চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভব

চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভব?পদার্থবিজ্ঞানীদের ধারণা, সম্ভবত গিট দেওয়া সম্ভব নাছবি: আন্দ্রি ওনুফ্রিয়েনকো / গেটি ইমেজ

সবাই  নিশ্চয়ই জুতার ফিতা বা দড়িতে শক্ত করে গিট দিতে পারেন। কিন্তু যদি বলি, বিজ্ঞানের এমন একটা জগৎ আছে যেখানে দড়িতে গিট দিলে সেটা জাদুর মতো নিজে থেকেই খুলে যায়? শুনতে যতই অদ্ভুত মনে হোক, ঘটনা কিন্তু সত্যি। তবে সেটা আমাদের পরিচিত জগতে নয়, বরং চার মাত্রার জগতে। চলুন সেই মজার গল্পটাই বলি!

গল্পটা ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি বিষয় আগে ধাপে ধাপে বুঝে নিতে হবে। যেমন, মাত্রা বা ডাইমেনশন কী, চতুর্থ মাত্রা কেমন ইত্যাদি। প্রথমে বলি মাত্রা জিনিসটা কী? একটা সরু সুতা বা সরলরেখার কথা ভাবুন। এর শুধু দৈর্ঘ্য আছে, মানে সুতাটি শুধু সামনে বা পেছনে যেতে পারবে। এটি হলো একমাত্রিক বা ১ মাত্রা।

একটি দড়ি ধরে কেবল সামনে বা পেছনে এগোতে পারবেন, কিন্তু ডানে বা বাঁয়ে পারবেন না
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই

এবার একটা কাগজের পৃষ্ঠার কথা ভাবুন। এর দৈর্ঘ্যও আছে, আবার প্রস্থও আছে। মানে আপনি সামনে-পেছনে যাওয়ার পাশাপাশি ডানে-বাঁয়েও যেতে পারবেন। এটি হলো দ্বিমাত্রিক বা ২ মাত্রা। আর ত্রিমাত্রিক বিষয়টা বুঝতে হলে একটা ক্লাসরুমের কথা ভাবতে পারেন। ক্লাসরুমের সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আপনি চাইলে লাফ দিয়ে ওপরেও উঠতে পারবেন! এই যে ওপরে বা নিচে যাওয়ার আরেকটা নতুন রাস্তা, এ জন্যই আমাদের এই জগৎটা হলো ত্রিমাত্রিক বা ৩ মাত্রা।

একটি দ্বিমাত্রিক, একটি ত্রিমাত্রিক এবং একটি চার মাত্রিক ঘনক
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই

তাহলে চতুর্থ মাত্রাটা আবার কেমন? চার মাত্রার জগতে ওই তিনটি রাস্তার সঙ্গে আরও একটি সম্পূর্ণ নতুন স্বাধীন রাস্তা বা দিক যোগ হয়! আমাদের সাধারণ চোখে এটি দেখা অসম্ভব। তবে আইনস্টাইনের সূত্র অনুযায়ী, এই চতুর্থ মাত্রাটি হলো সময়। পুরো ব্যাপারটাকে একটা থ্রিডি মুভির মতো ভাবা যায়। মুভির প্রতিটি দৃশ্য বা ফ্রেম ৩ মাত্রার, কিন্তু আপনি যখন রিমোট দিয়ে মুভিটা সামনে বা পেছনে টানেন, তখন আপনি আসলে চতুর্থ মাত্রা বা সময়ের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করেন!

আরও পড়ুন
এবার একটা কাগজের পৃষ্ঠার কথা ভাবুন। এর দৈর্ঘ্যও আছে, আবার প্রস্থও আছে। মানে আপনি সামনে-পেছনে যাওয়ার পাশাপাশি ডানে-বাঁয়েও যেতে পারবেন। এটি হলো দ্বিমাত্রিক বা ২ মাত্রা।

আমাদের এই তিন মাত্রার জগতে দড়িতে গিট দিলে সেটা খোলে না, কারণ দড়ির এক অংশ আরেক অংশকে আটকে রাখে। কিন্তু ৪ মাত্রায় এই গিট মুহূর্তের মধ্যে খুলে যাবে! কেন? চলুন একটা মজার উদাহরণ দিই।

দুটি দড়ি বিপরীত দিকে টানলে তারা একে অপরের গায়ে আটকে যায়। আর ঠিক এ কারণেই দড়িতে গিট দেওয়া সম্ভব হয়
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই

ধরুন, একটা সমতল কাগজের (২ মাত্রা) ওপর দিয়ে কিছু পিঁপড়া হেঁটে যাচ্ছে। আপনি তাদের সামনে কলম দিয়ে একটা লম্বা দাগ টেনে দিলেন।

দ্বিমাত্রিক জগতের সমতল পিঁপড়াদের দল টেরই পায় না যে, তাদের সামনের ওই রেখাটির ওপারেও আস্ত একটি জগৎ থাকতে পারে
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই

পিঁপড়াগুলো আর সেই দাগ পেরোতে পারবে না, কারণ তাদের জগতে শুধু ডানে-বাঁয়ে বা সামনে-পেছনে যাওয়ার রাস্তা আছে। কিন্তু আপনি তো ৩ মাত্রার মানুষ! আপনি চাইলে ওপর থেকে আঙুল দিয়ে পিঁপড়াটাকে তুলে দাগের ওই পারে বসিয়ে দিতে পারেন।

কোনোভাবে একটি পিঁপড়া যদি ত্রিমাত্রিক হয়ে যায়, তবে সে অনায়াসেই রেখাটির ওপার দেখতে পাবে এবং খুব সহজেই সেটি পার হয়ে যেতে পারবে
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই
আরও পড়ুন
ধরুন, একটা সমতল কাগজের ওপর দিয়ে কিছু পিঁপড়া হেঁটে যাচ্ছে। আপনি তাদের সামনে কলম দিয়ে একটা লম্বা দাগ টেনে দিলেন। পিঁপড়াগুলো আর সেই দাগ পেরোতে পারবে না।

ঠিক এভাবেই, আমাদের ৩ মাত্রার জগতে দুটি দড়ি যখন একে অপরকে আটকে রাখে, তখন ৪ মাত্রার জগতে তারা চাইলেই একটুখানি সেই নতুন চতুর্থ দিকের রাস্তায় পা বাড়িয়ে একে অপরের সঙ্গে কোনো রকম ঘর্ষণ ছাড়াই ভূতের মতো গলে বেরিয়ে যেতে পারবে!

চার মাত্রার জগৎকে আপনি ত্রিমাত্রিক ফ্রেম দিয়ে তৈরি একটি মুভি হিসেবে কল্পনা করতে পারেন। নিচের বাঁ দিকের ঘনকটিতে ‘বর্তমান’ ফ্রেমে একটি খাড়া দড়ির সামনে একটি আনুভূমিক দড়ি দেখা যাচ্ছে। আনুভূমিক দড়িটি চাইলে ‘ভবিষ্যৎ’ ফ্রেমে (দ্বিতীয় কলাম) চলে যেতে পারে। সেখানে সে সহজেই পেছনের দিকে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবে (তৃতীয় কলাম)। এরপর সে আবার ‘বর্তমান’ ফ্রেমে ফিরে আসতে পারে, তবে এবার তার অবস্থান হবে খাড়া দড়িটির ঠিক পেছনে!
ছবি: সুসানা ড্যানসো / সিসি বাই

তাহলে কি চার মাত্রার জগতে কোনো কিছুতেই গিট দেওয়া যায় না? যায়! তবে দড়ি দিয়ে নয়, চাদর বা বেলুন দিয়ে! গণিতবিদেরা এর জন্য দারুণ একটা সূত্র বের করেছেন। সূত্রটি হলো, যেকোনো বস্তুকে গিট দেওয়ার সর্বোচ্চ মাত্রা = (বস্তুটির মাত্রা × ২) + ১

চলুন একটা হিসাব করে দেখি। দড়ি হলো ১ মাত্রার। তাই সূত্র অনুযায়ী (১ × ২) + ১ = ৩। অর্থাৎ, দড়িকে সর্বোচ্চ ৩ মাত্রার জগতেই গিট দেওয়া যাবে। ৪ মাত্রায় গেলেই তা খুলে যাবে। কিন্তু একটা চাদর বা বেলুনের পৃষ্ঠতল হলো ২ মাত্রার। সূত্র অনুযায়ী (২ × ২) + ১ = ৫। অর্থাৎ, আপনি চাইলে একটা চাদরকে অনায়াসে ৪ মাত্রার (এমনকি ৫ মাত্রার) জগতেও শক্ত করে গিট দিতে পারবেন!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন