বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কোয়ান্টাম মেকানিকস দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তা তত্ত্বের ওপর, গত শতাব্দীর কুড়ির দশকে যেটা দাঁড় করিয়েছিলেন জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। সেই তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেই বেরিয়ে আসে আরেকটা তত্ত্ব—কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন। এই তত্ত্ব বলে, শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। তার ভেতরে লুকিয়ে আছে শক্তি। সেই শক্তির যোগান দেয় ভার্চ্যুয়াল কণারা।

শূন্যস্থানে সবসময় এই কণা-প্রতিকণার সৃষ্টি আর ধ্বংসের খেলা চলছে। প্রতিমুহূর্তে সব জায়গায় কণা আর প্রতিকণার জোড়া তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তারা খুব ক্ষণস্থায়ী। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এরা পরস্পরের সঙ্গে সংর্ঘষ ঘটিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। আর, এ সংঘর্ষের ফলে বেরিয়ে আসে শক্তি। সেই শক্তিই পরক্ষণে আবার একজোড়া কণা-প্রতিকণা তৈরি করে। এভাবেই প্রকৃতিতে চলছে ভার্চ্যুয়াল কণাদের ভাঙাগড়ার খেলা।

default-image

দুই

১৯২০ এর দশক। ড্যানিশ বিজ্ঞানী নীলস বোরের নেতৃত্বে তখন পতপত করে উড়ছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জয়পতাকা। দুনিয়াজুড়ে তরুণ বিজ্ঞানীরা ঝুঁকে পড়ছেন সেদিকে। বছর পঁচিশ বয়সের ব্রিটিশ তরুণ পল ডিরাক। নিলস বোরের ছাত্র। ১৯২৮ সাল। বিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন তাঁর বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণ। কিন্তু শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণে একটা সমস্যা ছিল। এই সমীকরণ গতিশীল ইলেকট্রন কণাদের আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু সেটা কম গতির ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বেশ ভালো কাজে দেয়। উচ্চগতির ইলেকট্রনদের আচরণ এ সমীকরণ ঠিকভাবে ব্যখ্যা করতে পারে না।

পল ডিরাক এর একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ শুধুই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্পত্তি। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। পল ডিরাক সেই সমীকরণে আপেক্ষিকতা আমদানি করলেন। আপেক্ষিকতার অন্যসব সমীকরণগুলোর সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার তফাতটা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু E=mc2 সমীকরণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ব্যবহার করতে গিয়ে অতটা ঝামেলায় পড়তে হয় না। পল ডিরাক তাই এই সমীকরণকেই বেছে নিলেন কোয়ান্টামের সঙ্গে আপেক্ষিতার মেলবন্ধন ঘটাতে।

পল ডিরাকের শক্তির ঋণাত্মক মান নিয়ে একটু বাড়তি দুশ্চিন্তা ছিল। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমীকরণে ঋণাত্মক মানের কোনো স্থান ছিল না। ডিরাক প্রথমেই এই সমীকরণে ঋণাত্মক রাশি যোগ করলেন। ইচ্ছে করে না, একরকম বাধ্য হয়ে। তখন বদলে যাওয়া সমীকরণটা দাঁড়াল, E=±mc2। সে যুগের বিজ্ঞানীরা শক্তির ঋণাত্মক মানকে অবাস্তব মনে করতেন। তাই শক্তির ঋণাত্মক মান নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাননি কখনো। কিন্তু ডিরাকের এটা দরকার। এই ঋণাত্মক মান বেরিয়ে এসেছে সমীকরণ থেকে। তিনি তাই ভর-শক্তির সমীকরণে ঋণাত্মক মান রেখে দিলেন। আর, এটা করতে গিয়েই বাঁধল গোল। ভর ও শক্তির ঋণাত্মক মান ঋণাত্মক কণিকার আভাস দিল। ডিরাক চাচ্ছিলেন ইলেকট্রনের আচরণ আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে। নতুন এই সমীকরণ সে কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী করছে ঋণাত্মক ইলেকট্রনের। ডিরাকের হিসাব মতে, সেই ইলেকট্রনের ভর হবে বাস্তব ইলেকট্রনের সমান। কিন্তু চার্জ হবে ইলেকট্রনের বিপরীত। অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন। পরে সেই বিপরীত ইলেকট্রনের নাম দেওয়া হয় পজিট্রন।

তত্ত্বকে তো বাস্তবে রূপান্তর করতে হবে! বিপরীত কণিকার অস্তিত্বের প্রমাণ আসবে কোত্থেকে?

তিনি বললেন, বিশেষ ঋণাত্মক বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে এই বিপরীত ইলেকট্রন পাওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, সাধারণ অবস্থায় ইলেকট্রন আমাদের চিরচেনা যে বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের ভেতর চলে, তার মান ধনাত্মক। কিন্তু ডিরাক এক নতুন এক কথা শোনালেন।

বললেন, ইলেকট্রন যে শক্তিস্তরগুলোতে থাকে পরমাণুর ভেতর বা বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে, সেগুলো দুই ধরনের হয়। একটা ধনাত্মক, আরেকটা ঋণাত্মক শক্তিস্তর। সাধারণ ইলেকট্রনগুলো ধনাত্মক শক্তিস্তরে থাকে, আর ঋণাত্মক শক্তিস্তরে থাকে বিপরীত ইলেকট্রনগুলো। তিনি আর‌ও বলেন, মহাবিশ্বের সব ঋণাত্মক শক্তিস্তর কোনো এক কারণে আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই বিপরীত ইলেকট্রনের থাকবার কোনো জায়গা নেই। এজন্য বিপরীত ইলেকট্রন অর্থাৎ পজিট্রন আমরা বাস্তব জগতে দেখতে পাই না। তার মানে এই নয় যে সেগুলো পাওয়া অসম্ভব। ডিরাক বললেন, যদি বিশেষ সেই ঋণাত্মক শক্তিস্তর আমরা তৈরি করতে পারি, তবে পজিট্রনের দেখা পাওয়া সম্ভব। অনেকেই তার কথা বিশ্বাস করেননি।

তবে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি প্রমাণের জন্য। ১৯৩২ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল অ্যান্ডারসন পজিট্রন আবিষ্কার করলেন। তখন এই বিপরীত কণা বা প্রতিকণা আর শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ রইল না। এবারে অন্য বিজ্ঞানীরা বললেন, শুধু ইলেকট্রনের কেন, অন্য কণাদেরও বিপরীত কণা থাকা উচিৎ। সেটাও প্রমাণ করতে বেশিদিন সময় লাগল না। ১৯৫৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিজ্ঞানী প্রতিপ্রোটন এবং ১৯৫৬ সালে প্রতিনিউট্রন আবিষ্কার করলেন।

তিন

১৯৫১ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী জুলিয়ান সুইংগার প্রমাণ করলেন, শূন্যস্থানের ভেতরেই যদি প্রবল তড়িৎ ক্ষেত্র তৈরি করা যায়, তাহলে কণাগুলো আর ভার্চ্যুয়াল থাকে না। সেগুলো বাস্তব কণায় পরিণত হয়।

এই যে শূন্যস্থানের শক্তির কথা বলা হচ্ছে, এ শক্তিকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ইনফ্লেশন তত্ত্বের নায়কেরা। শুরুটা করেছিলেন নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যপক এডওয়ার্ড ট্রিয়ন। ১৯৭০ সালে একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। সেই সম্মেলনে কোনো একজন বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে কথা বলছিলেন। তন্ময় হয়ে সেই বক্তৃতা শুনছিলেন ট্রিয়ন। তারপর হঠাৎ তার মাথায় আসে এক যুগান্তকারী ভাবনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের মহাবিশ্বটা হয়তো স্রেফ ভ্যাকুয়াম ফ্ল্যাকচুয়েশনের ফসল।’ সেদিন তাঁর কথা কেউ আমলে নেয়নি। বরং হাসির রোল ওঠে সভাকক্ষ জুড়ে।

কিন্তু দমে যাননি ট্রিয়ন। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে শুরু করেন। তারপর দুই বছর খেটেখুটে একটা প্রবন্ধ দাঁড় করালেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সেটা পাঠালেন বিখ্যাত নেচার পত্রিকায়, চিঠিপত্র বিভাগে ছাপার জন্য। কিন্তু নেচারের সম্পাদক লেখাটার গুরুত্ব বুঝলেন। সেটা ছাপলেন ফিচার আকারে।

ট্রিয়নের সেই ধারণা এক সময় সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যায় কাজে লাগান ইনফ্লেশন তত্ত্বের তিন জনক ডেমোস কাজনাস, অ্যালান গুথ ও আন্দ্রে লিন্ডে। তাঁরা দেখাতে সক্ষম হন, শূন্যস্থান থেকেই মহাবিশ্বের জন্ম। আর সেই মহাবিশ্বই পরে ইনফ্লেশন বা স্ফীত হয়ে ধীরে ধীরে পরিণত মহাবিশ্বে আত্মপ্রকাশ করেছে।

শূন্যতার শক্তির সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ধরা যাক, ভ্যাকুয়াম ফ্ল্যাকচুয়েশনের মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল। তবু কি সব সমস্যার সমাধান হয়? প্রথম প্রশ্নটা হলো, আমাদের যে পদার্থবিজ্ঞানের নীতি, সেটা আমাদের মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। কারণ কোয়ান্টাম ক্ষেত্র বলুন, আর শূন্যতার শক্তি বলুন, এগুলো তো আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের নীতির মধ্যেই পড়ে। মহাবিস্ফোরণের আগে যে শূন্যতা, সেটা কেমন? শূন্যস্থানের যে শক্তির কথা বলছি, তার জন্য দরকার মহাবিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা স্থান-কালের চাদর বা ক্ষেত্র। কিন্তু এই স্থান-কালের জন্ম মহাবিস্ফোরণের পর। তাই স্থান-কালের যে কোয়ান্টাম শক্তি, সেটার জন্মও নিশ্চয় মহাবিস্ফোরণের পর।

শূন্যস্থানের শক্তির মাধ্যমে কণা তৈরির যে ব্যাপারটা, সেটা হতে গেলে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের দরকার হয়, স্থান-কালের দরকার হয় আর দরকার হয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার। কিন্তু এসব কিছুরই জন্ম মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। মহাবিস্ফোরণের আগে স্থান-কাল থাকার কথা নয়, থাকার কথা নয় কোনো কোয়ান্টাম ক্ষেত্রও। সেখানে আমাদের পদার্থবিজ্ঞানও অচল হওয়ার কথা। কিন্তু মহাবিস্ফোরণ ঘটেছে এটাও তো সত্যি। মহাবিস্ফোরণের আগে যে পরম শূন্য ছিল, সেটা কি তবে শূন্য নয়? সেখানেও কি কাজ করেছিল পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র? তাই যদি হয়, সেখানেও কোয়ান্টাম ক্ষেত্র ছিল। সেই ক্ষেত্র কি আলাদা কোনো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিল? সেই মহাবিশ্বের কোনো বিন্দুতে বিগ ব্যাং ঘটে, ওর শাখা হিসেবে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম? অর্থাৎ আমাদের এই মহাবিশ্বের কি আরেকটা মাতৃমহাবিশ্ব আছে? সেই মহাবিশ্বের কি আমাদের মহাবিশ্বের মতো আরও কোনো স্থা্ন আছে? সেই স্থানগুলোই কি প্যারালাল ইউনিভার্স?

আরেকটা মজার প্রশ্ন এখানে করে ফেলতে পারি। আমাদের এই মহাবিশ্বের নিশ্চয়ই সীমা আছে। সীমা না থাকলে এর প্রসারণও সম্ভব হতো না। তাহলে, সেই সীমার বাইরে কী আছে? নিশ্চয়ই শূন্যতা? সেই শূন্যতা নিশ্চয়ই আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে যে স্থান-কালের শূন্যতা, তার মতো নয়? সেই শূন্যতারই কোনো একটা বিন্দুতেই তো মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল, আর জন্ম নিয়েছিল আমাদের মহাবিশ্ব।

এ সবই সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ। এসব প্রশ্নের সঠিক সমাধান এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে আসেনি। কিন্তু বিজ্ঞানের যেভাবে উন্নতি ঘটছে, হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। ততদিন এটা অমীমাংসিতই রয়ে যাবে।

সূত্র:

প্যারালাল ইউনিভার্স / মূল : মিচিও কাকু, অনু : আবুল বাসার

অ্যান্টিম্যাটার / মূল : ফ্র্যাঙ্ক ক্লোজ, অনু : উচ্ছ্বাস তৌসিফ

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন