বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই

বিদ্যুৎ আবিষ্কার করলেও, কেন এবং ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুতের জন্ম হচ্ছে সেটা জানতে পারেননি থ্যালেস। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে ফরাসী বিজ্ঞানে চার্লস অগাস্তেঁ দ্য কুলম্ব বিদ্যুৎকে নিয়মের ভেতর নিয়ে আসেন, ঠিক যেমন করে নিউটন মহাকর্ষ বলকে গণিতের নিয়ম দিয়ে বেঁধেছিলেন। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের মতো আরেকটি সূত্রের অবতারণা করেন। সেই সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা কর সম্ভব হলো বৈদুত্যিক আকর্ষণ বলের গতি-প্রকৃতি। কিন্তু বৈদ্যুতিক চার্জ যে কী, সেটা কেউ বলতে পারল না। এখনো যে খুব জুতসই ব্যখ্যা আছে, তা কিন্তু নয়।

অষ্টাদশ শতকে মার্কিন বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বিদ্যুৎ বেশকিছু গবেষণা করেন। তিনি ঘুড়ির সাহায্যে আকাশের মেঘ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে আসেন পৃথিবীতে। সেই বিদ্যুৎ চার্জ হিসেবে সংরক্ষণ করেন এক ধরনের চার্জ সংগ্রাহক জারে। তিনি অনেক হিসাব-নিকাশ কষে দেখান, চার্জ আসলে সংরক্ষণশীলতার নীতি। শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতিতে যেমন বলা হয়েছিল, মহাবিশ্বের মোট শক্তি সব সময় এক। কোনো শক্তিকে যেমন ধ্বংস করে ফেলা যায় না, তেমনি নতুন করে কোনো শক্তি উৎপাদন করা যায় না। ফ্রাঙ্কলিন দেখালেন, প্রকৃতিতে মোট মোট চার্জও এমন সংরক্ষিত। চার্জ যেমন ধ্বংস করা যায় না, তেমনি নতুন কোনো চার্জও তৈরি করা সম্ভব নয়। তাহলে কী চার্জও শক্তির মতো বস্তুর কোনো মৌলিক ধর্ম, যার অস্তিত্ব ও প্রভাব অনুভব করা সম্ভব, কিন্তু জিনিসটা কী, কোত্থেকেই বা এর আবির্ভাব হয়, বলা যায় না।

আসলেই তাই। ভর কী, ভরের উৎস কী? এ নিয়ে বহুদিন কোনো জবাব ছিল না। হিগস বোসনের তত্ত্ব আসার পর বস্তু কীভাবে ভারি হয়, তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেল। আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন, ভর আর শক্তি আলাদা কিছু নয়। একই রাশির দুটি আলাদা রূপ। তারপর থেকেই শক্তি আর ভরের সংরক্ষণশীলতার নীতি এক হয়ে গেল, দুটিতে মিলে হলো ভরশক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতি।

তিন

১৮৯৯ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার জে জে টমসন। পরমাণুর অস্তিত্ব তখনো নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ হয়নি। তবে পরমাণুর ধারণা তো ছিলই। টমসন পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, নতুন আবিষ্কৃত এই কণা হাইড্রোজেন পরমাণুর চেয়ে ১৮০০ গুণ ছোট। এর আগেই অবশ্য ইলেকট্রনের চার্জ কতটুকু হবে তা বিজ্ঞানীরা জানতেন।

চার্জের উৎস কী, এ নিয়ে কাজ করেছিলেন ইলেকট্রনের আবিষ্কারক। তিনি দেখতে পান, ভরের মতো চার্জ মৌলিক ধর্ম। বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে চার্জও অনেকটা ভরের মতো আচরণ করে। যেমন গ্রিক যুগ থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতেন, বস্তুর জড়তার পরিমাপকই হলো ভর। কোনো বস্তুকে বল প্রয়োগ করে গতিশীল করা যায়। যে বস্তুর ভর যত বেশি, সে বস্তুকে গতিশীল করতে গেলে তত বেশি বলো প্রয়োগ করতে হয়। আবার গতিশীল বস্তুকে থামাতে গেলেও বল প্রয়োগ করতে হয়, যেটাকে আমরা ‘বাধা’ বলি। যে বস্তুর ভর যত বেশি, সেটাকে থামাতে তত বেশি বল প্রয়োজন। এটাই ছিল বহুদিন পর্যন্ত ভরের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যার একমাত্র উপায়। তারপরে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন ভরশক্তির সমীকরণ প্রতিপাদন করে দেখান, ভর আর শক্তি আলাদা নয়, ভরকে শক্তিতে এবং শক্তিকে ভরে রূপান্তর করা সম্ভব। সুতরাং ভর ব্যখ্যার নতুন নতুন উপায় তৈরি হলো। বিদ্যুৎশক্তি, পারমাণবিক শক্তি, তাপ শক্তি, ইত্যাদি সব শক্তিকেই এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে যেকোনো শক্তিকেই ভরে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু পরীক্ষাগারে এই কাজটা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়, তবে ব্যয়বহুল। তাই শক্তিকে হরহামেশায় ভরে পরিণত করার ঘটনা ঠিক দেখা যায় না। কিন্তু ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা অত কঠিন নয়। পারমাণবিক চুল্লিতে এ কাজিটিই করা হয়। ভরকে শক্তিতে পরিণত করে তৈরি করা নিউক্লিয়ার বোমা অথবা বিদ্যুৎ।

গত শতাব্দীর চতুর্থ দশক থেকে কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। ১৯৮০ দশকে এসে ফিল্ড থিওরি পরিপূর্ণতা পায়। শুরুটা হয়েছিল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিকস দিয়ে। পরে কোয়ান্টাম ক্রমোডাইনামিকস বিকাশ লাভ করে। ইলেকট্রন, ফোটন, কোয়ার্ক, গ্লুয়োন, নিউট্রিনোর মতো মৌলিক কণাদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব এসব ফিল্ড থিওরির সাহায্যে। বেশ কিছু ফিল্ডের অবতারণা হয় একে একে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড, স্ট্রং ফিল্ড, উইক ফিল্ড, হিগস ফিল্ড ইত্যাদি। হিগস ফিল্ড হলো বস্তুর ভরের জন্য দায়ী। মহাবিস্ফোরণের পর পরই এই ফিল্ড ছড়িয়ে পড়ে মহাবিশ্বজুড়ে। তার পর মূলকণিগুলোর জন্ম হয়৷ জন্মের পরপরই কণাগুলো হিগস ফিল্ড ভেতর দিয়ে গোটা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় কিছু কণা জড়িয়ে পড়ে হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়। কিছু কণার ওপর হিগস ফিল্ড কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না। যেসব কণা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় সেগুলোকে ভারী কণা। অর্থাৎ এসব কণার ভর আছে। আবার সবগুলো কণার ওপর হিগস ফিল্ড একই প্রভাব ফেলতে পারে না। হিগস ফিল্ডের দ্বারা যেসব কণা বেশি বাধা পায়, সে সব কণা তত বেশি ভারী। সবচেয়ে কম বাধা পায় নিউট্রিনো। তাই এই কণা খুবই হালকা। ইলেকট্রন হিগস ফিল্ডের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয় না, ইলেকট্রন তাই খুব হালকা কণা। কিন্তু নিউট্রিনোর চেয়ে ভারী। এ যেন গ্রিক দার্শনিকদের ব্যাখ্যা করা ভর ও জড়তার সংজ্ঞার মতো। তবে তাঁরা বলেছিলেন, বড় সড় বস্তুর গতিশীলতায় বাধা প্রয়োগের কথা, আর হিগস ফিল্ডের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কোয়ান্টাম লেভেলে কীভাবে ভরের জন্ম হয়, সেটা।

চার

কোয়ান্টামের প্রথম ফিল্ড থিওরি কিউইডির জন্ম রিচার্ড ফাইনম্যানের হাতে। এই তত্ত্ব দেখায় আলোর সঙ্গে কণাদের মিথস্ক্রিয়া কীভাবে ঘটে। মহবিশ্বে প্রতিটা বলের জন্য আলাদা ক্ষেত্র রয়েছে। বৈদ্যুতিক বলের জন্য রয়েছে, বিদ্যুৎচুম্বক ক্ষেত্র। পুরো মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই ক্ষেত্র। মহাবিস্ফোরণের পর যখন কণাদের জন্ম হয়, তখন হিগস ফিল্ডের মতো বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে যেতে হয় মৌলিক কণাদের। যেসব কণারা ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এই ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তারা চার্জ লাভ করে। ইলেকট্রন-কোয়ার্কের মতো কণারা বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে নিজেরা চার্জিত হয়েছে। অন্যদিকে ফোটন এই ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে না, তাই এরা চার্জশূন্য। অথচ ফোটনের জন্মই হয়েছে এই ফিল্ডে। নিজেরাই বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

চার্জিত কণারা যখন ঘোরে কিংবা ত্বরিত হয়, তখন বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউই হলো বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের কণারূপ হলো ফোটন। যাকে আমরা আলোর কণা বলি। দুটি চার্জযুক্ত কণা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় বা মিথস্ক্রিয়া করে, তখন তারা ফোটন বিকিরণ করে।

পাঁচ

বৈদ্যুতিক চার্জ কোয়ান্টাম তত্ত্ব মেনে চলে। অর্থাৎ এদের সকল বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম কোয়ান্টাইজড। তার মানে এখানে চার্জের কারণে যে শক্তির জন্ম হয় সেগুলো প্যাকেট বা গুচ্ছের আকারে থাকে। আসলে বৈদ্যুতিক শক্তির আদান প্রদান হয় বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে। আর এই তরঙ্গের কোয়ান্টাইজড রূপ হলো ফোটন কণা।

সূত্র: সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন