তাপ, আলো ও শব্দ আমাদের পরম বন্ধু

সেই আদিম বন্য জীবন থেকে আজকের এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকেন্দ্রিক সভ্যতার যে বিপুল নির্মাণপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে মানুষ গেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে কার কাছ থেকে? হ্যাঁ, আমরা বলতেই পারি যে মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতার ফলাফলই আজকের এই সভ্যতা। ভুল নয় কথাটা। কিন্তু এই বুদ্ধি আর সৃজনক্ষমতা কোনো কাজেই লাগত না যদি আমরা প্রকৃতির বিভিন্ন ধরনের শক্তির সহায়তা না পেতাম। আর তাই কথাটা এভাবেই বললে সঠিক হয় যে প্রাকৃতিক শক্তির রূপান্তর ও ব্যবহারের বুদ্ধি আর সৃজনশীলতাই আমাদের সভ্যতাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। আমরা তাপকে ব্যবহার করি, আলোকে ব্যবহার করি, শব্দকে ব্যবহার করি, বিদ্যুত্চুম্বকীয় শক্তিকে ব্যবহার করি, রাসায়নিক শক্তিকে ব্যবহার করি, মানে করতে শিখেছি। এই রকম আরও কত-কী! এই শক্তিগুলো তো মানুষের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই প্রকৃতিতে ছিল, আমরা সেগুলো ব্যবহার করতে শিখেছি বলেই না এত কিছু আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।

প্রাকৃতিক শক্তিগুলো যে আমাদের চারপাশে নানারূপে বিরাজ করে, তা আমরা অনেক আগেই জেনে ফেলেছি। যদিও সেগুলো দেখা যায় না, কিন্তু সেগুলোর নানা কাজকর্মের ফলাফল আমরা ভোগ করি প্রতিনিয়তই। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা সদা সর্বদা এক বিপুল শক্তিসমুদ্রে বসবাস করি। আলো, তাপ, শব্দ, বিদ্যুিবদ্যুত্চুম্বকীয় শক্তি ইত্যাদি থেকে প্রতিমুহূর্তে আমরা কী বিপুল সুবিধা গ্রহণ করছি—একবার গভীরভাবে ভেবে দেখুন, অবাক হয়ে যাবেন! অবশ্যই এই ব্যাপারগুলো এতই স্বাভাবিক আমাদের জীবনে, বলা যায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক যে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন পড়ে না। আর তাই সেগুলোর উপস্থিতির মূল্য সম্বন্ধে একটু ভাবার কথা বললেও ঠিক ভেবে ওঠা যায় না। বরং ভেবে দেখা যেতে পারে সেগুলোর অনুপস্থিতির কথা। অর্থাত্ যদি ওগুলো না থাকত, তাহলে কী হতো? আবারও সেই শ্বাস-প্রশ্বাসের উদাহরণটিই আসবে। প্রতি মুহূর্তে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে বলেই আমরা বেঁচে আছি, বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই মৃত্যু। কিন্তু আমরা কতটুকুই-বা এ নিয়ে ভাবি? উদাহরণস্বরূপ, একটা শব্দহীন জগতের কথা ভাবুন তো! ভাবতে গিয়ে যদি আপনার কোনো নির্জন পাহাড় বা বনভূমি বা সমুদ্রের কথা মনে পড়ে, তাহলে হবে না। কারণ, ওসব জায়গাতেও শব্দ থাকে। হয়তো যান্ত্রিক চিত্কার থাকে না, মানুষের তৈরি শব্দ থাকে না, কিন্তু নিসর্গের নানা শব্দ তো থাকে! আমি কিন্তু নির্জনতার কথা বলছি না, মানে জনমানবহীন কোনো জায়গার কথা বলছি না, বলছি নৈঃশব্দ্যের কথা, শব্দহীনতার কথা, যেখানে কোনো শব্দই নেই। ভাবতে পারছেন? এটা অবশ্য অসম্ভব এক কল্পনা, এ রকম একটা অবস্থা বাস্তবে সম্ভবই নয়। তবু আপনি যদি এ রকম কিছু কল্পনা করে উঠতে পারেন, তাহলে আপনার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতেই হবে। আর কে না জানে, কল্পনার মূল্য অপরিসীম। আইনস্টাইন তো আর সাধে বলেননি যে জ্ঞানের চেয়ে কল্পনা অধিকমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ (ইমাজিনেশন ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান নলেজ)!

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ওই রকম একটা শব্দহীন অবস্থা কল্পনা করতে গিয়ে আপনার মস্তিষ্কে কী পরিমাণ চাপ পড়েছে, লক্ষ করেছেন? হ্যাঁ পড়বেই। শব্দের উপস্থিতির সঙ্গে আমরা এতটাই পরিচিত যে নৈঃশব্দ্যকে আমরা কল্পনাই করতে পারি না। যাহোক, শব্দের ব্যবহার আমরা নানাভাবেই করি, কিন্তু এই শক্তিটি আলো বা তাপের মতো নয়। কেন নয়, তার কারণ হিসেবে বলা যায়, শব্দের উত্পত্তি হয় বস্তুর কম্পন থেকে। আমরা যে সংগীত পরিবেশনের সময় বিভিন্ন যন্ত্র থেকে নানা ধরনের সুর তৈরি হতে দেখি তা আসলে ওই কম্পনেরই ফলাফল। আলো বা তাপের উত্পত্তি ওভাবে হয় না। আরেকটা পার্থক্য আছে। আলো বা তাপপ্রবাহের জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই, অন্যদিকে শব্দ মাধ্যম ছাড়া চলতেই পারে না। আর এ কারণেই মহাশূন্যে শব্দের অস্তিত্ব নেই। কারণ, তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো মাধ্যম ওখানে নেই। যাহোক, কেবল শব্দের কথা বললেই তো চলবে না, অন্য দু-একটি বিষয় নিয়েও ভাবা যাক। কল্পনা করতে চেষ্টা করি, আলো না থাকলে কী হতো? আলোর অনুপস্থিতি আসলে কেমন ব্যাপার? উত্তরটা সহজই মনে হচ্ছে—অন্ধকার! প্রগাঢ় অন্ধকার। কিন্তু অতটুকুতেই কি শেষ হয়ে গেল? কল্পনাকে আরেকটু শাণিত করতে হবে তো! নৈঃশব্দ্যকে কল্পনা করতে পেরেছেন, আর আলোহীনতাকে পারবেন না? কী মনে হচ্ছে? আলো যদি না থাকে তাহলে কি আর কিছু থাকে? যদি থাকেও তা কি দৃশ্যমান হয়ে ওঠার কোনো সুযোগ আছে? মানে দেখা যাবে কোনো কিছুু? আর আলো ছাড়া সভ্যতা? কী হাস্যকর লাগছে শুনতে, তাই না?

শব্দহীনতা বা আলোহীনতার ব্যাপারটা যত সহজে বোঝা গেল, তাপের প্রবাহ না থাকলে কি হতো সেটা এত সহজে কল্পনায় আনা যাবে না। সত্যি বলতে কি, মানবসভ্যতার উন্মেষকালে মানুষ প্রথম যে শক্তিটির ব্যবহার শিখেছিল সেটি তাপ। পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর সেই অভিনব বুদ্ধিটা মানুষ যখন ব্যবহার করতে পেরেছিল, তখনই শুরু হয়েছিল সভ্যতার অভিযাত্রা। আগুন তো এমনি এমনি জ্বলেনি, দুই পাথরের ঘর্ষণে যে বিপুল পরিমাণ তাপ উত্পন্ন হয়েছিল তা থেকেই আগুন জ্বলে উঠেছিল। হয়তো সেটিই মানুষের প্রথম বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। তাপ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের আগে একটা বিষয় বলে নেওয়া ভালো। প্রাকৃতিক শক্তিগুলো স্থির অবস্থায় কোথাও জমা হয়ে থাকতে পারে না, তাকে সব সময়ই প্রবহমান থাকতে হয়, এটাই তার চরিত্র। (অবশ্য স্থিতিশক্তির কথা একটু আলাদাভাবে বিচার করতে হবে, তবে সে আলোচনা আজকে নয়)। ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় তাপের ক্ষেত্রে। যেকোনো পাঠ্যপুস্তকে তাপের সংজ্ঞা দেওয়া হয় এর প্রবহমানতার কথা মাথায় রেখে। অনেকটা এভাবে—তাপ হচ্ছে এমন একধরনের শক্তি, যা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয় ওই দুটো স্থানের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে। অর্থাৎ তাপকে দুটো শর্ত মেনে চলতে হয়—প্রথমত, সে সর্বদা প্রবাহিত হতে থাকবে; দ্বিতীয়ত, তাপমাত্রার পার্থক্য থাকতে হবে। আর তাপ সব সময় প্রবাহিত হয় উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিম্ন তাপমাত্রার অঞ্চলে। আপনার বাসার দুটো আলাদা কক্ষের ভেতরে যদি কোনো তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকে তাহলে এই দুই কক্ষের মাঝখানের দরজাটি খুলে দিলেও তাপের কোনো প্রবাহ ঘটবে না। উল্টোটা ঘটবে যদি কক্ষ দুটোর তাপমাত্রা ভিন্ন হয়। ধরা যাক, কোনো একটি কক্ষকে আপনি কোনো উপায়ে শীতল করে ফেলেছেন, পাশেরটিকে তা করেননি। দরজা খুলে দিন, দেখবেন পাশের কক্ষ থেকে তাপ এসে আপনার শীতল রুমটিকে ধীরে ধীরে উষ্ণ করে তুলবে। একসময় দুই কক্ষের তাপমাত্রা সমান হয়ে যাবে। একে তাপীয় সমতা বলা হয়। এই যে প্রবাহের দিক, এটি প্রাকৃতিকভাবেই নির্ধারিত। আমরা একটু পরই দেখব তাপের এই চরিত্রের কারণে মহাবিশ্ব এক আশ্চর্য-অদ্ভুত পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। আরেকটা বিশেষ ব্যাপার হলো তাপকে আমরা স্পর্শ দ্বারা অনুভব করতে পারি, যা অন্য শক্তির বেলায় সম্ভব নয়।

যে কথা বলছিলাম, সভ্যতার উন্মেষপর্বে যখন আমাদের আদি পূর্বপুরুষেরা আগুনের আবিষ্কার করেছিলেন, তখন সেটিকে ব্যবহার করেছিলেন প্রথমত প্রকৃতিতে পাওয়া খাদ্যবস্তুকে ঝলসে নিয়ে একটু স্বাদু করার কাজে। সে জন্যই হয়তো তাপের ব্যবহারের কথা উঠলেই আমাদের প্রথমে রান্নার কথা মনে পড়ে। হ্যাঁ, দৈনন্দিন জীবনে রান্না করা আর কাপড় শুকানোর ব্যাপারগুলো খুবই দৃশ্যমান উদাহরণ বলে সেটি মনে পড়াও অস্বাভাবিক নয়। বরং চোখের সামনে এ রকম কিছু উদাহরণ থাকলে আমাদের এই শক্তিটির উপকারিতা বুঝতে সুবিধা হয়। সত্যি বলতে কি, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য (প্রাকৃতিকভাবে ও আমাদের উদ্ভাবিত নানা পদ্ধতির মাধ্যমে) এত বহুল ব্যবহার বোধ হয় আর কোনো শক্তিরই করা হয় না। যেমন ধরুন, পানিচক্রের ব্যাপারটা। মানে, সাগরের পানি থেকে মেঘ, আবার মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার ব্যাপারটাও তাপের কারণেই ঘটে। পানি উত্তপ্ত হয়ে, মানে তাপ গ্রহণ করে, বাষ্পে পরিণত হয়ে ওপরে উঠে যায়, পরিণত হয় মেঘে। পরে সেই মেঘ যখন আবার শীতল হয়, মানে তাপ কমে আসে, তখন বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে। এটা প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে। আবার গাছের খাদ্য তৈরি করার ব্যাপারেও তাপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটা জানি, সূর্যের আলো থেকে খাবার তৈরি করে গাছ। কিন্তু কীভাবে? আলোকশক্তি প্রথমে তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গাছের পাতায় সঞ্চিত হয়, তারপর শর্করা (কার্বোহাইড্রেট) তৈরি করে। সেই শর্করা যখন প্রাণীর দেহকোষে প্রবেশ করে তখন তা ভেঙে আবার তাপ নির্গত হয় এবং প্রাণীকে শক্তি জোগায়। এটাও প্রাকৃতিক উপায়েই ঘটে। আমরা নিজেরাও তো কম ব্যবহার করি না। বিদ্যুৎ উত্পাদনে, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তাপের ব্যবহার হয়, তেমনি আমাদের ঘর-গেরস্থালির নানা কাজে তার ভূমিকাও প্রচুর। যেমন, অধিক মাত্রায় তাপ দিলে লোহাকেও বাঁকিয়ে ইচ্ছেমতো আকার দেওয়া যায়, আর ওভাবেই কামাররা তৈরি করে দা-কাঁচি-ছুরি-বঁটি ইত্যাদি। দৈনন্দিন জীবনে অবশ্য তাপের আরও অজস্র ব্যবহার আছে। যেমন, আমরা যে গাড়ি চালাই তাও ওই তাপেরই খেলা। গ্যাস বা তেল পুড়ে ইঞ্জিনের ভেতরে তাপ উৎপন্ন হয়, সেই তাপ পিস্টনকে চলমান রাখতে সাহায্য করে, যেটি আবার পর্যায়বৃত্ত গতি তৈরি করে। আর তার ফলেই চাকা ঘোরে। যত বেশি তাপ উৎপন্ন হবে, তত বেশি চাকা ঘুরবে, মানে বেগ বাড়বে। রেফ্রিজারেটর কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রও কিন্তু তাপশক্তিকে ব্যবহারের উদাহরণ। তবে এগুলো একটু অগ্রসর ব্যবহার।

এগুলোতে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে, করা হয়েছে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রও। তার মানে এগুলো রান্না করার মতো প্রাচীন ব্যবহার নয়, বরং আধুনিক ব্যবহার। তাপপ্রবাহের দিক নিয়ে তো আগেই কথা বলেছি, উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিম্ন তাপমাত্রার অঞ্চলে এটি প্রবাহিত হয় প্রাকৃতিকভাবেই, কোনো চেষ্টা করতে হয় না আমাদের। কিন্তু আমরা যদি উল্টোদিকে তাপকে প্রবাহিত করতে চাই, তাহলে? মানে যদি নিম্ন তাপমাত্রার অঞ্চল থেকে উচ্চ তাপমাত্রার অঞ্চলে তাপকে পাঠাতে চাই, তাহলে কী করতে হবে? হ্যাঁ, কিছু কাজ করতে হবে, মানে কিছু শক্তি ব্যয় করতে হবে। এ কথাটিই বলে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র। আর রেফ্রিজারেটর বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের মাধ্যমে সেটিই করা হয়। ফ্রিজের ভেতরে থেকে তাপকে বাইরে পাঠানো হয়, এসি ব্যবহার করেও কক্ষের ভেতর থেকে তাপ বাইরে পাঠানো হয়। আপনি যদি ফ্রিজ বা এসির পেছনে হাত রাখেন দেখবেন গরম বাতাস বেরোচ্ছে। ব্যাপারটা এতটাই সহজে বোঝা যায়। বুঝতেই পারছেন, আমরা লক্ষ করি আর না করি, এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো পরম বন্ধুর মতোই আমাদের পাশে থাকে সব সময়। আমরা চাইলে তো নিজেকে ব্যবহার করতে দেয়ই, না চাইলেও বহু কাজ করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

তাপ গতিবিদ্যার এই দ্বিতীয় সূত্রটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। একটু আগে যেভাবে বললাম, ওটা ছাড়া আরও নানাভাবে এই সূত্রের বিবরণ দেওয়া যায়। যেমন তাপীয় বা হিট ইঞ্জিনের দক্ষতা যে কখনোই শতভাগ হয় না, এটাও ওই দ্বিতীয় সূত্রই জানায় আমাদের। হিট ইঞ্জিন হলো এমন ধরনের ইঞ্জিন, যেগুলো তাপকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এর দক্ষতা ১০০ শতাংশ হয় না। কারণ, যে তাপ ইনপুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তার পুরোটা যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে না, কিছুটা নষ্ট হয়। তবে এই সূত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণটি দেওয়া হয় এনট্রপি নামক এক বিশেষ রাশির মাধ্যমে। প্রকৃতিতে এনট্রপি সব সময় বেড়েই চলে, কখনোই কমে না। শক্তির মতো এটির সংরক্ষণ সূত্রও নেই। এই এনট্রপি রাশিটি বেশ রহস্যময়, জগতের বহু কিছু ব্যাখ্যা করা যায় এটা দিয়ে। সে আলোচনায়ও আজকে আর যাচ্ছি না।

একটু আগে তাপপ্রবাহের দিক নিয়ে যে কথাটি বলেছিলাম, সেটি নিয়ে আরও দু-চারটি কথা বলে আজকের লেখা শেষ করব। মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রার পার্থক্য আছে বলেই তাপের প্রবাহ চলছে। কিন্তু আমরা এও জানি যে তাপের প্রবাহ ঘটতে থাকলে একসময় দুটো স্থানের তাপমাত্রা সমান হয়ে যায়। অর্থাত্ তাপীয় সাম্যাবস্থা তৈরি হয়। একটু আগেই সে উদাহরণ দিয়েছি। তাহলে এমন সময় কি কখনো আসবে যখন মহাবিশ্বের সমগ্র অঞ্চলের তাপমাত্রা সমান হয়ে যাবে? হ্যাঁ, আসতে পারে। যদি আসে তখন কী হবে? বলাবাহুল্য, তাপমাত্রার পার্থক্য থাকবে না বলে তাপের প্রবাহও থাকবে না। আর তখন তাপপ্রবাহের কারণে যেসব ঘটনা ঘটে তার সবই থেমে যাবে। সব রাসায়নিক বিক্রিয়া থেমে যাবে, সব জৈবিক কাজকর্ম থেমে যাবে, সব শারীরবৃত্তীয় কাজকর্ম থেমে যাবে, সব কাজকর্মও থেমে যাবে। মোট কথা, মহাবিশ্ব পরিণত হবে এক বিশাল স্থিরচিত্রে, যেখানে সব গতি ও কাজ অনন্তকালের জন্য থেমে গেছে! এই অবস্থাটিকে বলা হয় ‘হিট ডেথ অব দ্য ইউনিভার্স বা মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু’। তবে সহসা এই ঘটনা ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই, এই যা ভরসার কথা! আমাদের পরম বন্ধু তাপ, প্রবাহিত হচ্ছে তো হচ্ছেই, চলমান রেখেছে এই মহাবিশ্বের সব কাজকর্ম, তাকে অন্তর থেকে একটা ধন্যবাদ তো আমরা দিতেই পারি!

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন