পৃথিবীর উল্টো পিঠের উল্টো অভিজ্ঞতা

দক্ষিণ গোলার্ধের এটিই ছিল আমার প্রথম ভ্রমণ। তাত্ত্বিক বা তাথ্যিকভাবে কিছুটা জানা ছিল বলে নতুন অভিজ্ঞতার জন্য কিছু মানসিক প্রস্তুতি ছিল। ঋতুচক্রে উত্তর গোলার্ধের বিপরীত অবস্থানে সে গোলার্ধ। যেমন আমাদের গোলার্ধে যখন গ্রীষ্ম, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন শীতকাল। আবার আমাদের উত্তর গোলার্ধে যখন শীত, সে গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল। শরৎ ও বসন্তের সময়টিও দুই গোলার্ধে ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ, বিষুব রেখার উত্তরে যখন গরমকাল শেষে শীত আসতে থাকে, তার দক্ষিণে তখন শীতকাল গিয়ে আসতে থাকে গরমকাল। আর আমি যখন মেলবোর্নে যাই, তখন ঢাকায় বসন্তকাল হলেই সেখানে তখন যথারীতি শরত্কাল। দুটোই অবশ্য শীত-গ্রীষ্মের সন্ধিকাল হিসেবে শীত-গ্রীষ্মের মাঝামাঝি অবস্থা। তবে সেখানে সেটি যে শরৎই, বসন্ত নয় তা মনে করিয়ে দিল মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের কাশফুলরাজি।

অবশ্য ভৌগোলিক অবস্থানের বিভিন্ন পার্থক্যের কারণে। প্রধানত মেলবোর্নের অবস্থান ঢাকার চেয়ে উচ্চতর অক্ষাংশে (ঢাকা-২৩৪৪' উত্তর, মেলবোর্ন-৩৭৪৯' দক্ষিণ)। পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে প্রতিসাম্যে কিছু ব্যত্যয়ের কারণে (সে কথায় পরে আসছি), সেখানকার শরৎ ঢাকার বসন্তের চেয়ে নিচের তাপমাত্রায় ছিল। আর যেদিন কিছু বৃষ্টি ও বায়ুপ্রবাহের তীব্রতা দেখা দিত, সেদিন আমাদের মাপকাঠিতে যথেষ্ট ঠান্ডাই পড়ত। আমরা জানি, আবহাওয়া বা জলবায়ু এবং ‘গরম-ঠান্ডা’র মাত্রা অক্ষাংশ ছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ, যেমন সাগরের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানটির অবস্থান, পাহাড়ের অবস্থান-আকার, স্থানটির উচ্চতা ইত্যাদি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। আমি থাকা অবস্থাতেই শীতের আগমন ঘোষিত হলো—সূর্য হেলে যেতে থাকল বেশ দ্রুত। মেলবোর্নের অক্ষাংশ ঢাকার তুলনায় একটু বেশি। তাই সূর্য হেলে যাবেও ঢাকার তুলনায় বেশি। দিবা-রাত্রির পার্থক্যটাও আমাদের ক্রান্তীয় এলাকার তুলনায় অনেক বেশি।

এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অবশ্য আমাদের অনেকেরই আছে। কারণ, উত্তর গোলার্ধেও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান ইত্যাদি উচ্চ অক্ষাংশের সব দেশেই অবস্থাটা এমন। (নরওয়ে, সুইডেন, রাশিয়া, কানাডার অনেক এলাকাই তো এমন উচ্চ অক্ষাংশে পড়েছে, যেখানে সূর্য শীতকালে এতই হেলে পড়ে যে তখন এক বা একাধিক দিন সূর্যোদয়ই হয় না; আবার গ্রীষ্মকালে এক বা একাধিক দিন সূর্যাস্ত হয় না)। তবে এ ক্ষেত্রে পার্থক্যটা এই যে দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত মেলবোর্নের সূর্য সেখানকার শীত ঋতুতে হেলে পড়ে দক্ষিণে নয়—উত্তরে। ব্যাপারটা কেমন যেন উল্টো উল্টো লাগে আমাদের কাছে। আমরা জানি, দক্ষিণমুখী ঘর—দক্ষিণ দিক খোলা ঘর সবার সেরা। শীতকালে সে ঘরে-বারান্দায় মিষ্টি রোদ আসবে কিন্তু গ্রীষ্মের প্রচণ্ড সূর্যরশ্মি আসবে না—আসবে দক্ষিণা বাতাস। কিন্তু সেখানে ব্যাপারটা উল্টো—শীত ঋতুর মিষ্টি রোদ আসবে উত্তরের দরজা বা জানালা দিয়ে—দক্ষিণের নয়।

মেলবোর্নে প্রথমেই যে জিনিসটা আমার মনোযোগ কাড়ল, তা তার আকাশ। এ আকাশ অন্য আকাশ। কারণ, আমাদের আকাশের অনেক তারা বা তারামণ্ডল এখানে নেই। আমাদের উত্তর আকাশের তারকারাজির অনেকেই নেই সেখানে। এখানকার অতি বিখ্যাত ধ্রুবতারা, লঘু সপ্তর্ষি একেবারেই নেই দক্ষিণের আকাশে। সপ্তর্ষিমণ্ডল, ক্যাসিওপিয়া নেই। ধ্রুবতারাহীন আকাশ, যা আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। তবে দক্ষিণ গোলার্ধের একটি নিজস্ব ধ্রুবতারা আছে—সেটি দক্ষিণ আকাশে। নাম তার সিগমা অকটানটিস। তবে এই তারাটি আমাদের ধ্রুবতারার সঙ্গে তুলনীয় নয়। তার উজ্জ্বলতা অনেক কম। যদিও পৃথিবী থেকে ওই তারার দূরত্ব ২৭০ আলোকবর্ষ। এদিকে পৃথিবী থেকে আমাদের ধ্রুবতারার দূরত্ব (৪৩০ আলোকবর্ষ)-এর তুলনায় অনেক কম। তবু এর উজ্জ্বলতা উত্তর ধ্রুবতারার উজ্জ্বলতার ২৫ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।

উত্তর ধ্রুবতারা সূর্যের চেয়ে ২ হাজার ৫০০ গুণ বেশি আলো বিকিরণকারী এক সুপারজায়ান্ট স্টার। আর সূর্যের প্রায় ৩৪ গুণ আলো বিকিরণকারী হলো দক্ষিণ তারাটি। আর সেটি প্রকৃত দক্ষিণ আকাশ মেরু থেকে ১ ডিগ্রির চেয়ে একটু বেশি দূরে। আর আমাদের উজ্জ্বল ধ্রুব উত্তর আকাশ মেরুর আরও কাছে, চার ভাগের তিন ডিগ্রির মধ্যে। আমাদের পক্ষে এ অনুজ্জ্বল দক্ষিণ তারাটি (আরেক নাম Polaris Australis) দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে শূন্যের কোঠায় জেনেও চেষ্টা করেছি—বৃথা চেষ্টা অবশ্য। চেষ্টা করার সময় মনে রেখেছিলাম যে আমাদের ধ্রুবকে উত্তর দিগন্ত থেকে যে কৌণিক উচ্চতায় আমরা দেখতে পাই (প্রায় ২৩০/২৪০), দক্ষিণ তারাটি দক্ষিণ দিগন্ত থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি কৌণিক উচ্চতায় (প্রায় ৩৭০ ৫০০) থাকবে। উত্তর মেরুতে ধ্রুবতারাকে ঠিক মাথার ওপর দেখা যায়। আর দক্ষিণ তারাটিও দক্ষিণ মেরুতে ঠিক মাথার ওপর থাকবে (তবে তা আমার মতো সাধারণ জন নয়, বরং বিজ্ঞ জ্যোতির্বিদেরাই উপযুক্ত টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে পাবেন)। তবে যা প্রাপ্তি হয়েছে তা হলো, দক্ষিণ আকাশে গুরুত্বপূর্ণ তারামণ্ডল Southern cross বা Crux আমি দেখতে পেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অনুজ্জ্বল দক্ষিণ ধ্রুবতারা (Polaris Australis) নয়, বরং সাউদার্ন ক্রসই নাকি সে যুগের নাবিকদের জন্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করত। এটি অস্ট্রেলিয়ায় অনেক মর্যাদাসম্পন্ন তারামণ্ডল। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীতে এর উল্লেখ আছে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, স্যামোয়া, পাপুয়া নিউগিনি প্রভৃতি দেশের পতাকাতেও সাউদার্ন ক্রসের তারারা অঙ্কিত। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার পতাকাতে শোভা পাচ্ছে এ তারামণ্ডল।

আরেকটি বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয় না বললেই নয়। এদেরই পাশের একটি তারা আলফা সেন্টুরাই। এটি আসলে একটি বিশেষ ধরনের ত্রয়ী তারা (Triple-Star)| এর রয়েছে অনন্য এক বৈশিষ্ট্য। সে বৈশিষ্ট্য হলো, সূর্য ছাড়া এটি আমাদের নিকটতম নক্ষত্র। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এই ত্রয়ী তারার একটি তারা প্রক্সিমো সেন্টুরাই নিকটতম নক্ষত্র, যার দূরত্ব ৪.৩৬ আলোকবর্ষ বা ৪১,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার। তবে অনুজ্জ্বল দক্ষিণ তারাটিসহ যেকোনো তারা দেখার ক্ষেত্রে যেকোনো শহরের মতো মেলবোর্নেও রয়েছে এক সমস্যা—আলোকদূষণ সমস্যা। ঢাকার মতো এমন প্রচণ্ড অসহনীয় শব্দদূষণ বা বায়ুদূষণ মেলবোর্নে নেই। সেখানে গাড়িগুলো এমন হর্ন বাজায় না, ধোঁয়া দেয় না; এমন ধুলা, দুর্গন্ধ নেই সেখানে। তবে আলোকদূষণ অবশ্যই আছে, যা আমাকে দক্ষিণ গোলার্ধের তারারাজির ভিন্নতর সৌন্দর্য থেকে অনেকটা বঞ্চিত করেছে।

লেখক: বেতার সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা, এবিসি রেডিও