জেব্রা গরু, রসুনের গন্ধযুক্ত দুধসহ আরও যেসব বিষয় জিতেছে এবারের ইগ নোবেল

২০২৫ সালের জীববিজ্ঞান ইগ নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করছেন টোমোকি কোজিমা, কাজাতো ওইশি, ইয়াসুশি মাতসুবারা, ইউকি উচিয়ামা, ইয়োশিহিকো ফুকুশিমা, নাওতো আওকি, সায় সাতো, তাতসুয়াকি মাসুদা, জুনইচি উএদা, হিরোইউকি হিরওকা এবং কাটসুতোশি কিনো। তাঁরা দেখিয়েছেন, গরুর শরীরে জেব্রার মতো ডোরাকাটা রং করলে মাছি কম কামড়ায়রবার্ট এফ. বুকাটি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

অক্টোবর মাস প্রায় চলেই এল। নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে শিগগিরই। নোবেল পুরস্কার কারা পাবেন, তা নিয়ে এখন চলছে আলোচনা। এমন সময় ঘোষণা করা হলো ইগ নোবেল পুরস্কার। 

বিভিন্ন গবেষক দলকে মজার গবেষণার জন্য দেওয়া হয় এই ইগ নোবেল। নোবেল কমিটির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার আগের মাস, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালের ইগ নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এই পুরস্কার এমন গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয়, যা প্রথমে মানুষকে হাসায়, পরে ভাবায়।

বিজ্ঞানী, চিকিৎসক বা অন্যান্য বিভাগে বিভিন্ন গবেষণার জন্য ইগ নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। নোবেলকে যদি সুক্ষ্ম পুরস্কার হিসেবে ধরা হয়, তবে ইগ নোবেল হলো স্থূল পুরস্কার। ইগ নোবেলে এবারের পুরস্কারের মধ্যেও স্থূলতা কমানোর দাওয়াই আছে। একদল গবেষক স্থূলতা কমানোর জন্য প্রস্তাব করে বলেছেন, মানুষকে টেফলন খাইয়ে শরীরের ক্যালরি কমানো সম্ভব।

এই অদ্ভুত ধারণাটি এসেছে জিরো ক্যালরি পানীয় থেকে। গবেষকেরা ভেবেছেন, যদি গুঁড়ো করা পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (PTFE) বা সহজ ভাষায় টেফলন খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এটি খাবারে কোনো ক্যালরি যোগ না করেই পেট ভরাবে। এরপর এটি শরীর থেকে আবার স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে যাবে। এমন ধারণার ওপর দেওয়া হয়েছে এবারের একটি ইগ নোবেল।

শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন জার্মান, ডাচ ও ব্রিটিশ গবেষকদের একটি দল। তাঁরা দেখিয়েছেন, এক পেগ ভদকা পান করলে মানুষের বিদেশি ভাষায় কথা বলার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।

আরেক দল বিজয়ী প্রমাণ করেছেন, সামান্য অ্যালকোহল পান করলে মানুষের বিদেশি ভাষায় কথা বলার দক্ষতা কিছুটা বাড়ে। এ ছাড়া জেব্রার মতো ডোরাকাটা দাগ দেওয়া গরুকে মাছি কম কামড়ায়। অন্যদিকে, কিছু মানুষকে যদি বলা হয়, তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, তাহলে তাঁরা আরও আত্মপ্রেমী (narcissistic) হয়ে ওঠে। আবার ৩৫ বছর ধরে নিজের নখের বৃদ্ধি রেকর্ড করার জন্য একজন মৃত ডাক্তার পেয়েছেন এবারে ইগ নোবেল।

রুটেম নাফতালোভিচ নামে এক গবেষক টেফলন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি সম্মানিত বোধ করছি।’ তিনি ও তাঁর ভাই ডেভিড প্রথমে স্থূলতা কমাতে টেফলনের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা দেখেছেন, টেফলনকে খাবারের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত জায়গা দেওয়া যায়। নাফতালোভিচ টেফলন দিয়ে তৈরি চকলেট বার খেয়েও দেখেছেন। তবে আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ কর্তৃপক্ষ (FDA) এই ধারণাটি নিয়ে খুব একটা আগ্রহী না। 

শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন জার্মান, ডাচ ও ব্রিটিশ গবেষকদের একটি দল। তাঁরা দেখিয়েছেন, এক পেগ ভদকা পান করলে মানুষের বিদেশি ভাষায় কথা বলার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।

আরেকদল গবেষক মিসরের ফ্রুট ব্যাট বা ফল খাওয়া বাদুড়কে ইথানল খাইয়ে এভিয়েশন পুরস্কার পেয়েছেন। ইথানল খাওয়ালে বাদুড়গুলো ধীরে ওড়ে। প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে পথ খোঁজার ক্ষমতাও কমে যায়। গবেষকেরা বলেন, ‘অতিরিক্ত পাকা ফলে বেশি ইথানল থাকে। বেশি পাকা ফল খেলে বাদুড় এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।’ 

২০২৫ সালে ইগ নোবেলে খাবার নিয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণা পুরস্কার পেয়েছে। যেমন, রসুনের গন্ধযুক্ত দুধের ওপর একটি গবেষণা পেয়েছে শিশু চিকিৎসা পুরস্কার। গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েরা রসুন খেলে শিশুরা মায়ের দুধ বেশি পান করে। 

ইতালীয় গবেষকদের একটি দল পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁরা পাস্তার সস জমে যাওয়ার পেছনের কারণ খুঁজে বের করেছেন। অন্য একটি দল আবিষ্কার করেছে, পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ টোগোর রংধনু টিকটিকি ‘ফোর-চিজ’ পিজ্জা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং পুরস্কার পেয়েছে ভারতীয় গবেষকেরা। তাঁরা এমন একটি জুতার র‍্যাক তৈরি করেছেন, যা দুর্গন্ধযুক্ত জুতার দুর্গন্ধ দূর করে। এই র‍্যাকে একটি ইউভি আলো বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউভি আলো দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মেরে ফেলে। তবে ব্যাকটেরিয়া মারার পাশাপাশি এই আলো জুতাও পুড়িয়ে ফেলে।

গরুর শরীরে জেব্রার মতো ডোরাকাটা দাগ দিলে মাছি কম কামড়ায়
বিবিসি

জাপানের কৃষি ও খাদ্য গবেষণা সংস্থার ডাক্তার তোমোকি কোজিমা ও তাঁর দল জীববিজ্ঞানে পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর দল দেখিয়েছেন, গরুর গায়ে জেব্রার মতো কালো দাগ আঁকলে মাছি কম কামড়ায়। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়েছিল আমি স্বপ্ন দেখছি।’

সাহিত্যে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয়েছে প্রয়াত ডাক্তার উইলিয়াম বিনকে। তিনি ৩৫ বছর ধরে নিজের হাত ও পায়ের নখের বৃদ্ধির হার লিখে রেখেছিলেন। তাঁর ছেলে বেনেট বলেছেন, ‘পুরো পরিবার এই কাজে যুক্ত ছিল। তিনি বিশ্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। আমরাও এর অংশ ছিলাম। তিনি এই পুরস্কার পেলে খুব খুশি হতেন। বলতেন অবশেষে স্বীকৃতি মিলল।’

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান