বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাবল যখন মাউন্ট উইলসনে কাজ শুরু করেছেন, তার আগে থেকেই একদল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি-ই আমাদের গোটা মহাবিশ্ব। এর বাইরে আর কিছু নেই। রাতের আকাশে যা কিছু দেখা যায়, সবই এই গ্যালাক্সির ভেতরে অবস্থিত। সে কালে বিজ্ঞানীরা জানতেন, সূর্য একটা বিশাল নক্ষত্রঝাঁকের ভেতরে অবস্থিত, যার নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। বাংলায়, আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। মিল্কিওয়ে হলো নক্ষত্রঝাঁকের আধার। এর আকৃতি চ্যাপ্টা, গোলাকার। অনেকটা কমপ্যাক্ট ডিস্ক বা সিডির মতো দেখতে। রাতের আকাশে একে কুয়াশাচ্ছন্ন দাগের মতো আকাশের এ প্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কারণ, আমাদের সৌরজগতের অবস্থান এর ভেতরে এবং ছায়াপথের প্রান্তের দিকে।

মোটামুটি মানের কোনো টেলিস্কোপে চোখ রাখলেই মহাকাশে রহস্যময় কিছু সাদা দাগ ধরা পড়ত। এই নীহারিকাগুলো দেখতে পাক খাওয়া কুণ্ডলীর মতো সুন্দর। সর্পিল আকৃতির কারণে এসব বস্তুকে বলা হতো স্পাইরাল নেবুলা বা সর্পিল নীহারিকা। সর্পিল নীহারিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টার নাম অ্যান্ড্রোমিডা। টেলিস্কোপে একে তাই সহজেই পর্যবেক্ষণ বা এ নিয়ে গবেষণা করা যেত।

সর্পিল নীহারিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল আরও আগে। সেই আঠারো শতকে। জ্যোতির্বিদদের প্রথম প্রজন্মের যাঁরা টেলিস্কোপ ব্যবহার করতেন, তাঁদের একটা শখ ছিল রাতের আকাশে ধূমকেতু খুঁজে বেড়ানো। সেটা করতে গিয়ে একটা জিনিস তাদের বেশ সমস্যা সৃষ্টি করত। রাতের আকাশে অসংখ্য অস্পষ্ট ফুটকি ফুটকি আলো। অনেকেই সেগুলোকে ধূমকেতু ভেবে বিভ্রান্ত হতেন।

এসব ধূমকেতু শিকারিদের সুবিধার জন্য ১৭৮৪ সালে একটা মূল্যবান কাজ করেছিলেন ফরাসি জ্যোতির্বিদ চার্লস মেসিয়ার। আকাশের উজ্জ্বল বস্তুগুলোর একটা তালিকা প্রকাশ করেন তিনি। সেগুলো 'মেসিয়ার অবজেক্টস' নামে পরিচিত। এই তালিকা আকাশ পর্যবেক্ষকদের স্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী আলো বিচ্ছুরণকারী বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে সহায়তা করল। মেসিয়ারের আদি ক্যাটালগে মোট ১০৩টি মেঘের মতো বস্তু ছিল, যার সিংহভাগ আসলে সর্পিল নীহারিকা। ওই তালিকায় ৩১ নম্বরটা সবচেয়ে বড় নীহারিকা, যার নাম অ্যান্ড্রোমিডা। রাতের আকাশে খালি চোখেই এই নীহারিকাটা দেখা সম্ভব। অবশ্য সেজন্য নিশ্চিত হতে হবে, নীহারিকাটার অবস্থান আকাশে ঠিক কোন জায়গায়। অস্পষ্ট এই দীর্ঘ মেঘটা আমাদের চাঁদের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বড়। বর্তমানে মেসিয়ার ৩১-কে সংক্ষেপে বলা হয় এম৩১।

অধিকাংশ জ্যোতির্বিজ্ঞানীর বিশ্বাস ছিল, এম৩১ আসলে উজ্জ্বল গ্যাসীয় মেঘ, যা নক্ষত্রগুলোর মাঝখানে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই সর্পিল নীহারিকার প্রকৃতি নিয়ে জ্যোতির্বিদদের মধ্যে উত্তপ্ত বির্তক শুরু হয়েছিল বিশ শতকের শুরুর দিকে। এই বিতর্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল আমাদের মহাবিশ্বের আকারও। তার কারণ, সর্পিল এ নীহারিকা যদি জ্বলন্ত বা উজ্জ্বল গ্যাসীয় মেঘ হয়ে থাকে, তাহলে তার অবস্থান অবশ্যই পৃথিবীর খুব কাছে হবে। কারণ, উজ্জ্বল গ্যাসের অবস্থান পৃথিবী থেকে বেশি দূরে হলে তা পৃথিবী থেকে দেখা সম্ভব নয়। এ মতের পক্ষে ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দির ও পরবর্তীতে হার্ভার্ড মানমন্দিরের জ্যোতির্বিদ হার্লো শ্যাপলিসহ আরও কজন জ্যোতির্বিদ। শ্যাপলি মনে করতেন, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি দিয়ে গঠিত আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। অর্থাৎ, এক গ্যালাক্সি, এক মহাবিশ্ব তত্ত্ব। মানে, মিল্কিওয়ে ছাড়া আর কোনো গ্যালাক্সি নেই এই মহাবিশ্বে।

এ ধারণার বিরোধী দলে ছিলেন লিক অবজারভেটরির হার্বার কার্টিসসহ কজন জ্যোতির্বিদ। কার্টিস বিশ্বাস করতেন, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে আরও দূরে অবস্থান সর্পিল নীহারিকাগুলোর। তাঁদের যুক্তি, সেগুলো উজ্জ্বল গ্যাসীয় মেঘের মতো দেখানোর কারণ, ভেতরের নক্ষত্রগুলোসহ সেগুলো আমাদের থেকে বহু বহু দূরে অবস্থিত।

নিজেদের মতের পক্ষে দুই দলের কাছেই ছিল জোরালো যুক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে তো আর দুটোই সত্যি হতে পারে না। তাহলে কোনটা সঠিক?

দুপক্ষের তর্কবির্তক দিন দিন বেড়ে চলল। কিন্তু কোনো সমাধান মিলল না। তাই বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ১৯২০ সালে দুই দলকে ডেকে পাঠানো হয় ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সে। এক গ্যালাক্সি, এক মহাবিশ্ব তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মানমন্দির কর্তৃপক্ষ পাঠালেন তাদের তুখোড় ও তরুণ জ্যোতির্বিদকে। নাম, হার্লো শ্যাপলি।

অন্যদিকে বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে কর্তৃপক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাল জ্যোতির্বিদ হেবার কার্টিসকে। মজার ব্যাপার হলো, ওয়াশিংটন যাওয়ার পথে একই ট্রেনে চড়ে বসেন শ্যাপলি আর কার্টিস। কাকতালীয়ভাবে ট্রেনেই দেখা হয়ে যায় দুজনের। এরপর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পথ দুজনকে একসঙ্গে পাড়ি দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই মহাবিশ্বের আকৃতির প্রশ্নে ট্রেনের ভেতরেও কয়েক দফা বির্তকে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।

১৯২০ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে সে কালের নামকরা কয়েকজন বিজ্ঞানীর উপস্থিতিতে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয় পরস্পরের। তবে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও কোনো লাভ হলো না। কোনো সমাধান পাননি বিজ্ঞানীরা। দুদলই নিজেদের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরে। শুরু হয় তুমুল বির্তক। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি গ্রেট ডিবেট বা মহাবিতর্ক নামে পরিচিত। দুপক্ষের যুক্তি শুনে উপস্থিত বিজ্ঞানীরা দিশেহারা হয়ে যান। কার কথা সঠিক? কোনটা মেনে নেবেন তাঁরা? শুধু যুক্তি-তর্ক আর কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে যে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়, তা বুঝে যান তাঁরা। আরও পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না বলে রায় দেন বিজ্ঞানীরা। তাই বিষয়টা অমীমাংসিত থেকে যায় আরও কয়েক বছর।

বালক হাবলের মনোজগত ওলটপালট করে দিয়েছিল দাদার কাছ থেকে উপহার পাওয়া টেলিস্কোপ এবং কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্ন। জুল ভার্নের বই পড়ে রোমাঞ্চিত হতেন হাবল। টোয়েন্টি থাউজেন্ট লিগস আন্ডার দ্য সী এবং ফর্ম দ্য আর্থ টু দ্য মুন-এর মতো ক্লাসিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনিগুলো গোগ্রাসে গিলতেন তিনি। সেই সঙ্গে তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তাঁর একরোখা প্রেম।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতে এসে স্বাভাবিকভাবেই এ বির্তকে জড়িয়ে পড়েন এডউইন হাবল। তাঁর কর্মস্থল মাউন্ট উইলসনের জ্যোতির্বিদরা মিল্কিওয়েকেই গোটা মহাবিশ্ব বলে মনে করত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, হাবল নিজে বিশ্বাস করতেন উল্টোটা। তাঁর নিয়োগদাতা হার্লো শ্যাপলির সঙ্গে এ নিয়ে মতদ্বন্ধও শুরু হয় হাবলের। তবে বছরখানেকের মধ্যে শ্যাপলি পদোন্নতি পেয়ে হার্ভার্ড কলেজ মানমন্দিরে চলে যাওয়ার পর একপ্রকার বেঁচে যান হাবল। বাঁচেন শ্যাপলিও।

হাবল সত্যিকার অর্থেই জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতে এসেছিলেন। তাই কঠিন সত্যটাও প্রকাশ করতে পিছপা হতেন না। তাঁর জ্যোর্তিবিদ হওয়ার স্বপ্ন শুরু হয়েছিল সেই বালক বয়সে। পুরো নাম এডউইন পোয়েল হাবল। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির মার্সফিল্ডে, ১৮৮৯ সালের ২০ নভেম্বর। বাবা জন হাবল, মা জেনি হাবল।

কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে হাবলের শৈশবকে সুখকর বলা চলে। বেশ ভদ্রগোছের গ্রাম্য বালক ছিলেন তিনি। ছেলেবেলাতে তাঁর মনের ভেতর ছিল অনেক বড় এক স্বপ্ন। দাদা মার্টিন হাবলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এই বালকের। তাই অষ্টম জন্মদিনে তাঁকে একটা টেলিস্কোপ উপহার দেন মার্টিন। তাঁর নির্দেশে হাবলের বাবা-মাও ছেলেকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতে থাকেন। এটাই তাঁকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি কৌতুহলী করে তোলে, যার রেশ রয়ে গিয়েছিল আজীবন।

টেলিস্কোপে মুগ্ধ চোখে মিসৌরির নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশে তাকিয়ে থাকতেন হাবল। পুলকিত হতেন আকাশ ভরা ঝিকিমিকি তারা দেখে। এই মুগ্ধতা থেকেই হাইস্কুলে পড়ার সময় একটা প্রবন্ধ লেখেন মঙ্গল গ্রহ বিষয়ে। সেটা স্থানীয় এক পত্রিকাতে ছাপাও হয়েছিল। তা দেখে তাঁর শিক্ষক মিস হ্যারিয়েট গট উৎসাহ দেন হাবলকে। তিনি বলেছিলেন, ‘এডউইন হাবল একদিন তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে মেধাবীদের একজন হয়ে উঠবে।’ বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রিয় শিক্ষার্থীকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করেন। তার সবগুলোই যে পরে সত্যি হয়, তা নয়। তবে হাবলের ক্ষেত্রে মিস গটের অনুমান সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল।

হাবলের বাবা ছিলেন আইনজীবী ও ইন্সুরেন্সের দালাল। ছেলেও নিজের মতো আইনে ক্যারিয়ার গড়বে, এমনটাই ছিল তাঁর আকাঙ্খা। সেই মোতাবেক ছেলেকে প্রস্তুতও করতে থাকেন। হাবলও বাবার কথামতো আইন পড়ার তালিম নিচ্ছিলেন। ছোটবেলা থেকে খেলাধুলাতেও ভালো ছিলেন তিনি। বক্সার হিসেবেও বেশ নাম কামাতে শুরু করেছিলেন। সুদক্ষ বক্সারও ছিলেন। তাই সেখানকার প্রোমোটররা চেয়েছিল, তিনি যাতে পেশাদার বক্সার হন এবং ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চাম্পিয়ন জ্যাক জনসনের সঙ্গে লড়েন। কিন্তু বালক হাবলের মনোজগত ওলটপালট করে দিয়েছিল দাদার কাছ থেকে উপহার পাওয়া টেলিস্কোপ এবং কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্ন। জুল ভার্নের বই পড়ে রোমাঞ্চিত হতেন হাবল। টোয়েন্টি থাউজেন্ট লিগস আন্ডার দ্য সী এবং ফর্ম দ্য আর্থ টু দ্য মুন-এর মতো ক্লাসিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনিগুলো গোগ্রাসে গিলতেন তিনি। সেই সঙ্গে তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তাঁর একরোখা প্রেম।

হাইস্কুল শেষ করে হুইটন কলেজে পড়তে যান। ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সেখানে স্কলারশিপ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল মনে। গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠানে ঘটল এক নাটকীয় ঘটনা। স্কলারশিপ ঘোষণা করতে গিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে সুপারিন্ডেন্ট বলে বসলেন, ‘এডউইন হাবল, গত চার বছরে তোমাকে তো কোনোদিন দশ মিনিটও পড়তে দেখিনি।’ কিছুক্ষণ থমকে থেকে আরও নাটকীয় স্বরে তিনি আবারও বললেন, ‘তোমার জন্য শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ পাওয়া গেছে।’

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পড়ার ইচ্ছা ছিল হাবলের। কিন্তু বাবাকে চটাতে চাননি তিনি। বাধ্য হয়ে তাই পড়তে শুরু করেন আইন বিষয়ে। তাঁর মধ্যবিত্ত বাবার ধারণা ছিল, আইনে পড়লে অর্থকড়ি উপার্জনের নিশ্চয়তা রয়েছে। একসময় অর্থ উপার্জনের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল ভদ্রলোককে। ছেলেও একই কষ্ট করুক, তা তিনি চাননি। সে কারণে আইন পেশায় পড়তে হাবলকে একরকম বাধ্য করেন তিনি।

তবে নিজের স্বপ্নকে এভাবে মাটিচাপা দেওয়ার মানুষ ছিলেন না হাবল। আইন পড়ে বাবাকে শান্ত করার পাশাপাশি চুপিচুপি পদার্থবিজ্ঞানেও একটা কোর্স নিলেন তিনি। এভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখলেন কোনোমতে। সে সময় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন আলবার্ট মাইকেলসন। ১৮৮৭ সালে এডওয়ার্ড মর্লিকে সঙ্গে নিয়ে একটা পরীক্ষা করে ইথার তত্ত্বকে বাতিল করেছিলেন তিনি। এ পরীক্ষা আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করেছিল। বিখ্যাত সেই মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার জন্য ১৯০৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান এই বিজ্ঞানী জুটি।

যুক্তরাষ্ট্রের নোবেলজয়ী দ্বিতীয় পদার্থবিদ রবার্ট মিলিকানও তখন ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর গবেষণাগারে সহকারী হিসেবে যোগ দেন হাবল। এটাই তাঁকে পরবর্তী লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করেছিল। অর্থাৎ অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য রোডস স্কলারশিপ। মিলিকানের সুপারিশে কিছুদিন পর নামকরা এ স্কলারশিপ জিতে নেন তিনি। কিন্তু এবারও বাবার আদেশে সেখানে আইন পড়তে হয় হাবলকে।

দুই বছরের জন্য ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন, ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বরে। সেখানে গিয়ে ব্রিটেনের আদবকেতা শেখার জোর প্রচেষ্টা চালান হাবল। ইংরেজদের মতো করে চোস্ত ইংরেজি বলার চর্চা করেন। পোশাক ও আচরণও করতে শুরু করেন ব্রিটিশদের মতো। তবে সেটা অনেকের চোখেই ছিল হাস্যকর প্রচেষ্টা।

অক্সফোর্ডে পড়ালেখার পাট হুট করে শেষ হয়ে যায় হাবলের। কারণ, হঠাৎ বাবা জন হাবল ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি মারা যান তিনি। তাই ইংল্যান্ডের পাট চুকিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে হয় হাবলকে। মা-সহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাধে। পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে কেনটাকির লুইসভিলে কিছুদিন হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। পার্টটাইম আইন বিষয়ক চর্চাও করেন। কিন্তু বালক বয়সে পড়া বিজ্ঞান কল্পকাহিনি আর রাতের আকাশ তাঁর মনে অন্য আরেক স্বপ্ন তৈরি করে রেখেছিল। সেজন্য বাবাকে না জানিয়ে চুপিচুপি অনেক দূরে এগিয়েছিলেন। সেটাই মাঝে মাঝে অজান্তে ভেসে উঠত মনের পর্দায়। তাই আইন পেশা নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি হাবল।

বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে এক ধরনের মুক্তি এনে দিয়েছিল। আগের সেই বাধ্যবাধকতা আর ছিল না। সে সময়ের মনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন হাবল নিজেই, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান হলো মন্ত্রণালয়ের মতো। কোনো ডাক না এলে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমি সেখান থেকে নির্ভুল এক ডাক পেয়েছিলাম। নিশ্চিত জানতাম, হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির জ্যোতির্বিদ হব, তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান আমার জন্য অশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম শ্রেণির আইনজীবী হওয়ার বদলে আমি বরং দ্বিতীয় শ্রেণির জ্যোতির্বিদ হব।’ শেষের কথাটা বোধহয় মৃত বাবার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন হাবল।

নিশিগ্রস্তের মতো সেই ডাকে সাড়া দিয়ে দুঃসাহসে ভর করে ক্যারিয়ার বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন। রূপকথার মতো একদিন সব ছেড়েছুড়ে পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করেন হাবল। সেজন্য ছুটে যান শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগের পরিচিত বিজ্ঞানী, অধ্যাপকরা তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন। সেখানে পড়তে শুরু করলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে। পার্শ্ববর্তী ইয়ার্কস মানমন্দিরে গেলেন পিএইচডি করতে। নেবুলা নিয়ে জরিপ চালিয়ে ১৯১৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। বুঝতে পারেন, ভালো গবেষণার জন্য ও পেশাদারী কাজের জন্য আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপে কাজ করতে হবে।

default-image

ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন তখন ৬০ ইঞ্চি টেলিস্কোপ। তার চেয়েও বড় আরেকটি টেলিস্কোপ বসানোর কাজও চলছিল। সেটি ১০০ ইঞ্চির প্রতিফলক টেলিস্কোপ। সেটা স্থাপনের কাজ শেষ হলে ওটাই হয়ে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আর সেরা টেলিস্কোপ। তাই সেখানেই কাজ করার ইচ্ছা ছিল হাবলের। এদিকে মাউন্ট উইলসন মানমন্দির কর্তৃপক্ষও হাবলের খোঁজখবর রাখতেন। জ্যোতির্বিদ হিসেবে তাঁর ভবিষ্যত সম্ভাবনাও তাঁদের মাথায় ছিল। কাজেই ১৯১৬ সালের নভেম্বরে হাবলকে চাকরির প্রস্তাব দিয়ে বসল মাউন্ট উইলসন কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু কাজে যোগ দিতে হাবলের দেরি হয়ে গেল কয়েক বছর। কারণ ইউরোপে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। একসময় তাতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রও। ব্রিটেনের পক্ষ নিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশটি। অক্সফোর্ডে পড়ার কারণে ইংল্যান্ডের প্রতি টান ছিল হাবলের। তাই ব্রিটেনকে সাহায্য করা দরকার বলে মনে করলেন তিনি। যুদ্ধে অংশ নিতে পাড়ি জমালেন ইউরোপে। মার্কিন সেনাবাহিনির ৮৬তম ডিভিশনে যোগ দেন তিনি। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে যোগ দেওয়ায় এই ৮৬তম ডিভিশনকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো লড়াই করতে হয়নি। তাই বিনা রক্তপাতে, কোনো বীরোচিত ঘটনা ছাড়াই যুদ্ধে মেজর পদ পান হাবল।

