হাইড্রোজেন পার অক্সাইড (H2O2) অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে মোটামুটি কমন রাসায়নিক, যেকোনো ওষুধের দোকানেই পাওয়া যায়। পানির মতো দেখতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের পাত্রে যদি আপনি এক টুকরা রুপা ফেলেন, দেখবেন প্রচুর পরিমাণে বুদ্‌বুদ উঠছে। এর মানে হলো, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ভেঙে পানি (H2O) ও অক্সিজেন (O2) উৎপন্ন হচ্ছে। যেহেতু এক রাসায়নিক পদার্থ অন্য দুই রাসায়নিক পদার্থে পরিণত হচ্ছে, এটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া। সবটুকু পানি আর অক্সিজেনে পরিণত হওয়া শেষ হলে দেখা যাবে, রুপার টুকরাটি ঠিক আগের মতোই আছে, ভরে কোনো পরিবর্তন হয়নি, রঙেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। রুপার টুকরা কোনো একভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু নিজের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আপনি যদি লম্বা সময় ধরে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রেখে দেন, কিছু পরিমাণ একাই ভেঙে যেত। কিন্তু সেটি খুবই ধীরগতিতে।

এটিই প্রভাবকের কাজ। প্রভাবক কোনো একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ায় বা কমায়। কিন্তু প্রভাবক নিজে বিক্রিয়া শেষে ঠিক আগের অবস্থাতেই থাকে—অপরিবর্তিত। এমনিতে অধিকাংশ রাসায়নিক বিক্রিয়া খুবই ধীরগতির, বাণিজ্যিকভাবে কারখানায় উৎপাদনের জন্য ঠিক ব্যবহারযোগ্য নয়। এ জন্য যেকোনো শিল্পকারখানায় প্রভাবকের দরকার, বিক্রিয়াকে গতিশীল করে বাণিজ্যিক উৎপাদন করতে।

প্রভাবকের আরেকটি গুণ হলো, সম্ভাব্য অনেকটি বিক্রিয়া থেকে একটি বিক্রিয়া বেছে নেওয়া। কীভাবে? একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কার্বন মনোক্সাইড আর হাইড্রোজেনের মিশ্রণকে বলে সিনগ্যাস (সিনথেসিস গ্যাস থেকে এসেছে)। ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবক ব্যবহার করে আপনি শুধু কার্বন মনোক্সাইড আর হাইড্রোজেনের মিশ্রণ থেকে নানা রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন করতে পারবেন। প্রভাবক হিসেবে নিকেল আর অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড ব্যবহার করলে হবে মিথেন, কপার আর জিংক অক্সাইড ব্যবহার করলে হবে মিথানল, রুথেনিয়াম ব্যবহার করে বানাতে পারবেন পলিথিন এবং আরও নানা কিছু। অর্থাৎ আপনি কী প্রভাবক ব্যবহার করছেন, তা শুধু বিক্রিয়ার গতি বাড়িয়েই দেবে না, কোন পদার্থ তৈরি হবে, তা–ও ঠিক করে দেবে।

শিল্পকারখানায় প্রভাবকের গুরুত্ব নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। হিসাব করে দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থনীতি কোনো না কোনোভাবে প্রভাবকের ওপর নির্ভরশীল। আর জীবজগতের প্রায় শতভাগ প্রক্রিয়া প্রভাবকের ওপর নির্ভরশীল।

এবার একটু পেছনে ফেরা যাক, ১৯৩৫ সালে। সে বছর সুইডিশ রয়্যাল সোসাইটি অব সায়েন্সেসের বার্ষিক রিপোর্টে বার্জেলিয়াস প্রভাবক সম্পর্কে তাঁর গবেষণা তুলে ধরেন, সেখানেই তিনি প্রভাবকের যে সংজ্ঞা আমরা মাত্র তুলে ধরলাম, তা লেখেন।

এরপর লম্বা সময় পেরিয়েছে। প্রভাবক নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। কিন্তু প্রভাবকের তালিকা যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন, ধাতব পদার্থ ও জটিল জৈব পদার্থ এনজাইম—দুই ধরনের প্রভাবক নিয়েই যত সব গবেষণা। ঠিক এখানেই আসে দুই বিজ্ঞানী লিস্ট ও ম্যাকমিলানের কথা। তাঁরা আবিষ্কার করেছেন একদম নতুন এক ক্যাটাগরি, জৈব প্রভাবক। জৈব প্রভাবক নিয়ে আলাপের আগে আমাদের একটু দেখে নেওয়া দরকার ধাতব প্রভাবক ও এনজাইমের ব্যাপারটি কী।

সাধারণভাবে দেখলে ধাতব প্রভাবকের রাসায়নিক গঠন তেমন জটিল কিছু নয়। অধিকাংশ সময়ে কোনো একটি ভারী ধাতু বা ধাতুর অক্সাইড প্রভাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন যেকোনো গাড়ির এগজস্ট পাইপে একটি প্রভাবকের ছাঁকনি দেওয়া থাকে। এই প্রভাবক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্যাসকে বিক্রিয়া করে কম ক্ষতিকর গ্যাসে রূপান্তর করে। সাধারণত এখানে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয় অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের ওপর প্লাটিনাম-রুথেনিয়ামের দ্বিধাতব কণা। ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অত্যন্ত ক্ষতিকর কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড ইত্যাদি পরিণত হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন বা পানিতে। এই ছাঁকনিকে বলে ক্যাটালাইটিক কনভার্টার। রাস্তায় কোনো গাড়ির এগজস্ট থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখলে বুঝবেন, প্রভাবক ঠিকমতো কাজ করছে না, ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে ছড়াচ্ছে।

এসব ধাতব প্রভাবকের সমস্যা হলো, গবেষণাগারে কার্যকর প্রভাবক বানানো খুব একটা কঠিন না হলেও সেগুলো অক্সিজেন বা পানির সংস্পর্শে এলে খুব সহজেই কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে শিল্পকারখানায় ধাতব প্রভাবক ব্যবহার ব্যয়সাধ্য এবং কঠিন। ধাতব প্রভাবকের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, অধিকাংশ ধাতব প্রভাবকই ভারী ধাতু বা হেভি মেটাল, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত।

অন্যদিকে যদি এনজাইমকে দেখেন, আমরা রাসায়নিক বিক্রিয়া করে এনজাইম তৈরি করতে পারি না। এনজাইম তৈরি হয় কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের কোষে। আমরা যে খাবার খাই, তার প্রধান অংশ শর্করা, আমিষ ও স্নেহজাতীয় পদার্থ। এই তিন ধরনের খাদ্য ভেঙে আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি ও অন্যান্য উপাদান তৈরি হয়। এই ভাঙার কাজ করে নানা ধরনের এনজাইম। এসব এনজাইমের তিনটি হলো কার্বোহাইড্রেজ, লাইপেজ ও প্রোটিয়েজ। এমন হাজারো এনজাইম আমাদের শরীরে সর্বক্ষণ কাজ করছে। এসব এনজাইম প্রোটিন নামের একধরনের অণুর মিশ্রণে তৈরি। শত শত প্রোটিন একসঙ্গে মিলে একেকটি এনজাইম তৈরি করে। এর গঠন এত জটিল যে আমরা তা ল্যাবে সহজে বানাতে পারি না। তাই প্রাকৃতিক কোনো উৎস থেকে প্রভাবক সংগ্রহ করে এনজাইম ব্যবহার করা যায়। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো দই। দুধ থেকে দই তৈরিতে এনজাইমের ভূমিকা রয়েছে, দরকারি ওই এনজাইম পাওয়া যায় ব্যাকটেরিয়া থেকে।

একটি তথ্য জেনে রাখা যেতে পারে। কিছু এনজাইমের কার্যপদ্ধতি আবার নির্ভর করে এর মধ্যে থাকা কোনো ধাতব পরমাণুর ওপর। ওই ধাতব পরমাণুই ঠিক করে দেয় এনজাইমটি কীভাবে কোনো একটি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে।

বিজ্ঞানী লিস্ট ও ম্যাকমিলান আসেন এখানেই, তাঁরা ধাতব আর এনজাইমের বাইরে নতুন ঘরানার প্রভাবক আবিষ্কার করেছেন। ম্যাকমিলান এই ঘরানার প্রভাবকের নাম দিয়েছেন অর্গানোক্যাটালিস্ট বা জৈব প্রভাবক। আর যে পদ্ধতিতে এ জৈব প্রভাবক উৎপন্ন হয়, তার নাম অর্গানোক্যাটালাইসিস বা জৈব অনুঘটন। প্রভাবক হিসেবে সাধারণ জৈব অণুর ব্যবহারই তাঁদের অর্জন। তাঁদের অর্জন সম্পর্কে জানার আগে আমাদের একটু দেখে নেওয়া দরকার জৈব অণু কী।

জৈব অণু বা জৈব রসায়ন শুনলেই আমাদের জীবজগতের অণু বা রসায়নের কথা মাথায় আসে। ঐতিহাসিকভাবে তা সত্য হলেও জৈব অণু শুধু জীবজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অণুই না। এক বিশেষ ধরনের অণুকে রসায়নবিদেরা জৈব অণু বলেন। সাধারণভাবে জৈব অণুর প্রধান অংশ কার্বন ও হাইড্রোজেন পরমাণু। সঙ্গে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, সালফার, ক্লোরিন বা ফ্লোরিন—এমন কিছু পরমাণুও যুক্ত হতে পারে। এসব পরমাণুর নানা রকম মিশ্রণে জৈব অণু তৈরি হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে আমরা যত পদার্থ ব্যবহার করি, সবই জৈব অণু। যেমন বাসায় চুলার গ্যাসের লাইনে যে জ্বালানি আসে, সেটি মিথেন—একটি কার্বন আর চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু দিয়ে হয় একটি মিথেন অণু। আবার চুলা জ্বালাতে যে গ্যাস সিলিন্ডার কেনা হয়, সেখানে থাকে সাধারণ প্রোপেন বা বিউটেন। প্রোপেন বা বিউটেনের অণুতে কার্বন থাকে যথাক্রমে তিন বা চারটি, বাকিটা হাইড্রোজেন। কসমেটিক, ওষুধ হিসেবে আমরা যা ব্যবহার করি, অধিকাংশই নানা ধরনের জৈব রাসায়নিক পদার্থ। হাড় বাদ দিলে আমাদের শরীরের প্রায় পুরোটাই জৈব পদার্থের।

প্রভাবক হিসেবে জৈব পদার্থের ব্যবহার কি আগে ছিল না? অবশ্যই ছিল। কোটি কোটি বছর ধরে প্রকৃতিতে যে এনজাইম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে, সেগুলো তো জৈব পদার্থই। কিন্তু রসায়নবিদেরা জৈব পদার্থকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করেননি, সম্ভবত তেমন একটা সফলতা আগে পাওয়া যায়নি। তাই ২০০০ সালের আগে খুব একটা চেষ্টাও হয়নি। সেখানেই নতুন পথ দেখিয়েছেন বেঞ্জামিন লিস্ট ও ডেভিড ম্যাকমিলান।

বেঞ্জামিন লিস্ট কাজ করতেন অ্যান্টিবডিকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহারের উপায় নিয়ে। সাধারণত আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের কাজ করে। কিন্তু তাঁরা চেষ্টা করছিলেন প্রভাবক হিসেবে অ্যান্টিবডিকে এনজাইমের মতো ব্যবহার করতে। এই কাজ করতে গিয়েই নতুন করে তিনি ভাবতে শুরু করেন, এনজাইম আসলে কীভাবে কাজ করে?

এনজাইম তো একধরনের পলিমার, শত শত অ্যামিনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে তৈরি। অনেক এনজাইমের মধ্যে ধাতব পরমাণু আছে, আবার অনেক এনজাইমে ধাতব পরমাণু নেই। এর মানে ধাতব পরমাণু প্রভাবকের জন্য শর্ত না। আবার একটি এনজাইমে শত শত অ্যামিনো অ্যাসিড একে একে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু প্রভাবক হিসেবে ওই এনজাইমের এক বা দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড সরাসরি কাজ করে। লিস্ট ভাবলেন, ওই এক বা দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড যদি আলাদা করে নেওয়া হয়, তাহলে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে, নাকি এনজাইমের বিশাল স্ট্রাকচারের মধ্যে থাকলেই শুধু প্রভাবক হিসেবে ওই এনজাইমের কার্যকারিতা থাকে।

এখান থেকেই শুরু। তিনি জানতেন যে সত্তরের দশকে গবেষকেরা প্রোলিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি ভাবলেন, তখন নিশ্চয় প্রোলিন নিয়ে তেমন কোনো সফলতা পাওয়া যায়নি, না হয় কেউ না কেউ নিশ্চয় তা নিয়ে এখন কাজ করতেন। এরপরও তিনি ঠিক করলেন, প্রোলিন নিয়ে চেষ্টা করেই দেখা যাক। এখানে বলে রাখা দরকার, এনজাইম খুব জটিল জৈব অণু হলেও অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো ছোট জৈব অণু, সহজেই গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব।

বেঞ্জামিন লিস্ট খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না, কিন্তু দেখা গেল, প্রোলিন খুব ভালোভাবেই প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। তিনি প্রোলিনকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করে ১৮৭০-এর দিকে আবিষ্কার করা অ্যালডল বিক্রিয়া করতে পারলেন। অ্যালডল বিক্রিয়ায় দুই ধরনের জৈব অণু যুক্ত হয়ে নতুন একধরনের জৈব অণু তৈরি করে। খুবই সরল জৈব অণু প্রোলিনকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করার এই ফলাফল অসামান্য, একদম নতুন এক জগৎ খুলে দিল। এই গবেষণায় তাঁরা যে শুধু প্রভাবক হিসেবে প্রোলিনকে ব্যবহার করতে সক্ষম হলেন তা-ই নয়, অপ্রতিসম প্রভাবক হিসেবে প্রোলিনের কার্যকারিতারও প্রমাণ পেলেন।

অ্যাসিমেট্রিক বা অপ্রতিসম প্রভাবক কী, সেটি বুঝতে আমাদের প্রথমে জানা দরকার প্রতিসম অণু কী। জৈব অণুর মধ্যে দেখা যায় যে কোনো কোনো অণুর সব পরমাণু একই রকম হলেও গঠনিক দিক দিয়ে একধরনের ভিন্নতা আছে। অনেকটা আমাদের দুই হাতের মতো। আমাদের দুই হাতেই পাঁচটি করে আঙুল, যার মধ্যে দুই হাতেই কনিষ্ঠ, অনামিকা, মধ্যমা, তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুল আছে। আছে হাতের তালু ও নখ। কিন্তু তারপরও ডান হাত আর বাঁ হাত আলাদা। একটি আরেকটির আয়নায় প্রতিফলিত ছবির মতো। প্রতিসম অণুও তেমন। একটির সঙ্গে এই রকম প্রতিফলিত পার্থক্য আছে।

প্রতিসম অণুর গুরুত্ব জৈব রসায়নে বিপুল। লিমোনিন নামের জৈব অণুর দুটি প্রতিসম গঠন আছে। এল-লিমোনিন ও আর-লিমোনিন। এল-লিমোনিনের গন্ধ লেবুর মতো ও আর-লিমোনিনের গন্ধ মাল্টার মতো। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিসম অণুর জন্য আমাদের নাক ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। বোঝাই যাচ্ছে, আলাদা প্রতিসম গঠন আমাদের শরীরের জন্য একদমই আলাদা প্রভাব রাখে। ওদিকে প্রায় সব ওষুধই নানা ধরনের জৈব পদার্থ। সেসব জৈব পদার্থের নির্দিষ্ট গঠনই যে শুধু রোগ সারাতে কার্যকর, তা বোঝা কঠিন নয়। তাই ওষুধশিল্পে একাধিক প্রতিসম অণু থেকে একটি নির্দিষ্ট গঠনের অণু তৈরি বা বাছাই করা খুবই দরকারি।

এখানেই দরকার প্রভাবক। এমনিতে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া করলে দেখা যাবে, একাধিক গঠনের প্রতিসম অণু তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু প্রভাবক ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিসম গঠন তৈরি করা সম্ভব। একেই বলা হচ্ছে অপ্রতিসম প্রভাবক। এই প্রভাবক যদি হয় সরল জৈব প্রভাবক, তবে আমরা তাকে বলব অপ্রতিসম জৈব প্রভাবক। বেঞ্জামিন লিস্টের তৈরি করা প্রভাবক নির্দিষ্ট গঠনের অণু বানাতে সক্ষম, এ জন্যই ২০০০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গবেষণাপত্রের নাম ছিল ‘প্রোলিন-প্রভাবিত সরাসরি অপ্রতিসম অ্যালডল বিক্রিয়া’। এই লেখার সময় উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ওই গবেষণাপত্র এখন পর্যন্ত অন্তত ২০০০ বার অন্য গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হলো, গত দুই দশকে অন্য সব গবেষককে বিপুলভাবে এ ধরনের প্রভাবক আকর্ষিত করেছে।

বেঞ্জামিন লিস্ট যে ইউরোপে বসে একাই এই বিষয়ে ভাবছিলেন, তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একই সময়ে এ ধরনের কাজ করছিলেন ডেভিড ম্যাকমিলান। এর আগে তিনি হার্ভার্ডে বসে কাজ করছিলেন অপ্রতিসম প্রভাবক নিয়ে। সেখানে তাঁরা চেষ্টা করছিলেন ধাতু ব্যবহার করেই অপ্রতিসম প্রভাবকের বিক্রিয়া করতে। গবেষণাগারে এই বিষয়ে অনেক সাফল্য। কিন্তু তা সব অক্সিজেন এবং আর্দ্রতামুক্ত পরিবেশে। কিন্তু কারখানায় তো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রায় সম্ভব নয়, সেখানে বিক্রিয়া করতে হবে বিশাল বিশাল পাত্রের মধ্যে। তিনি ভাবলেন, যদি এমন প্রভাবক বানাতেই হয়, নতুন কিছু করতে হবে। নতুন কিছু করার আশায় তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলেতে চলে গেলেন। পেছনে ফেলে গেলেন ধাতব প্রভাবককে।

ম্যাকমিলান চিন্তা করলেন, ভারী ধাতব পরমাণুর কোন গুণের জন্য তা প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে? কারণ, তা প্রয়োজনে বিক্রিয়ার সময় অন্য পদার্থকে আংশিকভাবে ইলেকট্রন দিতে বা সেখান থেকে ইলেকট্রন নিতে পারে, যা বিক্রিয়াকে সহজ করে দেয়। এখন যদি এমন সরল জৈব অণু ব্যবহার করা হয়, যা এমন সাময়িক ইলেকট্রন দিতে বা নিতে পারে বিক্রিয়ার সময়, তাহলে কি প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারবে?

ম্যাকমিলান জানতেন, ইমিনিয়াম আয়নের এমন গুণ আছে। ইমিনিয়াম আয়নে নাইট্রোজেন আছে আর নাইট্রোজেন সহজেই ইলেকট্রন নিতে পারে। তিনি এমন কিছু জৈব রাসায়নিক পদার্থ নির্বাচন করলেন। এরপর এসব পদার্থকে প্রভাবক হিসেবে ডাইএলস-অ্যালডার বিক্রিয়ায় ব্যবহার করলেন। রসায়নবিদেরা এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব অণুর রিং গঠন তৈরি করেন। দেখা গেল, এসব জৈব প্রভাবক অসাধারণ কাজ করল। শুধু তা–ই নয়, কিছু প্রভাবক দেখা গেল অপ্রতিসম যৌগ বানাতেও সক্ষম। দুটি প্রতিসম অণুর মধ্যে একটি অণু, এমনকি ৯০% পর্যন্ত তৈরি করা গেল এই প্রভাবক দিয়ে।

ম্যাকমিলান তখনই বুঝতে পারছিলেন, এটি নতুন ধরনের প্রভাবক। আগে ছোট ছোট কিছু কাজ হলেও জৈব প্রভাবক নতুন কিছু রসায়নে। তাই তিনি গবেষণাপত্র প্রকাশের সময় একে নতুন ক্যাটাগরির প্রভাবক হিসেবে বর্ণনা করলেন এবং অর্গানোক্যাটালাইসিস নামটি তাঁরই দেওয়া। তাঁর এই গবেষণাও প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের শুরু দিকে।

এরপর এ বিষয়ে হাজারো গবেষণা হয়েছে। প্রচুর কার্যকর জৈব প্রভাবক আবিষ্কার করেছেন গবেষকেরা। নতুন পথ দেখানো বেঞ্জামিন লিস্ট ও ডেভিড ম্যাকমিলান এখনো এই ফিল্ডে প্রথম সারির গবেষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

২০০০ সালে এই দুই গবেষণা প্রকাশের পর থেকে এমন সব জৈব প্রভাবক তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যার জন্য অক্সিজেন বা আর্দ্রতামুক্ত পরিবেশের দরকার হয় না। একই সঙ্গে সফলতার সঙ্গে অপ্রতিসম রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো যায়। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, জৈব প্রভাবক কীভাবে অনেক জটিল প্রক্রিয়া সহজ করে দিয়েছে।

স্ট্রিকনিন নামে একটি বিষাক্ত পদার্থ আছে, যা খুবই বিষাক্ত। একসময় পাখি বা ইঁদুর মারার জন্য ব্যবহৃত হলেও এখন আর স্ট্রিকনিনের ব্যবহার নেই। তবে রসায়নবিদদের কাছে স্ট্রিকনিন তৈরি রুবিকস কিউব পাজলের মতো। কত কম ধাপে এই জটিল অণু তৈরি করা যায়। ১৯৫২ সালে যখন প্রথম এই যৌগ গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব হয়, তখন পরপর ২৯টি ভিন্ন ভিন্ন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল এবং শুরুর বিক্রিয়ক পদার্থের ১০ হাজার ভাগের ১ ভাগের কম স্ট্রিকনিনে রূপান্তর হয়েছে। ২০১১ সালে গবেষকেরা জৈব প্রভাবক ব্যবহার করে এই স্ট্রিকনিন তৈরি করতে সক্ষম হন মাত্র ১২ ধাপে, এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ছিল আদি পদ্ধতির ৭ হাজার গুণ।

জৈব প্রভাবক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে ওষুধশিল্পে। প্রায়ই নির্দিষ্ট একটি প্রতিসম অণুর গঠন ওষুধ হিসেবে কাজ করে। অন্য প্রতিসম গঠন ওষুধ হিসেবে কাজ করে না বা অনেক সময় ক্ষতিকরও হয়। যেমন থ্যালিডোমিন, যার একটি প্রতিসম অণু ওষুধ হিসেবে কার্যকর হলেও অন্য প্রতিসম অণু গর্ভে থাকা মানবশিশুর গঠনে মারাত্মক ত্রুটি ঘটায়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রায় ১০ হাজার শিশুর বিকলাঙ্গতার জন্য দায়ী এটি, যাদের অর্ধেক জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে মারা গিয়েছিল।

অপ্রতিসম জৈব প্রভাবকের মাধ্যমে এখন নির্দিষ্ট প্রতিসম গঠনের অণু বানানো সম্ভব, যা আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থেকে পাওয়া যেত। এই পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে অনেক ওষুধ কারখানাতেই বানানো সম্ভব হচ্ছে, যা সেসব ওষুধকে সহজলভ্য করেছে।

কিন্তু শেষে একটি প্রশ্ন সহজেই মাথায় আসে, এত সরল ও কার্যকর পদ্ধতির কথা কেন আগে গবেষকদের চিন্তায় আসেনি? আসলে অনেক সময়ই সহজ বিষয়টি আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। প্রায় দুই শতাব্দীর গবেষণাকে এক পাশে রেখে নতুন করে ভাবতে পারাই বেঞ্জামিন লিস্ট ও ডেভিড ম্যাকমিলানের কৃতিত্ব। সে জন্যই তাঁরা দুজন পাচ্ছেন এবারের নোবেল পুরস্কার।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, রসায়ন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং, যুক্তরাষ্ট্র

সূত্র: নোবেল প্রাইজ ডটকম, জার্নাল অব আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি, সায়েন্স মিউজিয়াম, সুইডিশ রয়্যাল সোসাইটি অব সায়েন্সেস