বিজ্ঞানচিন্তা: কিন্তু আপনি তো সে সময় এ নিয়ে একটি পেপার লিখেছিলেন। সেই পেপার কি পরে প্রকাশ করেছিলেন?

জাহিদ হাসান: হ্যাঁ, তখন কেইনের তত্ত্ব বোঝার পরে আমার পাওয়া ফলাফল নিয়ে একটা পেপার লিখি। পেপারটি প্রকাশ করতে নেচার সম্পাদনা দল এবং রিভিউয়াররা অনেক সময় নিয়েছিলেন। কারণ, সে সময় তাঁরাও এ সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতেন না। অজ্ঞাতপরিচয়ে রিভিউয়ারদের বিষয়টি সম্পর্কে আমাকে শেখাতে হয়েছে। এভাবেই ত্রিমাত্রিক টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের ফিল্ডটির জন্ম হয়। এ ধরনের প্রাক্‌–ইতিহাস থেকে অনেক কিছু শেখা যায়, আপনি হয়তো এমন কিছু নিয়ে কাজ করছেন, যা আপনি বুঝতে পারছেন না। এভাবেই অনেক সময় বড় কিছু আবিষ্কার হয়ে যায়।

ওই সময় তাপবিদ্যুতীয় উপাদানগুলোর কোয়ান্টাম প্রভাব বা বৈশিষ্ট্যগুলো প্রমাণিত হয়েছিল। গবেষণাটি আমার সহকর্মী অ্যান্ডারসনের তত্ত্বের সঙ্গে না মিললেও কেইনের তত্ত্বের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানচিন্তা: বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য আপনার এ গবেষণার টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের সঙ্গে সম্পর্কিত কোয়ান্টাম স্টেটের বিষয়টা একটু সহজ করে যদি বলেন।

জাহিদ হাসান: ঠিক আছে। সবার জন্য আমি কোয়ান্টাম স্টেট বা অবস্থা সম্পর্কে সহজ করে বলছি। এখানে পদার্থবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অল্প জ্ঞান থাকলেই চলবে।

টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের ভেতরটি কাঠের মতো অপরিবাহী কিন্তু এর পৃষ্ঠতল তামা বা অন্য ধাতুদের মতো পরিবাহী। খুবই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, শুধু টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের ভেতরের ও বাইরের উপাদান ভিন্ন হওয়ার কারণে কিন্তু এমন ধর্ম প্রদর্শন করে না। এমনকি পৃষ্ঠ বা মধ্যবর্তী অংশের পারমাণবিক বিন্যাসের সঙ্গেও এই ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এমন ধর্ম প্রদর্শনের কারণের সঙ্গে খুবই অ্যাবস্ট্রাক্ট একটা বিষয় জড়িত। পৃষ্ঠতলের প্রতিটি ইলেকট্রনের একটি ওয়েভফাংশন আছে। পৃষ্ঠতলের বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনের ওয়েভফাংশন মিলে একটা ফেইজ তৈরি করে, যাকে বলা হয় ‘হিলবার্ট স্পেস’। হিলবার্ট স্পেসের জ্যামিতি একদমই আলাদা। অন্যভাবে বললে, এই টপোলজিক্যাল বস্তুর হিলবার্ট স্পেসে একধরনের টুইস্ট আছে। এই টুইস্ট রিয়েল স্পেসের কিছু না, একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট বিষয়। এই টপোলজিক্যাল টুইস্ট অনেকটা মবিয়াস স্ট্রিপের মতো। এই হিলবার্ট স্পেসের অনন্য জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মূলত টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের ভেতরে অপরিবাহী ও বাইরে পরিবাহী।

অন্যভাবে ভাবলে এই পদার্থ কিন্তু খুব একটা স্ট্রেঞ্জ মনে হয় না। আপনি ভাবতে পারেন, এ ধরনের ইনসুলেটর তো কৃত্রিমভাবে ভেতরে অপরিবাহী এবং বাইরে পরিবাহী উপাদান ব্যবহার করে যে কেউ বানাতে পারে। তাহলে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর কেন সবকিছু থেকে ভিন্ন? যখন আপনি কৃত্রিম একটি পরিবাহী পৃষ্ঠতল তৈরি করবেন, তখন যে উপাদান ব্যবহার করবেন, তার যে ইলেকট্রন থাকবে, সেটার ভর থাকবে। কিন্তু টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের পৃষ্ঠতলের ইলেকট্রন ভরহীন, যা কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে পাওয়া অসম্ভব। এটি ভরশূন্য, কারণ এটি একটু আগে বলা এক্সটিক কোয়ান্টাম অবস্থা মেনে চলে। পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য বিষয়টি খুবই সারপ্রাইজিং ছিল। পরে বোঝা গেল, এই বস্তু ইলেকট্রনিকসে হয়তো ব্যবহার করা সম্ভব, যেখানে এমন ট্রানজিস্টর বানানো যাবে, যেগুলো কম শক্তি খরচে চলবে। এ ছাড়া সুপারকন্ডাক্টরের সঙ্গে এই পদার্থ যুক্ত করে কিউবিট বানানো সম্ভব, যা পরবর্তী প্রজন্মের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে কাজে লাগবে। এগুলো হচ্ছে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।

টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের পৃষ্ঠ অনেকটা সুপারকন্ডাক্টরের মতো শক্তি অপচয় ছাড়াই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। কিন্তু কক্ষতাপমাত্রায় কার্যকর এমন কোনো সুপারকন্ডাক্টর এখনো আবিষ্কার হয়নি। এটা আমাকে আমার সম্প্রতি নেচার ম্যাটেরিয়াল-এর কাভার স্টোরি হিসেবে প্রকাশিত গবেষণা পর্যন্ত নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা কক্ষতাপমাত্রায় চলবে, এমন টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর তৈরির কথা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি, যা আসলে কক্ষতাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর আবিষ্কারের মতো, কারণ দুটির প্রভাব বা ফলাফল একই। কেন দরকার এমন বস্তুর? সারা বিশ্ব নানা ধরনের শক্তির জন্য ক্ষুধার্ত। রোধমুক্ত পরিবাহী শক্তির অপচয় কমাবে। আপনার স্মার্টফোন, কম্পিউটারসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আমরা যদি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে রোধমুক্ত পরিবাহী ব্যবহার করতে পারি, তাহলে বিদ্যুৎশক্তির ব্যবহার কম হবে। ফলে আমাদের কম টাকা খরচ হবে, বিল কম পরিশোধ করতে হবে।

আমি বিগ ব্যাং পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম কসমোলজি নিয়ে প্রথম কাজ শুরু করেছিলাম। এখন বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এই উপাদানগুলো কীভাবে ভূমিকা রাখে, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি

বিজ্ঞানচিন্তা: সাধারণ পাঠকের বোঝার জন্য এটা ভালো বলেছেন। অনেকেই হয়তো এই বিল বা খরচ কমার বিষয়টা থেকে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। তবে তাত্ত্বিক বলি বা ব্যবহারিক, দুই দিক থেকেই তো এটা আসলে একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার।

জাহিদ হাসান: হ্যাঁ, সেটা বলতে পারেন। টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর আসলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এখনই হয়তো এমন প্রযুক্তি পাওয়া যাবে না, ১০-২০ বছর লাগতে পারে। কিন্তু এর গুরুত্বের কারণে বিশ্বজুড়ে বিষয়টি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। এটা বোঝা যায় আমার পেপারটির সাইটেশন দেখে। বিশ্বব্যাপী এ নিয়ে গবেষণা চলছে, যার ফলেই আমার ‘টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর’ কলোকিয়ামটির সাইটেশন হয়েছে প্রায় ২০ হাজারের কাছাকাছি। তার মানে, এই অল্প সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে অন্তত ২০ হাজার ভিন্ন গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, অনেক মানুষ এ বিষয়ে গবেষণা করার জন্য টাকা পাচ্ছে। তার মানে, এটি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এর প্রায়োগিক দিক নিয়ে কম আগ্রহী। আমি কোয়ান্টাম কম্পিউটার বা সুপারকন্ডাক্টরের মতো শক্তির অপচয় ছাড়া বিদ্যুৎপ্রবাহ ইত্যাদি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেয়ে কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির পরীক্ষণের একটা ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী। আমি চেষ্টা করছি কোয়ান্টাম কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝার জন্য এই বস্তু ব্যবহার করতে। কারণ, এটাই আমার আসল গবেষণা, আমি এটা নিয়েই কাজ করেছি। একজন গবেষক হিসেবে আমি প্রথমে বিগ ব্যাং পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম কসমোলজি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। এখন আমি বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এই উপাদানগুলো কীভাবে ভূমিকা রাখে, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আসলে আমি মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য জানতে চাই।

ভাইল ফার্মিয়ন এর একটি উদাহরণ হতে পারে। ভাইল ফার্মিয়ন মূলত ভরশূন্য ইলেকট্রন। বিগ ব্যাংয়ের পরে হিগস বোসন অথবা হিগস ফিল্ড সৃষ্টির আগে ভাইল ফার্মিয়ন ছিল। হিগস ক্ষেত্র সৃষ্টির পরে সব ফার্মিয়ন ভরযুক্ত হয়েছে। কারণ, যখন হিগস ক্ষেত্র ভাইল ফার্মিয়নের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন ভাইল ফার্মিয়ন ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হয়। ফলে এটি সাধারণ ভরযুক্ত ইলেকট্রনে পরিণত হয়। আর এখন আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, আমরা ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে ভাইল ফার্মিয়ন এবং হিগস ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি। মহাবিশ্বের শুরুতে কী ঘটেছে, তা নিয়ে পরীক্ষা চালাতে পারি। তাই এই জিনিসগুলোর প্রতি আমি বেশি আগ্রহী এবং বিমোহিত। তবে আমি একই সঙ্গে এমন কিছু গবেষণাও করছি, যাতে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের কিছু প্রয়োগিক দিকও উন্মোচিত হচ্ছে।

এর আগে আমি টপোলজিক্যাল উপাদান নিয়ে গবেষণা করেছিলাম, সে সময় সবচেয়ে বড় দুটি বাধা ছিল। একটি হলো, ওই উপাদানগুলো বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া, আরেকটি হলো কক্ষতাপমাত্রায় ওই বস্তুগুলোর ওপর টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ফিল্ড প্রভাব বোঝা। আমরা জানি, সিলিকন অনেক পরিশুদ্ধ এবং এটি কক্ষতাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। এ জন্যই আমরা ল্যাপটপ, মাদারবোর্ড, স্মার্টফোনসহ সব বৈদ্যুতিক সার্কিটে সিলিকন ব্যবহার করি। সিলিকন একটি অর্ধপরিবাহী এবং এটি কক্ষতাপমাত্রায় চলতে পারে। ফলে আপনার কম্পিউটার চালানোর সময় এটিকে আলাদাভাবে ঠান্ডা করতে হয় না। আমরাও টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর ব্যবহার করে একই জিনিস করতে চাই, যেটা একটা অর্ধপরিবাহীর মতো কাজ করবে এবং টপোলজিক্যাল হবে। আমরা এটিকে পরিশুদ্ধ করে কক্ষতাপমাত্রায় কার্যক্ষম করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে এটি ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা যায়। তবে এটা কিন্তু সাধারণ কম্পিউটার বা ফোনে ব্যবহারের জন্য না, সাধারণের জন্য সিলিকন আছে।

বিজ্ঞানচিন্তা: আপনার সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে আমরা বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি। তবে শেষ করার আগে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের প্রায়োগিক দিক নিয়ে একটা প্রশ্ন করতে চাই। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এই টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর কীভাবে ব্যবহৃত হবে?

বিজ্ঞানীদের একটা অংশ মনে করেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো এমন পর্যায়ে যায়নি যে এটা নিয়ে এত রোমাঞ্চিত হতে হবে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এটাও ‘কক্ষতাপমাত্রায় নিউক্লিয়ার ফিউশন’-এর মতো। অনেক দিন আলোচনায় থাকবে, তবে শিগগির বাস্তবতার মুখ দেখবে না। আপনি কোন দলে পড়েন? 

জাহিদ হাসান: আমি বলব, কোয়ান্টাম কম্পিউটার একটা রিসার্চ টুল। এটা এখনো ওভাবে সাধারণের ব্যবহারের জন্য না। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল উপাদান, কিউবিট নিয়ে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রকমফের আছে। যেমন সুপারকন্ডাক্টিং বা অতিপরিবাহী কিউবিট, অতিপরিবাহী ফ্লাক্স কিউবিট, সুপারকন্ডাক্টিং ট্রান্সমন কিউবিট—আইবিএম কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে যা ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

এ ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের কিউবিট আছে। যেমন আয়ন কিউবিট, নিউট্রাল বা চার্জনিরপেক্ষ কিউবিট বা স্পিন কিউবিট। আপনি কোয়ান্টাম স্পিন ব্যবহার করে কিউবিট তৈরি করতে পারেন। এসব কিউবিট অতি নিম্ন তাপমাত্রায় কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতিপরিবাহী বা সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করে বানানো যায়। অ্যালুমিনিয়ামের অতিপরিবাহী হওয়ার ক্রিটিক্যাল বা সংকট তাপমাত্রা অনেক কম, তাই এটা দিয়ে কাজ করতে হলে হিলিয়াম শীতক ব্যবহার করতে হয়। আর নিম্ন তাপমাত্রায় তাপীয় নয়েজ বা গোলযোগ কম বলে, কোয়ান্টাম কোহেরেন্স (কণার যে তরঙ্গায়িত বৈশিষ্ট্যের কারণে সুপারপজিশন বা উপরিপাতন ঘটে) ঠিক রাখতে এটা ব্যবহার করা সহজ হয়।

আপনি যদি ব্যবহারিক না, তাত্ত্বিক দিক থেকে কাউকে জিজ্ঞাসা করেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের লিমিটিং ফ্যাক্টর কোনগুলো? মানে, কোন বিষয়গুলো এর সীমানা বেঁধে দেয়? তাহলে শুধু তাপমাত্রা নয়, সবাই বলবেন, এটা মূলত এই কোহেরেন্স টাইম। পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, এটার জন্য সর্বোচ্চ ৫০-৬০টার মতো কিউবিটকে একসঙ্গে যুক্ত করা যায়। তারপর আবার এতে বিভিন্ন ত্রুটি থাকে, যেগুলো এরর কারেকশন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ঠিক করে নিতে হয়। কারণটা এখানে নিম্ন তাপমাত্রা ধরে রাখা না। কারণ হলো, এদের কোহেরেন্স (সহজ করে বললে, আন্তসম্পর্ক) দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকছে না। তার মানে, আপনি এ ধরনের কিউবিট দিয়ে তৈরি কম্পিউটারে যা-ই করতে চান, সব ওই অল্প সময়েই করতে হবে। ঘণ্টা ধরে তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং করা যায় না, যা কিছু করার অনেকটা মাইক্রো সেকেন্ড বা সর্বোচ্চ সেকেন্ডের মধ্যে করতে হয়।

এই মুহূর্তে কিউবিট বানানোর চেষ্টা না করে শুধু তাত্ত্বিক দিক ভাবলে, যে কোনো তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীই একমত হবেন, শুধু টপোলজিক্যাল পদার্থ দিয়েই সত্যিকারের ব্যবহারযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানানো সম্ভব। যেগুলোতে এসব সমস্যা থাকবে না। কিন্তু এটার অনেক কিছুই আমরা এখনো বুঝি না। অনেক বিজ্ঞানী এ নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু এখনো কেউ টপোলজিক্যাল কিউবিট অপারেশন সফলভাবে প্রদর্শন করতে সক্ষম হননি। তাই সব সমস্যা সমাধান করে এ রকম ব্যবহারযোগ্য কম্পিউটার বানাতে তাঁদের সময় লাগবে। তবে এখন পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবে লম্বা সময় ধরে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং করতে সক্ষম কিউবিট বানানো সম্ভব শুধু টপোলজিক্যাল পদার্থ ব্যবহার করেই। এটা করতে হয়তো ৫০ বছর লেগে যাবে, কিন্তু যাঁরাই এই পদার্থবিজ্ঞান বোঝেন, তাঁরা একমত হবেন, এটাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে সফলতা দেবে। তবে বিজ্ঞান তো সরলরৈখিকভাবে এগোয় না। ৫০ বছর হলো সরলরৈখিক হিসাব। আমরা হয়তো আগামী ২০-৩০ বছরেই এ রকম কম্পিউটার তৈরি করতে পারব। অবশ্যই, আবারও বলি, এটা সবার ব্যবহারযোগ্য হবে না। তবে গবেষণাগারে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে অন্তত।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে গবেষণার জন্য শতকোটি ডলার ব্যয় করছে। আগামী ২০-৩০ বছরের জন্য এটা অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র বলে মার্কিন সরকার ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম ইনিশিয়েটিভ’ নামে ৫টি গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে একটি শুধু টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করে। আমি ওই গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করছি।

সব মিলিয়ে আমার বক্তব্য হলো, এটা খুবই সম্ভাবনায় ক্ষেত্র। আমি বলব—ভবিষ্যৎ। এটা কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নির্মাণের দরজা খুলে দেবে। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তো আসলে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত এটাকে সবাই অসম্ভবই বলবেন। তবে বিজ্ঞানে ব্রেকথ্রু ঘটে, হঠাৎ করেই বিজ্ঞানীরা বড় কিছু করে ফেলেন। সে রকম কিছু এ ক্ষেত্রেও হতে পারে। না হলেও, আমি বলব, এদিকেই আমাদের যেতে হবে।

এটা তো শুধু এর ব্যবহারিক দিক। তবে আমি যেমন বললাম, আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ। আমি মূলত সেদিকটায় বেশি মনোযোগ দিতে চাই।

 বিজ্ঞানচিন্তা: আপনাকে ধন্যবাদ, আমাদের পাঠকদের জন্য এত কঠিন বিষয়গুলো এভাবে সহজ করে বুঝিয়ে বলার জন্য।

জাহিদ হাসান: বিজ্ঞানচিন্তাকেও ধন্যবাদ। বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলো সবার কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। তাই কথা বলতে পেরে আমারও ভালো লেগেছে।

অনুলিখন ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মুশফিকুর প্রিয়, শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়