আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সাতকাহন

অফিস থেকে বেরিয়েছেন। খানিকটা এগোতেই দেখলেন হঠাৎ বৃষ্টি। বলা নেই কওয়া নেই, ঝুম বৃষ্টি এসে একেবারে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। যাকে বলে, ভিজে একসা। এ রকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কমবেশি হয়েছে।

যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁদের জন্য এ রকম পরিস্থিতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় কোনো সমস্যা তৈরি করে না। গ্রামগঞ্জে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বৃষ্টি, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়, অর্থাৎ বৈরী আবহাওয়া বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। জনজীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস তাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের জন্য। গুরুত্বপূর্ণ আরও নানা ক্ষেত্রে।

অনেকের ধারণা, আবহাওয়া বার্তায় যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়, তখন হয় না। আবার যখন বলে না, তখন ঝুম বৃষ্টি নামে। আসলেই কি তা–ই? যদি তা-ই হয়ে থাকে, প্রশ্ন আসে, কেন এমন হয়? আরেকটা মজার এবং বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আবহাওয়া বা ওয়েদার এবং জলবায়ু বা ক্লাইমেট কি এক জিনিস? এই শেষ প্রশ্নটি থেকেই বরং শুরু করা যাক। তারপর ধাপে ধাপে আমরা বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে কাজ করে আবহাওয়া। বাংলাদেশের আবহাওয়া কেমন এবং এর পূর্বাভাস কতটা সহজ বা কঠিন এবং কতটা নিখুঁতভাবে করা সম্ভব।

দুই

কোনো অঞ্চলের দীর্ঘদিনের আবহাওয়ার প্যাটার্ন বা ধরনকে বলে জলবায়ু। দীর্ঘদিন মানে কত দিন? মোটামুটি ৩০ বছরের মতো। সময়টা ঠিক নির্দিষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, কোনো একটা অঞ্চল খরাপ্রবণ নাকি বৃষ্টিপ্রবণ। বৃষ্টি বেশি হয় নাকি বৃষ্টির অভাবে সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর জীবনে নাভিশ্বাস ওঠার দশা৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে নাকি কমছে। এটাই জলবায়ু। পুরো পৃথিবীর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে তাই আমরা জলবায়ু নিয়ে কথা বলি। ভাবি, সেটা ভালো দিকে যাচ্ছে নাকি দিন দিন এর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।

আর কোনো অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে স্বল্প সময়ে যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো মিলেই আবহাওয়া। দিনাজপুরে কি আজকে বৃষ্টি হবে? খুলনায় কি গতকাল আর্দ্রতা বেশি ছিল? চট্টগ্রামে কি কোনো লঘুচাপ তৈরি হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় আবহাওয়াবার্তা থেকে।

আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য তো বোঝা গেল। এবার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসি। বাংলাদেশের আবহাওয়ার ধরন ঠিক কেমন? এককথায় বলা যায়, অস্থিতিশীল। পৃথিবীর সবচেয়ে অস্থিতিশীল আবহাওয়ার দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। আশপাশের ভারত ও মিয়ানমারের কিছু অঞ্চলের জন্যও এ কথা সত্যি। একই অবস্থা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেরও। মানচিত্রের সঙ্গে যদি পরিচয় থাকে, তাহলে সম্ভবত বিষয়টা বুঝে ফেলেছেন। যেসব জায়গায় সমুদ্র এসে মেলে স্থলের সঙ্গে, সেখানেই তৈরি হয় এই অস্থিতিশীলতা। কেন?

প্রশ্নটির একটি চমৎকার উত্তর দেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবদুল মান্নান। ধরুন, রাজশাহী থেকে একটি ট্রেন আসবে ঢাকায়। বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে ট্রেনটি যে মোটামুটি ছয় ঘণ্টা পরে কমলাপুরে পৌঁছে যাবে, তা বলে দেওয়া যায়। কারণ, রেললাইন একটা নির্দিষ্ট পথ। এই পথ ধরে ট্রেনটি আসবে। কিছুক্ষণ আগে হোক বা পরে, ট্রেনটি পৌঁছাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যেই।