ইউরোপের পরিস্থিতি ঠান্ডা হতেই পাড়ি জমান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিউটন আর ম্যাক্সওয়েলের মতো বিজ্ঞানীদের এই চারণক্ষেত্রে একবছর জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখা করেন। দীর্ঘদিন পর প্রিয় ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফেরেন হাবল। তখনও মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে তাঁর চাকরির প্রস্তাব বহাল ছিল। ১৯১৯ সালের শরতে সেখানে যোগ দেন। কিছুদিন আগে মাউন্ট উইলসনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপটি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে, যার আয়নার ব্যাস ১০০ ইঞ্চি। সে কালের যেকোনো মানমন্দিরের টেলিস্কোপের চেয়ে বড়। যেকোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীর জন্য সেটা তখন লোভনীয় জায়গা। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে তাই যোগ দিলেন স্বপ্নের জায়গাতে।

মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরের নামকরা জ্যোতির্বিদ হার্লো শ্যাপলি ছিলেন বিনয়ী ও ধীরস্থির মানুষ। তাই প্রতিপক্ষের ধারণায় বিশ্বাসী হাবলকেও তিনি সহজভাবে মেনে নিয়েছিলেন। মানমন্দিরের অন্য জ্যোতির্বিদদের তুলনায় হাবল ছিলেন বয়সে ছোট। তাঁর অভিজ্ঞতাও অন্যদের চেয়ে কম। কিন্তু তারপরও কিছুদিনের মধ্যেই বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ হয়ে উঠলেন হাবল। এর পেছনে ছিল তাঁর চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব এবং কাজের ক্ষেত্রে কঠোর অধ্যাবসায়।

অবশ্য চমক সৃষ্টি করতেও পছন্দ করতেন হাবল। সে কাজেও তাঁকে ওস্তাদ বলা যায়। খেলোয়ারসুলভ লম্বাদেহের হাবল সবসময় যুদ্ধের মাঠের মতো সেনাবাহিনির ট্রেঞ্চ কোট পরে থাকতেন। যেন এখনই কোনো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। অথচ সেটা শ্যাপলির কাছে ছিল অসহ্যকর। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। আবার ব্রিটিশ অভিজাতদের মতো কথাবার্তা ও চালচলন রপ্ত করেছিলেন হাবল। সেটাও শ্যাপলি পছন্দ করতে পারেননি।

default-image
মাউন্ট উইলসনে যোগ দেওয়ার চার বছর পরের কথা। সৌভাগ্যই বলতে হবে, সর্পিল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক ইউরেকা মুহূর্তের মুখোমুখি হন হাবল।

হাবলের ঠোঁটে সবসময় শার্লক হোমসের মতো পাইপ ধরা থাকত। নাটকীয়ভাবে সে পাইপে মাঝে মাঝে আগুন ধরাতেন। প্রথমে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আয়েশ করে পাইপের তামাকে আগুন জ্বালাতেন তিনি। তারপর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে দিতেন চারপাশ। তার ভেতরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা হাবলকে মনে হতো রহস্যময় এক মানুষ। এভাবে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরার অভ্যাসের কারণে অচিরেই মাউন্ট উইলসনে সবার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন হাবল। অবশ্য শ্যাপলি আর হাবলের মধ্যকার ব্যক্তিত্বের সংঘাত অচিরেই শেষ হয় যায়। কারণ ১৯২১ সালে শ্যাপলি হার্ভার্ড কলেজ মানমন্দিরে পরিচালক পদ নিয়ে চলে যান। তারপর সেখানে হাবলের প্রভাব প্রতিপত্তি আরও বেড়ে যায়।

আগেই বলেছি, মহাবিশ্বের আকৃতি নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে সে সময় মহাবির্তক চলছিল। আর একজন পেশাদার জ্যোতির্বিদ হিসেবে একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না হাবলের পক্ষে। শ্যাপলিসহ মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে হাবলের সহকর্মীরা বিশ্বাস করতেন, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিই গোটা মহাবিশ্ব, এর বাইরে আর কিছু নেই। এমনকি রাতের আকাশে সাদা অস্পষ্ট ফুটকির মতো নীহারিকাগুলোও মিল্কিওয়ের ভেতরে অবস্থিত বলে মনে করতেন তারা। এর ঠিক বিপরীত ধারণায় বিশ্বাস করতেন হাবল। অর্থাৎ তিনি মাউন্ট উইলসনে কাজ করলেও বিশ্বাস করতেন লিক মানমন্দিরের হেবার কার্টিসের ধারণায়। বিষয়টা বেশ বিব্রতকর। এক অর্থে হাবল ছিলেন ঘরের শত্রু বিভীষণ।

