গবেষণাগারে সুপারনোভা বিস্ফোরণ

সূর্যের চেয়ে পাঁচ গুণ বা তার বেশি ভরের নক্ষত্র জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে সুপারনোভায় পরিণত হয়। মূলত মহাকর্ষের প্রচণ্ড চাপের কারণে ঘটে সুপারনোভা বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড শক্তিশালী এই বিস্ফোরণ সরাসরি পরিমাপ করার সুযোগ আমাদের নেই। তাই বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। গবেষণাগারে প্রথমবারের মতো সুপারনোভার বিস্ফোরণ পরিমাপ করেছেন সম্প্রতি।

তেজস্ক্রিয় আয়ন রশ্মির সাহায্য নিয়ে যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী ড. গ্যাভিন লোটের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল এই পরীক্ষা চালিয়েছে। তারা সুপারনোভার কেন্দ্র ভেঙে পড়ার সময় যে প্রোটন-ক্যাপচার প্রক্রিয়াটি ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ করে। পাশাপাশি রহস্যময় পি-নিউক্লিয়াস কীভাবে তৈরি হয় এবং এর প্রাচুর্য কেন এত বেশি, সেটা এই গবেষণার মাধ্যমে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে দলটি।

নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ঘটে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া। মহাকর্ষের প্রচণ্ড চাপে হাইড্রোজেন বা হিলিয়ামের মতো মৌলের হালকা নিউক্লিয়াসগুলো একত্র হয়ে তৈরি হয় অপেক্ষাকৃত ভারী মৌল এবং তৈরি হয় প্রচণ্ড শক্তি। এরই বহিঃপ্রকাশ নক্ষত্রের বিপুল পরিমাণ তাপ ও আলো। আর তাপ যেখানে থাকবে, সেখানে চাপও থাকবে—এ তো সহজ কথা। এই চাপই বাইরের মহাকর্ষের চাপের মোকাবিলা করতে থাকে। তাই নক্ষত্র একটি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে।

বিপত্তি ঘটে যখন হিলিয়াম বা হাইড্রোজেনের মতো নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। নক্ষত্রের কেন্দ্রের তাপ কমে যায় জ্বালানির অভাবে। কমে যায় অভ্যন্তরীণ চাপ। এই সুযোগেই মহাকর্ষের প্রচণ্ড চাপ বাইরে থেকে নিমেষের মধ্যে পুরো নক্ষত্রকে অস্বাভাবিক রকম সংকুচিত করে ফেলার চেষ্টা করে। ফলাফল প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, সুপারনোভা।

এরপর নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ রূপান্তরিত হয় ভারী উপাদানে। সুপারনোভা বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী যে এখানে পরমাণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একে অপরের কাছে থেকে মৌলিক উপাদান সংগ্রহ করে। তবে শুধু সুপারনোভাই নয়, দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের মধ্যকার সংঘর্ষের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। বোঝা যাচ্ছে, এ ধরনের ভারী উপাদান তৈরির জন্য সুপারনোভা হতে হবে, এমনটা জরুরি নয়। সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা জরুরি।

ভারী উপাদান ছাড়াও সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে উৎপন্ন উপাদানের তালিকায় আছে পি-নিউক্লিয়াস। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ৩০ বা এর বেশি ভরের পি-নিউক্লিয়াস আইসোটোপগুলো আমাদের সৌরজগতেরই দৃশ্যমান ভারী উপাদানগুলোর প্রায় ১ শতাংশ তৈরির জন্য দায়ী। কিন্তু এরা নিজেরা কীভাবে গঠিত হয়, তা এখনো রহস্য।

আইসোটোপ হচ্ছে একই মৌলের ভিন্নরূপ। সাধারণ আইসোটোপে প্রোটনসংখ্যা একই থাকে, পার্থক্য হয় নিউট্রনসংখ্যাতে। পি-নিউক্লিয়াস আইসোটোপের বেলায় নিউক্লিয়াসে প্রোটন, নিউট্রনের চেয়ে অনেক পরিমাণে বেশি থাকে। প্রোটনের এই আধিক্যের কারণে এদের পর্যবেক্ষণ করা খুবই কঠিন। একই কারণে এরা ঠিক কীভাবে কাজ করে, সেটাও বোঝা কঠিন।

সুপারনোভা বিস্ফোরণ পরিমাপের জন্য সারের বিজ্ঞানীরা যে মডেল ব্যবহার করেন, সেটা মূলত একটি গামা প্রক্রিয়া। যেখানে এনার্জিটিক ইভেন্টে পরমাণু থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রোটনগুলোকে ক্যাপচার করে। এতে নতুন পরমাণু হয়, যেখানে নিউট্রনসংখ্যা প্রোটন থেকে অনেক কম থাকে।

কানাডার টিআরআইইউএমএফ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে আইসোটোপ সেপারেটার এবং অ্যাক্সিলারেটর ২ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা আয়নিত এবং তেজস্ক্রিয় রুবিডিয়াম-৮৩ পরমাণুর একটি রশ্মি তৈরি করতে গিয়ে এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করেন। বিমে সংঘটিত এই প্রক্রিয়াগুলো রেকর্ড এবং পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবহার করেন, টিআরআইইউএমএফ (TRIUMF)-আইএসএসি গামা-রে এস্কেপ স্পেকট্রোমিটার এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক মাস অ্যানালাইজার রিকোয়েল মাস স্পেকট্রোমিটার।

গবেষকেরা বলেন, এই ফলাফল পি-নিউক্লিয়াস স্ট্রনটিয়াম-৮৪ উৎপাদনের দিকে ইঙ্গিত করে; যা গামা প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলে যায়। থার্মোনিউক্লিয়ার প্রতিক্রিয়ার হার তাত্ত্বিক মডেলগুলোর ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে বেশ কম থাকার কারণে স্ট্রনসিয়াম-৮৪–এর উৎপাদন বেশি হয়েছিল।

তাঁদের এই গবেষণা সম্পর্কে দলটির প্রধান বিজ্ঞানী লোটে মনে করেন, গামা প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া পরিমাপের জন্য উন্নত ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বিভাজকসহ একটি হাইরেজল্যুশন গামা রশ্মি অ্যারে কাপলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের পরিমাপ বর্তমান প্রযুক্তির নাগালের বাইরে বলেই ধারণা ছিল সবার কাছে। কিন্তু আমাদের এই গবেষণার সফলতা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্স নিউজ, সায়েন্স অ্যালার্ট