আলোর সন্ধানে সত্যেন
১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রদান করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। পাশাপাশি তিনি গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মদিনে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
সত্যেন ও মেঘনাদকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিজ্ঞান বিভাগ ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্সের প্রভাষক করা হলো, কিন্তু নতুন বিজ্ঞান পড়াতে হলে নতুন বই চাই। কোথায় পাওয়া যাবে? আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ওপর বই ছিল (মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন বসু মূল জার্মান থেকে আইনস্টাইন অনুবাদ করছিলেন), কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব কোথায় পাওয়া যাবে—পড়তে হবে বোল্টজমান, কারশফ, প্ল্যাঙ্ক! এখানে মনে রাখতে হবে, তখনো হাইজেনবার্গ, শ্রোডিঙ্গারের মতো দিকপালের আবির্ভাব হয়নি। তখন তাঁরা খোঁজ পেলেন ব্রুহল (Dr. Paul Johannes Bruhl) নামের এক জার্মান ভদ্রলোকের, যিনি কিনা কলকাতার অদূরে শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবই পড়াতেন—পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূবিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, কৃষি। প্রায় পায়ে হেঁটেই মানুষটি ২৬ বছর বয়সে জার্মানি থেকে দানিয়ুব নদীর তীর ধরে তুরস্ক–পারস্য হয়ে পৌঁছেছিলেন করাচিতে ১৮৮১ সালে। সেখান থেকে জলপথে কলকাতায়। তারপর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজে পড়ালেন এক বছর। এরপর ১৮৮৭ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত ২৫ বছর পড়ালেন শিবপুর কলেজে। এই কৌতূহলোদ্দীপক মানুষটির কাছে ছিল দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ। সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহা তাঁর কাছ থেকে ধার করে আনলেন প্ল্যাঙ্ক, বোল্টজমান ও ভিয়েন (Wien)—জার্মান ভাষায় লেখা পদার্থবিদ্যার বই। ব্রুহল যখন ইউরোপ ছেড়েছিলেন, তখন সবে ‘কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সমস্যা’ নিয়ে নতুন পদার্থবিদ্যার ভিত্তিভূমি রচিত হচ্ছে, কেমন করে কলকাতায় বসে ব্রুহল নতুন গবেষণার বই সংগ্রহ করলেন, সেটা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। ব্রুহলের কাছ থেকে বই জোগাড় করার চার বছর পর, ১৯২১ সালে, সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার হিসেবে যোগ দিলেন।
আমরা জানি, সত্যেন বসু তাঁর মূল কাজটি ঢাকায় বসে করেছিলেন। কিন্তু ১৯১৭ থেকে ১৯২১—এই চার বছর তাঁর মৌলিক গবেষণার ভিত্তি স্থাপনের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকেরা অনেকেই ‘কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সমস্যা’ সম্পর্কে জানেন, তবু এ আলোচনার পূর্ণাঙ্গতার স্বার্থে ওই বৈজ্ঞানিক সমস্যা সম্পর্কে কিছুটা বলি। কারণ, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শুরুই হয়েছিল ওই সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে। কৃষ্ণবস্তুটি কী? এটি হলো একটি আদর্শায়িত কালো বস্তু, যা কিনা সব আপতিত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ শুষে নেবে, কিন্তু নিজে তার তাপমাত্রা অনুযায়ী আলো বিকিরণ করবে। ১৮৫৯ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কারশফ আমাদের আদর্শায়িত কৃষ্ণবস্তুর ধারণাটি দিয়েছিলেন—একটি চুল্লিকে কালো রং করে, তাপ কুপরিবাহী বস্তু দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে, তাতে শুধু একটা গর্ত (গর্তটির দেয়ালও কালো রঙের হবে) রাখতে হবে, যার মাধ্যমে চুল্লির বিকিরণটা বের হতে পারে। এর ফলে বাইরে থেকে আগত সব আলোকতরঙ্গ সেই গর্তে বা ভেতরের প্রকোষ্ঠের কালো রঙে শোষিত হয়ে যাবে। অন্যদিকে চুল্লি থেকে উদ্ভূত বিকিরণটি বাইরে দেখা যাবে। আমাদের ব্যবহারিক জগতে যেকোনো বস্তুকেই কৃষ্ণবস্তু বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে, যেমন সূর্য একটি কৃষ্ণবস্তু, এমনকি আমাদের দেহের বিকিরণকেও কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে ধ্রুপদ বিজ্ঞানের ভাবীকথন অনুযায়ী বস্তুর তাপ থাকলেই তার থেকে বিকিরণ বের হবে, আর বস্তুর তাপমাত্রা যত বেশি হবে, তত উচ্চশক্তিতে সেই বস্তু আলো বিকিরণ করবে। একটি কৃষ্ণবস্তু (তাপীয় সাম্যাবস্থায় (thermal equilibrium) আলোক (বা বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ) বিকিরণ করবে প্রতিটি কম্পাঙ্কেই এবং কম্পাঙ্ক যত বেশি হবে, তত বেশি সে শক্তি বিকিরণ করবে।
ছবিতে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালি দেখানো হচ্ছে– x-অক্ষে কম্পাঙ্ক এবং y-অক্ষে বিকিরণের পরিমাণ বা শক্তি। র৵ালে-জিনসের রাশি দিয়ে এই বর্ণালি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছিল—কম্পাঙ্কের মান কম হলে সেটি পরীক্ষালব্ধ মানের সঙ্গে মিলে যায়, কিন্তু উচ্চ কম্পাঙ্কে সেটি মেলে না; বরং অসীমের দিকে ধাবিত হয়। এটিকে তখনকার দিনে অতিবেগুনি বিপর্যয় (Ultraviolet Catastrophe) বলে আখ্যায়িত করা হতো। বিপর্যয় কেন? কারণ, অতিবেগুনি আলোর কম্পাঙ্কে দৃশ্যমান র্যালে-জিনস রাশিটির মানটি প্রায় অসীম হয়ে যাচ্ছিল।
পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত এই বর্ণালি প্ল্যাঙ্কের আগে ধ্রুপদি বা সনাতনী পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। এরপর ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ১৯০০ সালে সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দেখালেন, তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণকে যদি অবিচ্ছিন্ন না ধরে ছোট ছোট পৃথক অংশের (কোয়ান্টাম) মিলিত ফল হিসেবে ধরা যায়, তবে এমন একটি রাশি পাওয়া যাবে, যেটি কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালিকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। এই রাশি ২ নম্বর চিত্রে দেখানো হয়েছে। বর্তমানে ওই ছোট পৃথক অংশগুলোকে আমরা আলোর কণিকা বা ফোটন নামে অভিহিত করি। সত্যেন বসু প্ল্যাঙ্কের এই সূত্র বা রাশিই অন্যভাবে আহরণ করেছিলেন এবং সেটিও যুগান্তকারী ছিল। পুরোনো একটি রাশিকে আবার নতুন করে আহরণ করা কেন কালোত্তীর্ণ হতে পারে, সেটা বলার আগে আমরা র্যালে-জিনস ও প্ল্যাঙ্ক রাশি দুটো নিয়ে আলোচনা করব।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, কৃষ্ণবস্তুর ভেতরে যে গহ্বর আছে, সেখানে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। সেই তরঙ্গের উৎস হলো ওই গহ্বরের দেয়াল। ওই সময়ে পরমাণু ও তার মধ্যে ইলেকট্রনের অবস্থান সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা জানতেন না, তাঁরা বলতেন, দেয়ালে অবস্থিত একধরনের দোলক (Oscillator) থেকে তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে। এই দোলক যে কম্পাঙ্কে দুলবে, সেই কম্পাঙ্কের তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হবে। একেকটি কম্পাঙ্কের জন্য একেকটি তরঙ্গ। একটি নির্দিষ্ট আকারের গহ্বরে বিভিন্ন কম্পাঙ্কের কয়টি তরঙ্গের উপস্থিতি সম্ভব? কীভাবে সেটা গণনা করা যাবে, তার মধ্যে না গিয়ে চূড়ান্ত ফলটি লিখছি—একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের-পরিক্ষেপে (অর্থাৎ range-এ, f থেকে f + df) এটি হলো 8πf2/c3 । এখানে f হলো কম্পাঙ্ক এবং c হলো আলোর গতিবেগ। এটিকে আমরা দশার সংখ্যা বা দশার ঘনত্ব বলতে পারি। ২ নম্বর ছবিতে এই রাশিকে র্যালে-জিনস এবং প্ল্যাঙ্কের অভিব্যক্তির প্রথমেই দেখতে পাবেন। খুব সরলভাবে কি এই রাশির ব্যাখ্যা করা যায়? মনে করুন, ১০০ থেকে ১০০০ মানের কম্পাঙ্কের মধ্যে ৫টি তরঙ্গের উপস্থিতি সম্ভব, আমি যদি ৫-কে প্রতিটি তরঙ্গের শক্তি দিয়ে পূরণ করি, তাহলে ওই কম্পাঙ্কগুলোর তরঙ্গগুলোর মোট শক্তি পাওয়া যাবে, যেটা ২ নম্বর ছবিতে y-অক্ষে দেখানো হয়েছে। র্যালে-জিনসের রাশিটিতে তরঙ্গের গড় শক্তি ধরা হয়েছে kT (এখানে k বোল্টজমান ধ্রুবক ও T হলো তাপমাত্রা), কাজেই মোট শক্তি হবে [8πf2/c3]/ kT। । এটা ঠিক শক্তি নয়, বরং বলা যায় শক্তির ঘনত্ব।
আগেই বলেছি, এই র্যালে-জিনসের রাশিটি কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালি ব্যাখ্যা করতে পারল না। এ ছাড়া ভিনের একটি রাশি ছিল, যেটি কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালিকে র্যালে-জিনসের থেকে হয়তো আরেকটু ভালো করে ব্যাখ্যা করত, তবু উঁচু কম্পাঙ্কে সেটা কাজ করল না। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ১৯০০ সালে দেখালেন, বিকিরণকে বিচ্ছিন্ন শক্তির মিলিত ফল হিসেবে ধরলে আমরা kT-এর বদলে পাব hf/(ehf⁄kT-1)। এখানে h হলো প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। কীভাবে প্ল্যাঙ্ক এটি আহরণ করলেন, সেটা আজকের আলোচনার বাইরে রাখতে হবে, তবে একটি কথা বলা বাঞ্ছনীয়—এই সমস্যায় প্ল্যাঙ্ক এনট্রপির ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। শক্তিকে (বা কণাদের) কত বেশি ‘উপায়ে’ বিন্যস্ত বা বিতরণ করা যায়, এনট্রপি সেটার পরিমাপক, একটা বদ্ধ সিস্টেম ক্রমাগতই বেশি এনট্রপির দিকে যাবে এবং তাপীয় সাম্যাবস্থায় সর্বোচ্চ এনট্রপিতে থাকবে। এই কণা বা শক্তিগুলো সর্বোচ্চ এনট্রপিতে থাকবে—এই নীতি অবলম্বন করে প্ল্যাঙ্ক দেখালেন যে বিচ্ছিন্ন কোয়ান্টাম কণাগুলোর শক্তিকে hf দিয়ে বর্ণনা করা যায়।
প্ল্যাঙ্ক তাঁর রাশিটি আহরণ করতে ধ্রুপদ বিজ্ঞানের সঙ্গে নতুন কোয়ান্টামবিজ্ঞান মিশিয়েছিলেন। ধ্রুপদ বিজ্ঞান কোনটি? খেয়াল আছে কৃষ্ণবস্তুর গহ্বরে কত ধরনের তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে, সেটা গণনা করা হয়েছিল অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গ দিয়ে, সেটা হলো ধ্রুপদ পদ্ধতি। অথচ প্ল্যাঙ্ক শক্তি গণনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করলেন একক বিচ্ছিন্ন কণার কোয়ান্টাম ধারণা। গণনার ক্ষেত্রে বিকিরণ একই সঙ্গে তরঙ্গ ও কণা হতে পারে না, হয় তাকে অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গ হিসেবে ভাবতে হবে, নইলে পৃথক কণা হিসেবে গণ্য করতে হবে। এই যে অসামঞ্জস্য, সেটা পরবর্তী ২০ বছর ডিবাই, আইনস্টাইন, পাউলি, আরও দু-একজন বিজ্ঞানী দূর করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পুরোপুরি সফল হলেন না। এই সময়ে পৃথক কণা হিসেবে আলোকে গ্রহণ করার ব্যাপারে অনেক আপত্তি ছিল।
১৯২৪ সালের মার্চ মাসে মেঘনাদ সাহা ঢাকায় এলেন এবং সত্যেন বসুর সঙ্গে প্ল্যাঙ্ক পদ্ধতির যৌক্তিক অসামঞ্জস্য দূর করতে পরবর্তী বিজ্ঞানীদের গবেষণা নিয়ে আলোচনা করলেন। তত দিনে মেঘনাদ সাহা আলোর কোয়ান্টাম চরিত্রকে তাঁর গবেষণায় ব্যবহার করছিলেন, বিশেষত আলোর কণার যে ভরবেগ p = hf/c আছে, এই ধারণাকে।
দুই মাসের মধ্যে সত্যেন বসু প্ল্যাঙ্কের রাশিটি প্রণয়ন করলেন কোনো যৌক্তিক অসামঞ্জস্য ছাড়াই। ৪ জুন, ১৯২৪ সাল। সত্যেন বোস আইনস্টাইনকে একটি গবেষণাপত্র পাঠালেন একটি চিঠিসহ, ‘এটি সম্বন্ধে আপনি কী মনে করেন, তা জানতে আমি উদ্বিগ্ন আছি। আপনি লক্ষ করবেন যে প্ল্যাঙ্কের সূত্রের 4πf2/c3 সহগটি আমি সনাতনী তড়িৎ-গতিবিদ্যার ওপর নির্ভর না করেই নির্ণয় করেছি; আমি কেবল ধরে নিয়েছি যে দশা-দেশে একেবারে প্রাথমিক অঞ্চলের আয়তন হলো h3…’
এটি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। প্ল্যাঙ্ক ধরে নিয়েছিলেন যে কৃষ্ণবস্তুর দেয়ালে একধরনের দোলক বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি করে এবং সেই তরঙ্গের কম্পাঙ্ক দোলকের কম্পাঙ্কের সমান। তত দিনে অবশ্য দোলকগুলো যে পরমাণু, সেটা বোঝা গিয়েছিল। সত্যেন বসু দোলকের ধারণার মধ্যেই গেলেন না, বরং ধরে নিলেন কৃষ্ণবস্তুর গহ্বর আলোর কোয়ান্টাম কণিকা (বর্তমানে আমরা যাকে ফোটন বলি) দিয়ে ভর্তি। এরপর বের করলেন একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের–পরিক্ষেপে (f থেকে f + df) কয়টি অবস্থান (বা কয়টি দশায়) ওই কণাগুলো নিতে পারে। এর জন্য ব্যবহার করলেন কণার ভরবেগ ত্রিমাত্রিক ভরবেগ px, py, pz এবং ত্রিমাত্রিক স্থান x, y, z। এই পদ্ধতিতে পেলেন 4πf2/c3। এরপর একটি আলোর কণার দুটি পোলারাইজেশন (কৌণিক ভরবেগের কারণে) দশার জন্য শেষোক্ত রাশিটিকে ২ দিয়ে পূরণ করলেন। চন্দ্রশেখর রমনের একটি পেপার থেকে আমরা জানতে পারি, সত্যেন বসুর মূল গবেষণাপত্রে ২ দিয়ে পূরণ করার ব্যাপারে ওপরের ব্যাখ্যাটি দেওয়া ছিল, কিন্তু আইনস্টাইনের অনুবাদে সেই ব্যাখ্যা বাদ পড়ে।
এরপরের পদক্ষেপে সত্যেন বসু ব্যবহার করলেন নতুন পরিসংখ্যান পদ্ধতি। এতে একটি কোয়ান্টাম আলোক কণাকে অন্য একটি আলোক কণা থেকে আলাদা করা সম্ভব নয় এবং একটি কোয়ান্টাম দশায় একাধিক কণা থাকতে পারে। তাহলে n সংখ্যক কণাকে g সংখ্যক দশায়—
W=(n+g-1)!/n!(g-1)! সংখ্যকভাবে সাজানো যেতে পারে। যেমন n = ২টি কণাকে g = ৩টি দশায় বিন্যস্ত করার ৬টি বিভিন্ন ‘উপায়’ আছে। একটি তাপীয় সাম্যাবস্থায় সর্বাধিক ‘উপায় থাকবে’ এই নীতি অবলম্বন করে এই বিন্যাস থেকে সত্যেন বসু hf/(ehf⁄kT-1) রাশিটি প্রণয়ন করলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে সত্যেন বসুর এই কাজের দুটি দিক আছে, একটি হলো কোয়ান্টাম কণার ভরবেগ ও স্থানের ওপর ভিত্তি করে দশার ঘনত্ব বের করা। আর দ্বিতীয়টি হলো ওই কণাগুলোর শক্তি নির্ণয়ের জন্য একটি নতুন পরিসংখ্যান তত্ত্ব দেওয়া। এই দ্বিতীয় অংশের জন্যই কিন্তু তিনি বিখ্যাত, যাকে আমরা এখন বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান বলি। কিন্তু আইনস্টাইন যখন তাঁর গবেষণাপত্রটি অনুবাদ করেছিলেন, তখন পত্রিকার সম্পাদককে শুধু প্রথম সহগটির কথাই উল্লেখ করেছিলেন। তবে ১৯২৫ সালে আইনস্টাইন সত্যেন বসুর পরিসংখ্যান ব্যবহার করলেন গ্যাসীয় অণুর ওপর এবং ধারণা করলেন চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় অণুসমূহ বোস কণার মতো আচরণ করবে এবং একটি অভিন্ন কোয়ান্টাম দশায় থাকবে। বস্তুর এই অবস্থাকে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট বলা হয়। ২০০১ সালের নোবেল পুরস্কার তিনজন বিজ্ঞানীকে দেওয়া হয়, যাঁরা রুবিডিয়াম ও সোডিয়াম পরমাণুর গ্যাসে এই অবস্থা সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সত্যেন বসু যখন তাঁর পরিসংখ্যান প্রণয়ন করেছিলেন, তখনো কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বলতে আমরা এখন যা বুঝি, তার সৃষ্টি হয়নি, শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ বা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব প্রণীত হয়নি। ১৯২৪ সালে দুটি কালজয়ী গবেষণাপত্র লেখার পর তিনি দুই বছর ইউরোপে কাটালেন, মেরি কুরি, আইনস্টাইনসহ অনেক প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ পেলেন, কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে বহু বছর আর কিছু লিখলেন না। তাঁর ইউরোপ যাওয়া ও তাঁর ওপর আইনস্টাইনের প্রভাব কি তাঁর বিজ্ঞান গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব রেখেছিল? ভবিষ্যতের কোনো লেখায় এই নিয়ে কিছু বলার আশা রাখি।
লেখক: অধ্যাপক ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ, মরেনো ভ্যালি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়া
