বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রহস্যময় নিউট্রিনো কণা হাতেনাতে ধরতে বিজ্ঞানীদের চেষ্টার অন্ত নেই। তাই তো বিশ্বজুড়ে অন্তত ৪০টি নিউট্রিনো ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও স্থাপনের পরিকল্পনাতেও আছে আরও বেশ কিছু। যেমন জাপানের মোজুমি মাইনের প্রায় এক মাইল গভীরে এমনই একটা ডিটেক্টর বসানো হয়েছে। নাম সুপার কামিওকান্দি নিউট্রিনো ডিটেক্টর। সেখানে সিলিণ্ডার আকৃতির ইস্পাতের তৈরি বিশাল ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে, যেগুলোর উচ্চতা ৪২ মিটার ও ব্যাস প্রায় ৪২ মিটার। এসব ট্যাঙ্কে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অতিবিশুদ্ধ পানি ভরা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব, যারা চেরেনকভ রেডিয়েশন থেকে আসা আলো শনাক্ত করতে পারে। সূর্য থেকে নিউট্রিনো এসে পানির অণুতে থাকা ইলেকট্রনের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, তাহলে পানির ভেতরে একটা ইলেকট্রন বা পজিট্রন আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলার কথা। আসলে শূন্যস্থানে আলোর বেগের চেয়ে পানিতে আলোর বেগ অনেক কম। শূন্যস্থানে আলোর বেগ সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার। কিন্তু পানিতে আলোর বেগ সেকেন্ডে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কিলোমিটার। তাই পানিতে চেরেনকভ রেডিয়েশন দেখা যায়। অর্থাৎ পানির নিচে নীল আভা দেখা যায়।

শব্দের চেয়ে দ্রুতবেগে ধাবমান সুপারসনিক জেটবিমানের সাথে তুলনা করা যায় একে। এই বিমান শব্দের চেয়ে দ্রুত চলার কারণে তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যায়, যাকে বলা হয় সনিক বুম। চেরেনকভ বিকিরণের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। তবে এটা ঘটে আলোর জন্য। অর্থাৎ এখানে আলোর চেয়ে ইলেকট্রন বেশি বেগে চলে। পারমাণবিক চুল্লির পাশের পুকুরে যে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য জমানো হয়, সেখানও এই নীল আভা দেখা যায়। সোভিয়েত পদার্থবিজ্ঞানী পাভেল চেরেনকভের নামে এই পরিঘটনার নামকরণ করা হয়েছে। কারণ তিনিই প্রথম বিষয়টা আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের কারণে ১৯৫৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।

যাইহোক, ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব এই চেরেনকভ রেডিয়েশন রেকর্ড করে। এভাবে প্রতিটি টিউবে রেকর্ডকৃত তথ্য দিয়ে বোঝা যায় ভুতের মতো নিউট্রিনো সেখানে এসেছিল কিনা। এমনকি এভাবে নিউট্রিনোর গতিপথও নির্ণয় করতে পারেন পদার্থবিদরা।

নিউট্রিনো আমাদের চেনা পদার্থের সাথে অতি অল্প মিথস্ক্রিয়া করে বলেই তাকে ধরতে এত বিশাল আয়োজন করতে হয় বিজ্ঞানীদের। আসলে সূর্য থেকেও প্রায় বিনা বাধায় পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় এই কণা। সূর্যের কেন্দ্র থেকে এরা সোজা পথে সূর্যের পৃষ্ঠ পর্যন্ত আসে। সেজন্য সময় লাগে মাত্র দুই সেকেন্ড। আর সূর্যের পৃষ্ঠতলে পৌঁছার পর পৃথিবীতে উড়ে আসতে সময় লাগে সাড়ে আট মিনিট। সাধারণ দৃশ্যমান আলোরও একই সময় লাগে। তাই বলা যায়, সূর্যের ঠিক কেন্দ্র থেকে আমাদের কাছে নিউট্রিনো কণা পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে আট মিনিট।

কিন্তু সাধারণ আলো আর নিউট্রিনোর চলার পথে একটা গুরুত্বপূর্ণ তফাত আছে। সেটা বলার জন্যই এতক্ষণ এত প্যাঁচাল। সূর্যের কেন্দ্রের অবিরাম পারমাণবিক বিক্রিয়া চলছে, যাকে বলে ফিউশন প্রক্রিয়া। এ বিক্রিয়ার প্রধান জ্বালানি হাইড্রোজেন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সূর্যের ভেতরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপে দুটো প্রোটন একত্রিত হয়ে দুটো ডিউটেরন তৈরি করে। এরপর প্রতিটি ডিউটেরন আরেক প্রোটনের সঙ্গে একত্রিত হয়ে তৈরি করে হিলিয়াম-৩। দুটো হিলিয়াম-৩ আবার এরপর একত্রিত হয়ে তৈরি করে বেরিলিয়াম-৬। কিন্তু এটি খুবই অস্থিতিশীল মৌল। তাই তা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। তাই ভেঙে আবারও দুটি প্রোটন এবং হিলিয়াম-৪-এ পরিণত হয়। এ নিউক্লিয়াস ফিউশনের কারণে সূর্যে এই বিপুল তাপ, আলো এবং শক্তি তৈরি হচ্ছে। এভাবে ভুতুড়ে নিউট্রিনো কণা ছাড়াও তৈরি হচ্ছে আলো, যার আরেক নাম ফোটন। এখানে ফিউশন প্রক্রিয়ায় যে আলো বেরিয়ে আসে তা আমাদের দৃশ্যমান আলো নয়, বরং গামারশ্মি। আলো হল বুলেটের মতো কণার অবিরাম স্রোত। সূর্যের কেন্দ্র থেকে নিউট্রিনো যত সহজে সূর্যের পৃষ্ঠে পৌঁছে যায়, ফোটনের জন্য বিষয়টা তত সহজ নয়। সূর্য থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। অনেক রাজধানী ঢাকায় গুলিস্তানে বা নিউ মার্কেটে ঈদের বাজার করার মতো ব্যাপার। ভিড়ে ধাক্কাধাক্কিতে সামনে এগোনোই মুশকিল। এক জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে থাকা।

সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির চেয়ে ১৫০ গুণ বেশি। তাই সেখানে আলো সোজা পথে চলতে পারে না, বরং জিগজ্যাগ পথে চলতে থাকে। এক সেন্টিমিটার পথ সোজা চলার পরই ফোটনের গতিপথ আবারও বিক্ষিপ্ত হয়ে আরেক দিকে বেঁকে যায়। কারণ ফোটনটি তখন বিক্ষিপ্ত হয় কিংবা অন্য কোন নিউক্লিয়াসে শোষিত হয়, নয়ত ধাক্কা খেয়ে দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তারপরের এক সেন্টিমিটার পথ সোজা চলার পথ আবারও একই ঘটনা ঘটে। আবারও আরেক দিকে ছুটতে বাধ্য হয় ফোটনটা। এভাবে অনবরত ধাক্কা খেয়ে অসংখ্যবার ফোটনের গতিপথ পাল্টে যায়।

আবার কেন্দ্র থেকে বাইরে পর্যন্ত সূর্যের আলাদা আলাদা স্তরও রয়েছে। এসব স্তরেও ফোটন বারবার ধাক্কা খেয়ে বিচ্যুত হয়ে অন্যদিকে ছিটকে পড়ে। যেমন সূর্যের কেন্দ্রে ফিউশন ঘটার পর যে ফোটন তৈরি হয় তাকে এরপর রেডিয়েটিভ জোন পার হতে হয়। এই অঞ্চলটা আয়নিত গ্যাসে ঘনীভূত অবস্থায় থাকে। এখানেই প্রোটনের ফিউশন থেকে নিঃসৃত গামারশ্মি অনবরত আছড়ে পড়ছে। রেডিয়েটিভ জোনের ব্যাপ্তি সূর্যের ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০ ভাগ। প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার। ফোটন যদি আলোর বেগে চলতে পারত তাহলে এই দূরত্ব পাড়ি দিত চোখের পলকে। কিন্তু রেডিয়েটিভ জোনের ঘনত্ব এতই বেশি যে ফোটনের চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে পরমাণু এবং আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সাথে বারবার ঠোক্কর খেতে থাকে ফোটন বা গামা রশ্মিগুলো। আবার এই গামারশ্মি গ্যাসের সাথে ধাক্কা খাওয়ার সময় তা শোষিত হয়, পরে তা এক্স-রে এবং অতিবেগুনি রশ্মি হিসেবে নিঃসৃত হয়।

রেডিয়েটিভ জোন কোনমতে পার হওয়া সম্ভব হলে ফোটন এসে পৌঁছায় কনভেকশন জোন বা পরিচলন অঞ্চলে। এখানে শক্তি পরিচলন পদ্ধতিতে বাহিত হয়। সে কারণেই এ অঞ্চলের নাম পরিচলন। সূর্যপৃষ্ঠ থেকে এই জোনের দূরত্ব প্রায় পাঁচ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত। এই জোনের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম। তাই ফোটনের গতি কিছুটা বেড়ে যায়। সে কারণে প্রায় ১০ দিনের মধ্যেই তা সূর্যপৃষ্ঠে পৌঁছে যেতে পারে। তাই সূর্যের পৃষ্ঠে পৌঁছাতে নিউট্রিনোর মতো মাত্র দুই সেকেণ্ডে নয়, ফোটনের সময় লাগে কমপক্ষে ৩০ হাজার বছর থেকে প্রায় কয়েক মিলিয়ন বছর।

এই দীর্ঘ সময় পর সূর্যের পৃষ্ঠে পৌঁছার পর মাত্র সাড়ে আট মিনিটে পৃথিবীতে এসে পৌঁছে আলো। কাজেই আজকে, এই মুহূর্তের যে আলোর কণা আপনার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন, সেটা আসলে কমপক্ষে ৩০ হাজার বছর পুরনো। অর্থাৎ সর্বশেষ বরফ যুগে এই আলোর জন্ম হয়েছিল। আর সূর্যের পেটের ভেতর আজকে যে আলোর জন্ম হল, সেটা পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে আরও অন্তত ৩০ হাজার বছর পর।

সূত্র: ইনফিনিটি ইন দ্য পাম অব ইউর হ্যান্ড/মার্কাস চোন

উইকিপিডিয়া

https://www.quora.com/The-light-hitting-the-earth-right-now-is-30-thousand-years-old-Why

https://www.abc.net.au/science/articles/2012/04/24/3483573.htm

https://phys.org/news/2015-12-sun-energy.html

https://sciencing.com/long-photons-emerge-suns-core-outside-10063.html

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন