স্টিভেন ওয়াইনবার্গ : দুনিয়ার ‘প্রথম তিন মিনিটের’ বিজ্ঞানী

১৯৬৭ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স জার্নালে তিন পাতার চেয়ে কম একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয। ‘এ মডেল অব লেপটন’ নামের সেই নিবন্ধে লেখক পদার্থ বিজ্ঞানী লেপটনের একটি মডেল বর্ণনা করেছেন। সেখানে বেশ কিছু মৌল কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। লেখক সেই সময় ছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ল্যাবরেটরি ফর নিউক্লিয়ার সায়েন্স এন্ড ফিজিকস ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। সেই সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন। তাঁর মূল কাজের জায়গা ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে, যুক্তরাষ্ট্র। নিবন্ধের বিষয়বস্তু সহজ। দুনিয়ার সকল কিছু চারটি মৌলিক বল যথাক্রমে মহাকর্ষ, বিদ্যুৎচুম্বীঁয়, সবল ও দুর্বল বলের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

এর মধ্যে বিদ্যুৎচুম্বকীয় এবং দুর্বল বল উভয়ই সাবএটমিক বা অতিপারমাণবিক কণার মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকরী হয়। বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল তাত্ত্বিকভাবে অসীম দূরত্ব পর্যন্ত কাজ করতে পারে। কারণ এর কণা ফোটন ভরহীন। অন্যদিকে দুর্বল বল কেবল পরমাণুর মধ্যে সীমিত পরিসরে কাজ করতে পারে, কারণ এটি কাজ করে একটি ভারী বোসনের সাহায্যে। ফোটন ও এই অন্তর্বর্তী বোসনের সঙ্গে লেপটনের মিথস্ক্রিয়ার ফলে দুর্বল বলের কার্যকারিতা।

১৯৬৭ সালের আগে অনেকে বিজ্ঞানী দুর্বল ও বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে বিজ্ঞানী শেলডন গ্ল্যাশো ১৯৬১ সালে কিছুটা অগ্রগতি করেন। গ্ল্যাশোর মডেলে দুই বলের প্রতিসাম্য ভাঙার একটি চিত্র পাওয়া গেলেও সেখান থেকে এমন কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হয়নি, যা পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা যায়। তাছাড়া সেই মডেলে অযাচিতভাবে একটি ভরহীন গোল্ডস্টোন বোসনেরও দরকার হচ্ছে।

কিন্তু ১৯৬৭ সালের উল্লিখিত নিবন্ধের লেখক একটি নতুন মডেল প্রস্তাব করেন। দেখা গেল, এই মডেলে দূর্বল ও বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলের প্রতিসাম্য একসময় ভেঙে আলাদা হলেও সেখানে ভরহীন বোসনের প্রয়োজন পড়ছে না। তার বদলে ফোটন ও অন্তর্বর্তী বোসনই যথেষ্ট। লেখক প্রমাণ করলেন, বৈসাদৃশ্য থাকা স্বত্ত্বেও ফোটন ও ওই বোসন একই পরিবারের সদস্য। ওই কণার তিনি নাম দিয়েছেন ডব্লিউ ও জেড কণা। ১৯৮২-৮৩ সালে নানা পরীক্ষায় এই ডেজ ও ডব্লিউ কণার দেখা মেলে বিজ্ঞানীদের কাছে।

তবে, তার আগেই বিজ্ঞানীরা এই মডেলের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। এই মডেলের কারণে এই দুইটি বলকে একত্রিত করা সম্ভব হয়। গড়ে ওঠে দুনিয়াকে বোঝার জন্য একটি নতুন মডেল—স্টান্ডার্ড মডেল বা আদর্শ মডেল। এই কাজের জন্য ওই লেখক ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম ও শেলডন গ্ল্যাশোর সঙ্গে যৌথভাবে ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমাদের লেখক চারটি বলকে একত্রিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

দুনিয়াকে বোঝার মানুষের দুর্দমনীয় আকাঙ্খাকে এগিয়ে নেওয়ার এই বিজ্ঞানীর নাম স্টিভেন ওয়াইনবার্গ। গত ২৩ জুলাই ৮৮ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন।

জন্ম ও গবেষণা

ওয়াইনবার্গের জন্ম ১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে। তার পিতামাতা ইহুদি ইমিগ্রান্ট। পিতা ফ্রেডেরিক ওয়াইনবার্গ ছিলেন কোর্টে স্টেনোগ্রাফর। মা ইভা গৃহবধু। ১৬ বছর বয়সে এক তুতো ভাইয়ের কাছ থেকে একটি রসায়নের কিট উপহার পান কিশোর ওয়াইনবার্গ। এটিই তাকে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করে। ১৯৫০ সালে নিউইয়র্কের ব্রোনস্ক হাইস্কুল অব সায়েন্স থেকে তার প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ হয়। স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিলেন শেলডন গ্ল্যাশো। তাঁরা দুজন ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৫৪ সালে কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেন। সেই বছরেই লুইসকে বিবাহ করেন। এরপর তিনি চলে যান কোপেনহেগেনে নীলস বোর ইনস্টিটিউটে। এক বছর পর সেখান থেকে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে এসে নিজের পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। স্যাম ট্রেইম্যানের তত্ত্বাবধানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল, দ্য রোল অব স্ট্রং ইন্ট্যারকশনস ইন ডিকে প্রসেস। ১৯৫৭ সালে তিনি পিএইডি সম্পন্ন করেন।

পিএইচডি সম্পন্ন করার পর দুই বছর তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তারপর ১৯৫৯ সালে তিনি বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে চলে যান গবেষক হিসেবে।

১৯৬০ সালে পোস্ট ডক্টরাল শেষে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এ সময়কালে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল কোয়ান্টাম ফিল্ড থিউরি, সিমেট্রি ব্রেকিং, পিওনের বিচ্ছুরণ, অবলোহিত ফোটন ও কোয়ান্টাম মহাকর্ষ। এ সময় তিনি কোয়ান্টাম ফিল্ড থিউরি নিয়ে কাজ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে এবং পরের এক বছর এমআইটিতে কাজ করেন। এমআইটিতে কাজ করার সময় তাঁর 'আ মডেল ফর লেপটন' নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই নিবন্ধটি এখনও হাই-এনার্জি ফিজিকসের মোস্ট সাইটেট পেপার হিসেবে বিবেচিত। ১০৭৩ সালে তিনি হার্বার্ডে হিউজিন প্রফেসর হন এবং ১৯৮৩ সালে চলে যান ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে ফিজিকস ও অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক হিসেবে। আমৃত্যু সেখানেই ছিলেন তিনি।

আম জনতার জন্য বিজ্ঞান

শুধু গবেষণা নয়। ওয়াইনবার্গ বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দুই হাতে লিখেছেনও। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম পপুলার সায়েন্সের বই ‘দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস: আ মডার্ন ভিউ অব দ্য অরিজিন অব দ্য ইউনিভার্স’। এ বইয়ে তিনি খুব সাধারণভাবে বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর পরবর্তী তিন মিনিট সময়কালর কী কী হয়েছে সেটি বর্ণনা করেন।

১৯৯২ সালে তার বই ড্রিম অব আ ফাইনাল থিওরি প্রকাশিত হয়। এই বইতে তিনি উপলব্ধি করেন মানবজাতি হয়তো সকল বলকে একত্রিত করে একটি ফাইনাল থিওরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কোয়ান্টাম বিদ্যা ও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যে যে গ্যাপ সেটা পূরণের চেষ্টা বিজ্ঞানীদের চূড়ান্ত সত্যের কাছে নিয়ে গেছে বলেই তিনি মনে করতেন। কিন্তু ১৯৯৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের এই অবস্থান থেকে সরে আসেন। কারণ কোয়ান্টাম বিদ্যা ও আপেক্ষিকতাকে একীভূত করাটা মোটেই সহজ নয়।

তিনি বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়েছেন অত্যন্ত গভীরভাবে। সেটি নিয়ে কাজও করেছেন। 'মানুষ হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মকানুনগুলো পুরোপুরি আত্মস্থ করার মতো বুদ্ধিমান ও চৌকস কখনও হতে পারবে না।' ২০১৫ সালে নিউটনের সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে লেখা টু এক্সপ্লেইন দ্য ওয়ার্ল্ড বই-এ এ কথা লিখেছেন তিনি।

নবীন বিজ্ঞানীদের জন্য চার পরামর্শ

ক. সব কিছু জানার দরকার নেই

ওয়াইনবার্গের যখন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন হয়, তখন পদার্থবিজ্ঞান তার কাছে এক বিশাল সমুদ্র মনে হয়েছে। ২০০৩ সালে নেচার সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধে এ কথা উল্লেখ করেন ওয়াইনবার্গ। তিনি স্মরণ করেন, এরকম একটি মহাসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ভেবেছেন কীভাবে তাঁর গবেষণা করবেন। কারণ এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তার সব তো তিনি জানেন না।

বেশিরভাগ সময় শিক্ষার্থীরা কোনো কোনো বিষয়ের গভীরতা ও বিশালতা নিয়ে এতোই অভিভূত হয়ে পড়ে যে শুরু করার জন্য কোন রাস্তা বের করতে পারে না। 'তোমার সব কিছু জানার দরকার নেই, কারণ পিএইডডির সময় আমিও তেমন কিছু জানতাম না,' বলেছেন ওয়াইনবার্গ।

খ. উত্তাল সমুদ্রই ভাল

ওয়াইনবার্গ তখন অধ্যাপক। একদিন তাঁর এক শিক্ষার্থী এসে বলে, সে বিষয় পরিবর্তন করতে চায়। কণা পদার্থবিজ্ঞানের বদলে সে ওয়াইনবার্গের সঙ্গে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।

শিক্ষক হিসেবে ওয়াইনবার্গ একটু মনোবেদনা নিয়ে কারণ জানতে চান। শিক্ষার্থীটি তাকে জানায়—কণা পদার্থবিজ্ঞানের অবিন্যস্ত ঝড়ঝাপটার তুলনায় সাধারণ আপেক্ষিকতার নীতিগুলো সুসংহত ও অনেক গোছানো। এটা শুনে ওয়াইনবার্গের সরস জবাব, তাহলে তো কণা পদার্থবিজ্ঞানেই কাজ করা বেশি দরকার। কারণ সেখানে এখনো অনেক সৃজনশীল কাজের সুযোগ আছে।

কাজেই ওয়াইনবার্গের পছন্দ হলো সাঁতার জানলে উত্তাল সাগর বেছে নেওয়াটাই ভাল। কারণ তাতে অনিশ্চয়তা থাকলেও নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

গ. সময় নষ্ট করার জন্য অনুতপ্ত হয়ো না

ওয়াইনবার্গের এই পরামর্শটি খুবই সুন্দর—'ব্যর্থতার জন্য নিজেকে ক্ষমা করে দাও। ভুল সমস্যার পেছনে সময় নষ্ট করার জন্য নিজেকে ক্ষমা করো। মনে রেখো, যা যা খারাপ হওয়ার কথা, তা খারাপ হবেই। কিন্তু সব কিছুর শেষে রূপালি আলোর রেখা দেখা যাবে।'

এ বিষয়ে ওয়াইনবার্গ একটি উদাহরণ দেন। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝিতেও বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাদের এই কাজই ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনকে কাজ করার জন্য সঠিক সমস্যা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

ওয়াইনবার্গ যোগ করেছেন, 'বেশিরভাগ সময় জানবেই না, তুমি ঠিক নাকি ভুল পথে আছো। কিন্তু তুমি যদি সৃজনশীল হও, তাহলে দিন তুমি বিজয়ীর হাসি হাসবে।'

ঘ. বিজ্ঞানের ইতিহাস

নিজের গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞানের ইতিহাসও নিবিড়ভাবে জানার জন্য নবীন বিজ্ঞানীদের প্রতি ওয়াইনবার্গের আহবান ছিল। কারণ অনেক সময় নিজের কাজ বিজ্ঞানে কী কাজে লাগবে, তা সঠিকভাবে ও অল্পসময়ের মধ্যে বোঝা যায় না। কিন্তু ইতিহাস জানা থাকলে বোঝা যাবে, 'এই কাজের মাধ্যমে কীভাবে তুমি ইতিহাসের অংশ হচ্ছ। এটি তোমাকে আরও অনুপ্রাণিত করবে।'

দুনিয়ার সত্যাসত্য আর সেটির নিয়মকানুন জানার জন্য মানুষের চিরন্তন প্রয়াস যতদিন অব্যাহত থাকবে ততদিন লোকে স্টিভেন ওয়াইনবার্গকে স্মরণ করবে তার সময়ের একজন দুর্দান্ত বিজ্ঞানী হিসেবে।