যে তত্ত্বটির জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জগৎ–জোড়া খ্যাতি, এই প্রবন্ধে সেটি নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করব। তার আগে তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে একটু নজর ফেরানো যাক। বর্ণাঢ্য জীবন ছিল তাঁর, যদিও কোনো কিছুই সহজে আসেনি তাঁর জীবনে। ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯০৯ সালে কলকাতার হিন্দু স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান আর ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি তাঁর মেধার স্ফুরণ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৩ সালে গণিতে অনার্সসহ স্নাতক এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় দুর্দান্ত ভালো ফলাফল করার পরও সহসা সম্মানজনক কাজ জুটল না তাঁর। পাটনা কলেজে আবেদন করলেন, কিন্তু সেখান থেকে জানানো হলো, তাদের দরকার একজন দ্বিতীয় শ্রেণির এমএসসি, প্রথম শ্রেণির নয়! আবহাওয়া দপ্তরে যোগাযোগ করলেন, সেখান থেকে বলা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অতি মেধাবী ছাত্রের জন্য যোগ্যতম চাকরি তাদের দপ্তরে নেই! অতঃপর বেকারত্বের এ সময়টি তিনি কাটালেন প্রাইভেট টিউশনি করে। আসাম গৌরীপুরের জমিদারপুত্রকে পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন তিনি। তাঁর সেই ছাত্র, প্রমথেশ বড়ুয়া পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

তাঁর এই বেকার দশার অবসান ঘটল ১৯১৭ সালে, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবপ্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান কলেজে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন সত্যেন বসু। ১৯২০ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি এবং এই সময়ের মধ্যে তাঁর চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন তিনি। এর তিন বছর পর ১৯২৪ সালে আইনস্টাইনের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয় তাঁর বিশ্বনন্দিত প্রবন্ধটি, এখন যা বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান বলে পরিচিত। ওই বছরই শিক্ষাছুটি নিয়ে দুই বছরের জন্য ইউরোপে যান বসু। সাক্ষাৎ করেন আইনস্টাইন, মাদাম কুরি, দ্য ব্রগলিসহ অনেক খ্যাতিমান বিজ্ঞানীর সঙ্গে। ১৯২৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। আর তাঁর জন্য সুপারিশ করেন আইনস্টাইন, লাঞ্জেভাঁ, হেরমান মার্ক, সিলভাঁ লেভির মতো নন্দিত পণ্ডিত ব্যক্তিরা। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই বিভাগের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রাখেন সত্যেন বসু। ঢাকা ত্যাগের পর ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা বা খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই পদেই ছিলেন তিনি। এরপর তিনি দুই বছরের জন্য বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে মনোনীত করে এবং আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসানের আগ পর্যন্ত তিনি নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৫২-৫৮ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৫৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে বিশ্বভারতী কর্তৃক ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত হন, সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘বিজ্ঞান-ভাস্করম’ উপাধি প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে ইত্যাদি।

এবার বসুর গবেষণা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আগেই বলেছি, বসুর কাজ ছিল কোয়ান্টাম কণার বিন্যাস নিয়ে। এই কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন ম্যাক্স প্ল্যাংক, ১৯০১ সালে, কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। এই বিকিরণের শক্তি ঘনত্ব বের করার জন্য তিনি একটি সমীকরণ প্রতিপাদন করেন। সেটি এ রকম :

এই সমীকরণ দিয়ে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ বর্ণালি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এক বৈপ্লবিক ধারণার প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন, কৃষ্ণবস্তু থেকে শক্তির বিকিরণ নিরবচ্ছিন্নভাবে হয় না, বরং গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে বুলেটের মতো বের হয়। তিনি এই শক্তিগুচ্ছের নাম দিলেন কোয়ান্টাম। ধারণাটি বৈপ্লবিক এ জন্য যে এর আগে কখনোই শক্তিকে কণারূপে কল্পনা করা হয়নি, বরং এর তরঙ্গধর্মটিই সব সময় আলোচিত হয়েছে। ১৯০৫ সালে প্ল্যাংকের এই ধারণাটি ব্যবহার করে আলোক তড়িৎ প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিলেন আইনস্টাইন। তিনি জানালেন, আলো শুধু কণার কণাগুচ্ছ আকারেই থাকে না বরং একেকটি স্বতন্ত্র কণা হিসেবে বের হতে পারে এবং শূন্য মাধ্যমে একক কণা হিসেবেই চলাচল করতে পারে। আইনস্টাইন আলোক তড়িৎ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য যে সমীকরণটি প্রস্তাব করেছিলেন, সেটিকে ব্যবহার করে ভরশূন্য আলোর কণা (ফোটন) এবং ভরযুক্ত ইলেকট্রনের সংঘর্ষ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলেন কম্পটন ১৯২২ সালে। বসু এই তিনটি তত্ত্বকেই বিবেচনায় নিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ করেন, প্ল্যাংকের সমীকরণে একটি অসংগতি আছে। সমীকরণের ডান দিকে যে দুটি অংশ, সেটির দ্বিতীয় অংশ থেকে শক্তির কণাধর্ম বোঝা গেলেও প্রথম অংশটি আসলে এসেছে ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তত্ত্ব থেকে, যা প্রকৃতপক্ষে তরঙ্গধর্মেরই প্রকাশ। একই সমীকরণে শক্তির দুই রূপ থাকার ব্যাপারটিই তাঁকে প্ররোচিত করল নতুন করে ভাবতে। তিনি প্রথম অংশটি প্রতিপাদন করলেন ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তত্ত্ব ছাড়াই। শুধু তা–ই নয়, কোয়ান্টাম জগতের এই কণাগুলোর বিন্যাস কী রকম হবে, তারও প্রস্তাব করলেন বসু, তাঁর এই প্রবন্ধে।

এই প্রবন্ধটিই তিনি আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়েছিলেন তাঁর মতামত জানার জন্য। চিঠিতে উল্লেখ করতে ভোলেননি যে প্ল্যাংকের সমীকরণের ডান পাশের প্রথম অংশটি তিনি চিরায়ত বিদুৎ–চুম্বক তত্ত্ব ছাড়াই নির্ধারণ করেছেন। আইনস্টাইন যথার্থ কারণেই প্রবন্ধটির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে সাইটস্রিফ ফ্যুর ফিজিক-এ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। আইনস্টাইনের কাছে পাঠানোর আগে বসু প্রবন্ধটি লন্ডনের ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু রেফারি সেটিকে প্রকাশের অযোগ্য বলে ফেরত পাঠান। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ, বসুর পদ্ধতি চিরায়ত পরিসংখ্যান থেকে এতটাই আলাদা যে একে এত সহজে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। চিরায়ত গতিবিদ্যায় সব বস্তুকণাই আলাদা। এমনকি তারা দেখতে একই রকমের হলেও আলাদা। ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন ব্যবহারের মাধ্যমে এই পৃথকত্ব নির্দেশ করা যায়। আর এ ধরনের স্বতন্ত্র কণা পরস্পরের সঙ্গে অদলবদল করলে নতুন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে বসু কণার অর্থই হলো যে তারা সবাই একই রকমের এবং তাদের কোয়ান্টাম আচরণের পার্থক্য করা যায় না। দুটি বসু কণার অদলবদলে নতুন কোনো অবস্থারও সৃষ্টি হয় না। আবার বসু যে ধরনের কণার পরিসংখ্যান গণনা করেছিলেন, তা শুধু চিরায়ত কণা থেকেই আলাদা নয়, অন্য ধরনের কোয়ান্টাম কণা যেমন ইলেকট্রন বা প্রোটন থেকেও আলাদা। দুটি ইলেকট্রন কখনোই একই অবস্থায় থাকতে পারে না, অন্যদিকে অসীম সংখ্যক বসু কণাও (যেমন ফোটন) একই অবস্থায় সহাবস্থান করতে পারে।

আইনস্টাইন বসুর এ ধারণাটিকে ব্যবহার করেন পরমাণুর ক্ষেত্রেও। ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় বসু কণাগুলো ঘনীভূত রূপ লাভ করবে। এই প্রপঞ্চটিই এখন বসু-আইনস্টাইন কনডেনসেট বা ঘনীভবন নামে পরিচিত। পরীক্ষাগারে এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণ করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন একাধিক বিজ্ঞানী।

এই পরিসংখ্যানটিকে কেন দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল, তার কারণ হিসেবে অধ্যাপক এ এম হারুন অর রশীদ লিখেছেন:

পরিসংখ্যানতত্ত্বের মূল কথা হলো সূক্ষ্ম গণনা থেকে স্থূল গণনায় আসা অর্থাৎ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমষ্টি হিসেবে চিন্তা করে এই কণাগুলোর বিন্যাসের সম্ভাবনা গণনা করা এবং তা থেকে বস্তুর তাপ, চাপ ইত্যাদি ভৌত গুণ নির্ধারণ করা। চিরায়ত পদ্ধতিতে ম্যাক্সওয়েল-বোলজম্যান এটাই করেছিলেন এবং এ পদ্ধতিতে নিউটনীয় গতিবিদ্যা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু অণু-পরমাণু আর বস্তুকণার জগতে নিউটনীয় গতিবিদ্যা অচল। সুতরাং ওই জগতের পরিসংখ্যানও ভিন্ন হতে বাধ্য। তাই কোয়ান্টাম গতিবিদ্যা আবিষ্কারের আগে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান ঠিক উল্টোভাবে হয়েছে। অর্থাৎ বসু এবং আইনস্টাইন কোয়ান্টাম জগতের স্থূল গণনাপদ্ধতি অনুপ্রাণিত অনুমানের সাহায্যে আবিষ্কার করেছেন (১৯২৪-২৫)। তারপর হাইজেনবার্গ, শ্রোডিঙ্গার এবং ডিরাক কোয়ান্টাম গতিবিদ্যা আবিষ্কার করেছেন (১৯২৫-২৬)। সবশেষে ডিরাক ১৯২৬ সালে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের মূল কথাটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

