অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়

জেনোর সবচেয়ে চমকপ্রদ প্যারাডক্স হলো অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়ছবি: মিডিয়াম

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন আপনার প্রিয় বন্ধু ৫০ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি দৌড়ে তার কাছে যেতে চাইলেন। কিন্তু শর্ত হলো, প্রথমে আপনাকে অর্ধেক রাস্তা, মানে ২৫ হাত যেতে হবে। এরপর বাকি রাস্তার অর্ধেক, মানে সাড়ে ১২ হাত যেতে হবে। এরপর বাকিটুকুর অর্ধেক...এভাবে চলতেই থাকবে। একটু ভেবে দেখুন তো, আপনি যদি সব সময় বাকি রাস্তার ঠিক অর্ধেক পরিমাণ এগোতে থাকেন, তাহলে তো আপনার এবং আপনার বন্ধুর মাঝে সব সময়ই সামান্য একটু হলেও দূরত্ব রয়ে যাবে! তার মানে, আপনি কখনোই আপনার বন্ধুর কাছে পৌঁছাতে পারবেন না!

মাথাটা কি একটু ঘুরে গেল? সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান তো বলে, আপনি কয়েক সেকেন্ডেই বন্ধুর কাছে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এক গ্রিক দার্শনিক ঠিক এমন অদ্ভুত এক দাবি করে বসেছিলেন! তিনি বলেছিলেন, ‘গতি বলতে পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই, আমরা যে চলাফেরা করি, তার পুরোটাই একটা বিভ্রম!’

ভাবছেন, লোকটা পাগল ছিল নাকি? একদমই না! বুদ্ধি, যুক্তি ও গভীর চিন্তায় প্রাচীন গ্রিকদের টেক্কা দেওয়া আসলেই কঠিন। আইনস্টাইনের পাশাপাশি সক্রেটিস, প্লেটো বা অ্যারিস্টটলের মতো মানুষেরা এখনো আমাদের কাছে চূড়ান্ত মেধার প্রতীক হয়ে আছেন।

আরও পড়ুন
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এক গ্রিক দার্শনিক অদ্ভুত এক দাবি করে বসেছিলেন! তিনি বলেছিলেন, ‘গতি বলতে পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই, আমরা যে চলাফেরা করি, তার পুরোটাই একটা বিভ্রম!’

যাঁর কথা বলছিলাম, তাঁর নাম জেনো। তাঁর জন্ম দক্ষিণ ইতালির প্রাচীন গ্রিক শহর এলিয়াতে। তিনি ছিলেন আরেক বিখ্যাত দার্শনিক পারমেনাইডিসের ছাত্র। তাঁরা মিলে এলিয়াটিক আন্দোলন নামে একটা মতবাদ চালু করেছিলেন। তাঁদের সোজা কথা ছিল, চোখ বা কানকে বিশ্বাস কোরো না, বরং বিশ্বাস করো তোমার যুক্তিকে।

খুব একটা খারাপ কথা নয়, কিন্তু এই যুক্তির ওপর অতিরিক্ত ভক্তিই জেনোকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, জেনোর নিজের তেমন কোনো নতুন তত্ত্ব ছিল না। তাঁর কাজই ছিল অন্যের যুক্তি খণ্ডন করা! অ্যারিস্টটল তাঁকে যুক্তিতর্কের জনক বলেছিলেন। জেনো মানুষটা ছিলেন সাংঘাতিক জেদি। শেষ বয়সে এক শাসকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপরাধে তাঁকে বন্দী করে ভয়ংকর নির্যাতন করা হয়। কিন্তু সঙ্গীদের নাম বলে দেওয়ার বদলে তিনি নিজের জিভ কামড়ে ছিঁড়ে জল্লাদের মুখের ওপর থুতু হিসেবে ছুড়ে মেরেছিলেন!

