১৬৬৫ সাল। প্রিজমের মধ্যে সূর্যের সাদা আলোকে সাতটা ভাগে ভাগ করে বিজ্ঞানী মহলে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। সাদা আলো যে কোনো মৌলিক আলো নয়, এটা তৎকালীন অনেকেই মানতে পারছিলেন না। মূলত, কয়েকটি আলোর সংমিশ্রনেই হয় সাদা আলো। সে সময় অনেকেই নিউটনের এই কর্মকাণ্ডে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিলেন। তাঁরা ভাবতেন, নিউটন তাঁদের বোকা বানাচ্ছেন, কিন্তু তাঁরা সেটা ধরতে পারছেন না। আসলে এটা যে বিজ্ঞানের কত বড় আবিষ্কার, সেটা বুঝতে অনেকেরই সময় লেগেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিউটনের বর্ণালীতত্ত্ব বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সূর্য থেকে আসা সাদা আলো নিয়েও শুরু হয় বিস্তর গবেষণা। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন সংগীত শিল্পী ও কমপোজার। জার্মানি থেকে ব্রিটেনে এসেছিলেন গানের শিক্ষকতা করতে। পাশাপাশি ইচ্ছা ছিল শহরের বড় বড় কনসার্টে নিজেই বাজাবেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর জীবনের মোড় ঘুড়ে গেল। মোড় ঘুড়িয়ে দিল ছোট্ট একটি টেলিস্কোপ ও একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই।
১৭৭৭ সাল। শখের বসে কিনে বসেন একটি ছোট্ট টেলিস্কোপ। এক বছর পরে, ছোট্ট টেলিস্কোপের আদলে নিজেই বানিয়ে ফেলেন একটি বড় টেলিস্কোপ। হার্শেলের কিনে আনা টেলিস্কোপের চেয়ে বানানো টেলিস্কোপের ক্ষমতা ৬ হাজার ৪৫০ গুণ বেশি ছিল। সেই টেলিস্কোপ দিয়ে ১৭৮১ সালে নিজেই আবিষ্কার করেন সৌরজগতের ৭ম গ্রহ ইউরেনাস। ভাবা যায়! শখের বসে কেনা একটা টেলিস্কোপের কল্যাণে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন হার্শেল। চারিদিক থেকে সবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়ে আরও একটি টেলিস্কোপ বানানোর কাজে হাত দেন তিনি। ১৭৮৫ থেকে ১৭৮৯ সালের মধ্যে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের এক বিশাল টেলিস্কোপ বানিয়ে ফেলেন। ওই টেলিস্কোপের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এখনো লন্ডনের বিজ্ঞান জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সেই টেলিস্কোপ দিয়ে হার্শেল ইউরেনাসের দুটি উপগ্রহ টাইটেনিয়া ও ওবারন আবিষ্কার করেন।
১৮০০ সাল। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানী মহলে বেশ নাম ডাক হয়েছে হার্শেলের। এখনো বিশালাকারের টেলিস্কোপে বিভিন্ন তরঙ্গের (রঙের) ফিল্টার লাগিয়ে গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে গবেষণা করেন। হার্শেল লক্ষ করলেন, লাল (রঙের) ফিল্টার ব্যবহার করলে বেশিক্ষণ কাজ করা যায় না। কারণ চোখে গরম ভাব অনুভূত হয়। তাঁর এই ভাবনাটা সঠিক নাকি ভুল, সেটা যাচাই করার জন্য ছোট্ট একটা পরীক্ষা চালালেন। সূর্যের আলোকে প্রিজমের ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে প্রথমে দৃশ্যমান আলোকে আলাদা করেন। তারপর সেই ভিন্ন ভিন্ন আলোর ওপর বসিয়ে দিলেন সাতটা ভিন্ন ভিন্ন থার্মোমিটার। আর দৃশ্যমান আলোর বাইরে বসালেন আরেকটা থার্মোমিটার। এই থার্মোমিটারটা কাজ করবে কন্ট্রোলার হিসেবে। অর্থাৎ, যেখানে আলো নেই, সেখানকার তাপমাত্রা পরিমাপ করতে চান তিনি।
তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন, বেগুনি রঙের ওপর রাখা থার্মোমিটারের তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। আর বেগুনি থেকে লাল রঙের তরঙ্গের দিকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। লাল রঙের ওপর রাখা থার্মোমিটারের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি।
পরীক্ষা শেষ। তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন, বেগুনি রঙের ওপর রাখা থার্মোমিটারের তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। আর বেগুনি থেকে লাল রঙের তরঙ্গের দিকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। লাল রঙের ওপর রাখা থার্মোমিটারের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ টেলিস্কোপে চোখ রাখার সময় যেমনটা অনুমান করেছিলেন, তা ঠিকই ছিল। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দেয় অন্য একটি ঘটনা। কন্ট্রোলার হিসাবে অর্থাৎ অন্ধকার জায়গায় যে থার্মোমিটারটি রাখা হয়েছিল, সেটির তাপমাত্রা লাল তরঙ্গ থেকেও অনেক বেশি। কেন এমন হলো? পরিবেশের তাপমাত্রা কেন এত বেশি? অবশেষে হার্শেল সিদ্ধান্ত নেন, আমাদের দেখা আলোর বাইরেও অদেখা আলোর অস্তিত্ব আছে। এই অদেখা আলোর তাপমাত্রা দৃশ্যমান আলোর চেয়ে অনেক বেশি। তিনি এই অদেখা আলোর নাম দিলেন ‘ক্যালোরিফিক রশ্মি’। এটিকেই আমরা এখন ইনফ্রারেড রেডিয়েশন বা অবলাল আলো নামে চিনি।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
সূত্র: উইকিপিডিয়া