এখন আমরা জানি, প্রকৃতির বস্তুকণা দুই ধরনের, এক ধরনের বস্তুকণা পাউলির বর্জন নীতি মানে না এবং তারা যেকোনো কোয়ান্টাম অবস্থায় যেকোনো সংখ্যায় পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারে। এরা বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে এবং এই ধরনের কণাগুলোর তরঙ্গ অপেক্ষক প্রতিসাম্যের। এদের সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামানুসারে বোসন বলে ডাকা হয়। যেমন ফোটন, মেসন ইত্যাদি। অন্য ধরনের কণাগুলো পাউলির বর্জননীতি মেনে চলে, ফলে কোনো একটি শক্তিস্তরে বা কোয়ান্টাম অবস্থায় একটির বেশি কণা থাকতে পারে না। এরা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে এবং এদের তরঙ্গ অপেক্ষক বিপ্রতিসাম্যের। এই দ্বিতীয় ধরনের কণাগুলোকে বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মির নামানুসারে ফার্মিয়ন বলে ডাকা হয়।

এভাবে বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তত্ত্বের বদৌলতে প্রকৃতির কিছু মৌলিক কণার নামকরণ করা হলো সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে, আর পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর নামও চিরদিনের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে গেল। কারণ, যত দিন এই কণাগুলো থাকবে, তত দিন থাকবে তাঁর নামও। এবং আমরা জানি, সহসা এই কণাগুলো বিলুপ্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাই তাঁর নামও রয়ে যাবে চিরভাস্বর হয়ে।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু যে শুধু এই একটি প্রবন্ধই লিখেছিলেন, তা নয়। আমি তাঁর ২৩টি প্রবন্ধের খোঁজ পেয়েছি, যেগুলোর সবই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানটি এতটাই আলোচিত এবং পরিচিত তত্ত্ব যে বসুর প্রসঙ্গ উঠলেই এ প্রবন্ধটির কথা বিশেষভাবে উঠে আসে।

তবে কেবল গবেষক বসুর কথা বললে তাঁর সম্পূর্ণটুকু বলা হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত থাকেন, তাঁরা সাধারণত উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নিজের পেশাগত জীবনকে নিশ্চিত করেন। তিনি সেই প্রচলিত পথে হাঁটেননি। বিদেশে গিয়েছেন, বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করেছেন, অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ডিগ্রি লাভের চেষ্টা করেননি। কেন করেননি, সেই রহস্য আর কোনো দিনই জানা যাবে না। তাঁর কি ঋষীদের মতো বৈরাগ্য ছিল, ছিল উদাসীনতা? তা–ও তো মনে হয় না। তিনি তো বিপুলভাবে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন গবেষণায়, শিক্ষকতায়, সামাজিকতায়। গবেষণায় শুধু নিজেই যুক্ত থাকেননি, যুক্ত করেছেন আরও অনেককে।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে গবেষণার একটা ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন আর অচিরেই সেটিকে পরিণত করে তুলেছিলেন ঐতিহ্যে। দারুণ উদ্দীপনাময় এক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তিনি তরুণ সহকর্মীদের ভেতরে জাগিয়ে তুলেছিলেন নতুন জ্ঞান জানা এবং সৃষ্টির আগ্রহ। রঞ্জনরশ্মির কেলাসতত্ত্ব, রমনপ্রক্রিয়া, চৌম্বকত্ব বর্ণালি, বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয়। এমনকি রসায়নশাস্ত্রের কিছু গবেষণার দিকেও তাঁর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। শুধু গবেষণা নয়, শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম।

কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, সেই ব্রিটিশ আমলেই তিনি শ্রেণিকক্ষে বাংলা ভাষায় পড়াতে শুরু করেছিলেন এবং অন্যদেরও বাংলায় পড়ানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন। বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি তাঁর প্রতিভাকে নানা দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা পরিচয় এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রকাশ করেছেন, বাংলায় বই লিখতে কাজী মোতাহার হোসেনকে উত্সাহ দিয়েছেন। শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামী বিপ্লবীদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন। বিজ্ঞান তো নিত্য সহচর, কিন্তু তিনি আগ্রহভরে সংগীত, সাহিত্য ও শিল্পকলার নানা শাখার রসসুধাও পান করেছেন।

অনেক দিন আগে আলবিরুনি একটা কথা বলেছিলেন, ‘প্রভু, আমি দীর্ঘ জীবন চাই না, আমাকে একটা বিস্তীর্ণ জীবন দিন।’ সত্যেন্দ্রনাথ বসুরও ছিল বিস্তৃত জীবন। নিজেকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নানা দিকে, নানা কাজে, নানা চিন্তায়। একটা বিপুল কর্মমুখর জীবন যাপন করে ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি অনন্তলোকে পাড়ি দেন, আর আমাদের জন্য রেখে যান একটি বিস্তীর্ণ জীবনের আদর্শ ও উদাহরণ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক এবং সহযোগী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফিজিক্যাল সায়েন্সেস, ইনডিপেনডেন্ট ইউভার্সিটি, বাংলাদেশ

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন