মহাবিশ্বের গণিত

আদি নেই অন্ত নেই, সময়ের বালাই নেই। বস্তু তো নেই-ই। তারপর হঠাৎ এক বিস্ফোরণ। সময়ের শুরু। শুরু গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানেরও। আমরা আজ যে দশভিত্তিক সংখ্যা ব্যবহার করি, তার একটার জন্ম সেই মহাবিস্ফোরণের আগেই (শূন্যের)। বাকিগুলোর জন্ম একে একে নাকি একসঙ্গে-বিজ্ঞানীরা আজও নিশ্চিত নন। তাহলে মহাবিস্ফোরণের আগে সংখ্যা বলে কিছু ছিল না? অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হয়। মহাবিস্ফোরণের আগে একটাই সংখ্যা-শূন্য। নাকি অসীম? যেখানে মহাবিশ্বের জন্মই হয়নি, চরাচরজুড়ে শুধুই শূন্যতা, সেখানে শূন্য আর অসীমে কী পার্থক্য!

মহাবিস্ফোরণে দশটা সংখ্যারই বা জন্ম হলো কেন? আমাদের পৃথিবীতে শুধু দশভিত্তিক সংখ্যার অস্তিত্ব ছিল তা তো নয়। একেক সভ্যতায় একেক রকম সংখ্যাপদ্ধতি চালু ছিল, সেগুলোই বা কেন মহাবিশ্বের জীবনে নিয়ামক হয়ে উঠল না?

আসলে আমাদের অবস্থা অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো-যার হাতে হাতির যে অংশটা পড়ে-সে সেভাবেই মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করে। ১২ ভিত্তিক কিংবা ৬০ ভিত্তিক, সংখ্যাপদ্ধতি যেমনই হোক, মহাবিশ্বের চরিত্রে তার প্রভাব পড়ে না। গণিতটা আসলে বিজ্ঞানের ভাষা। সারা বিশ্বের মানুষ যাতে একে অন্যের ভাষা বোঝে, তাই একদিন ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটা কয়েক শ বছরের ঘটনা। কিন্তু বিজ্ঞানের এই দশভিত্তিক ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ হয়েছে কমবেশি ২ হাজার বছর আগে।

আমাদের উপমহাদেশে, এই সিন্ধু নদের উপকণ্ঠেই দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতির চল শুরু। কিন্তু সেটা এই উপমহাদেশের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরব বণিক আর পণ্ডিতেরা তখন চষে বেড়াচ্ছেন ভারত থেকে ইউরোপ, চীন থেকে আফ্রিকা। তাঁদের হাত ধরেই এ দেশের দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে গ্রিসসহ গোটা ইউরোপে। কিন্তু সেই দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতিতে শূন্যের ব্যবহার ছিল না। সিন্ধু সভ্যতায় বাক্সালী গ্রামে প্রথমবার শূন্যের ব্যবহার চালু হয়। পরে আরবদের হাত ধরে সেই শূন্যও চলে যায় ইউরোপে। গোটা পৃথিবীতে তখন সব রকম সংখ্যাপদ্ধতি বাতিল করে ভারতীয় রীতির দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি চালু হয়। প্রতিষ্ঠা পায় বিজ্ঞানের ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ।

বলছিলাম অন্ধের হস্তী দর্শনের কথা। অন্ধের কাছে দুটি হাতিয়ার থাকে হাতি চেনার জন্য। তার হাত আর অনুভূতি। মাত্র শ খানেক বছর আগে কসমোলজি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। এর আগে মহাকাশবিজ্ঞান বলতে ছিল শুধু জ্যোতির্বিদ্যা। জ্যোতির্বিদেরা তারা গুনেছেন, সেগুলোর নামকরণ করেছেন, এদের দূরত্ব মেপেছেন-ব্যস এই তো। কিন্তু মহাবিশ্ব কীভাবে তৈরি হলো, তারাদের জন্ম কীভাবে হলো, মহাবিশ্বের পরিণতি কী, মহাবিশ্বের আকার-আকৃতিই বা কেমন-এসব নিয়ে আগে গবেষণা অবশ্য হয়েছে-তার পুরোটাই ভাসা-ভাসা। নিউটন চেষ্টা করেছিলেন মহাবিশ্বের মন বুঝতে। আর আইনস্টাইন বুঝতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির মন। আসলে তিনি মহাবিশ্বের জন্ম প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। সেই বোঝাটা নিছক কল্পনা করে বা স্বপ্ন দেখে নয়, গণিতের ভাষা ব্যবহার করে মহাজাগতিক মহাকাব্য লিখতে। আইনস্টাইনের মতেই, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো একে বোঝা অত্যন্ত জটিল।

অন্ধের হস্তী দর্শনে হাতের যেমন ভূমিকা, বিজ্ঞানীদের হাত তেমনি পদার্থবিজ্ঞান। অন্ধেরা যেমন অনুভূতি দিয়ে হাতির গড়ন বোঝার চেষ্টা করে, বিজ্ঞানীরা গণিতের অনুভূতি দিয়ে চেষ্টা করেন মহাবিশ্বকে অনুভব করার। সেই চেষ্টার শুরুটা হয়েছিল নিউটনের হাত ধরেই। একটা আপেল কেন মাটিতে পড়ে, গ্রহরা কেন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, সেই রহস্য সমাধান করতে তিনি হাত বাড়িয়েছিলেন গণিতের জগতে।

নিউটন সাধারণ বীজগণিত ব্যবহার করে কাঠামোবদ্ধ করলেন মহাকর্ষ সূত্র। গণিতের রং-তুলিতে এঁকে দেখালেন, যে বলের কারণে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে, সেই একই বলের কারণে গাছের আপেল মাটিতে পড়ে।

পদার্থবিদ্যার সমীকরণগুলো দাঁড়িপাল্লার মতো। সমীকরণের দুপাশে স্রেফ কিছু চলক থাকলেই চলে না, ডান পাশে থাকতে হয় ধ্রুবক। দাঁড়িপাল্লায় পাত্রসহ বস্তু মাপতে গিয়ে এক পাশে বাটখারা বাড়িয়ে ভারসাম্য রাখতে হয়। কিন্তু মূল যে বাটখারাটি থাকে, যেটা দিয়ে বস্তু মাপতে হয়, সেটা সব সময় একই থাকে। বস্তু কমবেশি করে কিংবা পাত্রের জন্য যে বাটখারাটা দেওয়া হয়, তার মান পরিবর্তন করে দাঁড়িপাল্লার ভারসাম্য রাখা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোতেই তেমনি চলকের কমবেশি করে ঠিকঠাক মাপামাপিটা চলে, কিন্তু অপরিবর্তনীয় বাটখারার মতো সমীকরণের ডান দিকে গাঁট হয়ে বসে থাকে ধ্রুবকগুলো। মহাকর্ষ সূত্রের কথাই ধরা যাক। নিউটন বললেন, মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। বস্তু দুটির ভর যত বেশি হয়, তাদের মধ্যে আকর্ষণ বল তত বাড়ে। কিন্তু বস্তু দুটির মধ্যে দূরত্ব যদি বাড়ে, তাহলে মহাকর্ষ বল কমবে। সেই কমাটাও আবার যেনতেন নয়, বিপরীতবর্গীয় সূত্র মেনে কমবে। যেমন দূরত্ব যদি দ্বিগুণ করা হয়, তাহলে মহাকর্ষ বলের মান কমে দাঁড়াবে চার গুণে আবার দূরত্ব তিন গুণ হলে বল নয় গুণ ছোট হবে।

মহাকর্ষ বলের সমীকরণে ভারসাম্য আনতে নিউটন যোগ করলেন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G, একে আবার বিশ্বজনীন ধ্রুবকও বলা হয়। শুধু কি সমীকরণ মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারে? সমীকরণ গণিতের বিমূর্ত রূপ, পদার্থবিজ্ঞানে সমীকরণকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় ঠিকই, কিন্তু ঠিক ঠিক মান বের করতে দরকার হয় বিশুদ্ধ সংখ্যার। বস্তু দুটির ভর, যে দুটি হয়তো আপনি জানেন, জানেন এদের মধ্যবর্তী দূরত্বও, কিন্তু মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মানটা না জানলে মহাকর্ষ বলের মানই বা জানবেন কী করে? নিউটন মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মান বিশুদ্ধ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারেননি। তাই মহাকর্ষ সূত্রের জন্মদাতা হয়েও সংখ্যায় প্রকাশ করে যেতে পারেননি মহাবিশ্বের দুটি বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষ বলের মান। তার মানে, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যে কত আকর্ষণ বল কাজ করে, সেটা বের করা সম্ভব হয়নি নিউটনের পক্ষে। তাঁর মৃত্যুর পর জন্ম হয় আরেক ব্রিটিশ পদার্থবিদ হেনরি ক্যাভেন্ডিশের। তিনিই মহাকর্ষ ধ্রুবক G-এর মান বের করেন ৬.৬৭৪×১০-১১ নিউটন/কেজি-মিটার

শুধু G নয়, বিশ্বজনীন ধ্রুবক অনেকগুলো রয়েছে। এগুলোর মান একটু এদিক-সেদিক হলেই পাল্টে যেত মহাবিশ্বের ইতিহাস, বদলে যেত মহাবিশ্বের চেহারা। তখন আজকের এই পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো হয়তো খাটত না মহাবিশ্বের জন্য। হয়তো মানব বসতির জন্য এই পৃথিবীও গড়ে উঠত না। আসলে শেষমেশ পদার্থবিদ্যার ধ্রুবকগুলোই হয়ে উঠেছে মহাবিশ্বের নিয়ন্তা।

নিউটনের প্রায় দুই শ বছর পর পদার্থবিজ্ঞানে আরেকটা বিপ্লব ঘটালেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্ল্যার্ক ম্যাক্সওয়েল। তিনি কিছু যুক্তিতর্ক দেখিয়ে বললেন, আলোর বেগ আসলে ধ্রুবক। কিন্তু তখন তাঁর কথা মেনে নেওয়ার লোক তেমন ছিল না। কয়েক বছর পর আলবার্ট মাইকেলসন আর এডওয়ার্ড মর্লি মিলে প্রমাণ করে দিলেন ইথার বলে কিছু নেই। আগে ইথারকেই আলোক তরঙ্গের বাহক মনে করা হতো। সেটার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। ইথার অস্তিত্বহীন হওয়া মানেই আলোর বেগ ধ্রুবক, সেই ধারণাটা আরও শক্তপোক্ত হওয়া।

ইথার তত্ত্বের ভেঙে পড়াটা পদার্থবিদ্যার জগতে প্রভাব ফেলে ষাট বছর পরে। বড় কম প্রভাব নয়। সুইজারল্যান্ডের বার্নের পেটেন্ট অফিসের এক কেরানি গুঁড়িয়ে দিলেন মহাবিশ্বের গণিত। বললেন, আমরা যেসব বস্তু দেখি, সময়ের যে পরিমাপ করি কিংবা কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য মাপি, সেটা একেকজনের মাপনের ফল একেক রকম হতে পারে। আসলে কী ফল পাব, সেটা নির্ভর করবে পর্যবেক্ষক স্থির না গতিশীল অবস্থান থেকে মাপছেন, তার ওপর। গতিশীল হলে সেটার গতি কত, সেটা ধর্তব্যের মধ্যে আনতে হবে।

আইনস্টাইন নিউটনীয় বলবিদ্যার গণিত থেকে মুক্ত করলেন গোটা মহাবিশ্বকে। তৈরি করলেন আপেক্ষিকতার কাঠামো। মহাবিশ্বের ‘হস্তী’ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল পৃথিবীর ‘অন্ধ’ বিজ্ঞানীদের কাছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করল একটা সংখ্য-৩,০০,০০০। সংখ্যাটা নিছক কয়েকটি অঙ্কের সমাবেশ নয়। এটা আলোর বেগ। মহা ধ্রুবক। আলো ছোটে সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার গতিতে। এটাকে প্রকাশ করা হয় ইংরেজি প দিয়ে।

গতিবিদ্যার জন্য নিউটনের ভাষা পাল্টে নতুন গাণিতিক ভাষা তৈরি করলেন আইনস্টাইন। কিন্তু মহাবৈশ্বিক ভাষাটা গলার কাঁটা হয়ে পড়ে রইল নিউটনীয় রীতিতেই। বছর দশেক পর ফের আঘাত হানলেন আইনস্টাইন। আবারও চূর্ণ হলো নিউটনীয় গণিত, মহাবিশ্বের ভাষা। খোলনলচে বদলে গেল মহাবিশ্বের ইতিহাস। সত্যি সত্যিই এবার জন্ম হলো কসমোলজির। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার গাণিতিক ভাষাটা ছিল অত্যন্ত জটিল। একটা নির্দিষ্ট সমাধান সেটার কোনোকালেই ছিল না। একালেও নেই। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত অজস্র সমাধান বেরিয়ে এসেছে সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণের। প্রতিটি সমীকরণ জন্ম দিয়েছে একেকটা মহাবৈশ্বিক সিস্টেমের ভবিষ্যদ্বাণীর। স্রেফ গণিতের সাহায্যে করা সেই সব ভবিষ্যদ্বাণী পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

আইনস্টাইনের গণিত বলেছিল, মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু আইনস্টাইন নিজে সেটা মানেননি। আইনস্টাইন তখন চাইলেন গণিত দিয়ে গণিতকে রুখতে। মহাবিশ্বের প্রসারণ রুখতে জন্ম দিলেন আরেকটি ধ্রুবকের। মহাবৈশ্বিক ধ্রুবক। কিন্তু সেই ধ্রুবকও পারল না মহাবিশ্বের প্রসারণ থামাতে। এডউইন হাবল, আলেক্সান্ডার ফ্রিডম্যানরা বললেন, আইনস্টাইনের গণিতই ঠিক, আইনস্টাইন নন। তখন আইনস্টাইন নিজেই ধ্রুবকটার বিলোপ ঘটালেন।

কিন্তু আইনস্টাইন বলে কথা! প্রকৃতির ভাষা থেকে ঢুঁড়ে-ফুঁড়ে আনা একটা ধ্রুবকের এমনভাবে মৃত্যু ঘটবে! ষাট দশক পর বিজ্ঞানীরা আবার বাঁচিয়ে তুললেন সেই ধ্রুবককে বেহুলার লখিন্দরের মতো করে। তবে এবার আর মহাবিশ্বের প্রসারণ রোধ করল না সেটা। বদলে বিজ্ঞানীরা এমনভাবে সেটাকে ব্যবহার করলেন, যেন মহাবিশ্বের প্রসারণ স্পষ্ট বোঝাতে যেটা অস্পষ্টতা ছিল সেটা দূর করে।

আইনস্টাইনের গাণিতিক সমীকরণগুলোর একটা সমাধান বের হয় ১৯১৬ সালে। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল সোয়ার্জশিল্ড করেন সেটা। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে কৃষ্ণগহ্বরের ভবিষ্যদ্বাণী। এর পেছনেও গণিতের খেলা। আইনস্টাইন অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন, মহাকর্ষ আসলে স্থানকালের বক্রতার ফল। সোয়ার্জশিল্ড অঙ্ক কষে দেখালেন, মহাবিশ্বের কোনো বস্তুকে যদি চুপসে একটা নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে আনা যায়, সেটা থেকে আর আলোও বের হতে পারবে না। তখন সেই বস্তুটাই আর দেখা যাবে না।

নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর বিষয়টাও বেরিয়ে এল আইনস্টাইনের কষা অঙ্ক থেকে। সেখানে বড় ভূমিকা পালন করে নিউক্লিয়ার ফিউশন। নিউক্লিয়ার ফিউশন আবার আসে আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সমীকরণ থেকে। এই সমীকরণ থেকেই নিউক্লিয়ার বোমা বানানো হয়। আবার নিউক্লিয়ার এনার্জিও আসে এই সমীকরণ থেকে। এই সমীকরণ বলে, ভরকে শক্তিতে এবং শক্তিকে ভরে পরিণত করা সম্ভব। খুব সামান্য ভর থেকে তৈরি হতে পারে বিপুল পরিমাণ শক্তি। সেই শক্তি কতটা ভয়ানক হতে পারে, তা দেখিয়েছিল হিরোশিমা-নাগাসাকি ট্র্যাজেডি। আবার ভর থেকে তৈরি হওয়া শক্তি থেকেও আজকাল বিদ্যুত্ উত্পাদন করে মানবকল্যাণে লাগানো হচ্ছে। আবার পৃথিবীর মোট শক্তির বেশির ভাগই আসছে সূর্য থেকে। সেই সূর্যের ভেতর অনবরত ঘটছে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। তার পুরোটাই আসে ওই একটা সমীকরণ থেকে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, গণিতের ফলাফল একই সঙ্গে মরণডঙ্কা বাজাতে পারে, আবার শোনাতে পারে জীবনের জয়গান।

যাহোক, ভারতীয় তরুণ সুব্রহ্মাণন চন্দ্রশেখর বিলেতে যাওয়ার পথে একটা অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন, নক্ষত্রের মৃত্যু সব সময় এক রকম হয় না। সে একটা সংখ্যা মেনে চলে। সংখ্যাটা ১.৪। চন্দ্রশেখর বলেন, কোনো নক্ষত্রের জীবনপ্রদীপ শেষ হওয়ার পথে, শেষ বিস্ফোরণের পরে, একটা তারার ভর সূর্যের চেয়ে যদি ১.৪ গুণ বেশি হয়, সেই নক্ষত্র আর শ্বেত বামন অবস্থায় স্থিতি লাভ করবে না। তখন মনে করা হতো, সব নক্ষত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে গিয়ে ছোট্ট একটা সাদা গোলকে পরিণত হবে। তারপর ধীরে ধীরে সেটা আলো আর তাপ বিকিরণ করে পুরোপুরি নেই হয়ে যাবে। কিন্তু চন্দ্রশেখরের ১.৪ গুণ সীমা বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারটা মানতে পারেননি এডিংটনের মতো বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা। তাই এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেতে চন্দ্রশেখরকে ৫৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

চন্দ্রশেখর তো একটা গাণিতিক সীমা বেঁধে দিয়েই খালাস। ওই সীমার চেয়ে বেশি ভর যেসব মৃতপ্রায় নক্ষত্রের অবশিষ্ট থাকবে, তাদের কী হবে? রবার্ট ওপেনহাইমার, জর্জ ভলকফ আর হার্টল্যান্ড স্নাইডাররা অঙ্ক কষে দিলেন নিউট্রন নক্ষত্রের খোঁজ। বললেন, সূর্যের ভরের ৮ থেকে ২০ গুণ প্রথমিক ভর যেসব নক্ষত্রের, সেগুলো জীবনের শেষ পর্যায়ে গিয়ে সুপারনোভা বিস্ফোরণ করে ভর ঝরিয়ে ফেলবে। পড়ে থাকবে সূর্য থেকে মাত্র ১.৪-৩ গুণ ভর। তখন সেই নক্ষত্র পরিণত হবে নিউট্রনে ভরা একটা অতি ঘনত্বের নক্ষত্রে। সেই নক্ষত্রের এক টেবিল চামচ বস্তুর ওজন এক কোটি টন! এখানেই থামলেন না তাঁরা। নিজেদের সীমা নিজেরাই লঙ্ঘন করে দেখালেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরও যেসব নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের তিন গুণের বেশি অক্ষত থাকে, সেগুলো পরিণত হবে কৃষ্ণগহ্বরে। সেই কৃষ্ণগহ্বর, যার কথা বলেছিলেন সোয়ার্জশিল্ড। এর আগে সোয়ার্জশিল্ডের কৃষ্ণগহ্বর তত্ত্বকে কেউ আমলে নেয়নি। পরে জন হুইলার, রয় কার, ওয়ার্নার ইজরায়েল, ব্রেন্ডন কার্টার, ইয়াকভ জেলদোভিচ, রজার পেনরোজ আর স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিজ্ঞানীদের খাতা-কলমের হিসাব থেকে বেরিয়ে এসে আজ বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে কৃষ্ণগহ্বর।

