সার্বজনীন মহাকর্ষ কী?

কিন্তু এখানে নিউটন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপেল ওপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকে পড়ে কেন?’ ব্যস, এই ভাবনাই তাঁকে সন্ধান দিল গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ নামের যুগান্তকারী একটি তত্ত্বের।

১৭ শতকের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রকৃতিকে, বিশেষ করে মহাকর্ষকে বোঝার চেষ্টা করছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। কথিত আছে, তাঁর গ্রামের বাড়িতে একদিন এক আপেল গাছের নিচে বসেছিলেন তিনি। সে সময় আপেল গাছ থেকে একটা আপেল খসে তাঁর মাথায় পড়েছিল। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আপেল গাছ থেকে নিচে পড়ে। এটাই স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নিয়েছিল মানুষ। কিন্তু এখানে নিউটন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপেল ওপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকে পড়ে কেন?’ ব্যস, এই ভাবনাই তাঁকে সন্ধান দিল গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ নামের যুগান্তকারী একটি তত্ত্বের।

অবশ্য আপেল সংক্রান্ত এই ঘটনাটি মিথ বা কিংবদন্তী বলেই ধারণা করেন অনেকে। তবে নিউটনের সমসাময়িক উইলিয়াম স্টুকলির কাছে এমন ঘটনার উল্লেখ করেছেন স্বয়ং নিউটন। সেটিই লিখে গেছেন নিউটনের এই জীবনীকার। এই আপেল কাহিনি উল্লেখ করার পেছনে অন্য কিছু কারণ জড়িত বলে সন্দেহ করেন বিরুদ্ধবাদীরা বা মিথ তত্ত্বে বিশ্বাসীরা।

যাহোক, আপেল পড়ার সময় নিউটনের ভাবনা কী ছিল, তা কারো সঠিকভাবে জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, তিনি বুঝতে পারেন, আপেলটি স্থির অবস্থা (গাছে ঝুলে থাকা) থেকে গতিশীল (গাছ থেকে খসে নিচের দিকে ত্বরিত বেগে ধাবিত হওয়া) হয়। এতে বোঝা যায়, আপেলটির মাটির দিকে ত্বরণের পেছনে অবশ্যই রহস্যময় কোনো বল দায়ী। এই বলটিকেই অভিকর্ষজ ত্বরণ বা মহাকর্ষ নাম দেন নিউটন।

এরপর নিউটন যা করলেন, তা তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর। পৃথিবীর অভিকর্ষ বা অভিকর্ষজ ত্বরণ যদি সামান্য একটা আপেলের ওপর ক্রিয়াশীল হয়, তাহলে এই বল কি আরও দূরের কোনো বস্তুর ওপরও কাজ করবে? নিউটন ভাবলেন, এটা হতে পারে। আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল, চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তিনি গাণিতিক হিসেব কষে দেখলেন, পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানকে ভারসাম্যে রাখার মতো একটি বেগে ঘুরে চলেছে চাঁদ। এই বেগটা এমন বেশিও নয়, যার কারণে পৃথিবীর এই টান উপেক্ষা করে চাঁদ মহাশূন্যে ছিটকে পড়তে পারে। কিংবা এমন কিছু কমও নয়, যার কারণে তা পৃথিবীর টানে ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়তে পারে।

নিউটন যুক্তি দেখালেন, এই ধারণা ব্যবহার করে সূর্যের চারপাশের কক্ষপথে পৃথিবীর গতিও ব্যাখ্যা করা যায়

নিউটন এখানেই থামলেন না। তিনি যুক্তি দেখালেন, এই ধারণা ব্যবহার করে সূর্যের চারপাশের কক্ষপথে পৃথিবীর গতিও ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর লেখা বিখ্যাত প্রিন্সিপিয়াতে তা গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যাও করলেন। তিনি বললেন, মহাকর্ষ একটি সার্বজনীন বল। আর মহাবিশ্বের সব বস্তু অবশ্যই অন্যান্য বস্তুর মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবের আওতাধীন। দূরত্ব যত বাড়ে, এই বলের প্রভাব তত কমে (বর্গীয় ব্যস্তানুপাতিক হারে)। সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠল।

অল্প কথায়

ধরা যাক, আপনি প্রমাণ সাইজের একটা পাথর তুলে ছুড়ে মারলেন। সেটা হয়তো কিছুদূর সামনে গিয়েই মাটিতে আছড়ে পড়বে। কিন্তু আপনার চেয়ে শক্তিশালী কেউ পাথরটা ছুড়লে হয়তো সেটা আরও কিছুদূর সামনে গিয়ে পড়বে। এভাবে যত জোরে ছোড়া হবে, পাথর আরও, আরও দূরে গিয়ে পড়বে। এবার একটু অতি কল্পনা করা যাক। ধরা যাক, অতি শক্তিশালী কেউ এত জোরে পাথরটা ছুড়তে পারে যে সেটা মাটিতে না পড়ে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে আসতে পারে (বাস্তবে এমন কেউ কি আছে? হারকিউলিস বেঁচে থাকলে তাকে দিয়ে পাথর ছুড়ে হয়তো পরীক্ষা করে দেখা যেত!)। ওই লোকটি যদি ঠিক মতো ছুড়তে পারে, তাহলে দেখা যাবে পাথরটা পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সময় ভূপৃষ্ঠ থেকে একই দূরত্ব বজায় রাখছে। বায়ুর ঘর্ষণ অগ্রাহ্য করা হলে দেখা যাবে, পাথরটা অনবরত ঘুরেই চলেছে। অর্থাৎ, পাথরটা এখন পৃথিবীর চারপাশে তার একটি কক্ষপথে ঘুরবে। এই কার্যকারণ থেকেই নিউটনের সূত্র ব্যাখ্যা করে, গ্রহরা কেন সূর্যের চারপাশে বিরামহীনভাবে ঘুরছে। আবার, এই কার্যকারণটিকেই আরেকটু সুক্ষ্মভাবে ব্যবহার করে চাঁদ বা কৃত্রিম উপগ্রহগুলো নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে পৃথিবীর চারপাশে।

বস্তুর ভর ও দূরত্বের ওপর এই বল নির্ভরশীল

হ্যাক

মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু বা মানুষকে অন্যসব বস্তু টানছে। এই টান বা আকর্ষণ বলকে বলা হয় মহাকর্ষ বা গ্র্যাভিটি। শুধু পৃথিবীর ক্ষেত্রে এই বলকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বা অভিকর্ষ নামে ডাকা হয়। তবে এই নামটি শুধু বাংলায় রয়েছে, ইংরেজি দুটোরই এক। একে ইংরেজি G দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

বস্তুর ভর ও দূরত্বের ওপর এই বল নির্ভরশীল। ভর যত বেশি হবে, এই বলও তত বাড়বে। আর দূরত্ব বাড়লে কমবে।

নিউটনের ভাষায়, ‘মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটোর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং এদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক। এই বল বস্তু দুটোর কেন্দ্র সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।’

গাণিতিকভাবে, দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল F=G(m1.m2/r2)

এখানে F হলো বলের পরিমাণ

G হলো গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ

m1 হলো প্রথম বস্তুর ভর

m2 হলো দ্বিতীয় বস্তুর ভর

আর r হলো বস্তু দুটোর মধ্যবর্তী দূরত্ব।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: সায়েন্স হ্যাক, থার্টি সেকেন্ড ফিজিকস, উইকিপিডিয়া