এ অবস্থায় বলের গতি এতই বেশি হবে যে বলের সাপেক্ষে আশপাশের সবকিছু স্থির হয়ে যাবে। বায়ুর মধ্যে থাকা অণু-পরমাণুগুলো চলাচল করে। তাদের চলাচলের গতিও যথেষ্ট বেশি। ঘণ্টায় কয়েক শ মাইল। কিন্তু আলোর বেগে চলা ফুটবলের গতির কাছে এ গতি যেন নস্যি। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে চললে ফুটবলের গতি এসে দাঁড়াবে ঘণ্টায় ৬০ কোটি মাইলেরও ওপরে। বলটির যদি চেতনা থাকত তাহলে অনুভব করত, তার চারপাশের সবকিছু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বল যখন বায়ুর মধ্য দিয়ে চলে তখন বায়ুর কারণে তার গতি প্রভাবিত হয়। বায়ুর মধ্যে চলাচল করলে সবকিছুই এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়। বায়ু দ্বারা গতি প্রভাবিত হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা একটি শাখা আছে। সেটিকে বলা হয় বায়ুগতিবিদ্যা বা এরোডাইনামিক্স।

বিমান আকাশে চলাচল করে, ঘুড়ি আকাশে ওড়ে এই বায়ুগতিবিদ্যার ওপর ভর করে। বন্দুকের গুলির গতি কিংবা সড়কপথে চলমান গাড়ির গতিও এই নিয়মনীতির প্রভাবে প্রভাবিত। কিন্তু প্রায় আলোর বেগে চলমান বলের ক্ষেত্রে বায়ুগতিবিদ্যার কোনো নীতিই কাজ করবে না।

স্বাভাবিক গতিতে চলমান কোনো বস্তু বায়ুর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলে বায়ুর বাধার সম্মুখীন হবে। বাধা পাওয়া বায়ুগুলো বস্তুটির পাশ দিয়ে সরে গিয়ে তাকে চলার রাস্তা করে দেবে। কিন্তু আমাদের কল্পনার ফুটবলের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটবে না। এর গতি এতই বেশি যে সরে গিয়ে রাস্তা করে দিতে যে সময়টা দরকার সেটাই পাবে না বায়ুমণ্ডল। প্রচণ্ড বেগে এত শক্তি নিয়ে বায়ুকে আঘাত করবে যে অণুগুলোকে অনেকটা থেঁতলে ফেলার মতো অবস্থা হবে। এমনকি নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে যাবে। প্রবল সংঘর্ষের সঙ্গে বায়ুর পরমাণুগুলো একত্র হবে ফুটবলের পৃষ্ঠের পরমাণুর সঙ্গে। পারমাণবিক সংঘর্ষের ফল হিসেবে সেখান থেকে গামা রশ্মির প্রবল বিকিরণ হবে এবং বেশ কিছু মৌলিক কণা অবমুক্ত হবে। 

এসব কণা ও গামা রশ্মি শংকুর মতো করে এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। ফুটবল যেদিকে অগ্রসর হবে শংকুটির কেন্দ্রও সেদিকেই অগ্রসর হবে। পাশাপাশি চারদিকে বিকিরণও করবে। এই বিকিরণ যেদিকে যাবে, সেদিকে সব ওলট-পালট করে ফেলবে। ছিন্ন করে ফেলবে বায়ুর অণুগুলোর বন্ধন, পরমাণুর ইলেকট্রনকে নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। সব মিলিয়ে খেলার মাঠ পরিণত হবে আলোকিত এক প্লাজমা অঞ্চল।

কণা পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম আছে। একাধিক কণা যখন একত্র হয় তখন তাদের প্রভাবে নানা ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তারা উভয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, তারা মিলে নতুন কোনো কণা তৈরি করতে পারে, তাদের আচরণ পার্শ্ববর্তী কণায় প্রভাব রাখতে পারে।

কণা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই বায়ু ও ফুটবলের পৃষ্ঠের পরমাণুর সংঘর্ষে গামা রশ্মি ও কিছু মৌলিক কণার জন্ম হবে। কণা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের কারণেই বেরিয়ে যাবে ইলেকট্রনগুলো। বায়ুর সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষ বলকে সামনে এগোতে দেবে। কমিয়ে দেবে এর গতিবেগ। তবে বাধার তুলনায় বলের গতিবেগ এতই বেশি যে মনেই হবে না বলের গতি কমেছে। একটু রংচং মাখিয়ে বললে বলা যায়, থার্মোনিউক্লিয়ার বিক্রিয়াও ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ফুটবলের গতিকে।

অবধারিতভাবেই বলের গায়ে আগুন ধরে যাবে। বল ক্ষয়ে যেতে থাকবে বায়ুর সঙ্গে বলের পৃষ্ঠের সংঘর্ষে। চারপাশে সংঘর্ষের ফলে তৈরি বলের ভগ্নাবশেষ (ছাই) ছড়িয়ে পড়বে। সেই ভগ্নাবশেষগুলোও প্রবল বেগসম্পন্ন হবে। সেগুলো বায়ুর পরমাণুকে আঘাত করলে সেখানেও নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটবে।

বলটি যদি অন্য খেলোয়াড়কে পাস দেওয়া হয়, সে খেলোয়াড় যদি কয়েক মিটার দূরে অবস্থান করে তাহলে কয়েক ন্যানোসেকেন্ডেই বলটি তার কাছে পৌঁছে যাবে। এক সেকেন্ডকে যদি সমান ১০০ কোটি ভাগে ভাগ করা হয়, তাহলে প্রত্যেক ভাগকে বলা যাবে ১ ন্যানোসেকেন্ড।

পাস গ্রহণকারী ব্যক্তি বলটিকে ভালো করে দেখতেও পাবে না। পাশের ব্যক্তি যে বলটিকে শট দিয়ে তার কাছে পাঠিয়েছে সেটি বুঝতেও পারবে না। কারণ, পাস দানকারী খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আলো আসতে আসতে ফুটবলটিও চলে এসেছে। তবে এখানে দেখতে পাওয়ার একটি দাবি আছে। কারণ, বলটির বেগ তো আলোর বেগের সমান নয়, সামান্য একটু কম। তাহলে শট দেওয়ার সময়ের তথ্য আগে এসে পৌঁছানোর কথা। হ্যাঁ, পৌঁছাবে ঠিকই, কিন্তু তারপরও দেখতে পাবে না অন্য খেলোয়াড়। কারণ, আলো চোখে এসে পড়ার পর সেটি মস্তিষ্কে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। সেখানে পৌঁছানোর পর মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়, এটা ফুটবল, টেনিস বল নাকি ক্রিকেট বল। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায়ও সময় লাগে। হয়তো সেটি খুব দ্রুতগতিতেই হয়, কিন্তু ফুটবলের প্রবল বেগের কাছে সেটি কিছুই নয়।

নিউরনের বৈদ্যুতিক সিগন্যাল এবং মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত  নেওয়ার মন্থরগতির সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে গেলেও আরেকটি সীমাবদ্ধতা এসে ধরা দেবে। কয়েক মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতেই পুড়ে যাবে বলটি। পাস গ্রহণকারী খেলোয়াড়ের কাছে যেতে যেতে হয়তো সবটাই ছাই হয়ে যাবে। তবে বল ছাই হয়ে গেলেও তার তেজ ঠিকই থেকে যাবে। সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া এক্স-রে এসে প্রথমে পৌঁছাবে। তার কয়েক ন্যানোসেকেন্ড পর এসে পৌঁছাবে ফুটবলের ভগ্নাবশেষ। পাশাপাশি প্লাজমা অবস্থায় পরিণত হওয়া কার্বন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেনে ভরে যাবে এলাকা। মূলত এই মৌলগুলোই থাকে বায়ু ও ফুটবলের মধ্যে।

ফুটবল থেকে বেরোনো এক্স-রের বিম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে আশপাশের সারা মাঠ।  তারপর দর্শকের গ্যালারিতেও পৌঁছে যাবে। তারপর এর প্রভাব গ্যালারি ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায়ও পড়বে। আর ঘটনাগুলো ঘটে যাবে মাত্র ১ মাইক্রোসেকেন্ডের ভেতরই। ১ হাজার ন্যানোসেকেন্ডে হয় ১ মাইক্রোসেকেন্ড।

ধরা যাক, কোনো একজন ব্যক্তি মাঠের পাশে কোনো এক পাহাড়ের ওপর থেকে খেলা দেখছেন। তাঁর চোখের সংবেদনশীলতা প্রবল। সাধারণ মানুষ যা দেখতে পায় না, তিনি তা দেখতে পান। এক্স-রে, গামা রে ইত্যাদি অনেক অদৃশ্য রশ্মির প্রতি তার চোখ সংবেদনশীল। এমন অবস্থায় যদি তার সামনে ফুটবলের ঘটনাটি ঘটে তাহলে তিনি প্রথমেই দেখবেন তীব্র এক আলোর ঝলকানি। ফুটবল ও বায়ুর সংঘর্ষে এ ঝলকানির সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সূর্যের আলো ম্লান হয়ে যাবে সেখানে। তারপর দেখা যাবে একটি আলোর চাদর মাঠ থেকে উত্পন্ন হয়ে চারদিকে প্রসারিত হচ্ছে। সেটি মুহূর্তের মধ্যে মাঠ ও গ্যালারি পেরিয়ে আশপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা ইত্যাদিকে কাঁপিয়ে ফেলেছে।

তারপর তীব্র এক শব্দ এসে কান ঝালাপালা করে দেবে তার। কোনো বলকে, সে ফুটবলই হোক আর যে বলই হোক, প্রায় আলোর বেগে নিক্ষেপ করলে তার ফল মোটেই ভালো হবে না। বল নিজেও ধ্বংস হবে, পাশাপাশি তার আশপাশের অঞ্চলগুলোকেও বিশৃঙ্খল করে দিয়ে যাবে।

সূত্র: হোয়াট ইফ এবং নাসা