কৃষ্ণগহ্বর এমন একটা বস্তু, যেখানে ভেঙে পড়ে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র। গণিতের কোনো হিসাবের বাহাদুরিও সেখানে চলে না। তার ভেতরে ঢুকলে বের হতে পারে না আলো পর্যন্ত। সময় সেখানে অসীম হয়ে যায়। সূর্যের ভরের হাজার গুণ ভরও একত্রিত হয়ে একটা বিন্দুতে আটকে পড়ে, মানুষের কল্পনারও শক্তি নেই সেখানকার ছবি দেখার।

মহাবিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম হয়েছিল গণিতের, জন্ম হয়েছিল পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোর। সেগুলোই আবার ভেঙে পড়ে ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটিতে। তার মানে, আমাদের পদার্থবিদ্যার দৌড় আমাদের গণিতের হিসাব-নিকাশ, সব আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরেই সীমাবদ্ধ?

আসলে আমরা স্থূল বুদ্ধি দিয়ে ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করেছি অন্ধের মতো। তখন আমাদের পদার্থবিদ্যার মতো শক্তিশালী হাত ছিল না, গণিতের মতো ভাষা ছিল না। পরে আমরা ভাষা আর অনুভূতি হিসেবে গণিত পেয়েছি। আরও পরে পেয়েছি পদার্থবিদ্যার হাত। সেই হাতে নতুন যন্ত্রপাতি এসেছে। সেগুলোর সাহায্যে কালে কালে হস্তী দর্শনের মতো মহাবিশ্বকে বুঝতে চেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। একেকজন দেখেছেন একেকভাবে। সেগুলো ব্যাখ্যা করেছেন দশভিত্তিক গণিতের ভাষায়। গণিতও সবার কাজকে একত্রিত করছে সংখ্যা আর সমীকরণের সাহায্যে। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো মহাবিশ্বের জন্মের সময়ও যেমন ছিল, এখনো তেমন আছে। আমাদের সেগুলো আবিষ্কার করতেই অনেক দেরি হয়েছে, এই যা। কিন্তু হস্তীর পূর্ণাঙ্গ দর্শন পেতে শুধু হাত আর অনুভূতি থাকলেই চলে না, দরকার উদ্ভাসিত আলোয় ঝলসে যাওয়া এক জোড়া চোখ। সেই চোখের দেখা এখনো পায়নি পদার্থবিজ্ঞান, পায়নি ঝলসানো আলোর দেখাও। বলাই বাহুল্য, সেই চোখ আর আলোর ভূমিকাও পালন করবে আরও উচ্চতর গণিত। যেদিন সেই গণিতের দেখা পাব, পদার্থবিদ্যার সবগুলো সূত্র একটা সমীকরণে আবদ্ধ করা সম্ভব হবে, সেদিনই মহাবিশ্ব পুরোপুরি মূর্ত হবে আমাদের সামনে।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

*লেখাটি ২০১৮ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত