মজার গণিত
দেহের ভেতরের দানবীয় সংখ্যা
মাথা খাটাতে কে না পছন্দ করে! আর গল্পোচ্ছলে মজার বুদ্ধির ব্যায়াম হলে তো কথাই নেই। এরকমই একটি বই ‘অঙ্কের খেলা’। এটি রুশ গণিতবিদ ইয়াকভ পেরেলমানের নামকরা বই ‘ফিগারস ফর ফান: স্টোরিজ, পাজলস অ্যান্ড কোনান্ড্রামস’-এর বাংলা অনুবাদ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) প্রগতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বিমলেন্দু সেনগুপ্তের অনুবাদে। সম্পাদক ছিলেন নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা।
অঙ্কের মজার সব হেঁয়ালি, বুদ্ধির খেলাসহ মাথা খাটানোর মতো দারুণ সব ধাঁধা নিয়ে বইটি। মগজে শান দিতে যা অতুলনীয়। এ বই পড়ে দেশের অনেকে এককালে গণিতে আগ্রহী হয়েছে, সমস্যা সমাধান শিখেছে, মুগ্ধ হয়েছে, প্রেমে পড়েছে গণিতের। বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য বইটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
দানবীয় সংখ্যাগুলো বের করতে হলে খুব দূরে যাওয়ার দরকার নেই। সবই রয়েছে আমাদেরই চারপাশে, এমনকি আমাদের দেহের ভেতরেও। কি করে তাদের চিনতে হবে সেইটাই জানা দরকার। মাথার ওপরের আকাশ, পায়ের নীচের বালুরাশি, চারপাশের বাতাস, আমাদের দেহের রক্ত—সবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দৈত্যের মতো সব সংখ্যা।
আকাশের বিরাট সংখ্যাগুলো বেশিরভাগ লোকের কাছেই অজানা নয়। আকাশে তারার সংখ্যাই হোক, তাদের পরস্পরের ভেতরকার বা পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বই হোক বা তাদের আয়তন, ওজন বা বয়স যাই হোক—প্রত্যেক ক্ষেত্রের সংখ্যাগুলোই আমাদের কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়। মানুষ যে ‘জ্যোতিষিক সংখ্যা’ কথাটা বের করেছে তা তো আর শুধু শুধু নয়। কিন্তু কেউ কেউ হয়তো এটা ভাবতেও পারবে না যে, এই আকাশের যেসব জিনিসকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ‘ছোট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, সেগুলোকে যদি মানুষের অভ্যাসের দিক থেকে বিচার করা যায়, তাহলে সত্যি সত্যিই দৈত্যের মত্যে বিরাট হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সৌরজগতে কতকগুলো গ্রহ আছে যাদের ব্যাস মাত্র কয়েক কিলোমিটার। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সবসময় বিরাট বিরাট সংখ্যা নিয়ে কারবার করেন বলে এদের বলেছেন ‘ছোট’। কিন্তু আকাশের বড় বড় জিনিসগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে তবেই তাদের ‘ছোট’ বলে মনে হবে। আমাদের দৃষ্টিতে তারা মোটেই ‘ছোট’ নয়। তিন কিলোমিটার ব্যাসের একটা ‘ছোট’ গ্রহের কথাই ধরা যাক। জ্যামিতির সাহায্যে এটা হিসেব করা মোটেই কঠিন নয় যে এর ওপরিভাগের আয়তন ২৮ বর্গ কিলোমিটার বা ২৮,০০০,০০০ বর্গ মিটারের সমান। এক বর্গ মিটার জায়গায় সাত জন লোক স্বচ্ছন্দে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তাহলেই দেখতে পাচ্ছ, এই ছোট্ট গ্রহের ওপরেই ১৯৬,০০০,০০০ জন লোক দাঁড়িয়ে থাকার মতো যথেষ্ট জায়গা আছে।
যে বালুরাশির ওপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাই তা-ও দানবীয় সংখ্যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘সমুদ্রতীরের বালুরাশির মতোই অসংখ্য’ কথাটি তো আর শুধু শুধু আসেনি! দেখা যাচ্ছে, পুরনো দিনের লোকেরা বালুকণার সংখ্যাকে ছোট করে দেখতেন। তাঁরা ভাবতেন আকাশে যত তারা আছে বালুকণার সংখ্যাও ঠিক তত। প্রাচীনকালে কোন টেলিস্কোপ ছিল। না, তাই এক গোলার্ধে মানুষ খালি চোখে দেখতে পেত প্রায় ৩৫০০ নক্ষত্র। সমুদ্রতীরের বালুরাশি খালি চোখে যত নক্ষত্র দেখা যায়, তার কোটি কোটি গুণ বেশি।
যে বাতাসে আমরা নিঃশ্বাস নিই তার ভেতরও এমনি সংখ্যা লুকিয়ে আছে। এর প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে আছে ২৭,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ‘অণু’।
সংখ্যাটা যে কত বড় তা কল্পনা করাও অসম্ভব। পৃথিবীতে এত মানুষে থাকলে তাদের উপযুক্ত জায়গাই পাওয়া যেত না। সত্যি সত্যিই ভূপৃষ্ঠে সমস্ত মহাদেশ আর সমুদ্র ধরে নিলে আছে ৫০ কোটি বর্গ কিলোমিটার। একে যদি বর্গ মিটারে ভাঙা যায়, তাহলে দাঁড়াবে ৫০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বর্গ মিটার।
এবার ২৭,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০-কে এই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যাক। উত্তর হল ৫৪,০০০। আর এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে প্রত্যেক বর্গ মিটারের ভাগে ৫০,০০০-এরও বেশি লোক পড়ছে!
আমরা বলেছি যে প্রত্যেক মানুষই তার ভেতরে দৈত্যের মতো বিরাট সংখ্যা বহন করে চলেছে। সেটা হল রক্ত। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে এক ফোঁটা রক্ত পরীক্ষা করলে আমরা এক বিরাট সংখ্যার লোহিত কণিকা দেখতে পাব। এরা হলো চাকতির মতো, মাঝখানটা চাপা (১নং ছবি)। তাদের প্রত্যেকের আকৃতিই প্রায় সমান, ব্যাস ০-০০৭ মিলিমিটার, আর ০-০০২ মিলিমিটার পুরু। ১ ঘন মিলিমিটারের মতো ছোট এক ফোঁটা রক্তে অনেক অনেকগুলো কণিকা রয়েছে—তাদের সংখ্যা ৫০ লাখ। মানুষের শরীরে কত কণিকা আছে? একটা মানুষের শরীরের যত কিলোগ্রাম ওজন, শরীরে রক্তের পরিমাণ তার ১৪ ভাগের চেয়ে কিছু কম। ধরা যাক, লোকটির ওজন যদি হয় ৪০ কিলোগ্রাম, তাহলে তার শরীরে আছে প্রায় ৩ লিটার (বা ৩০ লাখ ঘন মিলিমিটার) রক্ত। খুব সহজ একটা হিসেব করলেই দেখা যাবে, তার শরীরে আছে ৫,০০০,০০০ × ৩,০০০,০০০ = ১৫,০০০,০০০,০০০,০০০ লোহিত কণিকা (২নং ছবি)।
একবার ভাবো তো! ১,৫০০,০০০ কোটি লোহিত কণিকা! এদের যদি সার বেধে রাখা যায় তাহলে কণিকার সুতোটা কত বড় হবে? সেটা হিসেব করা কঠিন নয় মোটেই, ১০৫,০০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর বিষুব রেখার চারদিকে কয়েক পাক জড়িয়ে রাখা যায়, এটা এমন লম্বা, এর ১০০,০০০: ৪০,০০০ = ২.৫ গুণ। উপযুক্ত ওজনের কোনো মানুষের কথাই ধরা যায়। তাহলে লোহিত কণিকার এই শেকল দিয়ে ৩ বার পৃথিবীকে জড়ানো যাবে।
এই ছোট্ট লোহিত কণিকাগুলো আমাদের দেহের অতি প্রয়োজনীয় কাজ করে। তারা শরীরের সব অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। রক্ত যখন ফুসফুসের ভেতর দিয়ে যায় তখন তারা অক্সিজেন শুষে নেয়, তারপর রক্তস্রোত যখন তাদের পৌঁছে দেয় আমাদের কোষকলার ভেতরে, তখন ফুসফুস থেকে বহু দূরের সেই অংশে তারা নিয়ে যায় সেই অক্সিজেন।
কণিকাগুলো যত ছোট হবে আর সংখ্যায় যত বেশি হবে, তাদের কাজও তত ভালভাবে চলবে। কারণ, তাহলে তাদের ত্বকের আয়তন বেশি হয় আর এই ত্বকের মধ্য দিয়েই তো তারা অক্সিজেন শুষে নিতে বা ছেড়ে দিতে পারে। হিসেব করলে দেখা যাবে, এদের ত্বকের মোট আয়তন মানুষের বাইরের ত্বকের আয়তনের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি। এটা ৪০ মিটার লম্বা আর ৩০ মিটার চওড়া, অর্থাৎ প্রায় ১২০০ বর্গ মিটারের সমান। এখন তাহলে বুঝতে পারছ জীবিত প্রাণীর দেহে যত বেশি সম্ভব লোহিত কণিকা থাকা কতটা দরকারী। এরা আমাদের শরীরের চেয়েও ১০০০ গুণ বেশি আয়তনের জায়গা দিয়ে অক্সিজেন শুষে নেয়, তারপর তা শরীরের অন্য অংশে নিয়ে যায়।
একজন মানুষ মোট যতটা পরিমাণ খাবার খায় তা-ও একটা দানবীয় সংখ্যা বৈকি (জীবনের দৈর্ঘ্য যদি গড়ে ৭০ বছর করে ধরা যায়)। একজন মানুষ তার সারা জীবনে যত টন পানি, রুটি, মাংস, পশুপাখি, মাছ, শাকসবজি, ডিম, দুধ ইত্যাদি খায়, তা চালান করতে রীতিমতো একটা ট্রেন লেগে যাবে। সত্যিই, এটা বিশ্বাস করতে বেগ পেতে হয় যে একবারে না হলেও একজন মানুষ একটা ট্রেন ভর্তি জিনিস তার পেটে চালান করতে পারে!