আপনি এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছেন। শত্রুপক্ষের এক রগচটা তিরন্দাজ আপনার দিকে সোঁ করে একটা ধারালো তীর ছুড়ে মারল! তীরটা শোঁ শোঁ শব্দ করে আপনার বুক বরাবর ধেয়ে আসছে। ভয়ে আপনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ঠিক এমন সময় আপনার পাশে এসে দাঁড়ালেন আমাদের সেই পুরোনো বন্ধু। হ্যাঁ, প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক জেনোর কথাই বলছি। ওনার কাজই সময়-অসময় এখানে সেখানে গিয়ে বাগড়া দেওয়া!
তিনি এসে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে আপনার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না বাছা! ওই তীর তোমার কিছুই করতে পারবে না। কারণ, ওটা আসলে আকাশেই স্থির হয়ে আছে। পৃথিবীতে গতি বা মোশন বলতে তো কিছু নেই!’
আপনি হয়তো ভাবছেন, তীরটা বুকে বিঁধার আগে এই পাগল বুড়োকে ধরে আচ্ছা করে দু-ঘা বসিয়ে দিই! কারণ তীর যে ঠিকই এসে বুকে বিঁধবে, তা তো আর প্রমাণ করার দরকার নেই। কিন্তু দার্শনিক জেনোকে তো আর এত সহজে থামানো যায় না। আগের পর্বে আমরা তাঁর স্টেডিয়াম প্যারাডক্স নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলাম। ডিকোটমি আর স্টেডিয়ামের পর এবার তিনি হাজির হয়েছেন তাঁর গতির বিভ্রম তত্ত্বের আরেক মাথা ঘোরানো ধাঁধা নিয়ে। এর নাম দ্য অ্যারো। আমরা একে বাংলায় বলব তীর প্যারাডক্স।
জেনো আপনার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না বাছা! ওই তীর তোমার কিছুই করতে পারবে না। কারণ, ওটা আসলে আকাশেই স্থির হয়ে আছে। পৃথিবীতে গতি বা মোশন বলতে তো কিছু নেই!’
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের বর্ণনায় জেনোর যুক্তিটা বেশ খটমটে। তিনি বলেছেন, ‘কোনো বস্তু যখন তার নিজের আকারের সমান জায়গা দখল করে থাকে, তখন সেটি স্থির থাকে। গতিশীল যেকোনো বস্তু প্রতি মুহূর্তেই এমন একটি সমান জায়গা দখল করে। সুতরাং, উড়ন্ত তীরটি আসলে গতিহীন।’
মাথার ওপর দিয়ে গেল তো? চলুন জেনোর এই দার্শনিক প্যাঁচটাকে একটু সহজ করে বলি।
কল্পনা করুন, ওই ছুটে আসা তীরটার একটা ছবি তুললেন আপনি। ছবিতে তীরটাকে কেমন দেখাবে? একদম স্থির, তাই তো? জেনো বলছেন, ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তের জন্য তীরটা তো আকাশের একটা নির্দিষ্ট জায়গাতেই আটকে আছে। এখন, সময় তো আসলে এরকম অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্তের যোগফল ছাড়া আর কিছুই নয়। আর প্রতিটি মুহূর্তেই যদি তীরটা স্থির থাকে, তাহলে সেই অসংখ্য স্থির মুহূর্তগুলো পর পর জোড়া লাগালে তো তীরটা সারা জীবনই স্থির থাকার কথা! তাহলে তীরটা সামনের দিকে এগোয় কখন?
পাঠক, জেনোর এই কথা শুনে হাসবেন নাকি কাঁদবেন বুঝতে পারছেন না তো? কারণ আমরা সবাই জানি তীরটা ঠিকই চলছে। তাহলে জেনোর এই নিখুঁত মনে হওয়া যুক্তিতে ঘাপলাটা কোথায়?
সপ্তদশ শতাব্দীতে আইজ্যাক নিউটন এবং অন্যান্য গণিতবিদেরা ক্যালকুলাসের মাধ্যমে দেখান, কীভাবে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণগুলোকে যোগ করে পরিবর্তনের সঠিক হিসাব বের করতে হয়।
একজন পদার্থবিদ হিসেবে জেনোর এই যুক্তির ফাঁকিটা ধরা খুব সহজ। জেনো সময়কে ছোট ছোট মুহূর্তে ভাগ করেছেন, যেগুলোকে আর ভাগ করা যায় না। এখন বিজ্ঞানের চোখে, এই মুহূর্তগুলোর সময়কাল যদি পুরোপুরি শূন্য না হয়, তবে সেই অতি ক্ষুদ্র সময়েও তীরটা তার জায়গা থেকে অন্তত একচুল হলেও নড়বে। সুতরাং, তীর স্থির থাকছে না।
অন্যদিকে, মুহূর্তগুলোর দৈর্ঘ্য যদি আক্ষরিক অর্থেই শূন্য হয়, তবে আপনি এমন কোটি কোটি শূন্য যোগ করলেও তো ফলাফল শূন্যই হবে! আপনি শূন্যের সঙ্গে শূন্য অনন্তকাল ধরে যোগ করলেও কোনো সময়কাল পাবেন না। অর্থাৎ, জেনোর এই অসংখ্য শূন্য মুহূর্ত মিলে একটা সময়কাল তৈরি হওয়ার যুক্তি একেবারেই ভুল।
জেনোর এই গোলকধাঁধা পুরোপুরি ভাঙতে বিজ্ঞানীদের ক্যালকুলাস আবিষ্কার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে আইজ্যাক নিউটন এবং অন্যান্য গণিতবিদেরা ক্যালকুলাসের মাধ্যমে দেখান, কীভাবে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণগুলোকে যোগ করে পরিবর্তনের সঠিক হিসাব বের করতে হয়। এর পরই জেনোর এই ছেলেমানুষি ধারণার কফিনে শেষ পেরেকটা ঠোকা হয়।
আপনি শূন্যের সঙ্গে শূন্য অনন্তকাল ধরে যোগ করলেও কোনো সময়কাল পাবেন না। অর্থাৎ, জেনোর এই অসংখ্য শূন্য মুহূর্ত মিলে একটা সময়কাল তৈরি হওয়ার যুক্তি একেবারেই ভুল।
হয়তো ভাবছেন, জেনোর গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু না। জেনো এত সহজে থামার পাত্র নন।
১৯৭৭ সালের কথা। টেক্সাস ইউনিভার্সিটির দুই পদার্থবিদ বৈদ্যনাথ মিশ্র এবং জর্জ সুদর্শন একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে পুরো বিজ্ঞান দুনিয়ায় বোমা ফাটালেন। তাঁদের পেপারের শিরোনাম ছিল ‘কোয়ান্টাম তত্ত্বে জেনোর প্যারাডক্স’। বিজ্ঞানীরা তো অবাক! কেউ ভাবলেন, এটা নির্ঘাত পাগলামি; আবার কেউ দৌড়ালেন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, জেনোর তীর প্যারাডক্সকে এত সহজে বাতিল করে দেওয়াটা হয়তো একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গিয়েছিল!
ব্যাপারটা কী? সেটা জানতে হলে আমাদের ঢুকতে হবে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সেই অদ্ভুত ও ভুতুড়ে জগতে। তবে সে গল্প আজ নয়। পরের পর্বে আমরা জেনোর প্যারাডক্স ও কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়ে আলোচনা করব।
