পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়ম মানছে না আলো!

ছবি: সাইটেক ডেইলি

আলোর একটা স্বভাব আছে—আলো যখন প্রিজম বা লেন্সের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার বিভিন্ন রং বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা হয়ে যায়। রংধনু দেখার জন্য ব্যাপারটা দারুণ হলেও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য তা বেশ বড় সমস্যা। একে বলে ক্রোমাটিক অ্যাবারেশন বা বর্ণের বিচ্যুতি।

মনে করুন, আপনি একটা চশমা পরেছেন। সেই চশমা দিয়ে লাল রঙের বস্তুকে এক জায়গায় দেখছেন, আর নীল রঙের বস্তুকে দেখছেন আরেকটু দূরে। ঝাপসা লাগবে না? বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছেন কীভাবে একটি সমতল পৃষ্ঠের ওপর আলোর এই রং না হারানো বা অ্যাক্রোম্যাটিক স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষ করে কৃত্রিম পৃষ্ঠতল ব্যবহার করে।

সম্প্রতি চীনের নানজিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইজুন ফেং এবং কে চেনের নেতৃত্বে একদল গবেষক ঠিক এই অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা এমন একটি কাগজের মতো পাতলা পৃষ্ঠ তৈরি করেছেন, যা আলোর রঙের স্বচ্ছতা নষ্ট না করেই তাকে দুটি ভিন্ন পথে চালনা করতে পারে। তাঁদের এই যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ফোটোনিক্স জার্নালে।

সাধারণত আলো যখন কোনো মেটাসারফেসের ওপর পড়ে, তখন তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে আলোর ঘূর্ণন আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। একটাকে ঠিক করতে গেলে আরেকটা বিগড়ে যেত।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছেন কীভাবে একটি সমতল পৃষ্ঠের ওপর আলোর এই রং না হারানো বা অ্যাক্রোম্যাটিক স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষ করে কৃত্রিম পৃষ্ঠতল ব্যবহার করে।

সহজ করে বললে, আপনি এমন একটা ট্রাফিক পুলিশ চাইলেন যে লাল গাড়িকে ডানে যেতে বলবে আর নীল গাড়িকে বাঁয়ে। কিন্তু দুটোর গতি বা সময় একই থাকবে। সাধারণ লেন্সে বা মেটাসারফেসে এটা করতে গেলে ঝামেলা হয়। একটার ফোকাস ঠিক থাকলে অন্যটার ফোকাস নড়ে যায়।

কিন্তু নানজিং ইউনিভার্সিটির গবেষক দলটি এক নতুন জাদুকরী উপায় বের করেছেন। তাঁরা দুটি জ্যামিতিক দশাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। একটার নাম আহারোনভ-আনন্দান ফেজ, আরেকটার নাম পঞ্চরত্নম-বেরি ফেজ। নামগুলো খটমট শোনালেও কাজটা বেশ চমকপ্রদ।

গবেষকেরা তাদের তৈরি মেটাসারফেসের প্রতিটি ক্ষুদ্র কণা এমনভাবে ডিজাইন করেছেন, যাতে আলোর দুটি ভিন্ন স্পিন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তাঁরা আলোর জন্য এক ঢিলে দুই পাখি মারার ব্যবস্থা করেছেন। একটি ফেজ আলোর স্পিন আলাদা করে ফেলে। ফলে ডানহাতি আলো এক পথে এবং বাঁহাতি আলো আরেক পথে যেতে পারে। অনেকটা রাস্তার মোড়ে গাড়ি আলাদা করার মতো।

অন্য ফেজটি আলোর পথকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে রং বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য পাল্টে গেলেও ফোকাস ঠিক থাকে। ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক বদলালেও আলোর দিশা হারায় না। ফলে মাত্র একটি পাতলা স্তরের মাধ্যমেই আলোকে ইচ্ছামতো বাঁকানো বা ফোকাস করা সম্ভব হচ্ছে, কোনো রকম রঙের বিচ্যুতি ছাড়াই। আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, স্পিন ও রঙের এই সম্পর্ক আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। এই গবেষণা সেই অসম্ভব দেয়ালটা ভেঙে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা তাদের তৈরি মেটাসারফেসের প্রতিটি ক্ষুদ্র কণা এমনভাবে ডিজাইন করেছেন, যাতে আলোর দুটি ভিন্ন স্পিন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

গবেষকেরা শুধু তত্ত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাঁরা পরীক্ষাগারে ৮ থেকে ১২ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন। (তাঁরা আপাতত মাইক্রোওয়েভ রেঞ্জে এটি সফলভাবে পরীক্ষা করেছেন, যা ভবিষ্যতে দৃশ্যমান আলোর ক্ষেত্রেও কাজ করবে।) তাঁরা দুটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। একটি বিম ডিফ্লেক্টর, অন্যটি মেটালেন্স। বিম ডিফ্লেক্টর আলোকে নির্দিষ্ট পথে বাঁকিয়ে দেয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর স্পিন অনুযায়ী এটি নিখুঁতভাবে আলোকে দুই দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে, অথচ কোনো রঙের বিকৃতি ঘটছে না। আর মেটালেন্স সাধারণ লেন্সের মতো আলোকে এক বিন্দুতে ফোকাস করে। এখানেও দেখা গেছে, ডানহাতি ও বাঁহাতি আলোর জন্য এটি আলাদা আলাদা ফোকাস তৈরি করতে পারছে একই সময়ে। এমনকি টেরাহার্টজ রেঞ্জেও এটি কাজ করছে। এর মানে হলো, এই প্রযুক্তি শুধু নির্দিষ্ট কোনো তরঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য।

এই আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে আমাদের অপটিক্যাল সিস্টেম বা আলোকযন্ত্রগুলোতে বিশাল পরিবর্তন আসবে। বর্তমানের ক্যামেরা বা সেন্সরে একাধিক লেন্স ব্যবহার করে রঙের সমস্যা সমাধান করা হয়। ফলে ডিভাইসগুলো ভারী ও মোটা হয়। এই নতুন প্রযুক্তিতে একটি পাতলা কাচ বা প্লাস্টিকের টুকরোই করতে পারবে হাজারটা লেন্সের কাজ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই ডিজাইনকে আরও নিখুঁত করা সম্ভব। তখন হয়তো আমাদের চশমা, ফোনের ক্যামেরা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা হলোগ্রাফিক ডিসপ্লেগুলো হবে আরও পাতলা ও শক্তিশালী।

অধ্যাপক ফেং এবং তাঁর দল বিশ্বাস করেন, মেটা-অপটিক্সের জগতে এটি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। আলো এখন আর বিজ্ঞানীদের ইশারার বাইরে নয়, বরং হাতের মুঠোয়!

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: ফোটোনিক্স জার্নাল ও ফিজিক্স ডটঅর্গ

আরও পড়ুন