এবার ‘রং কেন ছড়ায়’ এ প্রশ্নের উত্তরের দিকে নজর দিতে পারি। তাহলে অন্য প্রশ্নগুলোরও উত্তর বেরিয়ে আসবে। এক চিমটি রং থেকে ছড়ানো ব্যবস্থাকে যদি আমরা জুম করি, যেন রং যে পার্টিকেল দিয়ে তৈরি সেগুলোর ইনডিভিজ্যুয়াল মোশন দেখা যায়। সেই ইনডিভিজ্যুয়াল পার্টিকেলের মোশনকে ভিডিও করা যেতে পারে। তারপর সেই ভিডিও যদি ফরোয়ার্ড এবং রিভার্স করে দেখা যেতে পারে, তাহলে দেখা যাবে, এই দুই মোশনের কোনোটিই ফিজিকসের কোনো সূত্রকেই লঙ্ঘন করছে না। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ফরোয়ার্ড এবং রিভার্স দুটির কোনোটিই পদার্থবিজ্ঞানের কোনো আইন বা সূত্রকে লঙ্ঘন করে না। অথচ ম্যাক্রোস্কপিক্যালি দেখলে ঘটনা কেবল একদিকেই ঘটে। মাইক্রোস্কপিক ওয়ার্ল্ডে দুই দিকেই যাওয়া সম্ভব হলেও ম্যাক্রোস্কপিক এক ডিরেকশনাল। কেন? কেন রিভার্স ঘটনা কখনো দেখি না, যদিও মাইক্রোস্কপিক্যালি উভয় ঘটনাই সম্ভব।

অ্যাটম কিংবা পার্টিকেলের তো প্রাণ নেই যে জেনেবুঝে এগুলো একটি পথ বেছে নেবে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। একটি খেলার মাঠকে ৩০টি ছোট ভাগে মার্ক করা যাক। তারপর ৩টি ভেড়া ছেড়ে দেওয়া হোক। ৩টি ভেড়াকে মার্ক করা ৩ অংশে কতভাবে পাওয়া যেতে পারে? উত্তরটি বোস-আইনস্টাইনের স্ট্যাটিসটিকসের মাধ্যমেও পাওয়া যেতে পারে। কারণ, যেকোনো স্টেটে (মাঠের যেকোনো অংশে) যেকোনো সংখ্যক ভেড়া থাকতে পারে। একটু অঙ্ক করলেই বোঝা যাবে, ভিন্ন রকমের সর্বোচ্চ দশভাবে এগুলো পাওয়া যেতে পারে। ভেড়া যদি তিনটির জায়গায় চারটি হতো, পনেরোভাবে এগুলো পাওয়া যেত। এ রকম যদি দুটি মাঠকে পাশাপাশি আনা হয় এবং মোট ছয়টি ভেড়াকে দুটি মাঠের কোনো একটির এক কোণ থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন কী ঘটবে? ভেড়াগুলো দুই মাঠেই র৵ানডমলি দৌড়াদৌড়ি করতে পারে। এ অবস্থায় যদি ছবি তোলা হয়, তাহলে কী দেখা যাবে? দেখা যাবে, অধিকাংশ ছবিতেই ভেড়াগুলো দুই মাঠে সমানসংখ্যকভাবে ছড়িয়ে আছে। খুব কম ছবিতেই তাদের একটি মাঠের এক কোনায়, যেখান থেকে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পাওয়া যাবে। ভেড়ার সংখ্যা এবং মাঠ বিভক্তির সংখ্যা যদি বাড়ানো হয়, তাহলে আরও বেশি ছবিতে সেগুলোকে ছড়ানোভাবে পাওয়া যাবে। ভেড়ার সংখ্যা এবং মাঠ বিভক্তির সংখ্যা যদি আভোগেড্রো সংখ্যার কাছাকাছি হয়, তাহলে প্রায় শতভাগ ছবিতেই তাদের ছড়ানো অবস্থায় পাওয়া যাবে। কিন্তু কেন?

এবার একটু দেখি কতভাবে তিনটি ভেড়াকে দুটি মাঠে তিনটি করে মোট কতভাবে সাজানো সম্ভব। এর উত্তর হবে ১০০। চারটি ভেড়া একটি মাঠে এবং দুটি অন্য মাঠে কতভাবে সাজানো সম্ভব? উত্তর হলো ৯০। পাঁচটি ভেড়া একটি মাঠে এবং একটি অন্য মাঠে কত ভাবে সাজানো সম্ভব? উত্তর হলো ৬৩। আর ছয়টি ভেড়াকেই একটি মাঠে কত ভাবে সাজানো সম্ভব? উত্তর হলো ২৮ । এখন ভেড়া ৬টির জায়গায় যদি ৮টি আর মাঠকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়, তখন ৪টি এক মাঠে এবং ৪টি অন্য মাঠে মোট ১ হাজার ২২৫ ভাবে সাজানো যেত। আর যদি ভেড়া হতো ১০টি আর প্রতিটি মাঠকে ৮ ভাগে ভাগ করা হতো, তাহলে ৫টি এক মাঠে এবং ৫টি অন্য মাঠে মোট ৬ লাখ ২৭ হাজার ২৬৪ ভাবে সাজানো যেত। আর ১০টি ভেড়াকেই একটি মাঠে সাজানো যেত মাত্র ১৯ হাজার ভাবে। তাই ভেড়া এবং মাঠের সংখ্যা যতই বাড়বে, সবগুলোকে একই জায়গায় পাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত হারে কমতে থাকবে।

তাহলে কী দাঁড়াল? কণার কোনো জীবন নেই যে সেগুলো একটি দিকেই ধাবিত হবে। পানিতে রং কিন্তু ছড়ায় diffusion প্রসেসের মাধ্যমে। আবার ডিফিউশন প্রসেস মানে হলো রঙের কণাগুলো র‍্যানডম ওয়াকে চলে। র‍্যানডম ওয়াক মানে হলো, সব দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা সমান। কিন্তু ম্যাক্রোস্কপিক্যালি রং কেবল ছড়িয়ে যায়। মজার না? রং ছড়িয়ে যায়, কারণ, ছড়ানোভাবে সেগুলোকে এত বেশি ভাবে সাজানো যাবে, এই সংখ্যা অন্যগুলোর তুলনায় প্রায় ডেলটা ফাংশন। এ জন্যই আমরা যখন বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিকস করি, তখন পার্টিকেল আর স্টেটগুলোর মধ্যে কতভাবে সাজানো যায়, বের করে সেটিকে ম্যাক্সিমাইজ করি। কারণ, ম্যাক্সিমাম ডিস্ট্রিবিউশনই হলো মোস্ট প্রবাবল ডিস্ট্রিবিউশন।

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন