স্টিফেন হকিং
সিঙ্গুলারিটি: মহাবিশ্বের সূচনা
আজ স্টিফেন হকিং-এর জন্মদিন। ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। আমাদের কালের এই মহানায়ক যতটা বিখ্যাত তাঁর বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ ও বইগুলোর জন্য, তাঁর গবেষণাগুলো ততটা পরিচিত নয় সবার মাঝে। হকিংয়ের গবেষণাগুলো নিয়ে তাই ফ্লোরিয়ান ফ্রেয়িস্টেটার একটি বই লিখেছেন—স্টিফেন হকিং: হিজ সায়েন্স ইন আ নাটশেল। হকিংয়ের জন্মদিনে সেই বইটির প্রথম অধ্যায়টি পাঠকের জন্য ভাষান্তর করেছেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার।
স্টিফেন হকিং বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ার শুরু করেন মহাবিশ্বের চরম সূচনা দিয়ে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্মসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে। অনেক শতাব্দী ধরে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে আসছেন দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদরা। কিন্তু বিশ শতকে এসে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানও মহাবিশ্বের জন্মসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। বিশেষ করে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে গোটা মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণার একটি মোক্ষম অস্ত্র বা হাতিয়ারের জোগান দেন জার্মান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। সেই হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন অসংখ্য বিজ্ঞানী। তাঁদেরই একজন ছিলেন তরুণ স্টিফেন হকিং।
১৯৬৬ সালের ১৮ অক্টোবর। সেবার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট গবেষণা শেষ করেন হকিং। একই বছর তিনি দ্য অকারেন্স অব সিঙ্গুলারিটি ইন কসমোলজি শিরোনামে একটি গবেষণা প্রবন্ধও প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটি ছিল মহাবিশ্বের অতীত ও ‘সিঙ্গুলারিটি’-বিষয়ক। শেষের পরিভাষাটি আইনস্টাইনের স্পেস-টাইম বা স্থান-কালের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সেটা আসলে আইনস্টাইন নামের এই মহান চিন্তাবিদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিষয়টি আধুনিক বিজ্ঞানীদের মন এখনো দখল করে আছে। আইনস্টাইনের আগে বস্তু সম্পর্কে আইজ্যাক নিউটন যা বলে গেছেন, তাই মেনে নিয়েছিল মানুষ। নিউটন বলেছিলেন, স্থান হলো স্রেফ স্থান, আর সময় স্রেফ সময়।
অর্থাৎ নিউটনের মতে, স্থান ও সময় ছিল একটা আরেকটা থেকে আলাদা বা স্বাধীন। সময় ছিল পরম। সবার জন্য একই হারে বয়ে যেত সময়। আবার সময় ও স্থান ছিল এমন এক মঞ্চ, যেখানে মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা সম্পাদিত হতো। তবে নিউটনের ধারণাকে সমূলে হটিয়ে দেন আইনস্টাইন। তাঁর বদলে তিনি প্রমাণ দেখান, তিন মাত্রিক স্থান ও এক মাত্রিক সময় অবিচ্ছেদ্যভাবে একটি চতুর্থ মাত্রিক স্থান-কাল হিসেবে সংযুক্ত। আইনস্টাইনের পর থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি, স্থান আমাদের কাছে কীভাবে আবির্ভূত হবে এবং আমরা সময়কে কীভাবে অনুভব করব, তা নির্ভর করবে আমরা কতটা জোরে ছুটছি, তার ওপর। অন্য কথায়, সময় ও স্থান পরম কোনো কিছু নয়। বরং তা প্রতিটি পর্যবেক্ষকের জন্য আলাদা আলাদা হয়ে দেখা দেয়। এভাবে প্রকৃতির সূত্রের জন্য নিউটনের মঞ্চকে একটা ভৌত অস্তিত্বে রূপান্তর করলেন আইনস্টাইন। সহজ কথায়, খোদ স্থান-কালই পদার্থবিদ্যার একটা বিষয়ে পরিণত হলো। আবার এর ধর্ম আছে এবং এর পরিবর্তনও হতে পারে। সর্বোপরি এর আকার থাকতে পারে—সময় ও স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে ভর ও শক্তি। মহাকর্ষীয় টানের পার্থক্যে এই বক্রতার প্রাবল্যের যে তারতম্য হয়, তা-ও অনুভব করতে পারি আমরা।
বিষয়গুলো বেশ বিভ্রান্তিকর। আইনস্টাইনের সমীকরণগুলোতে বিজ্ঞানীরা ভালোভাবে নজর দেওয়ার পর পুরো ব্যাপারটি আরও তালগোল পাকিয়ে গেল। কারণ, সবশেষে এক সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুতে এসে ঠেকেন তাঁরা। নক্ষত্রের বিকাশ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে কেবল বিষয়টি বুঝতে শুরু করলেন বিজ্ঞানীরা। বিপুল আকৃতির এই উত্তপ্ত গ্যাসীয় বলের ভেতরে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে। এ প্রক্রিয়ায় বিমুক্ত শক্তি বিকিরণ হিসেবে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর নক্ষত্রের বস্তুকণাগুলোকে বিপরীত দিকে ধাক্কা দেয়।
মহাকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করে বিকিরণের এই চাপ। নক্ষত্র আসলে তার নিজের ভরের ভেতরে নিজেকে চুপসে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু জীবনকালের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে নক্ষত্র জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে। জ্বালানির অভাবে আর নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া চালু রাখতে পারে না ওই নক্ষত্র। তখন এই বিকিরণ চাপও আর থাকে না। এ সময় মহাকর্ষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নক্ষত্রটিতে। তাতে নক্ষত্রটি নিজের ওপরই চুপসে যেতে থাকে। কিংবা বলা যায়, ভেঙে পড়তে থাকে। এতে ক্রমেই ছোট হতে থাকে নক্ষত্রটি। তার ভেতরের পদার্থগুলো অনবরত সংকুচিত হতে হতে একসঙ্গে ঘনবদ্ধ হতে থাকে। এভাবে পরমাণুগুলো একসময় ঘনিষ্ঠভাবে চলে আসে ঠাসাঠাসি অবস্থায়। অনেক সময় নক্ষত্রের মহাকর্ষ টানও তাদের আরও ঠাসাঠাসিভাবে সংকুচিত করার মতো পর্যাপ্ত চাপ দিতে পারে না। তখন নক্ষত্রের এই চুপসে পড়া একসময় থেমে যেতে পারে। তবে নক্ষত্রটি যদি যথেষ্ট অতিভরের (Supermassive) হয়, তাহলে এই চুপসে যাওয়া ঠেকানোর মতো কোনো শক্তি তার আর থাকে না। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণগুলো প্রমাণ করে, নক্ষত্রটি তখন আরও ক্ষুদ্র ও ঘন হয়ে উঠতে পারে। এই সংকোচন প্রক্রিয়া চলতে পারে নক্ষত্রটির সবগুলো পদার্থ চরমভাবে একত্রিত হয়ে একক অতিক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত। চুপসে যাওয়ার সময় মৃত্যুমুখী এই নক্ষত্রের চারপাশের স্থান-কালের বিকৃতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। নক্ষত্রটি চুপসে গিয়ে অতিক্ষুদ্র বিন্দু অবস্থায় পৌঁছালে এই বিকৃতির পরিমাণ এবং নক্ষত্রের ঘনত্ব অসীম হয়ে ওঠে। খোদ নক্ষত্রটি তখন হয়ে যায় অসীম রকম ছোট। এই অবস্থায় অসীম হয়ে যায় ভৌত মাত্রাগুলোও। এ অবস্থাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু।
এইমাত্র বর্ণিত উপায়ে কোনো নক্ষত্র যদি নিঃশেষ হয়ে যায় বা মরে যায়, তাহলে তাকে আমরা বলি ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। তবে নক্ষত্রটি পরম বিন্দুর পর্যায়ে এসে সেটা এরপর কীভাবে বিকশিত হয়, তা আর আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু কেন তা পারি না? আসলে এর কারণ, এই শেষ বিন্দু সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় না।
নক্ষত্র চুপসে যাওয়ার সময় তার স্থান-কালের বিকৃতি বা বক্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এতে চরমভাবে বাড়তে থাকে মহাকর্ষের টানও। কোনো বস্তুর মহাকর্ষ টান যত শক্তিশালী হয়, সেই বস্তু থেকে দূরে সরে যেতে তারও তত বেশি শক্তির দরকার হয়। কিংবা তাকে অবশ্যই দ্রুত বেগে সেখান থেকে সরে যেতে হবে। উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীর কথা ধরা যাক। পৃথিবীর মহাকর্ষ টান ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে আপনাকে প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ১১.২ কিলোমিটার বেগে চলতে হবে। এই বেগকে বলা হয় মুক্তিবেগ বা এসকেপ ভেলোসিটি। কোনো স্থানের বক্রতা যত বেশি, এই আকর্ষণ বল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার বেগ বা মুক্তিবেগ হবে তত বেশি।
ক্রমান্বয়ে চুপসে যাওয়া কোনো নক্ষত্র একসময় এমন এক বিন্দুতে পৌঁছায়, যখন এই মুক্তিবেগের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় আলোর বেগের সমান। তার মানে, তখন এর মহাকর্ষ টান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার হবে আলোর চেয়েও বেশি বেগ। কিন্তু তা তো এককথায় অসম্ভব। এই সীমাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত। কোনো কৃষ্ণগহ্বরের বাইরে থেকে আমরা যে জিনিসটা টের পাই, ঘটনা দিগন্ত ঠিক তা-ই। ঘটনা দিগন্তে আসার আগ পর্যন্ত কোনো কৃষ্ণগহ্বর থেকে বাঁচার একটা মাত্র উপায় থাকে (আপনার যদি পর্যাপ্ত গতি থাকে, তাহলে বলা যায়, আপনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন)। কিন্তু ঘটনা দিগন্ত ছাড়িয়ে গেলে আপনার আর কোনো আশা নেই। এ কারণে বাইরে থেকে ঘটনা দিগন্তের পেছনের সবকিছুই আমাদের কাছে অদৃশ্য। রহস্যময়। কোনো কিছুই সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাই আমরা জানতে পারি না, এর পেছনে আসলে কী আছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বমতে, ঘটনা দিগন্তের পেছনে অবিরাম চুপসে যেতেই থাকে নক্ষত্রটি। সেটি পরম বিন্দুতে গিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।
তারপরও তাত্ত্বিকভাবে ঘটনা দিগন্তকে যতটা রহস্যময় দেখায়, আসলে ততটা নয়। একে দেখা যায় না, স্থানে এর সত্যিকার কোনো বিন্দু নেই। এমনকি কোনো ভৌত বাধাও নেই। আপনি যদি বাস্তব কোনো কৃষ্ণগহ্বরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে গেলেও বিশেষ কিছু দেখতে পাবেন না। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসতে চাইলে সমস্যায় পড়তে হবে। কিংবা সমস্যায় পড়তে হবে খোদ সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু পেরিয়ে এলেও।
বিজ্ঞানীরা জানেন, পরম বিন্দু বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। গণিতের বাইরে কোনো অসীম ক্ষুদ্র বস্তু থাকা সম্ভব নয়। পরম বিন্দু যদি দেখা যায়, তাহলে তার অর্থ হবে, যে তত্ত্বটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি আর সেখানে কার্যকর নয়। তাই আমাদের অন্য কিছু দরকার। অন্য কোনো হাতিয়ার।
১৯৬০-এর দশকে অনেকে বিশ্বাস করত, প্রয়োজন হলে আমরা এ ধরনের ঘটনা অগ্রাহ্য করতে পারব। তখন ভাবা হতো, এমনকি আশাও করা হতো যে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে পাওয়া পরম বিন্দু আসলে নিছক একধরনের গাণিতিক অস্বাভাবিকতা। সরলীকরণের জন্য এই তত্ত্ব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো অনুমান করার সময় এর আবির্ভাব হয়। মোটামুটি অল্প রহস্যময় উদাহরণ দিয়ে এই বিন্দুকে ব্যাখ্যা করা যায়—কুলম্বের সূত্র এমন এক গাণিতিক সূত্র। দুটি বৈদ্যুতিক চার্জের মধ্যে স্থিরতড়িৎ বলের আকর্ষণ কতটা শক্তিশালী, তা ব্যাখ্যা করে এ সূত্র। দুটি চার্জের মাঝখানের দূরত্ব যদি শূন্য হয়, তাহলে সূত্রটি বলে দুইয়ের আকর্ষণ বল হবে অসীম রকম বড়। এখানেও অসীম রকম বড় একটি মান পাওয়া যায়। আবার সূত্রটির ভেতর থাকে একটি পরম বিন্দু। কিন্তু একটি গাণিতিক রূপায়ণ থেকে এর উদয় হয়—সূত্রটি পরমাণুর মতো কণাকে ব্যাখ্যা করে একটি বিন্দু হিসেবে। গাণিতিকভাবে বলতে গেলে, দুটি বিন্দুও কাছাকাছি আসতে পারে, যাতে তাদের মধ্যকার দূরত্ব শূন্য হয়। তবে বাস্তব কণা কখনো বিন্দু হয় না। অর্থাৎ মাত্রা ছাড়া কোনো বস্তু হয় না, বরং কণাদের অবশ্যই মাত্রা থাকে। তাই তারা অতি ক্ষুদ্র হলেও তাদের অস্তিত্ব থাকে। আবার বাস্তব কণাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব কখনোই শূন্য হয় না। কুলম্বের সূত্রের পরম বিন্দু তাই নিছকই অন্তর্নিহিত অনুমান থেকে পাওয়া ফলাফল, যা ওই তত্ত্ব ব্যবহার করে পাওয়া যায়। কাজেই তখন আশা করা হয়েছিল, আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুগুলোও হয়তো একই রকম। আবার নক্ষত্রের মৃত্যুর বিষয়টি সিঙ্গুলারিটি বাদ দিয়েও ব্যাখ্যা করা যাবে বলেও তখন আশা করা হয়েছিল।
হকিংয়ের কাছে ফিরে আসা যাক। তাঁর গবেষণা প্রবন্ধটি কোনো চুপসে যাওয়া নক্ষত্রের পরম বিন্দু নিয়ে নয়। বরং তিনি আগ্রহী ছিলেন আরও বড় চিত্র, অর্থাৎ গোটা মহাবিশ্ব নিয়ে। মহাবিশ্বের বিকাশ বোঝার সুবিধার্থে নক্ষত্রের চুপসে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি।
ঠিক এখানেই ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে বেশ জাঁকালোভাবে আগমন ঘটে স্টিফেন হকিংয়ের। তাঁর প্রবন্ধে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে পাওয়া পরম বিন্দুগুলো সরিয়ে দেওয়ার কোনো উপায়ের খোঁজ করেননি তিনি। তার বদলে তিনি প্রমাণ করেন, পরম বিন্দু এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।
বিভিন্ন গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মার্কিন জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবল আর তাঁর সহকর্মীরা ১৯২০-এর দশকে উদ্ঘাটন করেন, মহাবিশ্ব গতিশীল বা প্রসারণমান। তার আগ পর্যন্ত মানুষের ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব স্থির। অর্থাৎ মহাবিশ্ব চিরকাল এ রকমই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থেকে যাবে সেভাবেই। সেই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করা হতো যে মহাবিশ্বের কোনো শুরু কিংবা শেষ, কিছুই নেই। কিন্তু হাবল আবিষ্কার করলেন, সব গ্যালাক্সি পরস্পরের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এর সহজ মানে হলো ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে আমাদের মহাবিশ্ব। পলে পলে এর আকারও বাড়ছে। আমরা যদি ভবিষ্যতের দিকে না তাকিয়ে অতীতে ফিরে দেখি, তাহলে অবস্থাটা স্রেফ উল্টে যেতে দেখা যাবে। এভাবে অতীতের যত পেছনে দেখা যাবে, ততই ছোট দেখতে পাওয়া যাবে আমাদের মহাবিশ্বকে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই তারও চেয়ে অনেক অনেক পেছনে ফিরে যাই, তাহলে কী ঘটবে?
তাহলে ক্রমেই ছোট থেকে আরও ছোট হতে থাকবে স্থান-কাল। পাশাপাশি অনেক বেশি ভর একত্রিত হয়ে ক্রমেই চুপসে যেতে থাকবে ক্ষুদ্র হতে থাকা স্থানের মধ্যে। দেখা যাচ্ছে, চুপসে যাওয়া নক্ষত্রের সঙ্গে বেশ মিল আছে মহাবিশ্বের এই অবস্থাটার। স্থান-কালের এ ধরনের স্থানীয় এলাকার ব্যাখ্যার জন্য আমরা আইনস্টাইনের সমীকরণগুলো ব্যবহার করতে পারি। আবার এই অবস্থায় স্থান-কাল কেমন আচরণ করবে, তা-ও হিসাব করে দেখা যায় এসব সমীকরণ ব্যবহার করে। হকিংয়ের যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো, তিনিই প্রথম সেটা গ্রহণ করেছিলেন। এভাবেই একসময় সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুর মুখোমুখি হন তিনি।
মহাবিশ্ব যদি অতীতে আজকের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্রতর হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে দুটি সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে বুঝতে পারলেন হকিং। হয় মহাবিশ্ব একসময় এমন কোনো অবস্থায় ছিল, যেখানে তার ঘনত্ব পৌঁছে গিয়েছিল সর্বোচ্চ কোনো মানে (খুবই বড়, কিন্তু অসীম নয়)। নয়তো একটি সর্বজনীন পরম বিন্দু ছিল অতীতে। অর্থাৎ সেটা এমন এক অবস্থা, যেখানে মহাবিশ্বের সর্বমোট ভর একক একটা বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। এই বিন্দুর ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও স্থানের বক্রতা অসীম।
সেই ১৯২০-এর দশকে আইনস্টাইনের সমীকরণে এই গোলমেলে অবস্থাটা আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। তবে সমীকরণগুলো ছিল অবিশ্বাস্যরকম জটিল। তাই মহাবিশ্বে বস্তুর বিন্যাস, মহাবিশ্বের প্রতিসাম্যতা এবং এ রকম আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করে অতি অল্প কিছু অনুমান করে সমীকরণগুলো সমাধান পারতেন তাঁরা। এটি এখন আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আশা করা যায়, মহাবিশ্বের চরিত্র সম্পর্কে নির্দিষ্ট ও আরও বাস্তবসম্মত কোনো অনুমান করা সম্ভব হলে তত্ত্ব থেকে পরম বিন্দু অদৃশ্য হয়ে যেত।
ঠিক এখানেই ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে বেশ জাঁকালোভাবে আগমন ঘটে স্টিফেন হকিংয়ের। তাঁর প্রবন্ধে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে পাওয়া পরম বিন্দুগুলো সরিয়ে দেওয়ার কোনো উপায়ের খোঁজ করেননি তিনি। তার বদলে তিনি প্রমাণ করেন, পরম বিন্দু এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। হিসাব কষে দেখান, শেষ পর্যন্ত পরম বিন্দুতে আসার জন্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে খুব অল্প কিছু বোধগম্য ও বাস্তবসম্মত অনুমানই যথেষ্ট। বোধগম্য ও বাস্তবসম্মত এই অনুমানগুলো হলো, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সঠিক এবং মহাবিশ্বে আমরা যেটুকু পর্যবেক্ষণ করি, সেখানে অন্তত ততটুকু ভর আছে।
