অদেখা আলো, না দেখা রূপ

উইলিয়াম হার্শেল। ইংরেজ জ্যোতির্বিদ। নিজের দেশ জার্মানি থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বসতি গড়েছেন ইংল্যান্ডে। নতুন দেশে এসেই সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। ১৭৮১ সালে নিজের বানানো দুরবীন দিয়ে আবিষ্কার করলেন নতুন একটা গ্রহ। নীলচে রঙা গ্রহ ইউরেনাস। এরপর পরই গোটা ইউরোপজুড়ে তার খ্যাতি। রাজকীয় সম্মানও জুটল মাথার পালকে। সেটা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলেন ঠিকই, তবে জ্ঞানের তৃষ্ণা মিটল না। তাই গবেষণা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

১৮০০ সালের দিকে সূর্যের আলো নিয়ে গবেষণা করছিলেন হার্শেল। সূর্যের আলোর রং ও তাপের ভেতর কোন সম্পর্ক আছে কি? প্রিজমের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো চালিয়ে সেটা খতিয়ে দেখছিলেন এই বিজ্ঞানী। অবশ্য নতুন কিছুই পেলেন না তিনি। এর প্রায় দেড় শ বছর আগে, সেই ১৬৬৬ সালে নিউটন এই পরীক্ষাটি করে দেখেছিলেন। সেবার নিউটন প্রমাণ দেখান, দৃশ্যমান সাদা আলো আসলে বিভিন্ন বর্ণের আলোর বুণন। সাদা আলোকে প্রিজমের মধ্য দিয়ে চালনা করলে তা রংধনুর সাতটি রঙে বা লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, আসমানি, নীল ও বেগুনি বর্ণে বিশ্লিষ্ট হয়ে যায়।

নিউটনের তত্ত্বমতে, এখানে লাল আর বেগুনি আলোর বর্ণালির সীমানা নির্দেশ করে। হার্শেল জানতে চাইছিলেন, এই প্রতিটি রঙের আলাদাভাবে তাপমাত্রা কত হতে পারে। তাই তিনি প্রিজম থেকে পাওয়া বর্ণালির বিভিন্ন অঞ্চলে পারদ থার্মোমিটার রেখে পরীক্ষা করলেন। তিনি দেখতে পেলেন, থার্মোমিটারটির বর্ণালি বেগুনি থেকে লাল আলোর দিকে নিলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এভাবে হার্শেল প্রমাণ করে দেখালেন, ভিন্ন ভিন্ন রঙের তাপমাত্রাও বিভিন্ন।

মজার ব্যাপারটি ঘটল হঠাৎ এক দুর্ঘটনায়। বেখেয়ালে তিনি হাতের থার্মোমিটারটি লাল আলোর ব্যান্ডের এক ইঞ্চি নিচে রেখেছিলেন। দৃশ্যত সেখানে কোনো রঙের আলোই ছিল না। তাই হার্শেলের আশা ছিল, পরীক্ষায় থার্মোমিটারের তাপমাত্রা কক্ষ তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হবে না। কিন্তু ফলাফল দেখে চোখ কপালে উঠল। দেখা গেল, এবার লাল আলোর নিচের থার্মোমিটারে তাপমাত্রা লালের চেয়ে বেশি দেখাচ্ছে। সেটা কীভাবে সম্ভব? ওই অদৃশ্য অংশে কোন অদৃশ্য আলো আছে নাকি? সেটাই সম্ভব বলে ধরে নিলেন হার্শেল। এই অদৃশ্য আলোর নাম দেওয়া হল ইনফ্রারেড বিকিরণ। লাতিন ইনফ্রা (Infra) শব্দটির অর্থ নিচে। অর্থাৎ, ইনফ্রারেড অর্থ লালের নিচে। বাংলায় অবলোহিত বা অবলাল। এই ‘অব’ উপসর্গও ব্যবহার করা হয়েছে ইংরেজির মতো নিম্নগামী বা নিচে অর্থে।

এরপর অদৃশ্য আলো ধরতে জাল পাতার হিড়িক পড়ল বিজ্ঞানীদের মধ্যে। হার্শেলের ঠিক এক বছরের মাথায় এভাবে বেগুনি আলোর উপরে আরেকটা অদৃশ্য আলোর ধরা পড়ল। ১৮০১ সালে সেটা আবিষ্কার করলেন জার্মান পদার্থবিদ জোহান উইলহেম রিটার। এই আলোর নাম দেওয়া হল অতিবেগুনি বা আলট্রাভায়োলেট আলো।

এরপর একে একে আরও বেশকিছু অদৃশ্য আলো আবিষ্কৃত হল। মোদ্দা কথা হল, মহাবিশ্বের মোট আলোকে মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। তাদের একভাগ আমাদের চোখে দৃশ্যমান, বাকি অংশ আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। পুরোপুরি অদৃশ্য। তবে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সেই আলোর অস্তিত্ব যে সত্যিই আছে তা বোঝা যায়।

উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ দিলেন। সেগুলো এখন ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ নামে পরিচিত। তার সমীকরণ মতে, সব ধরনের আলোই—মানে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আলো আসলে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বর্ণালীর বাসিন্দা। এই পরিসরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আলো ও রং রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিটি দৃশ্যমান বা অদৃশ্য আলোকে আলাদা করে চেনার উপায় কী? সেটা করার একটা নয়, দুটি উপায় আছে বিজ্ঞানীদের কাছে। প্রথমটা হল ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং দ্বিতীয়টা হল ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাংক।

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল কোন আলোর তরঙ্গের দৈর্ঘ্য বা আলোর তরঙ্গটা কতটুকু লম্বা তার পরিমাণ। এর বিস্তৃতি এক মিলিমিটারের অতিক্ষুদ্র ভগ্নাংশ থেকে শুরু করে এক কিলোমিটারের বেশি হতে পারে। যেমন বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৩৮০ ন্যানোমিটার। এক ন্যানোমিটার হল এক মিটারের এক শ কোটি বা এ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। বোঝার সুবিধার জন্য বলা যায়, একটা ভাইরাসের ব্যাস প্রায় ২০ ন্যানোমিটার বা তার বেশি হতে পারে। অন্যদিকে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বর্ণালীর সবচেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল রেডিও বা বেতার তরঙ্গের। এদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিলিমিটার থেকে শুরু করে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে কম্পাংক হল, কোন আলোর তরঙ্গ একটা নিদিষ্ট দূরত্ব পার হতে বা একটা চক্র সম্পূর্ণ করতে কতটুকু সময় নেয় তার হিসেব। এক সাধারণত হার্জ এককে প্রকাশ করা হয় (সংক্ষেপে Hz)। যেমন বেগুনি আলোর কম্পাংক ৬৭০ থেকে ৭৯০ টেরাহার্জ।

একটা সমুদ্রের ঢেউয়ের কথা কল্পনা করুন। খোলা সাগরে সাধারণ যে কোন ঢেউ প্রায় ৯০ মিটার লম্বা হতে পারে। অর্থাৎ এই দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পানিতে আছড়ে বা ভেঙে পড়ে ঢেউটা। সেটা মোটামুটি একটা ফুটবল মাঠের সমান লম্বা। কিংবা প্রায় ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতার ট্র্যাকের মতো লম্বা হতে পারে। এ ঢেউয়ের কম্পাংক এক সেকেন্ডেরও সামান্য কিছু কম হতে পারে। এর মানে, প্রতিটা ঢেউয়ের চূড়ার যেকোন বিন্দু পাড়ি দিতে প্রায় এক সেকেন্ড সময় লাগে এবং তারপর সেটা ঢেউয়ের খাত বা নিম্নবিন্দু দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। এরপরই পরবর্তী ঢেউয়ের শীর্ষবিন্দু একই পথ অনুসরণ করে।

তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা কম্পাংকের ভিত্তিতে আধুনিক বিজ্ঞান যেকোন ধরনের তরঙ্গ বা যেকোন ধরনের আলো শনাক্ত করতে পারে। যেমন কোন ট্রাফিক সিগন্যালে সবুজ আলোর প্রতিটি তরঙ্গের দৈর্ঘ্য ৫৩০ ন্যানোমিটার। মানে এক মিটারের ৫৩০ বিলিয়ন ভাগ। বলা যায়, এক ইঞ্চির প্রায় এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান। এই অতিক্ষুদ্র তরঙ্গের কম্পাংক প্রায় ৫৩০ টেরাহার্জ। এতে বোঝা যায়, প্রতি সেকেন্ডে ওই আলোর প্রায় ৫৩০ ট্রিলিয়ন কণা আপনার চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কাকতালীয় ব্যাপার হল, সবুজ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাংকের দুটো সংখ্যাই ৫৩০। তবে অন্য আলোর ক্ষেত্রে এরকম মিল দেখা যায় না।

ট্রাফিক লাইট যখন সবুজ থেকে বদলে লাল হয়ে যায়, তখন কিছু বড় দৈর্ঘ্যের আলো উপলব্ধি করেন আপনি। প্রায় দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যের। আসলে প্রতিটি লাল তরঙ্গের একটা শীর্ষ থেকে আরেক শীর্ষ পর্যন্ত প্রায় এক ইঞ্চির প্রায় দুই মিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান। দৃশ্যমান আলোর মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। তবুও আমাদের দেহে বসবাস করা জীবাণুর চেয়েও তার দৈর্ঘ্য ছোট। সবুজ আলোর তুলনায় লাল আলো বেশ ধীরে কম্পিত হয়। সেকেন্ডে এর তরঙ্গের কম্পন ৪৫০ ট্রিলিয়ন। খালি চোখে আমরা যেসব আলো দেখি, তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার। একে আরেকটা এককেও প্রকাশ করা যায়। ৪০০০ থেকে ৭০০০ অ্যাংস্ট্রম। কোন আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এর চেয়ে বেশি বা কম হলে সেগুলো আমরা দেখতে পাই না।

ছোট তরঙ্গের আলো বড় তরঙ্গের চেয়ে কম্পন দ্রুত পরিবর্তিত বা কম্পিত হয়। সে কারণে ছোট তরঙ্গের শক্তিও বেশি। আমরা যেসব আলো দেখি সেগুলোর শক্তি সে তুলনায় অনেক কম। দুর্বলও বলা যায়। কিন্তু ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর শক্তি এতই বেশি হতে পারে যে, তারা অণু বা পরমাণুকেও ভেঙে ফেলতে পারে। যেমন কোন পরমাণু থেকে এক বা একাধিক পরমাণু ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারে অতিবেগুনি রশ্মির মতো দ্রুত কম্পনশীল আলো। তাতে অণুর পরিবর্তন ঘটা সম্ভব এবং প্রাণিদেহে ক্যান্সারের সৃষ্টি হতে পারে।

অদৃশ্য আলোগুলোর নামকরণ করা হয়েছে সাধারণত তাদের তরঙ্গের আকার কিংবা বর্ণালীতে দৃশ্যমান আলোর সাপেক্ষে তাদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। সে কারণে বর্ণালীতে ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলোর অবস্থান লাল আলোর ঠিক আগে। মানে অবলোহিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল আলোর চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে অতিবেগুনি আলোর অবস্থান বেগুনি আলোর ঠিক পরে। আর তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যও বেগুনি আলোর চেয়ে কিছুটা ছোট।

সবচেয়ে দুর্বল আলোর নাম রেডিও ওয়েভ বা বেতার তরঙ্গ। সবচেয়ে লম্বা দূরত্বের যে বেতার তরঙ্গ পাওয়া গেছে তার তরঙ্গের এক চূড়া থেকে পরবর্তী চূড়া পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মাইল লম্বা। বিপরীতে দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গের এক চূড়া থেকে পরবর্তী পর্যন্ত দূরত্ব এক মিটারের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ বা এক ইঞ্চির এক লাখ ভাগের এক ভাগ মাত্র। প্রতি সেকেন্ডে আপনার চোখের ভেতর কয়েক শত ট্রিলিয়ন দৃশ্যমান আলো ঢুকে যাচ্ছে। এদিকে সবচেয়ে ছোট ও দ্রুতগামী তরঙ্গদৈর্ঘ্যের গামারশ্মির এক চূড়া থেকে পরবর্তী চূড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটারের এক ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। এরাই সবচেয়ে শক্তিশালী আলো। এদের কম্পাংক সেকেন্ডে এক বিলিয়ন ট্রিলিয়ন। রেডিও ওয়েভ এবং গামারশ্মির মাঝখানে রয়েছে বর্ণালীর অন্যান্য অংশ।