বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আয়নিত গ্যাস তিনটি বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে প্লাজমায় পরিণত হয়। ১. কোয়াসি নিউট্রালিটি (Quasi Neutrality), ২. কালেকটিভ বিহেভিয়ার (Collective Behavior) এবং ৩. প্লাজমা কম্পাঙ্ক (Plasma Frequency), সাংঘর্ষিক কম্পাঙ্ক (Collisional Frequency) থেকে বেশি। এখন আমরা এই শর্তগুলোকে সহজে বোঝার চেষ্টা করি।

কোয়াসি নিউট্রালিটি

‘কোয়াসি’ শব্দের অর্থ ‘প্রায়’ এবং ‘নিউট্রালিটি’ শব্দের অর্থ ‘নিরপেক্ষতা’। প্লাজমা প্রায় সমানসংখ্যক আয়ন ও ইলেকট্রন দিয়ে গঠিত হলেও এটি চার্জ নিরপেক্ষ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাজমার ভারী আয়ন হালকা ইলেকট্রন দ্বারা বেষ্টিত থাকে। সেটা এমনভাবে যে আয়নগুলোর বিদ্যুেক্ষত্র প্রায় সম্পূর্ণভাবে ওই বেষ্টনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই বেষ্টনটি গোলক আকৃতির হয়। একে ডিবাই স্ফেয়ার বা ডিবাই গোলক বলে। তাহলে ডিবাই গোলকের ভেতর বিদ্যুেক্ষত্র থাকলেও গোলকটির বাইরে বিদ্যুেক্ষত্র প্রায় শূন্য হয়। ফলে ডিবাই গোলকের ভেতরের স্থানটুকু অনিরপেক্ষ হলেও সম্পূর্ণ প্লাজমা নিরপেক্ষ বা নিউট্রাল হয়। আয়নিত গ্যাসের এই অবস্থাকে কোয়াসি নিউট্রালিটি বলে। এটা প্লাজমার একটি বৈশিষ্ট্য।

কালেকটিভ বিহেভিয়ার

ইলেকট্রন ও আয়ন দিয়ে গঠিত প্লাজমার ক্ষেত্রে আয়নগুলো ইলেকট্রন দিয়ে ঘেরা থাকে। ডিবাই গোলকের অংশগ্রহণ করা ইলেকট্রনের তাপীয় গতি রয়েছে। ফলে এই ইলেকট্রনগুলো ডিবাই গোলকের ভেতর ঢোকে ও বের হয়। এ কারণে আয়নের বিদ্যুেক্ষত্রকে পরিবর্তনশীল ডিবাই গোলক সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখতে পারে না, সামান্য হলেও বিদ্যুেক্ষত্রের কিছুটা ডিবাই গোলকের বাইরে বিস্তৃত থাকে। ফলে আয়নের বিদ্যুেক্ষত্রের প্রভাব ডিবাই গোলকের বাইরের আয়নগুলোর ওপর পড়ে। এভাবে বিদ্যুেক্ষত্রের মাধ্যমে আয়নগুলো একে অপরের গতিবিধিকে প্রভাবিত করে। অন্য কথায় বলা যায়, আয়নগুলো একে অপরের সঙ্গে বিদ্যুেক্ষত্র দিয়ে সংযুক্ত থাকে। এই প্রক্রিয়াকে কালেকটিভ বিহেভিয়ার বলে।

প্লাজমা কম্পাঙ্ক সাংঘর্ষিক কম্পাঙ্ক থেকে বেশি

ডিবাই গোলকের ভেতর ইলেকট্রনগুলো তাদের তাপীয় গতি এবং আয়নিক আকর্ষণের জন্য আয়নকে কেন্দ্র করে দুলতে থাকে। এই দোলনের কম্পাঙ্ককে ইলেকট্রন প্লাজমা কম্পাঙ্ক বা সংক্ষেপে প্লাজমা কম্পাঙ্ক (প্লাজমা ফ্রিকোয়েন্সি) বলে। সাধারণত প্লাজমায় নিরপেক্ষ অণু থাকে। এই নিরপেক্ষ অণুর সঙ্গে ইলেকট্রনের সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষের কম্পাঙ্ককে সাংঘর্ষিক কম্পাঙ্ক (কলিসোনাল ফ্রিকোয়েন্সি) বলে। কোনো আয়নিত গ্যাসকে প্লাজমা হতে হলে অবশ্যই প্লাজমা কম্পাঙ্ক কলিসোনাল কম্পাঙ্কের থেকে বেশি হতে হবে। এটাও প্লাজমার একটি বৈশিষ্ট্য।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রকেটের জেট ইঞ্জিন থেকে যে আয়নিত গ্যাস বের হয়, তা প্লাজমা নয়। কেননা এই আয়নিত গ্যাসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ নিরপেক্ষ অণু থাকে। ফলে নিরপেক্ষ অণুর সঙ্গে ইলেকট্রনের সংঘর্ষের ফ্রিকোয়েন্সি প্লাজমা ফ্রিকোয়েন্সি থেকে বেশি হয়। প্লাজমার তৃতীয় শর্ত ভঙ্গ করে বলে রকেটের জেট ইঞ্জিন থেকে নির্গত গ্যাস আয়নিত হলেও তা প্লাজমা নয়।

অনুমান করা হয়, দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ৯৯ শতাংশ প্লাজমা দিয়ে গঠিত। অবশিষ্ট ১ শতাংশে রয়েছে গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু—এরা কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ দিয়ে তৈরি। প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন কৌশল আইসি (ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট) তৈরি থেকে শুরু করে ছায়াপথের সর্পিল গঠন ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। অন্য কথায়, ন্যানোমিটার (১০-৯ মিটার) পরিসর থেকে শুরু করে কিলোপারসেকস (১০১৯ মিটার) পরিসরের বিষয়বস্তুর বিচিত্র ধর্ম ব্যাখ্যায় প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান অবদান রেখে চলছে। যা হোক, প্লাজমার প্রচলিত গবেষণাক্ষেত্রগুলো হলো প্রকৃতির বিচিত্র ঘটনা, ফিউশন শক্তি, আলোকযন্ত্র, অর্ধপরিবাহী চিপ উত্পাদন (ইচিং, ডোপিং), উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার, ইত্যাদি।

অন্যদিকে আধুনিক জীবনযাত্রাকে এগিয়ে নিতে প্লাজমাভিত্তিক প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত এগিয়ে চলছে। এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত। প্রকৃতির বিচিত্র ঘটনা এবং পরীক্ষাগারে উদ্ভূত বিভিন্ন নতুন নতুন বিষয় ব্যাখ্যা করতে প্লাজমা বিজ্ঞানের পরিধি ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে। প্লাজমা গবেষণার নতুন দুটি ক্ষেত্র হচ্ছে ডাস্টি (কমপ্লেক্স) প্লাজমা ও কোয়ান্টাম প্লাজমা। প্রকৃতির ও গবেষণাগারের বিচিত্র ঘটনা বুঝতে ডাস্টি প্লাজমা কয়েক দশক ধরে প্লাজমা বিজ্ঞানের একটি প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে অর্ধপরিবাহী ও ধাতব পদার্থের বৈশিষ্ট্য, ধাতব ন্যানো স্ট্রাকচার (মেটাল ক্লাস্টার, ন্যানো-পার্টিকেল, থিন ফ্লিম প্রভৃতি), ইত্যাদির বিচিত্র চরিত্র আরও সঠিকভাবে বুঝতে কোয়ান্টাম প্লাজমা নিয়ে গবেষণা ক্রমেই বাড়ছে।

প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকার পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের একটি নবীনতম বিভাগ। এর বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে মৌলিক, অ্যাডভান্সড ও অ্যাপ্লাইড গবেষণা পরিচালনার জন্য কাজ শুরু হয়েছে। ডাস্টি কমপ্লেক্স প্লাজমা, কোয়ান্টাম প্লাজমা, শিল্প প্লাজমা, ডেন্স প্লাজমা ফোকাস ডিভাইস এবং কন্ট্রোল্ড থার্মোনিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা ও প্লাজমাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নে সক্ষমতা গড়ে তোলাই এ বিভাগের প্রধান লক্ষ্য।

লেখক: জ্যেষ্ঠবিজ্ঞানী, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন