আলু থেকে হবে পলিথিন

আমাদের দেশে প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে, বেশি করে আলু খান ভাতের ওপর চাপ কমান। এই প্রবাদ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, ধানের চেয়ে আলুর উত্পাদন বেশি কিন্তু চাহিদা কম। তাই ভাতের পরিবর্তে আলু খাওয়ার পরামর্শ দেন অনেক নীতিনির্ধারক। যদিও ধানবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে এখন আর ভাতের অভাব নেই। আলু মৌসুমভিত্তিক ফসল হলেও সবজি হিসেবে এর প্রচলন সারা বছর। আলু ছাড়া যেন আমাদের চলে না, এর প্রয়োজনটা অনেকটা ভাতের মতোই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, দেশে এ বছর আলু উত্পাদিত হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ মেট্রিক টন। দেশের মোট আলুর চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন।

আবার ভরা মৌসুমে প্রতিবছর আলু নিয়ে সারা দেশেই কৃষকের হাহাকার চলে। খেত, মাঠ, উঠান, হাট সর্বত্রই আলু আর আলু। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় আলু যেন কৃষকদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। চাহিদার সঙ্গে উত্পাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের বহুমুখিতার অভাবই এর প্রধান কারণ। অনেকেই মনে করেন, আলুর রপ্তানি বাড়াতে পারলে কৃষকের এই হাহাকার কমানো সম্ভব। কিন্তু রপ্তানির বাজার খোঁজা এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে সেই বাজারে স্থান করে নেওয়া সহজ কথা নয়। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্যও নেই পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের বহুমুখিতা আনাই অন্যতম সমাধান হতে পারে।

আজকে এমন এক উদ্ভাবনের কথা জানাব, যা এই সমস্যাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে পারে। সেটি হলো আলু থেকে পলিথিন তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন। আলু থেকে পরিবেশবান্ধব এই ব্যাগ তৈরি করেছেন তরুণ গবেষক মাহবুব সুমন। তিনি তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক করেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে। তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ​–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বিকল্প জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা গবেষক দলের সদস্য। দেশে–বিদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে অনেক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন।

মাহবুব সুমন জানান, এটি শুধু উত্পাদিত আলুর সদ্ব্যবহার নয়, পলিথিন ও প্লাস্টিকের দূষণ কমানোর পাশাপাশি দেশের প্যাকেজিং শিল্প, আলুচাষি ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের জন্যও সুফল বয়ে আনতে পারে। ইতিমধ্যেই আলু থেকে এক্সপেরিমেন্টাল পলিথিনের শিট তৈরি করে তা থেকে ব্যাগ বানিয়ে ভার বহন ক্ষমতা পরীক্ষা করেও দেখেছেন। বাণিজ্যিক উত্পাদনে গেলে প্রতিটি ব্যাগের বিক্রয়মূল্য হবে আনুমানিক ৩ টাকা। এটি ৩০ দিনের মধ্যে মাটিতে মিশে যাবে। পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি গতানুগতিক সাইজের ব্যাগগুলোর ওজন ধারণক্ষমতা ৫-৬ কেজি।

নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’-এর পক্ষে আলু থেকে তৈরি পলিথিন ব্যাগের বাণিজ্যিক উত্পাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এ ব্যাপারে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও তিনি জানান কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এটি উদ্ভাবন করেননি বরং এই প্রযুক্তি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পলিথিনের ব্যবহার হ্রাস ও দূষণরোধ করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য প্রযুক্তিটি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য, গণমাধ্যমে বিষয়টি যেন বহুল প্রচার পায় এবং সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের মানুষ উপকৃত হয়। সুমন বলেন, সবাই ঘরে ঘরে এই ব্যাগ বানালে দেশজুড়ে পলিথিন, প্লাস্টিকের দূষণ অনেক কমে যাবে।

কীভাবে এই আইডিয়া এল, এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন বলেন, ‘২০১৮ সালের এপ্রিলে মুন্সিগঞ্জ এলাকার কোল্ড স্টোরেজগুলোতে সৌরবিদ্যুতের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার পর আলুচাষিদের ব্যবসায়িক দুরবস্থার কথা জানতে পারি। দেশের উত্তরাঞ্চলে আলু চাষ বৃদ্ধি পাছে ক্রমেই। একসময় একচেটিয়া ব্যবসা করলেও মুন্সিগঞ্জের কোল্ড স্টোরেজগুলো ও আলুচাষিরা ভরা মৌসুমে আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কয়েক বছর ধরে। ফলে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ছেন তাঁরা। নতুন করে বিনিয়োগের সক্ষমতা নেই বলে আমাদের জানান কোল্ড স্টোরেজের মালিকেরা। এ পরিস্থিতিতে আলু থেকে কোনো সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি প্রোডাক্ট ডেভেলপ করে দিয়ে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি কীভাবে এড়ানো যায়, তা ভাবতে থাকি। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিসহ পণ্যটি যদি পরিবেশবান্ধব হয়, তাহলে তাঁদের উপকারের পাশাপাশি পরিবেশের দূষণও কম হবে। মাঝখান থেকে প্রচুর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তো থেকেই গেল। বিষয়টি নিয়ে নানাজনের সঙ্গে আলাপচারিতার একপর্যায়ে ইয়ান শ্মিডট নামের এক জার্মান এনার্জি বিশেষজ্ঞ ‘পলকা’ বানানোর একটি প্রক্রিয়া শিখিয়ে দেন। শ্মিডটের সাহায্য নিয়ে আলু দিয়ে একদমই স্থানীয় যন্ত্রপাতি ও কমনসেন্সের ব্যবহার করে আমরা যে পলিথিন বানালাম, তার নামই পলকা (POLKA)। এর মধ্যে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক নেই।’

পলকা কী জিনিস, জানতে চাইলে গবেষক মাহবুব সুমন জানান, পলকা বুঝতে হলে আগে জানতে হবে প্লাস্টিক কী? অণুবীক্ষণ যন্ত্রে প্লাস্টিককে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, তাতে হাইড্রোকার্বনের খুব ছোট ছোট কণা বা মনোমার পরপর সজ্জিত হয়ে দীর্ঘ শিকলের পলিমার সৃষ্টি করে। এ রকম অনেক পলিমার একত্র হয়ে প্লাস্টিক তৈরি করে। প্লাস্টিকের পাতলা ব্যাগ পলিমারের তৈরি বলে তাকে বলা হয় পলিথিন। এই হাইড্রোকার্বন পলিমার মাটিতে পচে না, বরং অনেক দূষণ সৃষ্টি করে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি এই পলিথিন। আমরা সবাই জানি, জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ তেল, গ্যাস, কয়লা পৃথিবীকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে। তাই পৃথিবী রক্ষায় পলিথিনের বিকল্প দরকার। ফলে আমরা যদি এমন পলিমার বানাতে পারি, যা একই রকম লংচেইন পলিমার, কিন্তু মাটিতে দ্রুত পচে যাবে এবং কোনো দূষণ তৈরি করবে না, তাহলে ব্যাপারটা বেশ হয়। পলকা হচ্ছে সেই পরিবেশবান্ধব পচনশীল পলিমার, যা আমরা আলু দিয়ে তৈরি করেছি। পলকা বানানোর প্রক্রিয়াও জানালেন মাহবুব সুমন। এর জন্য লাগবে আলুর স্টার্চ, পানি, হোয়াইট ভিনেগার, গ্লিসারিন।

আলু থেকে স্টার্চ বানানোর প্রক্রিয়া

বাজার থেকে গোল আলু কিনে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে ছিলে নিতে হবে। তারপর খোসা ছাড়ানো সেই আলুকে কুচি কুচি করে কেটে বা গ্রিটারে গ্রিট করে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে ১০ মিনিট। তারপর হাত দিয়ে চেপে বা অন্য যেকোনো উপায়ে চেপে চেপে ভেতরের সব নির্যাস বের করে নিতে হবে। শেষে সেই পানিটা কোনো পরিষ্কার পাত্রে রেখে দিলে তলায় স্টার্চ জমা হবে। এই স্টার্চটা লালচে ময়লাযুক্ত থাকবে। একে কয়েকবার পাতন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নিলে ধবধবে সাদা পরিষ্কার স্টার্চ পাওয়া যাবে। প্রতি ১০ কেজি আলু থেকে ১৩০০ থেকে ১৬০০ গ্রাম স্টার্চ তৈরি করা সম্ভব। স্টার্চ তৈরি করা যায় এমন শস্য যেমন চাল, ভুট্টা এবং কাসাভা থেকেও এই পলকা তৈরি করা যাবে বলে জানান সুমন।

