ছুটে চলা তারা নিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরনের গল্প চালু আছে। তা থাকলেও ছুটন্ত তারার সত্যিকারের ‘গল্প’টি খুবই চমকপ্রদ। ছুটন্ত এই তারাগুলো আদতে কোনো তারাই না। এগুলো হলো বিভিন্ন আকারের পাথর ও ধাতব খণ্ড, যা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে বিভিন্ন রঙের রেখার সৃষ্টি করে। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় উল্কা। উল্কা সৃষ্টিকারী পাথরখণ্ডগুলোর নাম মিটিরয়েড বা উল্কাখণ্ড। উল্কাখণ্ডগুলো মহাকাশে ছুটতে থাকে অনবরত। যখন খুব কাছে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর আকর্ষণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং প্রচণ্ড গতিতে নিচের দিকে নেমে আসতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। প্রচণ্ড তাপে একসময় উল্কাখণ্ডটি তাপে ভেঙে যায়। তৈরি হয় ধুলা ও উজ্জ্বল গ্যাস। সেগুলো বিভিন্ন রঙের রেখার সৃষ্টি করে। আর এই রেখাগুলোকেই আমাদের কাছে ছুটন্ত তারা বলে মনে হয়।
পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান উল্কাগুলোর ৯০ শতাংশই তৈরি হয় কোনো না কোনো ধূমকেতু থেকে। এ ছাড়া গ্রহাণু। উপগ্রহ এমনকি গ্রহ থেকেও উল্কা সৃষ্টি হতে পারে। উল্কাখণ্ডের মূল উপাদান হলো লোহা ও নিকেল। তবে এরা বিভিন্ন যৌগ দিয়েও তৈরি হতে পারে। উল্কার গাঠনিক উপাদান শনাক্ত করার একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হলো এর ফেলে যাওয়া গ্যাস ও রং পর্যবেক্ষণ। কারণ, আলাদা আলাদা মৌলের উপস্থিতির কারণে এদের লেজের রংও বিভিন্ন হতে পারে। গাঠনিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে এদের তিনটি শ্রেণিতে ফেলা যায়—ধাতব, পাথুরে ও পাথুরে ধাতব। তবে এদের মধ্যে ধাতব লোহার তৈরি উল্কাই সবচেয়ে বেশি। উল্কার আকার নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উল্কার ব্যাস ৩০ মাইক্রোমিটার থেকে ১ মিটার পর্যন্ত হয়। অবশ্য কিছু মহাকাশবিজ্ঞানী এক কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাসবিশিষ্ট পাথরখণ্ডকেও উল্কাখণ্ড বলে মনে করেন।
সাধারণত উল্কাগুলোকে আকাশে বিচ্ছিন্নভাবে চলতে দেখা যায়। তবে একই ধরনের উল্কাকে বছরের একই সময়ে আকাশের একই বিন্দু থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। অসংখ্য উল্কা ছড়িয়ে পড়ার এ ঘটনাকেই উল্কাবৃষ্টি বলে। বছরের বিভিন্ন সময়ে আকাশের বিভিন্ন বিন্দুতে অসংখ্য উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এই উল্কাবৃষ্টিগুলো শনাক্ত করার জন্য এদের নাম দেওয়া প্রয়োজন। তাই উল্কাবৃষ্টির উত্পত্তি বিন্দুর নিকটবর্তী কোনো নক্ষত্র বা নক্ষত্রমণ্ডলের নামানুসারে উল্কাবৃষ্টিগুলোর নাম দেওয়া হয়। যেমন: সিংহ নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকে যে উল্কাবৃষ্টির জন্ম হয়, তার নাম লিওনিডস। ওই এলাকার উল্কাবৃষ্টির সব উল্কা একই ধূমকেতু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসে।
মজার ব্যাপার হলো, একই উল্কাবৃষ্টি বছরের নির্দিষ্ট সময় ধরেই চলে। কারণ, পৃথিবীর বার্ষিক গতির ফলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে আবার কক্ষপথের একই জায়গায় ফেরত আসে। এতে পৃথিবী প্রতিবছর একই সময়ে একই উল্কাখণ্ডের সংস্পর্শে আসে। তাই লিওনিডস নভেম্বরে ও ওরিয়নিডস সব সময় অক্টোবরেই দেখা যায়।
হ্যালির ধূমকেতু দেখতে হলে ২০৬১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এ কথা ভেবে অনেকে দুঃখ করেন। তাঁদের জন্য সুখবর, এপ্রিল-মে মাসের এটা অ্যাকুয়ারিডস আর অক্টোবরে ওরিয়নিডস নামে যে উল্কাবৃষ্টি দেখা যায় সেগুলোর উত্স আমাদের সবার প্রিয় হ্যালির ধূমকেতু। এ ছাড়া আরও অসংখ্য ধূমকেতু থেকে অসংখ্য উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি হয়। সুতরাং সচরাচর ধূমকেতুর দেখা না হয় না-ই পেলাম, ‘ধূমকেতুর বাচ্চা’দের তো দেখতেই পারি।