কলার তেজস্ক্রিয়তার উৎস কী? কলায় পটাশিয়াম আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম কলায় ৩৫৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আছে। পটাশিয়ামের তিনটি আইসোটোপ আছে। পটাশিয়াম-৩৯, পটাশিয়াম-৪০ আর পটাশিয়াম-৪১। পটাশিয়াম-৩৯ ও পটাশিয়াম-৪১ নিউক্লিয়াস মোটামুটি স্থায়ী, অর্থাৎ তারা তেজস্ক্রিয় নয়। কিন্তু পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াস অস্থায়ী, অর্থাৎ তেজস্ক্রিয়। কলায় পটাশিয়াম-৪০ আছে এবং সেটাই তার তেজস্ক্রিয়তার উৎস। পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয়তা খুবই দীর্ঘস্থায়ী। এর হাফ-লাইফ বা অর্ধায়ু ১২৫ কোটি বছর। অর্থাৎ, একটি কলার ভেতর যতটুকু পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াস আছে, ১২৫ কোটি বছর লাগবে তার অর্ধেক পরিমাণ ক্ষয় হতে। আমাদের মধ্যে অনেকেরই রেডিয়েশন ফোবিয়া বা বিকিরণভীতি আছে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কথা শুনলেই তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তাঁরা হয়তো বলবেন, ‘কলা থেকে দূরে থাকুন।’ কিন্তু কলায় যতটুকু পটাশিয়াম আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পটাশিয়াম আছে আলুতে। প্রতি ১০০ গ্রাম আলুতে ৬৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আছে। মিষ্টিকুমড়ার বিচিতে পটাশিয়াম আছে আরও বেশি—প্রতি ১০০ গ্রামে ৯১৯ মিলিগ্রাম। তাহলে শুধু কলাকে আমরা তেজস্ক্রিয় বলছি কেন? আসলেই তা–ই, শুধু কলা নয়, আলুও প্রাকৃতিকভাবে তেজস্ক্রিয়। শুধু তা–ই নয়, আমাদের সবার শরীরই কমবেশি তেজস্ক্রিয়। প্রাণিকোষের শক্তির জোগান আসে সোডিয়াম-পটাশিয়াম মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। ৭০ কিলোগ্রাম ভরের কোনো মানুষের শরীরে প্রায় ১৫০ গ্রাম পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে। আমাদের শরীর থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ পরমাণু তেজস্ক্রিয় পটাশিয়াম-৪০ নির্গত হচ্ছে। তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে নিজের শরীর ছেড়ে পালানোর কোনো উপায় নেই আমাদের।

কলার বিজ্ঞানে ফিরে আসি। আমরা সবাই জানি, কলার খোসায় পা পড়লে ‘পা পিছলে আলুর দম’ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই কলার খোসা থেকে আমরা সাবধানে থাকি। জেনেশুনে আমরা কেউ কলার খোসায় পা দিই না। কলার খোসা প্রচণ্ড পিচ্ছিল—এমন পিচ্ছিল যে গাড়ির চাকাও পিছলে যায় এর ওপর। কলার খোসা এত পিচ্ছিল কেন? বিজ্ঞানের যে শাখায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, সেই শাখার নাম ট্রাইবোলজি। ট্রাইবোলজি হলো বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা, যেখানে পদার্থের ঘর্ষণ, মসৃণতা ও পিচ্ছিলতা সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা করা হয়। মানুষের কারিগরি দক্ষতা অর্জনের শুরু থেকেই মানুষ ট্রাইবোলজির ধর্মগুলো পর্ববেক্ষণ এবং ব্যবহার করে আসছে। বরফের মসৃণ তলের ওপর দিয়ে কোনো ভারী মসৃণ তলের বস্তু ঠেলে দিলে খুব সহজেই তা গড়িয়ে যায়। আবার খসখসে কঠিন তলের ওপর দিয়ে আরেকটি খসখসে তলের বস্তু ঠেলে নিয়ে যেতে হলে অনেক বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। প্রাচীন মিসরীয়রা পিরামিড তৈরি করার জন্য বিশালাকৃতির পাথর ঠেলে নিয়ে গেছে পাথরের ওপর পিচ্ছিল তরল ঢেলে দিয়ে। যেকোনো মেশিনে পিচ্ছিল গ্রিজ বা তেল ব্যবহার করা হয় ঘর্ষণজনিত শক্তির অপচয় রোধ করার জন্য। আবার গাড়ি চলার রাস্তায় যদি যথেষ্ট ঘর্ষণ না থাকে, তাহলে গাড়ি চালানোই দুরূহ হয়ে পড়ে। পদার্থের মসৃণতা–সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোর বৈজ্ঞানিক হিসাব–নিকাশ করার জন্য আলাদা বিজ্ঞান ট্রাইবোলজি প্রথম শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী ডেভিড ট্যাবর ১৯৬৫ সালে। ট্রাইবোলজি শব্দটি নেওয়া হয়েছে গ্রিক শব্দ ট্রাইব থেকে। ‘ট্রাইব’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘আমি ঘষি’।

কলার খোসা কেন এত পিচ্ছিল, এই প্রশ্নের উত্তর প্রথম জানা যায় জাপানের বিজ্ঞানী কিয়োশি মাবুচির গবেষণা থেকে। ২০১২ সালে কিতাসাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী ও তাঁর দল ট্রাইবোলজির সাহায্যে কলার খোসার পিচ্ছিলতার পরিমাণ নির্ণয় করেন। কোন পদার্থ কত পিচ্ছিল, তা নির্ভর করে তার কো–অ্যাফিশিয়েন্ট অব ফ্রিকশন বা ঘর্ষণাঙ্কের ওপর। ধরা যাক, বসার ঘরের সোফাটা কার্পেটের ওপর দিয়ে ঠেলে সোজা করে বসাতে হবে। সোফার ভর যদি ৩০ কিলোগ্রাম হয়, এবং কার্পেটের ওপর দিয়ে তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে যদি ১০ কিলোগ্রামের সমতুল্য বল প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে কার্পেটের ওপর সোফার ঘর্ষণাঙ্ক হবে ১০/৩০ বা শূন্য দশমিক ৩৩। কার্পেটের বদলে সোফাটি যদি মসৃণ টাইলসের ওপরে থাকে, তাহলে অনেক কম বল প্রয়োগ করেই সোফাটি সরানো যাবে। ধরা যাক, ৩ কিলোগ্রামের সমতুল্য বল প্রয়োগ করেই সোফাটি সরানো যাবে। সে ক্ষেত্রে টাইলসের ওপর সোফার ঘর্ষণাঙ্ক হবে ৩/৩০ বা শূন্য দশমিক ১। দেখা যাচ্ছে, দুটো তলের মধ্যে ঘর্ষণাঙ্কের মান যত কম হবে, তল দুটো তত মসৃণ হবে। জমাট বরফের তলের ওপর আরেকটি জমাট বরফের মধ্যে ঘর্ষণাঙ্কের মান মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ২। বিজ্ঞানী কিয়োশি মাবুচি পরীক্ষা করে দেখেছেন, রাবারের ওপর কলার খোসার ঘর্ষণাঙ্ক মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৭। এই ঘর্ষণাঙ্কের মান পিচ্ছিল গ্রিজ মাখানো ধাতব তলের ওপর যে কোনে ধাতুর ঘর্ষণাঙ্কের চেয়েও কম। অর্থাৎ, কলার খোসা গ্রিজ মাখানো ধাতব তলের চেয়েও পিচ্ছিল। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা গেছে, কলার খোসার ভেতরের দিকে অসংখ্য ছোট ছোট গুটির মতো আছে, যেখানে জমা থাকে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন (তার মানে কলার খোসাতেও উপকারী খাদ্য উপাদান আছে)। রাস্তায় কলার খোসায় যখন আমাদের পা পড়ে, তখন খোসার এই গুটিগুলো থেকে কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন বের হয়ে রাস্তা ও খোসার ওপরের ত্বকের ভেতর খুবই পিচ্ছিল জেল জমা হয়ে যায়, যা রাস্তার সঙ্গে আমাদের পায়ের ঘর্ষণাঙ্কের মান খুবই কমিয়ে দেয়। তখন পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, স্কুল অব বায়োমেডিকেল সায়েন্সেস, আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া