তাহলে কি এই সমীকরণের কোনো সীমাবদ্ধতা আছে, নাকি ইলেকট্রনকে আদৌ কোনো বিন্দুতে নিশ্চিত করে পাওয়া যাবে না। শ্রোডিঙ্গারের মতো দ্বিতীয়টির পক্ষেই, অর্থাৎ ইলেকট্রন এমনই রহস্যময় চরিত্রের, একে কোথাও নিশ্চিত করে পাওয়া যাবে না। তাই কেউ শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না পরমাণুর শক্তিস্তরের অমুক বিন্দুতে ইলেকট্রনকে পাওয়া যাবে। তার বদলে তিনি বলতে পারবেন শক্তিস্তরের অমুক বিন্দুতে বা অমুক এলাকায় অমুক সময়ে ইলেকট্রনকে পাওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৮০ ভাগ বা ৩০ ভাগ কিংবা এক শর নিচের যেকোনো সংখ্যা।

শ্রোডিঙ্গার যখন তরঙ্গ ফাংশনের কথা বলছেন, তখন এক জার্মান তরুণ ভাবছেন আরেকটা আশ্চর্য ভাবনা। সেই ভাবনা ডালপালা মেলে পরিণত হয় অনিশ্চয়তার নীতিতে। বড় অদ্ভুত নীতি। শ্রোডিংগারের তরঙ্গ সমীকরণকে যতটুকু অদ্ভুত মনে করেছিলেন বিজ্ঞানীরা, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা–নীতি তার চেয়েও অদ্ভুত। তবে অনিশ্চয়তা–নীতি আবিষ্কারের আগে ইলেকট্রনের মতো খুদে কণিকাদের জন্য একটা বলবিদ্যা তৈরি করেছিলেন হাইজেনবার্গ, সেটা গণিতের খুব জনপ্রিয় একটা শাখা ম্যাট্রিক্স ব্যবহার করে। কোয়ান্টাম কণিকাদের গতিপ্রকৃতি, চরিত্র ইত্যাদি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয় এই নতুন বলবিদ্যা। সেটাই আসলে কোয়ান্টাম মেকানিকস বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। শ্রোডিংগারের তরঙ্গ সমীকরণ এই বলবিদ্যাকেই সমর্থন করে। অন্যদিকে সেই বলবিদ্যাকেই প্রশস্ত করে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা–নীতি।

কেন এই নীতিকে অদ্ভুত বলা হচ্ছে, তা বোঝা যায় হাইজেনবার্গের ব্যাখ্যাতেই। তিনি বলেন, ইলেকট্রনের মতো গতিশীল কণিকারা মোটেও সাধারণ বস্তুর মতো আচরণ করে না। আপনি একটি গাড়ির অবস্থান ও ভর একই সঙ্গে পরিমাপ করতে পারবেন, কিন্তু ইলেকট্রন কণাদের অবস্থান আর ভরবেগ একই সঙ্গে মাপতে পারবেন না। কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে ইলেকট্রনের ভরবেগ যদি মাপতে সক্ষম হন, তাহলে এর অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে ভরবেগটা আপনি মাপলেন, তখন ইলেকট্রন ঠিক কোন জায়গায় অবস্থান করছিল, সেটা বলা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে আপনি কোনো এক সময় ইলেকট্রনের অবস্থান যদি মাপেন, তখন ওর ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা ইলেকট্রনের অবস্থান কোথায় যখন জানতে পারবেন, সেই সময়ে ইলেকট্রনের ভরবেগ কত ছিল, সেটা জানতে পারবেন না।

এটা একটা অদ্ভুত সমস্যা। তারপরও কিন্তু দুনিয়া চলছে, এই অনিশ্চয়তা মেনে নিয়েই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সব হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। তার ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে ইলেকট্রনিকসের মতো প্রযুক্তিবিদ্যা।

তখন বিজ্ঞানীদের বুঝতে বাকি রইল না, বক্তব্য দুই রকম হলেও শ্রোডিঙ্গার আর হাইজেনবার্গের তত্ত্বের মূল কথা কিন্তু একই, অর্থাৎ খুদে কণাদের তরঙ্গ ধর্ম আছে আর এরা অনিশ্চয়তা–নীতি মেনে চলে।

কয়েক বছরের মধ্যে অনিশ্চয়তা–নীতির অনেকগুলো ডালপালা গজায়। সেখানে বেরিয়ে আসে এই অধ্যায়ের শুরুতে করা প্রশ্নটির উত্তর। অর্থাৎ কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার সময় ইলেকট্রনেরা আসলে কোথায় থাকে, এর ব্যাখ্যা।

অনিশ্চয়তা–নীতি থেকে একটা অদ্ভুত কথা ছড়িয়ে পড়ে। ইলেকট্রনের মতো খুদে কণিকারা নাকি একই সঙ্গে কণা আর তরঙ্গরূপে থাকে, কিন্তু এদের আপনি যেভাবে দেখতে চাইবেন, সেভাবেই সে দেখা দেবে। মোদ্দাকথা, আপনি যদি একে কণা হিসেবে দেখতে চান, তাহলে এর কণা রূপই দেখতে পাবেন। আবার যদি তরঙ্গ হিসেবে দেখতে চান, তাহলে তরঙ্গ হিসেবেই পাবেন।

এ কথা শুনে ভীষণ চটেছিলেন কোয়ান্টামের অন্যতম জনক আলবার্ট আইনস্টাইন। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছিলেন অনিশ্চয়তার নীতিকে। আইনস্টাইন যত বড় মহারথীই হোন, সত্যের কাছে মহারথীকেও হার মানতে হয়। ১৯২৭ সালে সলভে সম্মেলনে আইনস্টাইন কোয়ান্টামের অদ্ভুত ব্যাপারগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যুক্তি উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ধারক-বাহকেরাও হারার পাত্র নয়। আইনস্টাইনের একার বিপরীতে তখন নিলস বোরের একঝাঁক শিষ্য কোয়ান্টাম তত্ত্ববিদ—ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, পল ডিরাক, লুই দ্য ব্রগলি। অন্যদিকে আইনস্টাইনের পক্ষে শুধু এরইউন শ্রোডিঙ্গার। হ্যাঁ, অনিশ্চয়তা–নীতির অন্যতম কারিগর শ্রোডিংগার কোয়ান্টামের অদ্ভুত বিষয়গুলো মানতে পারছিলেন না।

পরদিন আইনস্টাইনের প্রতিটা যুক্তিকে খণ্ডন করে বোর বাহিনী ব্যাখ্যা করেছিলেন অনিশ্চয়তা নীতি কেন ঠিক। বোর তখন নিজ দেশ ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষক। তাঁর অধীনে গবেষণা করছেন বিশ্বের নামকরা সব তরুণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গবেষক। তাই সলভে সম্মেলনে বোর বাহিনী যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা বিশ্ববিজ্ঞানে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা নামে অমর হয়ে আছে। কোপেনহেগেন ব্যাখ্যায় আইনস্টাইন কিছুটা নরম হলেন, কিন্তু পুরোপুরি মন গলেনি তাঁর। সম্মেলনে অন্য বিজ্ঞানীরা সেটা মেনে নিলেন। যদিও পরে আইনস্টাইন আবার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকসের জয়যাত্রা থামাতে পারেননি।

এই লেখার শুরুর প্রশ্নটিতে ফিরে আসা যাক, কোয়ান্টাম লাফের সময় ইলেকট্রনরা কোথায় থাকে। অনিশ্চিয়তা–নীতি বলে দেয় সে প্রশ্নের উত্তর। সে উত্তরটিও অনিশ্চয়তা নীতির মতোই অদ্ভুত! অনিশ্চয়তা–নীতি বলে, দুই শক্তিস্তরের মাঝখানে ইলেকট্রনের থাকার কোনো জায়গা নেই। ইলেকট্রনরা আসলে শুধু শক্তিস্তরেই থাকে, এর মধ্যবর্তী কোনো স্থানে ইলেকট্রনরা থাকতে পারে না। অর্থাৎ শক্তি শোষণ করার সঙ্গে সঙ্গেই ইলেকট্রন ওপরের শক্তিস্তরে চলে যাচ্ছে। আবার শক্তি বিকিরণের সঙ্গে সঙ্গেই ইলেকট্রনরা নিচের শক্তিস্তরে চলে আসে। এ জন্য দুই শক্তিস্তরের মাঝখানের কোনো পথ এদের পাড়ি দিতে হয় না। কারণ, শক্তিস্তরের বাইরে, দুই শক্তিস্তরের মাঝামাঝি কোনো বিন্দুতে ইলেকট্রনকে অবস্থান করার অনুমতি কোয়ান্টাম মেকানিকস দেয় না। ভূতের মতো এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে উদয় হয় ইলেকট্রন। এটা সম্ভব হয় ইলেকট্রনের সুপার পজিশনের কারণে। সুপার পজিশনটাই আসলে একধরনের অলীক অবস্থানের মতো, যেখানে এর থাকার অনুমতি আসে সেখানেই সে থাকতে পারবে।

ধরা যাক, একটা ভূত থাকে এক পোড়োবাড়িতে। ১০ মাইল দূরে আরেকটা পোড়োবাড়ি আছে। মাঝখানে আর কোনো পোড়োবাড়ি নেই। ধরা যাক, ভূতদের রাজা একটা কড়াকড়ি আইন জারি করেছেন। সাধারণ ভূতেরা পোড়োবাড়ি ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারবে না, চলতে-ফিরতেও পারবে না। তবে এক পোড়োবাড়ি থেকে আরেক পোড়োবাড়িতে যেতে পারবে, কিন্তু তার জন্য মাঝখানের কোনো রাস্তাই ব্যবহার করতে পারবে না। মানুষের পক্ষে সম্ভব হতো না আকাশ, জল কিংবা স্থলপথ ব্যবহার না করে এক পোড়োবাড়ি থেকে আরেক পোড়োবাড়িতে যাওয়া। কিন্তু ভূত বলে কথা! ওদের পক্ষে সম্ভব মাঝখানের কোনো পথ ব্যবহার না করেই এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে পৌঁছে যাওয়া। সেটা কীভাবে সম্ভব?

এর জন্য চাই অলৌকিক শক্তি। ধরা যাক, ভূতের রাজার সেই শক্তি আছে। তিনি একটা ভূতকে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি দিলেন। সেই শক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে যাবতীয় নির্দেশনা অর্থাৎ এই শক্তি গ্রহণ করে ভূতটা কোন পোড়োবাড়িতে যাবে, তার নির্দেশনা। তারপরও মাঝের কোনো রাস্তা পার না হয়েই কীভাবে ভূতটা ১০ মাইল দূরের অন্য পোড়োবাড়িতে যেতে পারবে? এটা সম্ভব যদি অলৌকিক শক্তি লাভের পর ভূতটা এই পোড়োবাড়ি থেকে একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল, এখানকার ভূতের মধ্যে যে তথ্য ছিল, অর্থাৎ ভূতটা কী দিয়ে তৈরি, দেখতে কেমন, কী খায় ইত্যাদি তথ্যগুলো জমা হলো ১০ মাইল দূরের ওই পোড়োবাড়িতে। অলৌকিক শক্তিটা এই তথ্যগুলো ব্যবহার করেই ১০ মাইল দূরের ওই পোড়োবাড়িতে হুবহু এই ভূতটার একটা কপি তৈরি করে দিল। পুরো ঘটনাটা ঘটবে এক লহমায়। যখনই এখানকার ভূতটা ধ্বংস হচ্ছে, তখনই ১০ মাইল দূরের পোড়োবাড়িতে ভূতটার হুবহু কপি তৈরি হচ্ছে। খালি চোখে মনে হবে এখানকার ভূত একমুহূর্তেই ১০ মাইল দূরের পোড়োবাড়িতে চলে গেল।

হুবহু এমন ঘটনা না ঘটলেও কোয়ান্টামের জগৎটা আসলে এমনই ভুতুড়ে। ইলেকট্রন যখন শক্তি শোষণ করছে, সে আসলে ওই শক্তিস্তরে থাকা নির্দেশনা অনুসারে তার নিজের কক্ষপথ থেকে ভ্যানিশ হচ্ছে এবং অন্য শক্তিস্তরে গিয়ে নিজের কপি তৈরি করছে। এই একমুহূর্তেই এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শস্তিস্তরে যাওয়ার যে ক্ষমতা বা দুই শক্তিস্তরের মাঝখানে ইলেকট্রনের কোনো বাস্তব অবস্থান না থাকা, এই ব্যাপারটিকেই বলে ইলেকট্রনের সুপারপজিশন। এই সুপারপজিশনের কারণেই কোনো নির্দিষ্ট শক্তিস্তরের কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে তাই ইলেকট্রনকে পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ থাকে না। তরঙ্গ ফাংশনের মাধ্যমে ইলেকট্রন কোথায় থাকতে পারে, তার একটা সম্ভাবনা বের করা যায় মাত্র।

অনিশ্চয়তা–নীতি, তরঙ্গ ফাংশনের এ ধরনের বৈশিষ্ট্যই পরে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল, এর কারণেই এসেছিল কোয়ান্টাম অ্যান্টেঙ্গলমেন্টের ধারণা। পরে ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের মাধ্যমে খুদে কণিকাদের বিস্ময়কর এই চলার পথের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: ফিজিকস ডট ওআরজি

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন