উদ্ভিদবিদের হিমালয়-যাত্রা

সে প্রায় দেড় শ বছর আগের কথা। ভারতবর্ষে তখনো ট্রেনলাইন বসেনি। বাস, মোটরগাড়ি তো দূর ভবিষ্যতের যান তখন। ব্রিটিশরাজের দখলে এ দেশের শাসনভার। ঘন, দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ভরা গোটা উপমহাদেশ। তার ভেতর হিংস্র শ্বাপদের অবাধ বিচরণ, শত শত পাখির কলতান। হিমালয় থেকে সুন্দরবন—হাজার হাজার উদ্ভিদের অভয়ারণ্য। ঠিক কত উদ্ভিদ আছে এ দেশের বনে-জঙ্গলে, পথে-প্রান্তরে, খালে-বিলে, মাঠে-নদীর কিনারে—তার খবর কেউ জানে না। গোটা বিশ্বেই উদ্ভিদ-প্রাণিকুলের শ্রেণিবিন্যাস তখনো শৈশব পেরোয়নি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঝান্ডা উড়ছে তখন ইউরোপীয়দের হাতে। বিশেষ করে জীববিজ্ঞান তাদের চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর মেরু থেকে অ্যান্টার্কটিকার বিজন বরফীয় অঞ্চলে। তাদের কাছে এই উপমহাদেশ তখন তীর্থভূমি। ঊষর মরু থেকে শুভ্র তুষার, সমতলীয় পাহাড়ি জঙ্গল থেকে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন—জীববৈচিত্র্যের স্বর্গোদ্যান—এমন পরিবেশবৈচিত্র্য শুধু ভারতেই ছিল। হজসন থেকে ব্লাইদের মতো বিখ্যাত জীববিজ্ঞানীরা ছুটে এসেছিলেন সেই প্রাণীবৈচিত্র্যে আকৃষ্ট হয়ে। আর উদ্ভিদের টানে ১৮৪৭ সালে ভারতবর্ষে পা রাখেন বছর ত্রিশের টগবগে যুবক যোশেফ ডাল্টন হুকার। পেশায় চিকিত্সক। সহযোগী সার্জন হিসেবে ঘুরে এসেছেন কুমেরু থেকে। এর পরই ভারতবর্ষের উদ্ভিদ গবেষণার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসন অর্থ বরাদ্দ করে তাঁর জন্য। এ দেশের আনাচকানাচে খুুঁজে বেড়ান নানা জাতের উদ্ভিদ। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়, সিলেট, কাছাড়, নোয়াখালী আর চট্টগ্রামের বন থেকে তুলে এনেছেন উপমহাদেশের উদ্ভিদকুলের খবর। এর মধ্যে কিছু একেবারেই দুর্লভ, আবার কিছু উদ্ভিদের কথা তাঁর মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারে বিশ্ববাসী। ছয়-সাত হাজার উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেন ডাল্টন হুকার। সেসব নমুনা পাঠান ভারত, ব্রিটেন, ইউরোপ ও আমেরিকার ৬০টি বেসরকারি গবেষণাকেন্দ্রে।

শুধু গবেষণা করেই জীবন পার করেননি হুকার। লিখেছেন কিছু অমূল্য বইও। দ্য ফ্লোরা অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া নামে লেখেন সাত খণ্ডের উদ্ভিদ পরিচিতিমূলক বই। উপমহাদেশের উদ্ভিদ গবেষণায় সেটি আজও শ্রেষ্ঠতম বইগুলোর একটি। এ ছাড়া ভ্রমণকাহিনির মতো করে লেখেন দ্য হিমালয়ান জার্নাল। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এই বইটিতে যেমন উদ্ভিদ স্থান পেয়েছে, ফুটে উঠেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর হিমালয়ের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, মানুষের জীবন, সমাজ ইত্যাদিও। হিমালয়ের পথে হুকার দার্জিলিংয়ে প্রথম দেখা পান বিখ্যাত রডোডেনড্রন ফুলের। পৃথিবী বিখ্যাত এই ফুলটিকে অনেকেই ব্রিটিশদের নিজস্ব উদ্ভিদ মনে করে। মজার কথা হলো, দার্জিলিং থেকেই রডোডেনড্রন প্রথম ইউরোপে পাড়ি দেয় হুকারের হাত ধরে।

হিমালয়ের উপত্যকায়, পাহাড়ে তিন বছর অবিরাম ঘুরে চলার বিচিত্র কাহিনি লেখক তুলে এনেছেন তাঁর দ্য হিমালয়ান জার্নাল-এ। কীভাবে কোনো উদ্ভিদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছে, সেসব উদ্ভিদ কীভাবে হিমালয়ের তুষারাবৃত জঙ্গলে টিকে থাকে, সেসব বর্ণনা করা হয়েছে স্বাদু লেখার ঢঙে। মূল ইংরেজি বইটির আকার ৫০০ পৃষ্ঠার ওপরে। সেই বইটির ভিত্তিতে ভাবানুবাদের সঙ্গে নিজের লেখার শৈলী মিশিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডাল্টন হুকার। বইটি প্রকাশ করেছে সাহিত্য প্রকাশ। বইটি পাওয়া যাবে দেশের অভিজাত বুকস্টলে।

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত