লাইব্রেরিতে প্রচুর বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ছিল, সেসব বই পড়তাম। এভাবেই ধীরে ধীরে আগ্রহ বেড়েছে। পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, কোডিং—এসবের প্রতি ভালো লাগা তো আছেই, সমস্যা সমাধানের প্রতি আমার সব সময় ঝোঁকও ছিল।

বিজ্ঞানচিন্তা: যুক্তরাষ্ট্রের সায়েন্স নিউজ-এর দৃষ্টিতে আপনি ২০২০ সালের উল্লেখযোগ্য ১০ বিজ্ঞানীর একজন। কেন তারা আপনার কাজটি বিশেষভাবে মূল্যায়ন করছে?

তনিমা তাসনিম: যত দূর জানি, সায়েন্স নিউজ-এ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী, আমেরিকান অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল সোসাইটির সদস্য বা এর আগে যাঁরা এই তালিকায় ছিলেন, তাঁরাই নাম মনোনয়ন দেন। আমি জানি না কে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। গবেষণার কাজ জানান দিতে পারলে বেশ ভালো, তাতে দারুণ সব মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। আমাদের কাজটা জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ কিছু সুযোগ পেয়েছি। যেমন আমাকে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল থেকে আহ্বান জানানো হয় পেপার রিভিউ করার জন্য। নাসা কোন কোন গবেষণা প্রকল্পকে তহবিল দেবে, তা নির্ধারণ করতে তাদের প্যানেলের সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণও আমি পেয়েছি। এসব থেকে ধারণা করতে পারি, আমার গবেষণা অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

বিজ্ঞানচিন্তা: শুনেছি, মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে যখন পড়তেন, তখন থেকেই আপনার আগ্রহ জ্যোতির্বিজ্ঞানে।

তনিমা তাসনিম: একদম ক্লাস ওয়ান থেকেই এই ইচ্ছা। ছোটবেলায় আম্মু যখন খবরের কাগজ পড়ে আমাকে জানালেন, পাথফাইন্ডার মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করেছে। আমি বললাম, গ্রহ কী? আম্মু বুঝিয়ে বললেন, পৃথিবীর মতোই একটা গ্রহ, যেখানে সবকিছু লাল...। আস্তে আস্তে বুঝলাম, পৃথিবীর বাইরেও অনেক বড় একটা জগৎ আছে। আমাদের অস্তিত্ব সেখানে খুব ছোট। তখন থেকেই ঠিক করে ফেলেছিলাম, আমি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়ব।

বিজ্ঞানচিন্তা: তখন থেকেই কি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন?

তনিমা তাসনিম: মানারাতে একটা চমৎকার কম্পিউটার ল্যাব ছিল, সেখানে আমি মনের মতো কোডিং (প্রোগ্রামিং সংকেত লেখা) করতে পারতাম। লাইব্রেরিতে প্রচুর বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ছিল, সেসব বই পড়তাম। এভাবেই ধীরে ধীরে আগ্রহ বেড়েছে। পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, কোডিং—এসবের প্রতি ভালো লাগা তো আছেই, সমস্যা সমাধানের প্রতি আমার সব সময় ঝোঁকও ছিল। দেখা গেল, কোনো একটা কারণে মানসিক চাপে আছি, আমি অঙ্ক করতে বসে যেতাম। গান শুনতে শুনতে কোডিং করতাম। একটা কিছু বোঝার মধ্যে আনন্দ আছে। হয়তো এটি আপনার পরবর্তী জীবনে কোনো কাজে আসবে না, তবু। পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান ‘দ্য প্লেজার অব ফাইন্ডিং থিংস আউট’ বইয়ে এ বিষয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তাঁর কথাগুলোর কিছু ইউটিউব ভিডিও আছে। তিনি যেভাবে বিজ্ঞানচর্চা করার আনন্দ বর্ণনা করেছেন, আমার কাছে সেটা বাস্তবের কাছাকাছি মনে হয়।

বিজ্ঞানচিন্তা: জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যেহেতু ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল, এ লেভেলের পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিনমার কলেজে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গেলেন, তখন এমন কোনো মুহূর্ত কি এসেছে, যখন মনে হয়েছে এ মুহূর্তটার জন্যই তো আমি অপেক্ষা করছিলাম কিংবা এমনটাই তো সায়েন্স ফিকশন বইতে পড়েছি!

তনিমা তাসনিম: গল্প তো আদতে গল্পই। এর সঙ্গে বাস্তব মেলে না। তবে ব্রিনমারের হ্যাভারফোর্ড কলেজে পড়ার সময় ‘ইউরেকা’ বলার মতো অনেক মুহূর্ত এসেছে। আচ্ছা, নির্দিষ্ট একটা উদাহরণ দিয়েই বলি। আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। সেখানে পাহাড়ের ওপর কিছু অবজারভেটরি ছিল। অবজারভেটরিতে বসে টেলিস্কোপ দিয়ে আমরা আকাশ দেখতাম। পাহাড় যেহেতু শহর থেকে দূরে, দূষণ কম, তাই অবজারভেটরিগুলো থেকে কাজ করতে সুবিধা হতো। আকাশগঙ্গার আশপাশে আরও অনেক ছোট ছোট ছায়াপথ আছে। আমরা সেগুলোর ছবি তুলেছি। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা উপাত্ত সংগ্রহ করছিলাম। কিছু তারা আছে, যেগুলোর ঔজ্জ্বল্যের তারতম্য হয়। ছয় ঘণ্টা পরপর একটা সাইন কার্ভের মতো পাওয়া যায়। হাজার হাজার তারা আছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমন একটা তারা খুঁজে বের করা, যেটা ঠিক সাইন কার্ভের মতো হয়। রাত একটার সময় আমি ঠিকঠাক একটা সাইন কার্ভ পেয়ে গেলাম! অবজারভেটরিতে আমি তখন একা, চারদিকে অন্ধকার। আমার আনন্দটা ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতোও কেউ ছিল না। ১৫ মিনিট পরই ক্যাম্পাসে যাওয়ার শেষ বাস। দৌড়ে গিয়ে বাস ধরলাম। সব বিজ্ঞানীরই এমন হয়। কিছু বুঝতে পারছি না...। তারপর হঠাৎ মিলে যায়! মনে হয়, কী দারুণ!

বিজ্ঞানচিন্তা: নাসা বা সার্নের মতো জায়গায় কাজ করার সুযোগ কীভাবে পেলেন?

তনিমা তাসনিম: ব্রিনমার খুব ছোট একটা ক্যাম্পাস। ক্লাস সাইজ ছোট হলে শিক্ষকদের সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো হয়। আমার খুব সৌভাগ্য, আমি নিজের মতো করে শিখতে পেরেছি। তা ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত প্রোগ্রামিংটা ঝালাই করতে পেরেছিলাম বলেই আমি পরে নাসা বা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্নের (দ্য ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ) মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশির সুযোগ পেয়েছি। সার্নে যখন ছিলাম ২০১২ সালে, তখনই হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়। ব্রিটিশ পদার্থবিদ পিটার হিগস তখন এসেছিলেন। তাঁর মতো একজন ‘রকস্টার’ পদার্থবিদকে সামনাসামনি দেখা এক পরাবাস্তব অনুভূতি! নাসায় আমি অ্যাডাম রিজকে দেখেছি। তিনি ১৯৯৮ সালে ডার্ক এনার্জি আবিষ্কার করেছিলেন।

বিজ্ঞানচিন্তা: কখনো কি মহাকাশচারী হওয়ার কথা ভেবেছেন?

তনিমা তাসনিম: এটা তো সবারই স্বপ্ন—মহাকাশচারী হব। আমি বলব না, এখন এই স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু বেশ কিছু বাধা আছে। কারণ, আমি বাংলাদেশি। সরাসরি মহাকাশচারী আমি হতে পারব না। কারণ, মহাকাশচারী হতে হলে নির্দিষ্ট একটা জাতীয়তা থাকতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম নেওয়া একজনের জন্য এই স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, আমার জন্য ব্যাপারটা সে রকম নয়। কখনো সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই আমিও চেষ্টা করব।

বিজ্ঞানচিন্তা: আপনি বিখ্যাত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। ইয়েলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। এই যাত্রায় এমন কোনো শিক্ষা কি আছে, যেটা আপনি তরুণদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে চান?

তনিমা তাসনিম: কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ইদানীং গ্রোথ মাইন্ডসেট (আরও ভালো করার মানসিকতা) বলে একটা কথা খুব শোনা যায়। এ সম্পর্কে স্ট্যানফোর্ডের অধ্যাপক ক্যারল ডোয়েকের একটা ছোট বই আছে। পড়ে দেখতে পারেন।

বিজ্ঞানচিন্তা: নারীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে আগ্রহী করতে আপনি একটা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে জানি—উইমেন ইন স্টেম, সংক্ষেপে উই-স্টেম। কী পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করেছিলেন বা এখন কী কাজ করছেন?

তনিমা তাসনিম: ২০১৫ সালে হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা বেশ কিছু কর্মশালা করেছিলাম। ২০১৬-১৭ সালে আমরা কিছু মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকল্প উপস্থাপন করেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে আগ্রহী মেয়েদের আমরা সাহায্য করতে চাই।

বিজ্ঞানচিন্তা: গবেষণা এমন একটা কাজ, যেটার জন্য প্রচুর ধৈর্য লাগে। আপনিও নিশ্চয়ই কাজ করতে করতে কখনো ক্লান্ত হয়ে যান। হয়তো মনে হয়, আর পারছি না কিংবা হচ্ছে না। তখন কীভাবে নিজেকে অনুপ্রাণিত করেন?

তনিমা তাসনিম: একটা কাজ এক ভাবে না হয়ে অন্য ভাবেও হতে পারে। আগে কেউ একজন করে গেছে, আমি হয়তো তাঁকে অনুসরণ করছি কিংবা আমার একটা আইডিয়া নিয়ে হয়তো এগোচ্ছি। কিন্তু অন্যভাবেও করা যায়। রিচার্ড ফাইনম্যানের কথা আগেই বলেছি, তাঁর কাছ থেকে আমি অনুপ্রেরণা পাই। কখনো কখনো গল্পের চরিত্ররাও অনুপ্রাণিত করে। আমার নিজস্ব আরেকটা পদ্ধতি আছে। আমার কাজের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, আমি এমন কোনো দক্ষতা রপ্ত করতে চেষ্টা করি। সেটাই কোনো না কোনোভাবে কাজে লেগে যায়।

বিজ্ঞানচিন্তা: তরুণদের জন্য যদি তিনটি উপদেশ দিতে হয়, কী বলবেন?

তনিমা তাসনিম: আপনি যখন কিছু করতে যান, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেখবেন, অনেকে আপনাকে নিরুৎসাহিত করবে। আবার ধরুন, আমি একটা অঙ্ক করতে চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না—এটা স্রেফ একটি চ্যালেঞ্জ। আপনি যখন আপনার মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ করেন, মস্তিষ্ক আরও পরিণত হয়। অতএব হাল ছাড়া যাবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয় পরামর্শ হলো আমি যতটুকু জানি, ততটুকুই বলব। কাউকে প্রভাবিত করতে আমি যতটুকু জানি, তার চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস দেখাব না। আর সব শেষ কথা, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকতে হবে সব সময়। আমি প্রতিদিন যতটুকুই কাজ করি না কেন, নিজের সেরাটা দেব।

বিজ্ঞানচিন্তা: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে? দেশের ছেলেমেয়েরা যদি আপনার কাছ থেকে শিখতে চায় বা আপনার সঙ্গে গবেষণা করতে চায়, কী করতে পারেন?

তনিমা তাসনিম: গবেষণাই চালিয়ে যাব, না শিক্ষকতার দিকে যাব—আমি এখনো ঠিক করিনি। স্থায়ী কোনো চাকরি করলে সেটা সম্ভবত বাংলাদেশে হবে না। কিন্তু আমি দেশে কিছু ক্লাস নিতে পারি, কয়েকজনকে গবেষণার সুযোগ করে দিতে পারি। আর আমার সঙ্গে যদি যোগাযোগ করতে চায় বা কাজ করতে চায়, উই-স্টেম একটা ভালো উপায়। কর্মশালা আয়োজন করে কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত প্রকৃত উপাত্ত দিয়ে আমি তাদের সাহায্য করতে পারি।