আধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলন ঘটেছে প্ল্যানেট আর্থ টুতে। ফলে দৃশ্যগুলো দেখতে মনে হয় সিনেমার কোনো টান টান উত্তেজনার মুহূর্ত।
প্রাণ ও প্রকৃতির ডকুমেন্টারি নির্মাণের জন্য বিবিসি বিখ্যাত। তাদের নির্মিত প্ল্যানেট আর্থ, লাইফ, ব্লু প্ল্যানেট, ফ্রোজেন প্ল্যানেট, হিউম্যান প্ল্যানেট ইত্যাদি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। সিরিজগুলোতে প্রাণী, প্রকৃতি, উদ্ভিদ ও পরিবেশের এমন সব ঘটনা দেখানো হয়, যেগুলো আমাদের আশপাশে অহরহ ঘট, কিন্তু দুই চোখ খুলে দেখা হয় না। কিংবা এমন সব দৃশ্য তুলে আনা হয়, যেগুলো পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ঘটে চললেও দেখা সম্ভব হবে না আমাদের অধিকাংশের। এমন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়, সাধারণ বিষয়কেও অসাধারণ লাগে। সেসবেরই একটি হলো প্ল্যানেট আর্থ টু।
২০০৬ সালে যে দৃষ্টিকোণ থেকে প্ল্যানেট আর্থ নির্মিত হয়েছিল, একই দৃষ্টিকোণ থেকে ১০ বছর পর ২০১৬ সালে নির্মিত হয়েছে প্ল্যানেট আর্থ টু। ১০ বছরে তথ্যচিত্র ধারণের প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই ছবির দৃশ্যের, মানের অনেক উন্নয়ন হয়েছে।
আগের ডকুমেন্টারিগুলোতে চিত্র ধারণ করতে হলে ট্রাইপডের সাহায্য নিতে হতো। সাধারণ সিনেমা নির্মাণের জন্য এ পদ্ধতি উপযুক্ত হলেও প্রাণী-প্রকৃতির চিত্র ধারণের জন্য সুবিধাজনক নয়। মানুষ নির্দেশনা দেখে কাজ করে, ফলে পরিকল্পিত দৃশ্যায়ন হয়। কিন্তু উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী কিংবা পরিবেশ তো স্ক্রিপ্ট দেখে আচরণ করে না।
দৃশ্য ধারণ করার সময় কোন প্রাণী কখন কোন দিকে চলে যায়, কখন কী করে বসে, তার ঠিক নেই। এ ক্ষেত্রে কিছুটা সমাধান হয়ে আসে হেলিকপ্টারে বসানো ক্যামেরা। জুম লেন্সের মাধ্যমে অনেক দূর থেকে প্রাণীর কার্যক্রম ও আচরণ ধারণ করা যায় সহজে। ২০০৬ সালের প্ল্যানেট আর্থ–এ, যা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু হেলিকপ্টারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। একে তো চাইলেই বনে-জঙ্গলে যেখানে খুশি সেখানে দৃশ্য ধারণ করা যায় না, তার ওপর হেলিকপ্টারের প্রচণ্ড শব্দে ভীত হয়ে পড়ে আশপাশের প্রাণীরা, যা তাদের স্বাভাবিক আচরণ বিঘ্নিত করে। আর যা–ই হোক, তারা তো আর বিঘ্নিত ও স্বভাবিকতাহীন দৃশ্য ধারণ করতে চায় না।
প্রযুক্তির উৎকর্ষে সে সমস্যার সমাধান হয়েছে। এসেছে আকারে ছোট এবং প্রায় শব্দহীন ড্রোন ক্যামেরা, যা চলে যেতে পারে প্রাণীর একদম কাছাকাছি, উড়তে পারে ডালপালার জঙ্গল ভেদ করে। সঙ্গে যেতে হয় না, দূর থেকেই রিমোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর যুক্ত হয়েছে উন্নত জাইরোস্কোপিক স্ট্যাবিলাইজেশন প্রযুক্তি। ক্যামেরা বহনকারী যন্ত্র নড়াচড়া করলেও এই বিশেষ প্রযুক্তিতে স্থির থাকে ক্যামেরা। একে মার্কেট পরিভাষায় গিম্বল বলে ডাকা হয়। প্রাণীর সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরাও চলে আর তাতে দৃশ্যের মানও বাড়ে অনেক।
আধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলন ঘটেছে প্ল্যানেট আর্থ টুতে। ফলে দৃশ্যগুলো দেখতে মনে হয় সিনেমার কোনো টান টান উত্তেজনার মুহূর্ত।
আইল্যান্ডস, মাউন্টেন, জঙ্গলস, ডেজার্টস, গ্রাসল্যান্ডিস ও সিটিস নামে মোট ৬ পর্বে বিভক্ত সিরিজটি। সব কটিই পর্বই চমৎকার। শেষ পর্বটির (Cities) কথা একটু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাণী-প্রকৃতির ডকুমেন্টারি সাধারণভাবে সব সময়ই হয়ে এসেছে বনে-জঙ্গলে, নদীতে-সমুদ্রে, পাহাড়ে-আকাশে, মেরুতে-বরফে। মানুষ ও মানুষের কংক্রিটের শহর সব সময়ই প্রাণী ও পরিবেশের জন্য নেতিবাচক। তাই প্রকৃতির দৃশ্যায়নে শহর-নগর সব সময়ই থেকেছে আলোচনার বাইরে। কিন্তু কংক্রিটের শহরও প্রাণ ধারণ করে। বন-জঙ্গলের অনেক প্রাণী দিব্য নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে শহরের সঙ্গে। কেউ কেউ জঙ্গলের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে শহরে। কবুতর, বানর, ইঁদুর, তেলাপোকা ইত্যাদি তার সেরা উদাহরণ। প্ল্যানেট আর্থ টুতে শহরের ওই না তোলা দৃশ্যগুলো তুলে আনা হয়েছে। এদের আমরা সব সময়ই দেখি, কিন্তু সেভাবে এদের নিয়ে ভাবি না, যেভাবে ভাবনা উসকে দিয়েছে শেষ পর্ব।
প্রথম পর্ব আইল্যান্ডস-এ পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্যের অলংকার গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক ইগুয়ানা ও সাপের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এমন দৃশ্য যেকোনো সিনেমার থ্রিলার দৃশ্যকেও হার মানাবে। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে সিনেমার প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে।
ন্যারেটর হিসেবে এতে কণ্ঠ দিয়েছেন ডেভিড অ্যাটেনবরো, যিনি তাঁর সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেন প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে করে। এই ধাঁচের ডকুমেন্টারি আর ডেভিড অ্যাটেনবরোর নাম যেন একটি অন্যটির পরিপূরক হয়ে গেছে। এ ধরনের কাজ করে করে পেয়েছেন নাইট উপাধি, নামের আগে যুক্ত হয়েছে স্যার। ডকুমেন্টারিতে তাঁর কণ্ঠের উপস্থিতি মানেই অন্য রকম এক পরিপূর্ণতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
ডকুমেন্টারি দেখা পরিশ্রমের কাজ, মানতেই হবে। একজন গড়পড়তা মানুষের এক বছরে যে পরিমাণ সিনেমা দেখা হয়, তার তুলনায় ডকুমেন্টারি দেখা হয় খুবই কম। তবে অল্প করে দেখতে পারলেও মনে প্রশান্তি কাজ করে যে নাহ্, ভালো কিছু একটা দেখলাম। তেমনই প্রশান্তিযোগ্য একটি সিরিজের নাম প্ল্যানেট আর্থ টু। প্রায় তিন বছর ধরে ৪০টির বেশি দেশে ধারণ করা হয়েছে এর দৃশ্য। নামের শেষে টু আছে বলে যে আগের সিরিজটি দেখে এসে এটি দেখতে হবে এমন নয়। দুটিই স্বাধীন, তবে দুটির থিম বা ফিলোসফি এক—প্রাণ ও প্রকৃতি। বই যেমন পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়, এ ধরনের শিক্ষণীয় ডকু-সিরিজও স্কুলে স্কুলে পাঠ্য করা উচিত।
কেউ যদি দেখতে চান, তাহলে দুটি বিষয় খেয়াল রাখবেন। ভালো সাউন্ড ও ভালো ডিসপ্লে। এ ধরনের তথ্যচিত্র কমই আছে সিনেমাপাড়ায়। তাই যত্ন নিয়ে দেখা উচিত। সাউন্ডের জন্য ভালো স্পিকার আর দৃশ্যের জন্য ভালো কোয়ালিটির প্রিন্ট বা রিপ সংগ্রহ করে নিতে পারলে ভালো হবে।
লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সায়েন্স ক্লাব
*লেখাটি বিজ্ঞানচিন্তার ২০২২ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত