কোয়ান্টাম টানেলিং কীভাবে হয়?
ছুটির ঘণ্টার খোকন পারেনি টয়লেটের দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসতে। তার আফসোস ছিল, জাদুকর যদি শেখাতেন মন্ত্রটা, তাহলে সহজেই হয়ত তার বন্দীত্ব ঘুঁচত। ফ্লাসব্যাকে ব্যাপারটা এমন:
বিখ্যাত জাদুকর জুয়েল আইচ জাদু দেখাতে এসেছেন। হলরুমে উপচে পড়েছে দর্শক। জাদুকরকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে, বস্তাবন্দী করে ঢোকানো হলো একটা লোহার বাক্সে। চাবি রইল এক দর্শকের কাছে। কয়েক মিনিট পরে যখন জাদুকরের সহকারী যখন আবার খুললেন বাক্সটা, তখন জাদুকরকে পাওয়া গেল না বাক্সের ভেতরে। কোথায় তিনি? পাওয়া গেল দর্শকদের ভেতরে! কীভাবে বেরুলেন? তিনি তো জাদুকর। তাই পারেন। কেউ তাই জিজ্ঞিস করে না, এ প্রশ্ন।
ছোট্ট একটা ছেলে ছুটে আসে। চোখে তাঁর বিস্ময়। কেউ জিজ্ঞেস করে না যে প্রশ্ন, সেটাই সে জানতে চায়। চোখে কৌতুহল আর অবিশ্বাস নিয়ে জানতে চায়, জাদুকর এটা কীভবে পারলেন?
জুয়েল আইচ মুচকি হাসেন, কিন্তু ভেঙে বলেন না। ছেলেটা তখন জানতে চায়, জাদুকরকে কোনো বন্ধ ঘরে আটকে রাখলে তিনি বেরুতে পারবেন কি-না। জবাবে জাদুকর বলেন, বদ্ধঘর কেন, জেলখানাতে ভরে রাখলেও তিনি বেরিয়ে আসতে পারবেন। ছোট্ট ছেলেটাকে সহজেই বিশ্বাস করানো গিয়েছিল কথাটা, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের কোনো শিক্ষক বা ছাত্রকে এ মিথ্যা গেলানো যাবে না।
জাদুকরের কথায় সন্তুষ্ট ছেলেটা আবদার করে, এই জাদু তাঁকে শেখাতেই হবে। জাদুকর রাজি হন। ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্বও করেন। তিনি জাদু সেদিন শেখাননি। চাইলেই বাক্স থেকে বের হওয়ার জাদু শেখানো যায় না। এর জন্য দরকার প্র্যাকটিস। কিন্তু প্র্যাকটিসের সময় আর ছেলেটা পায়নি। দশদিনের ঈদের ছুটির আগে আটকে পড়ে স্কুলের টয়লেটে। খাবার ছাড়া শুধু পানি খেয়ে কয়েকটা দিন পার করে দেয়। ট্যাপের পানিও ফুরিয়ে যায় একদিন। তারপর ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর সেই ছেলের তখন কত আফসোস! জাদুকর যদি সেদিন, তাঁকে জাদুটা শেখাতেন তাহলে। এ ভাবে টয়লেটে পচে মরতে হত না। শেষমেশ টয়লেটে খাবার-আর পানির অভাবে ধুকে ধুকে মরে যায় সে।
গল্পটা গত শতাব্দীর আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয় সিনেমা ছুটির ঘণ্টার শেষ অংশের। কিন্তু এখানে এ গল্পের অবতারণার কারণ আছে। তার আগে একটা প্রশ্ন করি। সত্যিই যদি জাদুকর খোকন নামের ওই ছেলেটাকে বাক্স থেকে বের হওয়ার ট্রিকটা শিখিয়ে দিতেন, তাহলে কি খোকন টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসতে পারত?
যাদের ম্যাজিকের ট্রিকস জানা আছে, তারা নিশ্চয়ই জানেন, ম্যাজিক পুরোটাই কৌশল। অর্থাৎ দর্শকের চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন কিছু করা, যা অবিশ্বাস্য মনে হবে। এখন ইউটিউবে ম্যাজিকের ট্রিকস দেখা যায়, জানা যায় জাদুকরের আসল কেরামতি। জাদুকর তাঁর মঞ্চে থাকা বিশেষ বক্সেই এই কেরামতি দেখাতে পারেন। কখনোই আপনার-আমার দেওয়া বাক্স থেকে বেরুতে পারবেন না। মজার ব্যাপার হলো, মানুষের বদলে যদি কণা হয়, তাহলে কণাদের পক্ষে সম্ভব দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসার। কীভাবে?
এখানেই আসলে অনিশ্চয়তা আর ওয়েভ ফাংশনের বাহাদুরি। নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানে কখনো একটা বস্তুকে দেয়াল ভেদ করে পাঠানো সম্ভব নয়, যদি না ওটার পর্যাপ্ত গতিশক্তি থাকে। বুলেট কাঠের দেয়াল ভেদ করতে পারে। কিন্তু কংক্রিটের দেওয়া বা পুরু লোহার পাত ভেদ করা বুলেটের পক্ষেও সম্ভব নয়। কিন্তু প্রবল গতিশক্তিওয়ালা বুলেট যেটা পারে না, অতিক্ষুদ্র চোখে দেখা যায় না যে কণা, সেই সামান্য ইলেকট্রনের পক্ষে সম্ভব দেয়াল ভেদ করে চলে যাওয়া! এই প্রক্রিয়াকে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং।
দুই
খুদে কণাদের জগতটাই অদ্ভুত। কাণ্ডজ্ঞান সেখানে প্রতারিত হয়, হোঁচট খায় বিবেচনাবোধ। আপাতদৃষ্টিতে যা অসম্ভব মনে হয়, সেগুলো কোয়ান্টাম জগতে হর-হামেশাই ঘটে। বাস্তব জগতে কোনো বস্তুর দেয়াল পার হওয়ার ঘটনা অসম্ভব হলেও, ইলেকট্রনের মতো খুদে কণারা সেটা সেটা পারে। যদিও সেটা অত সহজ ব্যাপার নয়। তবু ঘটে। বড় বড় বাধাও ইলেকট্রন ডিঙিয়ে যেতে পারে। তবে চাইলেই একটা ইলেকট্রনকে ধরে দেয়ালের ওপাশে পাস করা যাবে না।
ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রগলি বলেছিলেন, ইলেকট্রনের মতো খুদে কণারা সবসময় কণা ও তরঙ্গের দুই অবস্থাতেই থাকে। আর হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন আপনি কণাদের বস্তু হিসেবে দেখতে চাইবেন, সেটা বস্তু হিসেবেই ধরা দেবে। তখন এর তরঙ্গ চরিত্র অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার উল্টোটাও ঘটা সম্ভব।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার কণাদের অবস্থান শনাক্তের জন্য দিয়েছিলেন ওয়েভ ফাংশনের ধারণা। সাই (Y) নামের সেই ওয়েভ ফাংশনটি কোনো একটা বিন্দুতে ইলেকট্রনের অবস্থানের সম্ভাবনা কতটুকু সেটা জানিয়ে দেয়। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, কখনোই কোনো বিন্দুতে ইলেকট্রনের পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য হবে না। আবার বস্তু তরঙ্গের বিস্তার বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক কম হতে পারে, শূন্যে নামানো যাবে না কখনো। কোয়ান্টাম টানেলিংয়ে এমনটাই ঘটে। যদিও এক্ষেত্রে কংক্রিটের দেয়ালের কথা বলা হয় না, বরং এরচেয়ে অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী দেয়াল আছে কোয়ান্টাম জগতে। পটেনশিয়াল ব্যারিয়ার বা বিভব বাধা, বিদ্যুৎচুম্বকীয় শক্তিজনিত বাধা—এগুলো। নিউক্লিয়ার বলের কারণেও নিউক্লিয়ার বিভব দেয়াল তৈরি হতে পারে।
তিন
বিভব দেয়াল কীভাবে পার হয় ইলেকট্রনেরা? ব্যাপারটা সোজা। ইলেকট্রনের তরঙ্গের বিস্তার এর জন্য বড় ভূমিকা রাখে। ইলেকট্রন যখন কোনো দেয়ালে আঘাত করে, সেই দেয়ালের পূরুত্ব যদি ইলেকট্রন তরঙ্গের বিস্তারের চেয়ে কম হয়, তাহলে সম্ভাবনা আছে ইলেকট্রনের সেই দেওয়াল টপকে যাওয়ার। ইলেকট্রন যখন দেয়াল ভেদ করার চেষ্টা করে, তখন তার গতি যথেষ্ট কমে যায়। ইলেকট্রন ধীর হয়। ফলে কমতে থাকে তরঙ্গের বিস্তার। তাই দেওয়ালে আঘাত করার পর বেশিরভাগ ইলেকট্রন দেয়ালে বাধা পেয়ে পেছন দিকে ইউটার্ন করে। কিন্তু ইলেকট্রনের বিস্তার যেহেতু শুরুর দিকে দেয়ালের পুরত্বের বেশি ছিল, তারমানে ইলেকট্রনের ওয়েভ ফাংশনের বিস্তার ছিল দেয়ালের ওপারেও। তরঙ্গ ফাংশন ইলেকট্রনকে কোনো বিন্দুতে পাওয়ার সম্ভাবনা জানিয়ে দেয়। আর এই সম্ভাবনার মান কখনোই শূন্য নয়। তাই দেওয়ালের ওপারে যে ইলেকট্রনকে পাওয়ার সম্ভাবনা কখনই শূন্য হবে না। কিন্তু সম্ভাবনার মান যেহেতু কম, তাই প্রথম ইলেকট্রনের পক্ষে দেয়াল টপকানোর কাজটা কঠিন। ধরা যাক, একটা ইলেকট্রনের জন্য কোনো একটা দেয়াল টপকানোর সম্ভাবনা ০.০০১ শতাংশ। ধরা যাক, এমন ইলেকট্রন একটার বদলে ১০০০টা নিলেন। সবগুলোর মিলিত সম্ভাবনা ১০০০×০.০০১ = ১ শতাংশ। অর্থাৎ আপনি ইলেকট্রনের সংখ্যা বাড়িয়ে সম্ভাবনা বাড়াতে পারছেন। অর্থাৎ ১ হাজারটা ইলেকট্রন নিলে ১টা ইলেকট্রনের সম্ভাবনা আছে দেয়াল ভেদ করে যাওয়ার। আরও বাড়ান ইলেকট্রন সংখ্যা, ১ হাজারের বদলে ১ লাখ নিন, তাহলে সম্ভাবনার মান বেড়ে হবে ১০০। অর্থাৎ এক লাখ ইলেকট্রন যদি আপনি একটা দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারেন, তাহলে মোটামুটি ১০০টা ইলেকট্রন ওপাশে পৌঁছে যাবে।
এখন কিন্তু আপনি প্র্যাকটিকালি চেষ্টা করেই দেখতে পারেন।
চার
কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ্য করেন জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিখ হুন্ড। ১৯২৭ সালে। তিনি ডাবল ওয়েল পটেনশিয়াল সিস্টেম নিয়ে কাজ করছিলেন। ডাবল ওয়েল মানে দুই কূপ বা দ্বিকূপ ব্যবস্থা। এটাকে আবার পানির কুয়ার মতো ভাববেন না। বরং ইলেকট্রনের জন্য একটা শক্তিস্তরের কথা ভাবুন। এই শক্তিস্তর যদি একটা বিভিব বাধ দিয়ে দুটো আলাদা ভাগে ভাগ করা হয়, তাহলে এর দুপাশে দুটি পটেনশিয়াল কূপ তৈরি হবে। হুন্ড লক্ষ করেন, কিছু কিছু ইলেকট্রন বিভব বাধা পেরিয়ে অন্য কূপে চলে যাচ্ছে।
একই বছর কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী লিওনিড ম্যান্ডেলস্টাম ও মিখাইল লেনতোভিচ। তাঁরা এই ঘটনার ব্যাখ্যাও দেন। শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশনের সাহায্যে।
পাঁচ
কখন কোথায় কোয়ান্টাম টানেলিং হয়?
উদাহরণ হলো সূর্য। সূর্যের প্রধান জ্বালানি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস। প্রবল মহাকর্ষীয় চাপ, নরককুণ্ডের মতো তাপমাত্রা হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের ফিউশন ঘটাতে সাহায্য করে। ফিউশন একধরনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। এর ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট নিউক্লিয়াস জোড়া লেগে আরও বড় নিউক্লিয়াস তৈরি হয়।
আগেই বলেছি, সূর্যে ফিউশনের প্রধান উৎস হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসে মাত্র একটি প্রোটন থাকে। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় দুটো প্রোটন যুক্ত হয়, সঙ্গে আরও দুটো নিউট্রন জুটিয়ে নিয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া এত সহজ নয়। এর জন্য সবল নিউক্লিয়ার বল সক্রিয় হতে হয়। এই বলের রেঞ্জ ১০-১৫ মিটার। অর্থাৎ ১ মিটারকে ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ভাগে ভাগ করলে যে ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যটা পাওয়া যাবে, সেটাই হলো সবল নিউক্লীয় বলের কার্যকরী দূরত্ব। এরচেয়ে বেশি দূরত্বে থাকলে সবল নিউক্লিয়ার বল কার্যকর হবে না। ফলে প্রোটন আর নিউট্রনদের একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনাও হয়ে যাবে শূন্য। সূর্য বা যেকোনো নক্ষত্রের ভেতরের তাপমাত্রা অনেক অনেক বেশি। ফলে এর ভেতরকার কণাগুলো অবিরাম ছোটাছুটি করছে। ধাক্কাধাক্কিও হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া নক্ষত্রের মতো অতি ঘনত্বের বস্তুর ভেতর মহাকর্ষ বলও খুব সক্রিয়। তাই সহজেই কণাগুলো কাছাকাছি এসে পড়ে। নিউক্লিয়ার বলের রেঞ্জের ভেতর দুটি কণা এসে পড়লে সেগুলো ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বড় নিউক্লিয়াস তৈরি হবে।
ব্যাপারটা এতটা সরলও নয়। কারণ বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল। একই চার্জের দুটি কণা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। তাই প্রোটনগুলোও ওই রীতি মেনে পরস্পরকে বিকর্ষণ করবে। সবল নিউক্লীয় বলের চেয়ে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল অনেক অনেক দুর্বল। কিন্তু সমস্যাটা হলো বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলের রেঞ্জ অনেক বেশি। তাই সবল বলের সীমার মধ্যে আসার আগেই বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিকর্ষণ বলের প্রভাবে খুব কাছাকাছি হতে পারে না। ফলে সেখানে বিদ্যুৎচম্বকীয় ব্যারিয়ার বা বাধা তৈরি হয়। গতিশক্তি বা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সব প্রোটন একত্রিত হতে পারে না। যতটা ফিউশনে সুর্যের ভেতর ঘটে, অতটা ফিউশন ঘটা সম্ভব ছিল না। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দিয়েছে কোয়ান্টাম টানেলিং।
প্রচুর প্রোটন বিদ্যুৎচুম্বকীয় বাধার সম্মুখিন হয়। সেগুলোর জন্য আশির্বাদ হয়ে দেখা দেয় কোয়ান্টাম টানেলিং। সেই বৈদ্যুতিক বাধা কিছু কিছু প্রোটন পার হয়ে যায় টানেলিংয়ের মাধ্যমে।