অন্যকথায় স্টিফেন হকিং প্রমাণ করতে সক্ষম হন, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে মহাবিশ্বের শুরুর পরম বিন্দু কোনো গাণিতিক অস্বাভাবিকতা নয়। মহাকর্ষ এমন একটি বল, যা সব সময় শুধু আকর্ষণ করে। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বেও বলা হয়েছে বিষয়টি। হকিংয়ের মতো আমরা যদি অনুমান করি তত্ত্বটি সঠিক, তাহলে তত্ত্বটি থেকে সরাসরি পরম বিন্দু পাওয়া যায়। আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, সাধারণ আপেক্ষিকতায় একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই তত্ত্বে জন্মগতভাবে রয়ে গেছে সেটা। আবার আমরা যদি তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করি, তাহলে পরম বিন্দুতে আসা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।
আইনস্টাইনের তত্ত্ব মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে অতীতের এক অবস্থার মুখোমুখি হতেই হবে। সেখানে সবকিছু সংকুচিত হয়েছিল অসীম ঘনত্বে ও তাপমাত্রার একক কোনো বিন্দুতে। এই ফলাফল একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বকে নিশ্চিত করে। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব বলে অতীতের কোনো এক সময়ে মহাবিশ্বের সূচনা ছিল। মৌলিক ওই বিন্দু থেকে বিকশিত হয়ে গড়ে উঠেছে আজকের মহাবিশ্ব। দ্বিতীয়ত, এতে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় মহাবিশ্বের অতীত-সম্পর্কিত চিরায়ত ব্যাখ্যা সব সময় আইনস্টাইনের সমীকরণের সঙ্গে মেলে না। কারণ, অতীতের যথেষ্ট পেছনে গেলে একটি পরম বিন্দুতে পৌঁছাতে হবে অনিবার্যভাবে (তার অসীম ভৌত মাত্রাসহ)। সেখানে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কোনো কাজ করে না।
আমাদের মহাবিশ্ব মহাকর্ষ নিয়ন্ত্রিত। এমনটা হওয়ার কারণে আপেক্ষিকতা তত্ত্বে পরম বিন্দু খুঁজে পাওয়া যায়। ঠিক সেটাই পেয়েছিলেন হকিং। বিশেষ করে আমরা অতীতে ফিরে তাকালে এবং মহাবিশ্বের সূচনা বিন্দু পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে পাওয়া যায় পরম বিন্দু। একই সঙ্গে দুটো বিষয় প্রমাণ করেছেন হকিং। সেগুলো হলো, মহাবিশ্ব অতি অবশ্যই একটা পরম বিন্দুর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। তাই শুধু আলবার্ট আইনস্টাইনের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারি না আমরা। যদি সত্যিই বুঝতে চাই, সবকিছু কীভাবে শুরু হলো, তাহলে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যার জন্য আমাদের অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আসলে আমাদের এখন এমন একটা তত্ত্বের প্রয়োজন, যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিতা তত্ত্বকে ছাড়িয়ে যাবে। মহাবিস্ফোরণে সহজাতভাবে অবোধ্য কোনো পরম বিন্দু থাকবে না সেই কাঙ্ক্ষিত তত্ত্বে। বরং নতুন সেই তত্ত্বের মাধ্যমে তা বোধগম্য হয়ে উঠবে। এই বৈজ্ঞানিক অন্বেষাতে নিজের ক্যারিয়ারের বড় একটা অংশ উৎসর্গ করেছিলেন স্টিফেন হকিং।