এসব পড়ে-টড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এমন কিছু করতে হবে যেন মৃত্যুর পর মানুষ তাঁকে মৃত্যুদূত হিসাবে নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে। এরপর তিনি নিজের উইলে লিখে যান, তাঁর মৃত্যুর পর চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্ব, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হবে। সেজন্য গড়ে তুলতে হবে ‘নোবেল ফাউন্ডেশন’।

১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির সান রেমোতে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান আলফ্রেড নোবেল। মৃত্যুর পর তাঁর উইলে দেখা যায়, সম্পদের প্রায় চুরানব্বই শতাংশ দিয়ে গেছেন নোবেল ফাউন্ডেশন গড়ার জন্য। যার আর্থিক মূল্য সে সময় ছিল ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৫ মিলিয়ন ডলারে।

কিন্তু গণিতে কেন নয়? এ নিয়ে অনেক মিথ বা কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। তবে আমরা সেদিকে যাব না। বাস্তবতাটুকু বোঝার চেষ্টা করব।

নোবেল নিজে সারা জীবন কাজ করেছেন রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। এ ব্যাপারেই তাঁর আগ্রহ বেশি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্ব এবং শান্তিতেই কেন? শান্তিতে নোবেল দেওয়ার একটি বড় কারণ, ১৮৮৯ সালে বার্থা ভন শাটনার একটি যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস লেখেন—লে ডাউন ইওর আর্মস। আলফ্রেড নোবেল বইটি পড়েন। উপন্যাসটি তাঁকে প্রভাবিত করে। গণিতবিদ লার্স গোর্ডিং এবং লার্স হোরমান্ডারের ধারণা, এই ঘটনার কারণে তিনি শান্তিতে নোবেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি নিজে বেশ সচেতন ছিলেন স্বাস্থ্য নিয়ে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বও জায়গা পায় তাঁর উইলে। কিন্তু জায়গা পায়নি গণিত।

অনেকের ধারণা, এর কারণ হলো, নোবেল নিজে তাঁর গবেষণায় গণিত তেমন ব্যবহার করেননি। তাছাড়া গণিত সরাসরি কোনো আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করতে পারে না বলেই সম্ভবত ভেবেছিলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের অনেক তত্ত্ব প্রমাণ করতে ব্যবহার করা হয় গণিত। বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সব প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন কাজেও প্রয়োজন পড়ে গণিতের। কিন্তু খালি চোখে গণিতের এসব ব্যবহার বোঝা কঠিন। সম্ভবত সেজন্যই নোবেল ভেবেছিলেন, ব্যবহারিক কাজে গণিতের ব্যবহার কম।

স্পষ্ট করে বলে রাখা প্রয়োজন, এসবই নিছক ধারণা। যৌক্তিক ধারণা, তবে শেষ পর্যন্ত ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। নোবেল নিজে কোথাও বলে যাননি, গণিতে কেন নোবেল পুরস্কার দিতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। হতে পারে, গণিতের কথা তাঁর মাথায়-ই আসেনি, কে জানে! কিংবা হয়তো বিজ্ঞানের ভাষা গণিতকে তিনি ভেবেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অংশ। এ ধরনের নানারকম ধারণা করা যায়, তবে তাঁর মাথার ভেতরে আসলে কী চলছিল, আজ আর তা জানার উপায় নেই। আমরা কেবল ধারণা করতে পারি।

এখানে একটা মজার জিনিস জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। অর্থনীতিতেও কিন্তু নোবেল কোনো পুরস্কারের কথা লিখে যাননি। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোয়েরিয়ে রিকসব্যাংক (Sveriges Riksbank) তাদের ৩০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলফ্রেড নোবেলের সম্মানে এ পুরস্কারের প্রচলন করে। এর আনুষ্ঠানিক নাম, দ্য সোয়েরিয়ে রিকসব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনোমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল। তবে বর্তমানে এ পুরস্কারের বিজয়ী নির্বাচন থেকে সব দায়িত্ব পালন করে নোবেল ফাউন্ডেশন-ই। এটি তাই অর্থনীতির নোবেল হিসেবে খ্যাত।

নোবেল দেওয়া না হলেও ফিল্ডস মেডেল বা অ্যাবেলের মতো সম্মানজনক পুরস্কার দেওয়া হয় গণিতে। তাছাড়া অনেক গণিতবিদ আছেন, যাঁরা গণিতে নোবেল না পেলেও পদার্থবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সাহিত্যে বাগিয়ে নিয়েছেন নোবেল পুরস্কার। বার্টান্ড রাসেল গণিতবিদ হয়েও ১৯৫০ সালে সাহিত্যে পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। এছাড়া ম্যাক্স বর্ন ও ওয়াল্টার বোথ ১৯৫৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন কোয়ান্টাম মেকানিকসে পরিসংখ্যানমূলক কাজের জন্য। ১৯৯৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া জন ন্যাশও ছিলেন গণিতবিদ। গেম থিওরির জন্য তিনি এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: ইউওয়াটারলু ডট সিএ