চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন অ্যালান আসপেক্ট, জন ক্লাউসার ও অ্যান্টন জেইলিঙ্গার। বেল ইনেকুয়ালিটি বা বেলের অপ্রতিসমতা ভঙ্গের পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ ও কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্সের (কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান) অগ্রদূত হিসেবে এ পুরস্কার পান এই তিন বিজ্ঞানী।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম বিস্ময়কর বিষয় হলো কোয়ান্টাম অ্যান্টেঙ্গেলমেন্ট। এটি ছিল কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে আইনস্টাইনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ। দুই বা ততোধিক কণা (বা সিস্টেম) আলাদা হলেও যেন একই ইনফরমেশন বহন করে চলে।

ইলেকট্রনের স্পিনের কথা ধরা যাক। ইলেকট্রনের স্পিন পজিটিভ (ধনাত্মক) বা নেগেটিভ (ঋণাত্মক) হতে পারে, কিন্তু তা পরীক্ষা না করে বলার উপায় নেই। তাই দুটি ইলেকট্রনের স্পিন পরীক্ষা করলে অর্ধেক সময় এদের স্পিন হবে একইরকম, আর বাকি অর্ধেক সময় উল্টো। কিন্তু এই দুটি ইলেকট্রনই যদি অ্যান্টেঙ্গেলড হয়, তবে সব সময়েই এদের স্পিন হবে বিপরীত।

ধরা যাক, এমন দুটি অ্যান্টেঙ্গেলড ইলেকট্রনকে একে অন্যের থেকে অনেক দূরে রাখা হয়েছে। এখন আপনি যদি একটির স্পিন মাপেন, তবে পরীক্ষা না করেই বলে দিতে পারবেন হাজারো কিলোমিটার দূরের  অন্য ইলেকট্রনের স্পিন কী। যেন এই ইলেকট্রন অন্যটির কাছে সেই স্পিনের তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিল।

সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ
সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন, পোডলস্কি ও রোজেন মিলে একটি গবেষণপত্রে তাঁদের অভিযোগ একটি থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস পরীক্ষার মাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি ছিল, কোয়ান্টাম মেকানিকসের অনুসিদ্ধান্ত সঠিক হলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে তথ্য বিনিময় হতে পারে, যা অসম্ভব। কারণ কোন কিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। তাই তাঁদের পছন্দের তথাকথিত ‘হিডেন ভ্যারিয়েবল’ তত্ত্ব বেশি যুক্তিযুক্ত। এই তত্ত্বে কোনো কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল অবস্থার তথ্য আগেই কোনো একভাবে গুপ্ত থাকে এবং পরীক্ষা করলে তখন প্রকাশ পায়। অর্থাৎ ওই ইলেকট্রন-জোড় আগে থেকেই পজিটিভ ও নেগেটিভ হয়ে ছিল, কিন্তু সেই তথ্য আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না।

উদাহরণ দিই। ধরুন, একটা কয়েন টস করলে হেড এবং টেল ৫০-৫০ ভাবে আসে র‍্যান্ডম হয়ে। কিন্তু আসলে তা র‍্যান্ডম নয়, বরং কত বেগে কোন স্থানে টোকা দেওয়া হয়েছে, বাতাসের বাধা কেমন ইত্যাদি সব জানলে সঠিকভাবে বলা সম্ভব। কিন্তু এই হিসাব অনেক জটিল। অর্থাৎ কয়েন টস আপাত র‍্যান্ডম মনে হলেও এটা অনেক অজানা ভ্যারিয়েবলের ওপর নির্ভর করে। আইনস্টাইনপন্থীদের পছন্দ ছিল এমন একটি কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল তত্ত্ব। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকসের মূল তত্ত্বই হলো বিভিন্ন সিস্টেমের র‍্যান্ডম হওয়া এবং সম্ভাবনার ভিত্তিতে কণাদের আচরণ। আইনস্টাইন, রোজেন, পেডোলস্কির অনেক বছর পরে ১৯৬৪ সালে জন স্টুয়ার্ট বেল এই গবেষণাপত্রের অভিযোগের ওপর আরও কাজ করে বেল থিওরেম প্রকাশ করেন।

সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ

যদি হিডেন ভ্যারিয়েবল থেকে থাকে, তবে অনেকবার পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যে নির্ভরতা (কো-রিলেশন) আশা করা যায়, তা কখনোই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি হবে না। কিন্তু ঠিকঠাক ডিজাইন করলে কিছু কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল পরীক্ষায় এরচেয়ে বেশি কো-রিলেশন পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ এমন পরীক্ষা প্রমাণ করবে যে কোয়ান্টাম মেকানিকস একটি নন-লোকাল হিডেন ভ্যারিয়েবল তত্ত্ব হতে পারে না। বেল থিওরেমের পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ হলে সেটা হবে কোয়ান্টাম মেকানিকসেরই প্রমাণ।

১৯৭২ সালে ক্লাউসার এবং ফ্রিডম্যান বেলের কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রথম পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ হাজির করেন। এর পরে ১৯৮০-৮২ সালে বিজ্ঞানী জন ক্লাউসারের সেটাপের কিছু ত্রুটি দূর করে আরও শক্ত প্রমাণ দেন অ্যালান আসপেক্ট। ১৯৯৮ সালে অ্যান্টন জেইলিঙ্গার তাঁর পরীক্ষায় কোয়ান্টাম অ্যান্টেঙ্গেলমেন্ট ব্যবহার করে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন, অর্থাৎ একটি সিস্টেমের কোয়ান্টাম স্টেট আরেকটি দূরের সিস্টেমে পাঠাতে সক্ষম হন। আধুনিক সময়ের কোয়ান্টাম ইনফরমেশন দাঁড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম সিস্টেমের এই অ্যান্টেঙ্গেলমেন্ট ধর্মের ওপর। তাই তাঁদের এই কাজ কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

অনেক বছর ধরেই এই চারজন নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ফ্রিডমান ২০১২ সালে মারা যান। বাকি তিনজন শেষ পর্যন্ত মনোনীত হলেন ২০২২ সালে এসে।

লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, প্যারিস অবজারভেটরি

সূত্র: নোবেলপ্রাইজ ডট অর্গ