কিন্তু ফার্মগেটের মোড়ে দাঁড়িয়ে আপনি যদি প্রতিটি গাড়ির গন্তব্য আন্দাজ করার চেষ্টা করেন, কতক্ষণ পরে সেই গাড়িগুলো নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাবে, তা বের করতে চান, পারবেন? যেসব বাসের গন্তব্য নির্দিষ্ট, সেগুলোর বিষয়ে তা–ও খানিকটা আন্দাজ করা সম্ভব। কিন্তু এত এত ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ইত্যাদি গাড়ি? এদের গন্তব্য আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব।

জল-স্থলের সংযোগস্থলে ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সমুদ্র থেকে তৈরি হচ্ছে লঘুচাপ, গড়ে উঠছে মেঘ কিন্তু এদের গন্তব্য আগে থেকে নিখুঁতভাবে হিসাব করাটা বেশ কঠিন। বিশেষ করে লঘুচাপ বেশি সমস্যা করে। দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে, অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে কিন্তু শতভাগ নিশ্চিতভাবে এই বিষয়গুলোর পূর্বাভাস করা খুব সহজ কাজ নয়।

 তিন

এবারে এই লেখার মূল প্রশ্নগুলো নিয়ে কথা বলা যাক। কীভাবে কাজ করে আবহাওয়া? আবহাওয়ার পূর্বাভাসই–বা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?

খুব সহজ করে যদি বলি, আবহাওয়া বিষয়ে প্রথম কথা হলো, লঘুচাপ জিনিসটা খারাপ। এটি বেশ সমস্যা তৈরি করে। লঘুচাপ মানে আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় কোনো জায়গায় বায়ুর চাপ কম থাকা। জল-স্থলের সংযোগস্থলে এ রকম হয়। কীভাবে?

দিনের বেলা সূর্যের তাপের কারণে স্থল বা মাটি পানির চেয়ে বেশি উত্তপ্ত বা উষ্ণ থাকে। এর কারণ, পানিতে যে পরিমাণ সূর্যের তাপ পড়ে, তার বেশির ভাগ প্রতিফলিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায় ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। মাটি এতটা প্রতিফলিত করতে পারে না।

এই উষ্ণ মাটি আবার তার ওপরে থাকা বায়ুর তাপ বাড়িয়ে দেয়। তাপ বাড়লে বায়ুর অণুগুলো একে অন্যের চেয়ে তুলনামূলক দূরে সরে যায়, অর্থাৎ বাতাসের ঘনত্ব কমে যায়। ফলে বাতাস হয়ে যায় হালকা। এই উষ্ণ, হালকা বায়ু ওপরের দিকে উঠে গেলে নিচের অংশটা ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে ওই জায়গাটায় তৈরি হয় লঘুচাপ।

ওদিকে সমুদ্রের ওপরাংশে চলছে উল্টো ঘটনা। সমুদ্রের ওপরের বাতাস যেহেতু তুলনামূলক শীতল, তাই এর অণুগুলো কাছাকাছি অবস্থান করে। বায়ুর ঘনত্ব যায় বেড়ে। এই ভারী বায়ু নেমে আসে নিচের দিকে। ফলে সমুদ্রের ওপর বায়ুর চাপ বেড়ে যায়।

এখন পাশাপাশি যদি দুটো ঘটনার কথা ভাবি, একদিকে লঘুচাপ অঞ্চলের হালকা বাতাস ওপরের দিকে উঠে গেল। অন্যদিকে আশপাশের উচ্চ চাপ অঞ্চলের শীতল, ভারী বায়ু ছুটে আসতে শুরু করেছে এই লঘুচাপ অঞ্চলের দিকে। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই সৃষ্টি হয় ঘূর্ণি।

রাতের বেলা আবার উল্টো ঘটনা ঘটে। পানির তাপধারণের ক্ষমতা বেশি। তাই রাতের বেলা মাটি দ্রুত সব তাপ বিকিরণ করে দেওয়ার পরও আশপাশের পানি তাপ ধরে রাখে। ফলে রাতে মাটি হয়ে যায় তুলনামূলক ঠান্ডা আর সমুদ্রের পানি হয়ে যায় তুলনামূলক উষ্ণ। বুঝতেই পারছেন, এর ফলে রাতের বেলা সমুদ্রের ওপর লঘুচাপ তৈরি হয় আর মাটির ওপরের উচ্চ চাপের বায়ু সেদিকে ছুটে যেতে থাকে। এর ফলেও তৈরি হয় ঘূর্ণি।