স্টার্চ থেকে পলকা (POLKA) বানানোর প্রক্রিয়া

আলুর তৈরি স্টার্চ জটলা পাকানো গাদা গাদা পলিমারের একটা দঙ্গল। অগোছালো এই পলিমারের লং চেইনগুলোতে পানি মেশালে তা মোটামুটি ব্যবহার উপযোগী সজ্জায় আসে। লংচেইন পলিমার যেমন হয়, সে রকম হয় দেখতে। কিন্তু আণুবীক্ষণিক লেভেলে এতেও প্রচুর শাখা–প্রশাখা থেকে যায়। এই শাখা–প্রশাখা ছেঁটে ফেলে একে একটা সিঙ্গেল লংচেইন পলিমারে রূপান্তরের জন্য ভিনেগার বা ২০ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিড প্রয়োগ করতে হবে। এ অবস্থায় ‘পলকা’ বানালে প্লাস্টিকের মতো একটা কিছু হবে, কিন্তু তা হবে খুবই শক্ত ও ভঙ্গুর। ভঙ্গুর প্রবণতা কমানো ও জিনিসটাকে নরম বা ফ্লেক্সিবল করার জন্য এই মিশ্রণে প্লাস্টিসাইজার প্রয়োগ করতে হবে। এখানে আমরা প্লাস্টিসাইজার হিসেবে গ্লিসারিন ব্যবহার করব। গ্লিসারিনের অণুগুলো লংচেইন পলিমারের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে একে নরম করে ফেলে। এই নরম পলকাকে কোনো ফ্ল্যাট সারফেসে লেপ্টে দিলেই পেয়ে যাব আমাদের কাঙ্ক্ষিত পলকা শিট। শিট থেকে পরে আমরা ব্যাগ বা র‍্যাপিং পেপার বানিয়ে নিতে পারব সহজেই।

পরীক্ষা করার জন্য একটা পাত্রে ১০ গ্রাম স্টার্চ, ৫ মিলি ভিনেগার, ৫ মিলি গ্লিসারিন, ৬০ মিলি পানি ভালো করে মিশিয়ে গরম করতে হবে। কিছুক্ষণ গরম করলে এটি ঘন থিকথিকে হয়ে উঠবে। গরম অবস্থাতেই একে কোনো ফ্ল্যাট সারফেসে লেপে দিয়ে ওভেন বা ড্রয়ারে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক ঘণ্টা শুকাতে হবে। শুকানোর পর যে পলিমার শিট পাওয়া যাবে, সেটাই ‘পলকা’। এবার ওই পলকা শিট যেকোনো আকৃতিতে কেটে নিয়ে ব্যাগ, র৵াপিং হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

আলু থেকে পরিবেশবান্ধব এই ব্যাগ তৈরির উদ্যোগে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা। নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে এই তরুণ গবেষক জানান, প্রথম লক্ষ্য এক টাকায় পলকা ব্যাগ বাংলাদেশের মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া। ‌এ ছাড়া হলো পাহাড় আর সমতলে পানিশূন্য কিছু জায়গা আছে। আবার কিছু জায়গায় আছে লোনা পানি। খাওয়া যায় না, ব্যবহার করা যায় না। তাদের জন্য কমপক্ষে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা। বৃদ্ধি পাওয়া বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্যের বিকল্প তৈরি করে যাওয়া। বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য নতুন একটা নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বসাধারণের ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়ন করা, যার কাজ ইতিমধ্যে চলছে। কিন্তু গবেষণা আর মানুষের হাতে এই উদ্ভাবনগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনেক উদ্যোগের দরকার। তার জন্য কোনো সরকারি-বেসরসরকারি বিনিয়োগকারীকে এগিয়ে আসতে হবে।