ঞান প্রকল্প হবে।
কেন বানালে এমন প্রকল্প
কোনো প্রকল্প বানালে, কেন সেটি বানিয়েছ, তার স্পষ্ট ধারণা তোমার থাকা দরকার। তুমি যে জিনিসটি বানিয়েছ, তার কি কোনো বিকল্প আছে? সেই বিকল্পটি কী? সেটি থাকার পরও কেন তুমি এটি বানালে? কোন জায়গায় তোমার প্রকল্পটি সেটির চেয়ে ভালো? তোমার বানানো জিনিসটি যদি মূল্যের দিকে সাশ্রয়ী হয়, তাহলে তবে তা শতকরা কতভাগ সাশ্রয়ী? এসব প্রশ্নের খুঁটিনাটি উত্তর কিন্তু তোমাকে অবশ্যই জেনে প্রস্তুত হয়ে আসতে হবে সুন্দর একটি প্রকল্প উপস্থাপন করতে হলে।
নোট করে রাখো সবকিছু
তুমি যদি তোমার প্রকল্পটি সুন্দরভাবে শেষ করতে চাও, কাজের বিভিন্ন ধাপে তোমাকে যে কাজটি করতেই হবে তা হলো, তুমি পুরো কাজটি কীভাবে করেছ, তা লিখে রাখা। তুমি একটা কাজ করতে পারো, তোমার প্রকল্পের সঙ্গে খুঁটিনাটি লিখে একটা পোস্টার বানিয়ে নিয়ে আসতে পারো। তোমার পোস্টারে রাখতে পারো নিচের বিষয়গুলো—১. কী নিয়ে প্রকল্পটি? ২. উপকারিতা কী বা কেন এই প্রকল্পটি বানালে? ৩. বিজ্ঞানের কোন বিষয়টি কাজে লাগছে এখানে? ৪. বিদ্যমান অন্য কোনো জিনিসের বিকল্প এটি এবং সেটির থেকে কোন দিক দিয়ে এটি বেশি উপযোগী? ৫. এটি কী কাজে লাগবে?
সৃজনশীলতা মানে আজগুবি কিছু নয়
সুন্দর একটি বিজ্ঞান প্রকল্প করতে তোমাকে নানা নিয়মকানুনে বন্দী হতে হবে না, দরকার শুধু তোমার সৃজনশীলতা। তবে মাথায় রাখতে হবে তুমি বিজ্ঞান প্রকল্প করছ, ম্যাজিক দেখাচ্ছ না বা রূপকথার গল্পের কোনো যন্ত্র বানাচ্ছ না। তাই তোমাকে অবশ্যই বিজ্ঞানের মূলনীতিগুলো মেনে কাজ করতে হবে। সবকিছু আরেকবার যাচাই করে দেখো, ওপরের বিষয়গুলোর কোনোটা ঘাটতি আছে কি না তোমার প্রকল্পে। তাহলে ওই ঘাটতি পূরণ করো। দেখবে তুমি চমৎকার একটি বিজ্ঞানসম্মত বিজ্ঞান প্রকল্প বানিয়ে ফেলেছ।
তোমাকে অভিনন্দন।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, রসায়ন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং, যুক্তরাষ্ট্র