এই জেনো প্রায় ৪০টির মতো প্যারাডক্স তৈরি করেছিলেন, যার মধ্যে মাত্র কয়েকটি এখন টিকে আছে। সবচেয়ে বিখ্যাত চারটি হলো অ্যাকিলিস, ডিকোটমি, স্টেডিয়াম এবং অ্যারো। এগুলোর মূল কথাই হলো গতি বা সময়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, সবটাই আমাদের মনের ভুল! তবে বিজ্ঞান এখন জেনোর সময়ের তুলনায় অনেক উন্নত। তাই বর্তমানের বিজ্ঞান দিয়ে আমরা খুব সহজেই জেনোর এই ধাঁধাগুলোকে তুলোধুনো করতে পারি। চলুন, তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত প্যারাডক্স ‘অ্যাকিলিস অ্যান্ড টরটয়েস’ দিয়েই শুরু করা যাক।

আরও পড়ুন
মজার ব্যাপার হলো, জেনোর নিজের তেমন কোনো নতুন তত্ত্ব ছিল না। তাঁর কাজই ছিল অন্যের যুক্তি খণ্ডন করা! অ্যারিস্টটল তাঁকে যুক্তিতর্কের জনক বলেছিলেন। জেনো মানুষটা ছিলেন সাংঘাতিক জেদি।

অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়

এটি জেনোর সবচেয়ে চমকপ্রদ প্যারাডক্স। কারণ প্রথম দেখায় একে একদম নিখুঁত যুক্তি বলে মনে হলেও, একটু পরেই দেখবেন এটি কীভাবে আপনার মগজের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করছে!

অ্যাকিলিস গ্রিক পুরাণের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের এই নায়কের বাবা ছিলেন রাজা পেলিউস, মা ছিলেন সমুদ্রদেবী থেটিস। অ্যাকিলিস এতই শক্তিশালী ও দ্রুতগতির ছিলেন যে, তিনি নাকি দৌড়ে হরিণ ধরতে পারতেন। আবার তিনিই নাকি খালি হাতে মারতে পারতেন সিংহ! জেনো ইচ্ছা করেই এই সুপারহিরোকে বেছে নিয়েছিলেন একটা ধীর গতির কচ্ছপের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামানোর জন্য।

গল্পটা কিছুটা সেই খরগোশ আর কচ্ছপের বিখ্যাত রূপকথার মতোই, যা জেনোর জন্মের প্রায় ১০০ বছর আগে ঈশপ লিখেছিলেন। তবে জেনোর গল্পে অ্যাকিলিস কোনো অহংকার করে মাঝপথে ঘুমাতে যান না। তিনি কচ্ছপকে কিছুটা সামনে থেকে দৌড় শুরুর সুযোগ দেন। আর এটাই নাকি তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়!

জেনোর যুক্তিটা হলো: ধরুন, কচ্ছপটি ‘ক’ বিন্দু থেকে দৌড় শুরু করল। অ্যাকিলিস যেহেতু কচ্ছপের চেয়ে অনেক গুণ জোরে দৌড়ান, তাই তিনি খুব দ্রুত ‘ক’ বিন্দুতে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু ততক্ষণে কচ্ছপটি তো আর বসে নেই! সে গুটি গুটি পায়ে আরও কিছুটা সামনে, ধরুন ‘খ’ বিন্দুতে চলে যাবে।

আরও পড়ুন
জেনোর গল্পে অ্যাকিলিস কোনো অহংকার করে মাঝপথে ঘুমাতে যান না। তিনি কচ্ছপকে কিছুটা সামনে থেকে দৌড় শুরুর সুযোগ দেন। আর এটাই নাকি তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়!

এবার অ্যাকিলিস যখন ‘খ’ বিন্দুতে পৌঁছাবেন, কচ্ছপটি ততক্ষণে ‘গ’ বিন্দুতে চলে যাবে। অ্যাকিলিস যখন ‘গ’ বিন্দুতে, কচ্ছপ তখন যাবে ‘ঘ’ বিন্দুতে। এভাবে অ্যাকিলিস কচ্ছপের যত কাছেই যাক না কেন, কচ্ছপটি সব সময়ই অ্যাকিলিসের চেয়ে সামান্য একটু এগিয়ে থাকবে। জেনোর মতে, অ্যাকিলিস জীবনেও কচ্ছপকে ধরতে পারবে না!

বাস্তবে কি এমনটা হয়? মোটেও না! তাহলে জেনোর হিসাবে ভুলটা কোথায় ছিল?

সমস্যা হলো, প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদদের অসীম ধারা সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ধারণাই ছিল না। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক গতি সূত্রের (গতি = দূরত্ব ÷ সময়) ব্যাপারেও তাঁরা জানতেন না। জেনো ভেবেছিলেন, যেহেতু ঘটনাগুলো অসীম সংখ্যক ধাপে ঘটছে—‘ক’ থেকে ‘খ’, ‘খ’ থেকে ‘গ’...—তাই এই ধাপগুলো পার হতে নিশ্চয়ই অসীম পরিমাণ সময় লাগবে!

কিন্তু এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়েছিল। প্যারাডক্সটার মূল চমকই হলো, সাধারণ মানুষ ভাবে অসীম সংখ্যক সংখ্যা যোগ করলে যোগফলও বুঝি অসীম হবে। কিন্তু শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি, অসীম সংখ্যক ধাপ একটি নির্দিষ্ট (সসীম) সময়ের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব! গণিতের ভাষায় একে বলে গুণোত্তর ধারা।

আরও পড়ুন
সমস্যা হলো, প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদদের অসীম ধারা সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ধারণাই ছিল না। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক গতি সূত্রের ব্যাপারেও তাঁরা জানতেন না।

একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি ১-এর সঙ্গে এর অর্ধেক (১/২) যোগ করলেন। তারপর তার অর্ধেক (১/৪), তারপর তার অর্ধেক (১/৮)...এভাবে অনন্তকাল ধরে যোগ করতে থাকলেন। আপনার মনে হতে পারে যোগফল বুঝি বাড়তেই থাকবে। কিন্তু না! এই ভগ্নাংশগুলো এতই ছোট হতে থাকবে যে, আপনি অসীম পর্যন্ত যোগ করলেও এর যোগফল কখনোই ২-এর বেশি হবে না! এটি ২-এর খুব কাছাকাছি গিয়ে থেমে যাবে।

নিচের ছবিটা দেখুন। একটা রেখাকে প্রথমে অর্ধেক করা হলো, এরপর বাকি অর্ধেককে আবার অর্ধেক, এভাবে চলতে থাকলে সব ছোট ছোট অংশ যোগ করলে ওই একটা নির্দিষ্ট রেখাই পাওয়া যাবে।

এখন অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের কথায় ফিরে আসি। ধাপগুলোর কথা চিন্তা না করে বরং অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের মধ্যকার দূরত্বের কথা ভাবুন। যেহেতু অ্যাকিলিস ও কচ্ছপ একটি নির্দিষ্ট বেগে ছুটছে, তাই তাদের মধ্যকার দূরত্বও একটি নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকবে।

আরও পড়ুন
আপনার মনে হতে পারে যোগফল বুঝি বাড়তেই থাকবে। কিন্তু না! এই ভগ্নাংশগুলো এতই ছোট হতে থাকবে যে, আপনি অসীম পর্যন্ত যোগ করলেও এর যোগফল কখনোই ২-এর বেশি হবে না!

ধরুন, অ্যাকিলিস কচ্ছপকে ১০০ মিটার সামনে থেকে দৌড়ানোর সুযোগ দিল। অ্যাকিলিস দৌড়াচ্ছে সেকেন্ডে ১০ মিটার বেগে। তাহলে জেনোর হিসাব অনুযায়ী কী হবে? প্রথম ৫ সেকেন্ড পর অ্যাকিলিসের সঙ্গে কচ্ছপের দূরত্ব অর্ধেক হয়ে যাবে। এরপরের ২.৫ সেকেন্ডে বাকি দূরত্বের অর্ধেক কমবে। এরপর ১.২৫ সেকেন্ডে, তারপর ০.৬২৫ সেকেন্ডে... এভাবে সময় ও দূরত্ব দুটোই কমতে থাকবে।

কিন্তু আমরা যদি এই ছোট ছোট সময়গুলোকে, মানে ৫ + ২.৫ + ১.২৫ + ০.৬২৫...যোগ করি, তবে দেখব এই অসীম ধারাটির যোগফল ঠিক ১০ সেকেন্ডে গিয়ে ঠেকেছে! অর্থাৎ, ঠিক ১০ সেকেন্ডের মাথায় ওই ১০০ মিটারের দূরত্ব শূন্য হয়ে যাবে এবং অ্যাকিলিস কচ্ছপটিকে অনায়াসে টপকে বাতাসের বেগে সামনে এগিয়ে যাবে। অবশ্য অ্যাকিলিস যদি মাঝপথে থেমে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত খাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়, তবেই এটা সম্ভব!

আরও পড়ুন