নিজের ধারণাটা কোনোভাবে প্রমাণ করা যায় কি না, সে উপায় খুঁজতে শুরু করলেন তিনি। ভাবলেন, কোনোভাবে যদি প্রমাণ করা যায়, সর্পিল নীহারিকাগুলো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে, তাহলে তাদের বিশ্বাসের আর কোনো ভিত্তি থাকে না। তাসের ঘরের মতো ভেঙেচুরে যাবে 'এক গ্যালাক্সি, এক মহাবিশ্ব' তত্ত্ব। ক্রমেই টেলিস্কোপের পেছনে বেশি সময় দিতে লাগলেন তিনি। নীহারিকাগুলোর সবচেয়ে ভালো ছবি পাওয়ার জন্য রাতের পর রাত মানমন্দিরের হিমশীতল পরিবেশে জেগে আকাশে দুরবীন তাক করে বসে থাকতে লাগলেন।

রাতের বেলা পাহাড়চূড়ার মানমন্দির এলাকার তাপমাত্রা প্রায়ই নেমে যেত হিমাঙ্কের নিচে। তখন চোখের পানি পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যেত। তাই দুরবিনে চোখ রাখতে গিয়ে টেলিস্কোপের আইপিসের সঙ্গে অনেক জ্যোতির্বিদের চোখের পাতার লোমও আটকে যেত। জমে যেত হাত-পা। তাই কঠোর জেদ আর ভীষণ কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে এই মানমন্দিরে কাজ করা ছিল অসম্ভব। নিজের জেদের কারণেই এসব বাধা ডিঙিয়ে কাজ করতেন হাবল।

মাউন্ট উইলসনে যোগ দেওয়ার চার বছর পরের কথা। সৌভাগ্যই বলতে হবে, সর্পিল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক ইউরেকা মুহূর্তের মুখোমুখি হন তিনি। সেটা ছিল ১৯২৩ সালের ৪ অক্টোবর রাত। ১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপে এম৩১ বা অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার ছবি তুললেন তিনি। সেজন্য ৪০ মিনিট এক্সপোজার ব্যবহার করলেন। ছবিটা ডেভেলপ করে দিনের আলোয় পরীক্ষা করতে বসলেন হাবল। ছবিতে নতুন কিছু দাগ দেখতে পেলেন তিনি। ভাবলেন, সেগুলো হয় ফটোগ্রাফিক প্লেটের ত্রুটি, নয়তো কোনো নীহারিকা বা নতুন তারা।

সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরের রাতে আবারও এম৩১ নীহারিকার ছবি তুললেন হাবল। সে রাতে আকাশ আগের চেয়ে পরিষ্কার ছিল। এবার এক্সপোজার ব্যবহার করলেন ৫০ মিনিট। ছবিটা ডেভেলপ করে আরও দুটি নতুন দাগ দেখতে পেলেন। এরাও কি নতুন দুটি নীহারিকা? ফটোগ্রাফিক প্লেটে ‘এন’ লিখে চিহ্নিত করলেন তিনি। নীহারিকার ইংরেজিত নোভা বোঝাতেই অক্ষরটা ব্যবহার করা। এরপর অফিসে ফিরে প্যাসেডিনার সান্তা বারবারা স্ট্রিটে ফটোগ্রাফিক প্লেট লাইব্রেরিতে ঢুঁ মারলেন।

নতুন প্লেটটিকে আগের প্লেটগুলোর সঙ্গে মেলাতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন হাবল। কারণ তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, এই নোভাগুলো আসলেই সত্যি কি না। ফটোগ্রাফিক প্লেট লাইব্রেরিতে ভূমিকম্পরোধী ভল্টের ব্যবস্থা ছিল, যাতে ভূমিকম্প হলেও মূল্যবান প্লেটগুলো নষ্ট না হয়। সেগুলো খুব যত্মের সঙ্গে ক্যাটালগ করে ফাইল করে রাখা হতো, যাতে খুব সহজেই সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আগের তোলা ছবিগুলোতে এরকম কোনো নীহারিকার অস্তিত্ব পেলেন না হাবল। কাজেই তাঁর তোলা ছবিতে নতুন দুটি দাগ নতুন তারা বা নোভা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। হাবলের জন্য আরেকটা সুখবর অপেক্ষা করছিল। ছবির তৃতীয় দাগটি নীহারিকা নয়, বরং সেফিড ভ্যারিয়েবল স্টার। বাংলায়, শেফালি বিষমতারা। আগের কিছু প্লেটে এই সেফিড নক্ষত্রটির উল্লেখ আছে। হাবলের ক্যারিয়ারে সেটা ছিল অনেক বড় একটা আবিষ্কার। কাজেই তাঁর তোলা ফটোগ্রাফিক প্লেটে আগে লেখা ‘এন’ একটানে কেটে দিয়ে সেখানে লিখলেন ‘ভিএআর’ বা 'ভার'। অর্থাৎ ভ্যারিয়েবল স্টার। (ভ্যারিয়েবলের সংক্ষিপ্ত রূপ এই ভার)।

এভাবে অ্যান্ড্রোমিডার নক্ষত্রগুলোর মধ্যে সেফিড নক্ষত্র শনাক্ত করেন তিনি। জ্যোতির্বিদদের জন্য সেফিড নক্ষত্র খুঁজে পাওয়াকে বিস্তীর্ণ সাগর সৈকতে মহামূল্যবান রত্ম খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা চলে। কারণ সাধারণ নক্ষত্র দিয়ে যেখানে দূরত্ব নির্ণয় করা অসম্ভব, সেখানে খুবই অস্বাভাবিক সেফিড বা শেফালি তারা ব্যবহার করে সবসময় সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। তার মানে, এ নক্ষত্রের মাধ্যমে বহুল আলোচিত বিতর্কটার সমাধান করতে পারেন তিনি। এসব নক্ষত্র অত্যন্ত উজ্জ্বল, সূর্যের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল। তাই তাদেরকে অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। এদের বৈশিষ্ট্য হলো, এরা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। এ সময় তাদের উজ্জ্বলতা পর্যায়ক্রমে বাড়ে ও কমে। সেজন্য তাঁদেরকে স্পন্দিত নক্ষত্রও বলা হয়।

১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাবল এ নিরবতা ভাঙেন। প্রথমেই ফলাফল জানিয়ে চিঠি লেখেন হার্লো শ্যাপলিকে। চিঠি পেয়ে শ্যাপলি মন্তব্য করেন, ‘এই চিঠিটা আমার মহাবিশ্ব গুঁড়িয়ে দিয়েছে।’

৫.

শেফালি তারা আবিষ্কার হয়েছিল আঠারো শতকে। তবে ১৯০৮ সালে সেফিড পর্যায় ও উজ্জ্বলতার মধ্যে একটা সম্পর্ক আবিষ্কার করেন মার্কিন জ্যোতির্বিদ হেনরিয়েটা সোয়ান লেভিট। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড কলেজ মানমন্দিরে ‘মানব কম্পিউটার’ হিসেবে কাজ করতেন এই নারী। ফটোগ্রাফিক প্লেট পরীক্ষা করে নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা পরিমাপ ও তালিকা তৈরি করা ছিল এই মানব কম্পিউটারদের কাজ। সেটা করতে গিয়ে শেফালি বিষমতারার উজ্জ্বলতা আর পর্যায়কালের মধ্যে একটা সম্পর্ক আবিষ্কার করে বসেন লেভিট। তাঁর এই আবিষ্কার জ্যোতির্বিদদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে বহু দূরের নীহারিকাগুলোর দূরত্ব নির্ণয়ে স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডল বা আদর্শ আলোক উৎস হিসেবে শেফালি বিষমতারার ব্যবহার শুরু হয়।

default-image

অন্যদের মতো হাবলও এই শেফালি তারাকে স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডল হিসেবে ব্যবহার করেন। হেনরিয়েটা লেভিটের গবেষণার ফলে আগে থেকেই জানা ছিল, এই নক্ষত্রের আলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিতভাবে উঠা-নামা করে। আর এ নক্ষত্রের একটা পুরো চক্রের সঙ্গে নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার সম্পর্ক আছে। নক্ষত্রটি যত উজ্জ্বল হয়, ততই তার পালস বা স্পন্দনের চক্রও দীর্ঘ হয়। কাজেই সহজভাবে এই চক্রের ব্যাপ্তি মেপে এর উজ্জ্বলতা ক্যালিব্রেট বা পরিমাপের মানদণ্ড ঠিক করা যায়। এর মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় নক্ষত্রটির দূরত্ব। হাবল দেখতে পান, এর চক্রের সময়সীমা বা ব্যাপ্তি ৩১.৪১৫ দিনের। অর্থাৎ সেফিডটা সূর্যের চেয়েও ৭,০০০ গুণ বেশি উজ্জ্বল। এর পরম ও আপাত উজ্জ্বলতা পরিমাপ করে শেফালি তারাটির দূরত্ব নির্ণয় করেন হাবল। বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি দেখলেন, নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে ৯ লাখ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত।

অন্যদিকে মিল্কিওয়ের ব্যাস ধরা হয়েছিল মোটামুটি ১ লাখ আলোকবর্ষ। কাজেই ওই সেফিড নক্ষত্র তথা অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা (যে নীহারিকার মধ্যে নক্ষত্রটির অবস্থান) মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অবশ্যই এটা মিল্কিওয়ে থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থিত। সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা চলে, অ্যান্ড্রোমিডা অবশ্যই অবিশ্বাস্যরকম উজ্জ্বল। কারণ তা খালি চোখেই পৃথিবী থেকে দেখা যায়। এরকম উজ্জ্বলতা শুধু কোনো নক্ষত্র ব্যবস্থাতেই থাকা সম্ভব। কাজেই অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা নয়, সেটা আসলে একটা গ্যালাক্সি, যেখানে মিল্কিওয়ের মতোই কোটি কোটি নক্ষত্রের আবাস। এভাবেই হার্লো শ্যাপলি আর হেবার কার্টিসের মহাবির্তকের সমাধান করেন হাবল।

বলে রাখা ভালো, পরে আরেক গণনায় দেখা যায়, হাবল আসলে অ্যান্ড্রোমিডার সত্যিকার দূরত্ব হিসেব করতে ভুল করেছিলেন। আসলে এ গ্যালাক্সির প্রকৃত দূরত্ব প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বা ২৫ লাখ আলোকবর্ষের কাছাকাছি। হাবলের এই ভুলের কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানে মজার কিছু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। সে কাহিনি পরে বলছি।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কার করার পরও বেশ কিছুদিন সে সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি তিনি। আরও প্রমাণ হাতে না পেয়ে আবিষ্কারটার ঘোষণা করার সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে তাঁর চারপাশে প্রতিপক্ষ দলের লোকজন। হাবল জানতেন, তিনি যদি ভুল করেন, তাহলে তাঁরা কেউ ছেড়ে কথা বলবে না। তাই আরও কিছু ছবি তুলে আরও কয়েকবার পরীক্ষা চালান তিনি। বারবার নিশ্চিত হন। অ্যান্ড্রোমিডার পর অন্যান্য সর্পিল নেবুলা নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা চালান। তাতে দেখা গেল, সেগুলোও মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে অবস্থিত। আর অ্যান্ড্রোমিডা যদি ছায়াপথ হয়, তাহলে আকাশের অন্যান্য সর্পিল নীহারিকাগুলোও একেকটা ছায়াপথ হওয়ার কথা। পর্যবেক্ষণে তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, এসব সর্পিল নেবুলা নিজ অধিকার বলে একেকটি গোটা দ্বীপ-মহাবিশ্ব। আর মহাকাশে এরকম সর্পিল নীহারিকার সংখ্যা অগণিত। কাজেই মহাকাশের কোটি কোটি ছায়াপথের মতো আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিও একটা ছায়াপথ মাত্র। আর এদের মধ্যে অ্যান্ড্রমিডা আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি।

১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এ নিরবতা ভাঙেন। প্রথমেই ফলাফল জানিয়ে চিঠি লেখেন হার্লো শ্যাপলিকে। চিঠি পেয়ে শ্যাপলি মন্তব্য করেন, ‘এই চিঠিটা আমার মহাবিশ্ব গুঁড়িয়ে দিয়েছে।’ টেলিস্কোপের এই ফলাফল প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের ২৩ নভেম্বর। আর, ১৯২৫ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ৩৩তম সভায় সেটা উপস্থাপন করেন হাবল, যার কথা শুরুতেই বলেছি। এর শিরোনাম ছিল ‘সেফিড ইন স্পাইরাল নেবুলা’। তবে নিজে উপস্থিত হতে পারেননি তিনি। এতে জ্যোতির্বিদ মহলে একটা শোরগোল পড়ে যায়। আগেই বলেছি, এ আবিষ্কারের জন্য সেবার পুরস্কারও পান তিনি।

default-image

হাবলের এ গণনার ফলে আমাদের জানামতে মহাবিশ্বের আকার বিপুল পরিমাণ বেড়ে গেল এক ধাক্কাতেই। একটা মাত্র ছায়াপথ থেকে মহাবিশ্ব হঠাৎ লাখ লাখ বা কোটি কোটি ছায়াপথের বসতিতে পরিণত হলো। মাত্র এক লাখ আলোকবর্ষ থেকে এক লহমায় কোটি কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত হয়ে গেল আমাদের মহাবিশ্ব।

হাবলকে অভিবাদন জানিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে চিঠি পাঠাতে থাকেন জ্যোতির্বিদরা। তাঁর আবিষ্কার আর তাঁকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হতে থাকে। জুটতে থাকে একের পর এক পুরস্কারও। রাতারাতি বিখ্যাত জ্যোতির্বিদে পরিণত হন তিনি। এটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারতেন। কিন্তু এরপর আরেক চমক নিয়ে সবার সামনে হাজির হন তিনি। হাবল আসলে চমকে দিতে পছন্দ করতেন। আরেক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে আরেকবার চমকে দেন। মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণার খোলনচে পাল্টে দেন এডউইন হাবল। শ্যাপলির মহাবিশ্ব ধ্বংস করার পর হাবলের সেই আবিষ্কার এবার ভেঙেচুরে গুড়িয়ে দেয় আইনস্টাইনের কষ্টকল্পিত মহাবিশ্বকে। সে গল্প আরেকদিন।

সূত্র

জন গ্রিবিন/ইন সার্চ অব দ্য বিগ ব্যাং

সাইমন সিং/ বিগ ব্যাং

প্রিয়ংবদা নটরঞ্জন/ ম্যাপিং দ্য হেভেন

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন