লবণাক্ত পানিতে কেন সহজে ভেসে থাকা যায়

মৃত সাগরে মানুষ অনায়াসে ভেসে থাকতে পারেছবি: মিস্টি

বিজ্ঞানের কঠিন কঠিন রহস্য নিয়ে আমরা প্রায়ই মাথা ঘামাই। ব্ল্যাকহোল কী, টাইম ট্রাভেল সম্ভব কি না; এসব নিয়ে তর্কের শেষ নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন আমাদের চোখের সামনে ঘোরে, যেগুলোর উত্তর হয়তো আমরা সেভাবে খুঁজি না। যেমন ধরুন, পুকুরের চেয়ে সমুদ্রের পানিতে সাঁতার কাটা বা ভেসে থাকা সহজ কেন?

আরও মজার প্রশ্ন হলো, পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা কি আছে, যেখানে সাঁতার না জানলেও ডুববেন না? হ্যাঁ, সত্যিই এরকম জায়গা আছে। আপনি সাঁতার না জানলেও সেখানে ভেসে থাকতে পারবেন। জর্ডান ও ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত ডেড সি বা মৃত সাগর। এটিই সেই জায়গা। সেখানে মানুষ আয়েশ করে চিত হয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ে, অথচ ডোবার কোনো ভয় নেই! মিশরের সিওয়া মরূদ্যান বা ওয়েসিসে গেলেও এই জাদুকরী ব্যাপার দেখা যায়।

মৃত সাগর
ছবি: শাটারস্টোক

কিন্তু কেন? এর পেছনে কি কোনো জাদু আছে? না, এর পেছনে আছে বিজ্ঞান। পদার্থবিজ্ঞানের ছোট্ট দুটো বিষয়ের কারণে মানুষ পানিতে অনায়াসে ভেসে থাকতে পারে। একটি ঘনত্ব, অন্যটি প্লবতা।

বিষয়টি বোঝার জন্য স্কুলের সেই পুরোনো পড়াটা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ইউরেকার গল্প মনে আছে। একবার রাজা তাঁকে রাজমুকুটের স্বর্ণ পরীক্ষার ভার দেন। স্বর্ণে খাদ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে আর্কিমিডিসকে। তাও করতে হবে রাজার মুকুটটা না ভেঙে। কিন্তু কিছুতেই কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

আরও পড়ুন
জর্ডান ও ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত ডেড সি বা মৃত সাগর। এটিই সেই জায়গা। সেখানে মানুষ আয়েশ করে চিত হয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ে, অথচ ডোবার কোনো ভয় নেই!

তিনি একদিন বাথটাবে নামেন গোসলের জন্য। পানিতে নামতেই বাথটাবের কিছু পানি উপচে নিচে পড়ে যায়। অমনি তিনি ইউরেকা ইউরেকা বলে চিৎকার শুরু করেন। ইউরেকা মানে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, পেয়েছি! পেয়েছি! কী পেয়েছেন? স্বর্ণে খাদ আছে কিনা, তা প্রমাণের একটা উপায় পেয়েছেন।

আসলে বাথটাবের পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে আর্কিমিডিসের শরীরের আয়তনের সমান পানি উপচে পড়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, যতটুকু পানি সরানো হবে, সেই পানিটুকুও আপনাকে উল্টো দিকে একটা ধাক্কা দেবে। এই ধাক্কাকেই বলে প্লবতা।

আর্কিমিডিসের বিখ্যাত ইউরেকা মুহূর্ত
ছবি: আন্দ্রি ঝেজেরা / শাটারস্টোক

এখন নিয়মটা খুব সোজা। আপনার শরীরের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের চেয়ে বেশি হলে আপনি পানিতে ভাসতে পারবেন না। মানে পানি আপনাকে ভাসিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু যদি উল্টো হয়? মানে আপনার শরীরের ঘনত্ব যদি পানির চেয়ে কম হয়? তাহলেই আপনি ভেসে থাকবেন।

আমরা সাধারণত মিঠা পানিতে মানে পুকুর বা সুইমিং পুলে ভেসে থাকতে পারি। সেটা অনায়াসে না, হাত-পা চালিয়ে ভেসে থাকতে পারি। কারণ আমাদের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। শিশুদের শরীরে পানির পরিমাণ আরও বেশি, প্রায় ৭৮ ভাগ। যেহেতু আমাদের শরীর মূলত পানি দিয়েই তৈরি, তাই আমাদের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের চেয়ে খুব একটা বেশি নয়। ফুসফুস ভর্তি বাতাস রাখলে আমরা অনায়াসেই ভেসে থাকি।

আরও পড়ুন
বাথটাবের পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে আর্কিমিডিসের শরীরের আয়তনের সমান পানি উপচে পড়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, যতটুকু পানি সরানো হবে, সেই পানিটুকু আপনাকে উল্টো দিকে একটা ধাক্কা দেবে।

এবার আসি লবণের গল্পে। পানিতে লবণ মেশালে কী হয়? লবণের অণুগুলো ভেঙে গিয়ে পানির অণুর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে। রসায়নের ভাষায় বললে, সোডিয়াম আর ক্লোরাইড আয়নগুলো পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়।

ফলে পানির ওজন বা ঘনত্ব যায় বেড়ে। এক গ্লাস সাধারণ পানির চেয়ে এক গ্লাস নোনা পানি অনেক বেশি ভারী। আর পানি যত বেশি ঘন বা ভারী হবে, তার ওপরের দিকে ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা বা প্লবতা তত বেড়ে যাবে।

মৃত সাগরের পানিতে লবণের পরিমাণ সাধারণ সমুদ্রের চেয়ে অনেক বেশি
ছবি: ডেড সি ডটকম

মৃত সাগরের পানিতে লবণের পরিমাণ সাধারণ সমুদ্রের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। সাধারণ পানির ঘনত্ব যদি হয় ১০০০ কেজি/কিউবিক মিটার, তবে মৃত সাগরের পানির ঘনত্ব প্রায় ১২৪০ কেজি/কিউবিক মিটার!

এই পানি এতই ঘন যে, আপনার শরীরকে পানি প্রচণ্ড জোরে ওপরের দিকে ঠেলে রাখে। মহাকর্ষ শক্তি আপনাকে নিচে টানার চেষ্টা করলেও পানির এই বাড়তি ঘনত্ব আপনাকে ডুবতে দেয় না। ও কারণেই মৃত সাগরে মানুষ ভেসে থাকে অনায়াসে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন