যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো রাজ্যের ধূ ধূ প্রান্তর। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক একটি দল সফলভাবে তৈরি করলেন ১ কোটি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা। যে পদ্ধতিতে তাঁরা এই তাপমাত্রা তৈরি করলেন তার কেতাবি নাম, নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া। সাধারণ মানুষের কাছে যেটা পরিচিত পারমাণবিক বোমা নামে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটন নামে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন এক প্রজেক্টে পারমাণবিক বোমা বানানোর কাজ করছিল এক দল বিজ্ঞানী। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহাইমার। প্রথম পারমাণবিক বোমার সেই বিপুল শক্তি দেখে তিনি সেদিন হিন্দুধর্ম গ্রন্থ গীতা থেকে শ্লোক আউড়েছিলেন, ‘এখন আমিই মৃত্যু, আমিই জগতের ধ্বংসকারী।’
আসলে সেদিনের সেই নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন তাপমাত্রা সূর্যেরও প্রায় সাড়ে ৬ গুণ। সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা মাত্র ১৫ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। বিপুল এই তাপমাত্রা ঠিক কী করতে সক্ষম সেটা তখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। জানা গেল এর কয়েক সপ্তাহ পরেই। ম্যানহাটন প্রজেক্টে বানানো মাত্র দুইটি বোমার আঘাতে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নামের দুইটি শহর পরিণত হল ধ্বংসস্তুপে। নিমিষেই মারা গেল লাখ লাখ নিরাপরাধ মানুষ। এরই পরই মিত্রবাহিনির কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় জাপান।
মানব ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ের গ্লানি মোছার চেষ্টায় কেটে গেল প্রায় ৫ বছর। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর চালু হলো প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট। ভয়ংকর নিউক্লিয়ার ফিশন শক্তিকে বশে এনে বিজ্ঞানীরা তৈরি করলেন বিদ্যুৎ শক্তি। বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ যোগান আসছে নিউক্লিয়ার ফিশন শক্তি থেকে।
ভারী ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে উচ্চগতির নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে তৈরি হয় কম ভরের দুইটি ভিন্ন পরমাণু। দুটি পরমাণুর মোট ভর ইউরেনিয়ামের থেকে কিছুটা কম হয়। আইনস্টাইনের E=mc2 অনুসারে, এই কিছুটা ভরই পরিণত হয় তাপশক্তিতে। এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপন্ন করা হয় বিদ্যুৎ।
নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি পাওয়া গেলেও, তা পুরোপুরি নিরাপদ শক্তির উৎস নয়। এ থেকে তৈরি হওয়া পারমাণবিক বর্জ্য জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বিজ্ঞানীরা তাই এগিয়ে গেলেন নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার দিকে। সূর্যের কেন্দ্রে শক্তি উৎপন্ন এই পদ্ধতিতে। নিউক্লিয়ার ফিশনের মতো পরমাণুর ভাঙন থেকে নয়, বরং দুইটি হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াস যুক্ত হয় ফিউশন বিক্রিয়ায়। তৈরি হয় হিলিয়াম পরমাণু। বেরিয়ে আসে প্রচণ্ড তাপশক্তি।
নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ায় নেই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। আবার জ্বালানী হাইড্রোজেনও ইউরেনিয়ামের মতো দুষ্প্রাপ্য নয়। সবমিলিয়ে নিউক্লিয়ার ফিউশন হতে পারে শক্তির আদর্শ উৎস। বিজ্ঞানীরা উঠে পড়ে লাগলেন নিউক্লিয়ার ফিউশন নামক দৈত্যকে হাতের মুঠোয় আনতে।
কিন্তু ব্যাপারটি নিউক্লিয়ার ফিশনের মতো অতোটা সহজ নয়। কারণ নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য চাই প্রচুর তাপমাত্রা আর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশ একক ও যৌথভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে ফিউশন শক্তি তৈরির।
ইতিমধ্যেই সফলভাবে চালানো হয়েছে কয়েকটি পরীক্ষামূলক সঞ্চালন। এমনই একটি প্রজেক্ট যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট ইউরোপিয়ান টরাস। পরীক্ষার সময় সেখানে তাপমাত্রা পাওয়া গেছে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের তথ্য অনুসারে, মানুষের তৈরি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১২ সালের ১৩ আগস্ট সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের এই তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়। কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা তৈরির জন্য আলোর প্রায় ৯৯ শতাংশ বেগে লেড আয়নের সংঘর্ষ ঘটান বিজ্ঞানীরা। তাতেই খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তৈরি হয় এই বিপুল তাপমাত্রা।
লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা
সূত্র: সায়েন্স ফোকাস