সাধারণত সমুদ্রে যেখানে এ রকম হয়, তার কেন্দ্রের চারপাশের বাতাসের গতিবেগ যদি ঘণ্টায় ১৭ থেকে ৩০ কিলোমিটার হয়, তাহলে তাকে বলে লঘুচাপ। আর এই লঘুচাপের শক্তি বেড়ে গিয়ে যখন বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩১ থেকে ৪০ কিলোমিটার হয়ে যায়, তখন সেটা পরিণত হয় নিম্নচাপে। অর্থাৎ লঘুচাপের আরও ভয়ংকর রূপ হলো নিম্নচাপ।

এই যে নিম্নচাপ তৈরি হলো, সেটা কিন্তু এক জায়গায় স্থির থাকে না। তার  আশপাশের কোনো অঞ্চলের উচ্চ চাপের তুলনায় তার শক্তি যদি বেশি হয়, তখন সে ওই অঞ্চলের দিকে যেতে থাকে। নিম্নচাপ আসলে ঘূর্ণিবায়ুর প্রবাহ। তাই সে যেদিকে গিয়ে স্থির হবে বা যেখানে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে অবস্থান করবে, সেখানে হতে পারে ঘূর্ণিঝড়।

জল-স্থল যেখানে পাশাপাশি, সেখানে নিয়মিত হারে লঘুচাপ, নিম্নচাপ ইত্যাদি তৈরি হয়। আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানি এতে শক্তি জোগায়। বায়ুর প্রবাহ একে একবার এদিকে, তো পরমুহূর্তে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশের মতো অঞ্চলগুলোতে আবহাওয়া খুবই অস্থিতিশীল। এই অস্থিতিশীলতা বেশি দেখা যায় দক্ষিণাঞ্চলে। যেখানে শুধুই সমুদ্র বা শুধু স্থল, সেসব অঞ্চলে এ রকম সমস্যা হয় না। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও তাই ঘূর্ণিঝড় বা এ ধরনের আবহাওয়াগত দুর্যোগ কম দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মেঘ। ট্রপোস্ফিয়ার বা বায়ুমণ্ডলের নিচের দিকের স্তরের মেঘই মূলত বৃষ্টির জন্য দায়ী। কিছুটা ওপরের দিকের মেঘ বৃষ্টিতে এতটা ভূমিকা রাখে না। নদী, সমুদ্র ইত্যাদি জলাধার থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘের সৃষ্টি হওয়া ও বৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি সবারই জানা। তবে একটি বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। মেঘ কখন কোথায় থাকবে, তা মূলত নির্ভর করে মেঘের ঘনত্ব এবং বাতাসের গতিবেগের ওপর। ঘনত্ব বেশি হলেই সাধারণত ভারী বৃষ্টি হয়। হালকা মেঘ সামান্য বৃষ্টি হয়েই শেষ হয়ে যায়। আর বাতাসের গতিবেগ হালকা মেঘকে সহজে ভাসিয়ে নিতে পারে। ভারী মেঘকে খুব একটা দূরে বাতাস বয়ে নিতে পারে না। ফলে ভারী বৃষ্টি হয়। আবার আর্দ্রতা বেশি হলে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

মেঘ এবং বায়ুচাপের ওপরই মূলত নির্ভর করে কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা কেমন হবে, আর্দ্রতা কেমন হবে ইত্যাদি। আরও নানা বিষয় আছে অবশ্য। কোনো অঞ্চলে উদ্ভিদের পরিমাণ, সে অঞ্চলে পাহাড় আছে কি না, এ রকম নানা কিছু। এই ছোট্ট লেখায় খুঁটিনাটি সব বিষয় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর চেয়ে মূল বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করা যাক।

আমরা যেহেতু মেঘ, লঘুচাপ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছি, এখন তাহলে একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কীভাবে করা হয় এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর কাজটা কীভাবে করে।

সান-সাইন রেকর্ডার। এটি দিয়ে সূর্যের আলো কতক্ষণ থাকবে ও বর্তমানে সূর্য কোথায় আছে, তা পরিমাপ করা হয়

চার

সারা পৃথিবীতেই সাধারণত তিন ধরনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এক. সিজনাল ফোরকাস্ট বা মৌসুমি আবহাওয়াবার্তা। দুই. মিডটার্ম ফোরকাস্ট বা মধ্যবর্তী আবহাওয়াবার্তা। তিন. ডেইলি ফোরকাস্ট বা দৈনিক আবহাওয়াবার্তা। প্রথমটি, অর্থাৎ মৌসুমি আবহাওয়াবার্তা দেওয়া হয় প্রায় তিন মাস আগে। এতে নিশ্চিত করে বলা থাকে না, কবে কতটা বৃষ্টি হবে বা কোন দিনের তাপমাত্রা কত হবে। এতে বলা থাকে, সামগ্রিকভাবে মৌসুমটিতে ভারী বর্ষণ হবে নাকি অল্প বৃষ্টি হবে। তাপমাত্রা কি খুব বেশি হবে? এসব বিষয়। মধ্যবর্তী আবহাওয়াবার্তা দেওয়া হয় সপ্তাহ দুয়েক আগে। আগামী দুই সপ্তাহে পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা এই আবহাওয়াবার্তার আলোচ্য বিষয়। এতে পূর্বাভাস দেওয়া থাকে এভাবে—দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ ভাগে বৃষ্টি হতে পারে বা তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। দৈনিক আবহাওয়াবার্তা দেওয়া হয় দু-তিন দিন আগে। আগামী দু-তিন দিনে কবে কোথায় বৃষ্টি হতে পারে বা আবহাওয়ার কী অবস্থা থাকবে, তা বলা থাকে। আমরা আবহাওয়াবার্তা বলতে মূলত এই শেষটিকেই বোঝাই।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরও এই তিন ধরনের আবহাওয়াবার্তা দেয়। প্রথম দুটির জন্য দেখা হয় বঙ্গোপসাগরে বর্তমানে কী অবস্থা, উত্তর থেকে শীতল বাতাস আসছে কি না, এ রকম বিভিন্ন বিষয়। পাশাপাশি আগের বছরগুলোতে বছরের এ সময়ে আবহাওয়া পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেটাও দেখা হয়।

দৈনিক পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য বেশ কিছু জিনিস (পড়ুন প্যারামিটার) দেখে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। যেমন বায়ুচাপ, পানির জলীয় বাষ্পে পরিণত হওয়ার হার, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ইত্যাদি। এগুলো পরিমাপের জন্য আছে আলাদা আলাদা যন্ত্র। যেমন বায়ুচাপ মাপা হয় ব্যারোমিটার দিয়ে, পানির জলীয় বাষ্পে পরিণত হওয়ার হার মাপা হয় অ্যাটমোমিটার বা ইভাপোরিমিটার দিয়ে। অ্যানিমোমিটার দিয়ে মাপা হয় বায়ুপ্রবাহের বেগ ও দিক।

প্রতিদিন তিন ঘণ্টা পরপর আবহাওয়ার এ রকম বিভিন্ন প্যারামিটার মাপার যন্ত্রের পাঠ নেওয়া হয়। সকাল ছয়টায় শুরু করে প্রতিদিন এ রকম পাঠ নেওয়া হয় আটবার। আবহাওয়া ভালো থাকুক বা হোক দুর্যোগপূর্ণ, এই কাজ তাদের করতে হয় নিয়ম মেনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্থানীয় শাখাগুলো প্রতি তিন ঘণ্টা পরপর এ রকম পাঠ নিয়ে জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর, অর্থাৎ ঢাকা শাখায় এসব পাঠ পাঠায়। সাধারণ আবহাওয়া পরিমাপ করার পাশাপাশি কৃষিকাজে লাগে, এ রকম বিভিন্ন প্যারামিটারও মাপতে হয় তাদের। যেমন বিভিন্ন উচ্চতায় মাটির তাপমাত্রা। এ জন্য আবার বিশেষ ধরনের থার্মোমিটার আছে—সয়েল থার্মোমিটার। ৫ মিটার, ১০ মিটার, ১৫ মিটার—এ রকম বেশ কয়েকটি উচ্চতায় এ তাপমাত্রা মাপা হয়। সূর্যালোক কতক্ষণ পাওয়া যাবে, সেটা পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয় সানশাইন রেকর্ডার। এসব তথ্য কৃষকদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এ তো গেল সারফেস রিডিং, অর্থাৎ মাটির কাছাকাছি নেওয়া বিভিন্ন পাঠের কথা। কিন্তু একটা সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস করার জন্য তো শুধু এই পাঠ দিয়ে হবে না। জানতে হবে বায়ুমণ্ডলের অবস্থাও। সে জন্য ব্যবহার করা হয় ওয়েদার বেলুন। এই বেলুনে বসানো থাকে বিভিন্ন যন্ত্র ও সেন্সর। এ রকম একটি যন্ত্রের নাম রয়েনসোন্ড। এটি একধরনের ব্যাটারিচালিত আবহাওয়া পরিমাপক যন্ত্র। ওয়েদার বেলুন ওপরে উঠতে উঠতে রয়েনসোন্ড যন্ত্রটি বাতাসের বেগ, দিক, বায়ুচাপ, কোথাও লঘুচাপ আছে কি না ইত্যাদি তথ্য পাঠাতে থাকে বেতার তরঙ্গে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এ রকম দুটো রয়েনসোন্ড যন্ত্র আবহাওয়া বেলুনে করে ছাড়ে প্রতিদিন, বাংলাদেশের চারটি জায়গা থেকে। একটি সকালে, আরেকটি সন্ধ্যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন মোট আটটি যন্ত্র ছাড়া হয়। এই যন্ত্রগুলো বেলুনে চড়ে উঠে যেতে থাকে ওপরের দিকে। ৪ হাজার ৮০০ ফুট, ১০ হাজার ফুট…এভাবে ৫৩ হাজার ফুট পর্যন্তও উঠে যায় এসব বেলুন।

যন্ত্রগুলো বেশ দামি, তাই চাইলেও এর বেশি পাঠানো যায় না। তাই এর বদলে ব্যবহার করা হয় কম দামি থিওডোলাইট ওয়েদার বেলুন। এটি আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য পাঠায় না। দুরবিন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, বেলুনের গতিপথ ও অবস্থা দেখে এ থেকে বায়ুপ্রবাহের বেগ, দিক ইত্যাদি কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাপমাত্রা বা এ ধরনের তথ্য এ থেকে পাওয়া যায় না। এসব বেলুন বাংলাদেশের ১০টি জায়গা থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর ছাড়া হয়। আবার রয়েনসোন্ড প্রসঙ্গে ফিরি।

রয়েনসোন্ড যন্ত্রবাহী বেলুন আবার ছাড়া হয় আন্তর্জাতিক নিয়ম ও সময় মেনে। যেমন সন্ধ্যার বেলুনটি ছাড়া হয় বাংলাদেশ সময় ছয়টায়। আন্তর্জাতিক সময় অনুসারে এ সময় হলো ১২ ইউনিভার্সাল টাইম কো-অর্ডিনেটেড (ইউটিসি)। একই সময়ে আশপাশের দেশগুলোও তাদের রয়েনসোন্ড যন্ত্রবাহী বেলুন ছাড়ে। ফলে একই সময়ে আশপাশের সব জায়গায় কী অবস্থা, তা জানা যায়। পৃথিবীর সব দেশই এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় অংশ নেয়। সব দেশ মানে ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) আওতাভুক্ত সব দেশ। বাংলাদেশ নিজেদের সংগৃহীত তথ্যগুলো গ্লোবাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম (জিটিএস) লিংক ব্যবহার করে পাঠায় ডব্লিউএমওর দক্ষিণ এশিয়া হাব ভারতের দিল্লিতে। সেখান থেকে এই মান চলে যায় পুরো পৃথিবীতে। আবার দিল্লির হাব হয়ে আশপাশের সব দেশের আবহাওয়ার তথ্য চলে আসে বাংলাদেশের কাছে। তথ্যগুলো থাকে কোডেড। আবহাওয়াবিদদের এসব কোড বিশেষভাবে শেখানো হয়, তাঁরা কোড ভেঙে পাঠগুলো লিখে নেন। এই কোড তথ্য গোপনের জন্য নয়, সংক্ষেপে প্রচুর তথ্য পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

আবহাওয়ার এই তথ্য বিনিময় হয় ডব্লিউএমওর অধীন। পাশাপাশি দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেলেও এই পাঠগুলো পাঠাতে হবে নিয়ম মেনে। নাহয় কারণ দর্শাতে হবে। উপযুক্ত কারণ না দর্শাতে পারলে বেরিয়ে যেতে হবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এই সম্পর্ক থেকে। আর এভাবে বেরিয়ে যাওয়া কোনো দেশের জন্যই খুব ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

এই পাঠগুলো সব একটি চার্টে প্লট করা হয়, মানে বসানো হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সাধারণত পশ্চিমে পাকিস্তান পর্যন্ত ও পূর্বে থাইল্যান্ড পর্যন্ত পুরো এলাকাটির আবহাওয়ার অবস্থা চার্টে বসায়। ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বে জাপান পর্যন্ত তথ্যও চার্টে বসানো হয়।

এই চার্ট থেকে তথ্য নিয়ে, বিভিন্ন প্যারামিটার হিসাব করে বের করা হয় আবহাওয়া কেমন হবে। যেমন ৩০-৪০ কিলোমিটারের বেশি বাতাসের বেগ হলে হবে দমকা হাওয়া, ১৫০ কিলোমিটার বা এর বেশি হলে হবে টর্নেডো ইত্যাদি।

তালিকা ১ থেকে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে।

বাতাসের বিভিন্ন প্রকার

আবার মেঘের অবস্থান, ঘনত্ব, আর্দ্রতা, বাতাসের দিক, লঘুচাপের অবস্থা ইত্যাদি হিসাব করে বের করা হয় কোথাও বৃষ্টি হবে কি না, হলে কী রকম বৃষ্টি হবে।

 নিচের তালিকা ২-এ বৃষ্টির পরিমাণের বিষয়টি আছে।

বৃষ্টির বিভিন্ন প্রকার

অনেকে অভিযোগ করেন, কোথায় কতটা বৃষ্টিপাত হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না আবহাওয়া অধিদপ্তর। আসলে বাংলাদেশের অস্থিতিশীল আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে শতভাগ নিশ্চিত করে এটা বলা যায় না যে আজ ঢাকার মিরপুরে এতটা থেকে এতটা পর্যন্ত এই পরিমাণ বৃষ্টি হবে। তবে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর পুরো ঢাকার জন্য বা এ রকম একেকটি অঞ্চলের জন্য পূর্বাভাস দিতে পারে। এই পূর্বাভাসের জন্য ব্যবহার করা হয় একধরনের পরিভাষা। যেমন আবহাওয়াবার্তায় বলা হয়, খুলনার ‘কিছু জায়গায়’ মাঝারি ভারী বৃষ্টিপাত হবে। ‘মাঝারি ভারী’ মানে কী, তা আমরা দেখেছি। কিন্তু এই ‘কিছু জায়গা’ মানে কী? এখানে তো নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বলা নেই। আসলে আছে। আবহাওয়াবার্তা অনুযায়ী ‘এক-দুই জায়গা’ মানে সে অঞ্চলের ২৫ শতাংশ, ‘কিছু জায়গা’ মানে ২৬-৫০ শতাংশ, ‘অনেক জায়গা’ মানে ৫১-৭৫ শতাংশ আর ‘সব জায়গা’ মানে ১০০ শতাংশ। কিন্তু খুলনার ২৬-৫০ শতাংশ এলাকার মধ্যে ঠিক কোন এলাকাগুলো পড়বে, এটা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয় না। এ নিয়ে আসলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরই শুধু নয়, পৃথিবীর কারওই এখন পর্যন্ত আর কিছু করার নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত প্রযুক্তির দেশেও অস্থিতিশীল আবহাওয়া পরিস্থিতির জন্য পূর্বাভাসের অবস্থা একই রকম। আসলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আবহাওয়া যে পরিমাণ অস্থিতিশীল এবং এই অস্থিতিশীল আবহাওয়াকে মোটামুটি নিখুঁতভাবে নির্ণয় করার জন্য একটু পরপর যে পরিমাণ যন্ত্র বসানো প্রয়োজন, তার বাজেট এই দেশগুলোর কোনোটিরই নেই। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের জন্য এইটুকু অনিশ্চয়তা তাই আপাতত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে এটি আরও নিখুঁত করতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এতক্ষণে সবার মাথায় চলে আসার কথা, এবার সেটা নিয়ে একটু বলি। স্যাটেলাইট ডেটা ও আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেটেড মডেল ব্যবহার করে কি এই আবহাওয়াবার্তা নিখুঁত করা যায় না?

ডিজিটাল ইভাপোরিমিটার থেকে প্রাপ্ত ডেটাগুলো গ্রাফ আকারে দেখা যায় এই ইভাপোগ্রাফে
বৃষ্টি পরিমাপক যন্ত্র

পাঁচ

যুক্তরাষ্ট্র আবহাওয়া পূর্বাভাসের জন্য স্যাটেলাইট তথ্যের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া–NOAA) সুপারকম্পিউটারে নিউমেরিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন (এনডব্লিউপি) মডেল ব্যবহার করে। যুক্তরাজ্যে আবার একটু ভিন্ন ধরনের নিউমেরিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন মডেল ব্যবহার করা হয় ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদারে (ইসিএমডব্লিউএফ)। যুক্তরাজ্যের এই সংস্থা বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিউমেরিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার। তাদের মডেলটিও পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মডেল।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর যুক্তরাজ্যের এই নিউমেরিক্যাল মডেলটিই ব্যবহার করে। এ জন্য পুরো আকাশকে অনেকগুলো গ্রিডে ভাগ করে নেওয়া হয়। প্রতিটি গ্রিডের জন্য হিসাব কষা হয় আলাদা করে। এই গ্রিডগুলো দেখা যাবে যেকোনো আবহাওয়া চার্টে।

এই হিসাব কষতে হলে লাগে সমীকরণ। মূল সমীকরণটি এত বিশাল ও এত জটিল যে তা এই ছোট লেখায় আলোচনা করা সম্ভব নয়। বরং একটু সহজ করে, সমীকরণের গাণিতিক মারপ্যাঁচে না গিয়ে বিশাল সমীকরণটি কীভাবে আসে, তা বলি।

এর পেছনে কাজ করে সাতটি সমীকরণ। এদের মধ্যে থাকে সাতটি অজানা রাশি বা চলক। এই সাতটি চলক বায়ুমণ্ডলের সাতটি বিষয়কে বোঝায়।

সমীকরণ সাতটির প্রথম তিনটি হলো বায়ুপ্রবাহের বেগের তিনটি উপাংশের জন্য নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র বা ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা সূত্র। আরও সরলীকরণ করে যদি বলি, দ্বিমাত্রিক তলের ওপর স্থানাঙ্ক আঁকা হলে এতে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিনটি দিক পাওয়া যায়। যেকোনো কিছুর বেগকে এই তিন দিক বরাবর তিন ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। মোট বেগ হলো এই তিনটি বেগের সমষ্টি, পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে লব্ধি বেগ। চতুর্থ সমীকরণটি হলো ভরের সংরক্ষণশীলতা সূত্র। পঞ্চমটি হলো আদর্শ গ্যাসের সমীকরণ। ষষ্ঠটি হলো তাপগতিবিদ্যার প্রথম শক্তির সূত্র, একে সংরক্ষণশীলতা সূত্রও বলে। সপ্তম সূত্রটির নাম জলীয় ভরের সংরক্ষণশীলতা সূত্র। এসব সূত্রকে একসঙ্গে মিলিয়ে, দ্বিমাত্রিক তলের বদলে গোলীয় তলের জন্য তাদের পরিমার্জন করার পর পাওয়া যায় একটি বিশাল সমীকরণ। এই সমীকরণটিই বর্তমানে ব্যবহৃত নিউমেরিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন মডেলগুলোর ভিত্তি।

যাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সমস্যা সমাধান করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন, সূত্র হলেই শুধু চলে না। প্রতিটি সূত্রের যে রাশিগুলো ‘জানা রাশি’, তাদের মান প্রশ্নে দেওয়া থাকে। বাস্তব জগতে এসব তথ্য পাওয়া যায় পর্যবেক্ষণ থেকে। এই পর্যবেক্ষণগুলো কীভাবে করা হয়, তা আগেই বলেছি।

সমস্যা হলো, এই নিউমেরিক্যাল মডেল অনেকটা নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারে মোটামুটি স্থিতিশীল আবহাওয়ার দেশগুলোর জন্য। বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতের দক্ষিণাংশ ইত্যাদি এলাকার জন্য এটি পুরোপুরি নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারে না। এসব দেশের আবহাওয়াবিদেরা তাই নিউমেরিক্যাল মডেলের তথ্য দেখেন, একে হিসাবে নেন, তারপর নিজেদের ম্যানুয়ালি সংগৃহীত তথ্য ও পদ্ধতি, অতীতের তথ্য, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে আসেন।

ভবিষ্যতে হয়তো স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে নিউমেরিক্যাল মডেলগুলো আরও নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারবে। তবে এখনো সেই অবস্থা আসেনি। দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রের পাশের প্রায় সব দেশের জন্যই কথাটি সত্যি।

তবু বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগগুলোর পূর্বাভাস বেশ নিখুঁতভাবে দিতে পেরেছে। সিডরের সময়ে আগে থেকে পূর্বাভাস করা সম্ভব হয়েছে বলেই তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এর অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ ঘূর্ণিঝড় অশনি। নিউমেরিক্যাল মডেল বলছিল, এটি সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন, বাংলাদেশে এটি তেমন কোনো সমস্যা করবে না। মূলত আঘাত হানবে বাংলাদেশের একটু পাশে, মিয়ানমার উপকূলে। বাস্তবেও তা-ই হয়েছে। যদিও সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে ও সমুদ্র উপকূলে সতর্কসংকেত দেওয়া হয়েছিল।

বৃষ্টি পরিমাপক যন্ত্রে কী পরিমাণ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, তা জানা যায় এই গ্রাফ থেকে
সয়েল থার্মোমিটার দিয়ে বিভিন্ন উচ্চতায় মাপা হচ্ছে মাটির তাপমাত্রা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ রকম পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড় আসুক বা না আসুক, ঘূর্ণিঝড়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকা যায় না? এর সঙ্গে জড়িত অর্থনীতির বিষয়টি। যেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রচুর খরচ হয় না, সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলে দেয় আবহাওয়া অধিদপ্তর। কিন্তু সত্যিকার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে, প্রচুর অর্থ খরচ করে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়াটা অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ক্ষতিকর। এ জন্য কোন ঘূর্ণিঝড়টি আসবে, সেটি সঠিকভাবে বলতে পারার পাশাপাশি কোন ঘূর্ণিঝড়টি আসলে আসবে না, পাশ কাটিয়ে যাবে, তার পূর্বাভাস করতে পারাও জরুরি। একটু এদিক-ওদিক হলেই হতে পারে অনেক ক্ষয়ক্ষতি। এদিক থেকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসগুলো আসলে প্রশংসার যোগ্য।

একটি দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভর করে আবহাওয়াবার্তার ওপর। শহুরে জীবনে এর বড় প্রভাব টের পাওয়া যায় না সরাসরি। কিন্তু কৃষকদের ফসল ফলানো (কখন ফসল তুলতে হবে, ফসল তোলার আগেই ঝড় চলে এলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে) থেকে শুরু করে শীতকালে কী পরিমাণ কম্বল বানানো হবে (কারণ, শীত বেশি পড়লে ও দীর্ঘস্থায়ী হলে কম্বল বেশি বিক্রি হবে, বেশি বানানো না হলে অভাব দেখা যাবে), এ রকম নানা ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দরকার পড়ে আবহাওয়াবার্তার।

বাসায় বসে আমরা যখন চট করে আবহাওয়াবার্তা বের করে দেখে নিই, একটু এদিক-ওদিক হলে কড়া সমালোচনা করি, তখন কি আমরা এত কিছু ভাবি?

পুনশ্চ. ছোট পরিসরের এ লেখায় ঘূর্ণিঝড় কীভাবে হয়, এর প্রকারভেদ, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কসংকেতগুলো ইত্যাদি নানা বিষয় লিখতে পারিনি। আবহাওয়াবার্তার মূল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। পরে কখনো ওসব বিষয় নিয়ে লিখব আশা করি। তবে আগ্রহীরা চাইলে তথ্যসূত্রের শেষ বইটি পড়তে পারেন—স্টর্ম ডানলপের লেখা ওয়েদার: আ ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন। সংক্ষেপে আবহাওয়া নিয়ে জানার জন্য এটি সুপাঠ্য।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: ব্রিটানিকা, উইকিপিডিয়া, নাসা, ডব্লিউএমও, নোয়া, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর;

নিউমেরিক্যাল ওয়েদার প্রেডিকশন বেসিকস: মডেলস, নিউমেরিক্যাল মেথডস অ্যান্ড ডেটা অ্যাসিমিলেশন/ঝাওশাই পু এবং ইউজেনিয়া ক্যালনিই;

ওয়েদার: আ ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন/ স্টর্ম ডানলপ